উচ্চ আদালতের রায় এবং রাজনীতিতে নতুন তরঙ্গ
২০০০ ডেস্ক
উচ্চ আদালতে সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়ায় রাজনীতিতে নতুন তরঙ্গ তৈরি রয়েছে। মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বিচারের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই উদ্বিগ্ন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন।
পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখলকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে কিনা? আদালতের রায়ে এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। রায়ে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতায় আসার পথ বন্ধ করতে জাতীয় সংসদ শাস্তি নির্ধারণ করে আইন পাস করতে পারে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিচারের জন্য আইন প্রণয়ন করার প্রয়োজন নেই। দ-বিধি অনুযায়ীই তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব। আইনের আদালতে স্বৈরশাসকদের বিচার না হলেও জনতার আদালতে অনেক আগেই বিচার হয়ে গেছে। এখন তারা ইতিহাসের কাঠগড়ায়।
বিচারের ব্যাপারে সরকার চুপ থাকলেও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সেনাশাসক ও তাদের দোসরদের বিচার ও শাস্তি দাবি করেছে আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের শরিক দলগুলো। ভবিষ্যতে কেউ যাতে অবৈধ উপায়ে অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করতে, গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত করতে না পারে তার জন্যই অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী জীবিত বা মৃত যেই হোন না কেন তার বিচার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন মহাজোটের অনেক নেতা। এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, যারা বন্দুকের নল উঁচিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, গণতন্ত্রকে পদদলিত করেছে তাদের বিচার হওয়া উচিত। মহাজোটের শরিক ও ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, স্বৈরাচার বা স্বৈরশাসকের কোনো ভালো সূত্র নেই। এরা আসে অবৈধ উপায়ে। যারা অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখল করেছে জীবিত বা মৃত যেই হোন না কেন তাদের বিচার হওয়া উচিত। জোটের অন্য শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অভিযোগে সাবেক সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল হয় ২০০৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। মামলা নম্বর ২৫, ধারা ১২৪। ওই মামলায় এরশাদকে আসামি করা হয়। অবৈধ ক্ষমতা দখল প্রসঙ্গে হাসানুল হক ইনু বলেন, অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখলকারী সে যেই হোন তার বিচার করতে হবে। এরশাদ এখন আপনার জোটের শরিক। তার বিচার চান কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মহাজোটের শরিক বলে এরশাদ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তার বিচার হওয়া জরুরি।
সংবিধান হচ্ছে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। জনগণই সব ক্ষমতার মালিক। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। এ আইনের ওপর সামরিক আইনসহ কোনো আইনের অবস্থান হতে পারে না। বন্দুকের নল দিয়ে ক্ষমতা নিয়ে আইন পাস করলে তা বৈধতা পায় নাÑ তা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। এখন মূল আলোচনার বিষয় হচ্ছে শাস্তি কী এবং শাস্তি কীভাবে দেওয়া যাবে। আদালত বলেছে, সংসদ এ বিষয়ে আইন পাস করতে পারে। সামরিক আইন জারির ফসল যারা ভোগ করেছে তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তাদের রয়েছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্লাটফরম। রায় যাদের বিপক্ষে গেছে তারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। এই রাজনৈতিক দল কী ভূমিকা নেয় তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। জেনারেল জিয়ার সৃষ্ট বিএনপি এখন প্রধান বিরোধী দল, আর জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি মহাজোটের প্রধান শরিক। মন্ত্রিসভায় তাদের সদস্য রয়েছে। এই অবস্থায় জিয়া ও এরশাদের বিচার করা কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। বিচার প্রশ্নে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নৈতিক অবস্থান কী হবে তা ভেবে দেখার বিষয়। আদালতের রায়কে কীভাবে দেখছেন ও জাতীয় পার্টির অবস্থান কী প্রশ্নে এইচএম এরশাদ বলেন, আদালতের রায়কে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করছি। সম্পূর্ণ রায় জানার পরে পূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানাব। তবে আমি যা করেছি তা জনগণের মঙ্গলের জন্য করেছি। এ প্রসঙ্গে বিএনপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আদালতের রায়কে স্বাগত জানাই। তবে এ রায় এখন সরকার কীভাবে বাস্তবায়ন করবে সেটাই বড় বিষয়। আপনি উভয় স্বৈরশাসকের দোসর ছিলেনÑ এ বিষয়ে এই সিনিয়র বিএনপি নেতা বলেন, জিয়া ও এরশাদ যখন সামরিক শাসন জারি করে সংবিধান লঙ্ঘন করেন তখন আমি তাদের সঙ্গে ছিলাম না। আমি তাদের রাজনীতির সঙ্গে অনেক পরে সম্পৃক্ত হয়েছি।
সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়ায় রাজনীতিতে হঠাৎ ঝড়োহাওয়ার পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে। জিয়ার মরণোত্তর ও এরশাদের বিচার করতে গেলে তা বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ভালোভাবে নেয়ার সম্ভাবনা নেই। বিষয়টি নিয়ে উভয় দলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্নেল তাহের হত্যা। নিয়মবহির্ভূতভাবে যেভাবে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল তা জাতির এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আদালত ওই বিচারের গোপন নথিও চেয়ে পাঠিয়েছে। এতে বিএনপির রাজনীতি নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপি সঙ্কটময় মুহূর্ত পার করছে। দুর্নীতি, লুটপাট, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে মামলায় দলটি অনেকটা বিপর্যস্ত। সেই জায়গা থেকে উত্তরণের জন্য খালেদা জিয়া ঈদের পরে দেশ বাঁচানোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে রাজনীতি সংঘাতের দিকে মোড় নিচ্ছে।
তবে আদালতের রায়ে একটা বিষয় নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের মালিক বন্দুকের নল নয়, জনগণ। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সেই সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।


