নেপালের পুনরুদ্ধারকৃত ‘স্বর্গ’ শফিকুর রহমান
প্রবেশপথে বিশাল এক কাঠের তোরণ। যাতে অঙ্কিত রয়েছে নেপালের ঐতিহ্যবাহী নকশা। বারদিয়া ন্যাশনাল পার্কে ঢুকতেই আপনার কানে আসবে বিহঙ্গের কিচিরমিচির আর শাখামৃগের দাপাদাপির শব্দ। আপনি হয়তো মনে করতে পারেন, এ আর নতুন কি, এসব তো হরহামেশাই শোনা যায়, দেখা যায়। কিন্তু যতই ভেতরে যাবেন, ততই বিস্মিত হবেন। শেষ পর্যন্ত চোখ কপালে গিয়ে ঠেকতে পারে। বৃক্ষ, পাখি ও জন্তুপ্রেমী পর্যটকদের জন্য বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক অসাধারণ এক স্পট। শুনলে হয়তো অবাক হবেন, ইতিহাস দীর্ঘদিনের হলেও নেপালের পর্যটন মানচিত্র থেকে এটি হারিয়ে যেতে বসেছিল। মাওবাদী বিদ্রোহের কারণে বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক বনে গিয়েছিল রণক্ষেত্র। বিদ্রোহীরা অস্ত্র ছেড়ে প্রচলিত রাজনীতিতে আসায় এখন ফিরে পেতে শুরু করেছে পুরনো রূপ।
বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক আসলে নদীতীরস্থ বন। জায়গায় নামানুসারেই যার নামকরণ। অবস্থান নেপালের পশ্চিমে। বর্তমান আয়তন ৯৬৮ বর্গকিলোমিটার। এখানে সংরক্ষিত বন স্থাপনের উদ্যোগটি গ্রহণ করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৮১৫ সালে। শুরুতে ভারত পর্যন্ত প্রসারিত ছিল এর সীমানা। নেপালেও আয়তন কমে গেছে। নেপালগঞ্জ থেকে প্রাদেশিক রাজধানী ডি দিপায়াল পর্যন্ত বিস্তৃত যে বনটি নয়া মুলুক (নতুন দেশ) নামে পরিচিত ছিল একটা সময়ে, সেটিই কমতে কমতে আজকের বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক। বন্যহাতি এখানে ঘুরে বেড়ায় যত্রতত্র। এক-শিঙা গণ্ডার ও ঘড়িয়ালের (কুমিরের আত্মীয়) দেখা প্রায়ই মেলে। ভাগ্য ভালো থাকলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখাও পেয়ে যাবেন। রয়েছে গাছের রেকর্ডভুক্ত ১০৮টি প্রজাতি। এখানেই শেষ নয়, অন্যান্য পাখির পাশাপাশি শিং ও লম্বা ঠোঁটযুক্ত কালো সারস স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। প্রকৃতির সান্নিধ্যে এত কিছু দেখার সুযোগ হয়তো অন্য কোথাও নাও পেতে পারেন।
প্রতিবেশব্যবস্থার বৈচিত্র্য সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় রয়্যাল কার্নালি ওয়াইল্ডলাইফ রিজার্ভ। পরবর্তী সময়ে নাম পাল্টিয়ে রাখা হয় বারদিয়া পার্ক। এশিয়ার বিপন্ন বাঘদের নিরাপদ স্থান হিসেবে পার্কটি এখন পশ্চিম নেপালের গর্ব। বনের উত্তরে শক্তিশালী হিমালয়। পশ্চিম থেকে দক্ষিণে বয়ে গেছে কার্নালি নদী, এঁকেবেঁকে। ওই অঞ্চলের ১৫০০ থারু আদিবাসী পরিবারকে ১৯৮২ সালে পুনর্বাসন করা হয় পার্কের বাইরে। উদ্দেশ্য গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর বিকাশ। ফলে এ অসংখ্য প্রজাতির জন্য পার্কটি হয়ে পড়ে স্বর্গ। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতেই ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর ন্যাচার কনজারভেশনের উদ্যোগে চিতওয়ান অঞ্চল থেকে ৮৩টি গণ্ডার ধরে এনে ছাড়া হয় পার্কের ভেতর। সেই সঙ্গে সীমানা বর্ধিত করা হয় বাবাই নদী উপত্যকা পর্যন্ত। ১৯৮৮-তে রাজকীয় ডিক্রিবলে বারদিয়া পায় ন্যাশনাল পার্কের স্ট্যাটাস এবং খুব দ্রুতই হয়ে পড়ে নেপালের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বিকাশের প্রধান কেন্দ্র। এরপরই নেমে আসে দুর্যোগ।
১৯৯০-এর দশকের শেষ এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক বনে যায় মাওবাদী বিদ্রোহীদের চারণভ‚মি। রাজতন্ত্রবিরোধী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা জড়ো হতে শুরু করে কার্নালি নদী উপত্যকায়। অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং প্রচুর লোক সমাগমের কারণে এক পর্যায়ে পার্কের হরিণের সংখ্যা নেমে আসে ৫৫ হাজার থেকে ১০ হাজারে। এক পর্যায়ে বারদিয়া উপাধি পায় ‘হারিয়ে যাওয়া স্বর্গ’।
শান্তির সুবাতাস
নেপালে শান্তি ফিরে আসায় আবার চঞ্চল হয়ে ওঠে বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক। আর এতে ফের নড়েচড়ে বসেন স্থানীয় পরিবেশপ্রেমীরা। তাদের চাপের মুখে সরকার বাধ্য হচ্ছে পার্কের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত নিত্য-নতুন কৌশল গ্রহণে। প্রাণীর সংখ্যা ইতিমধ্যে আবার বাড়তে শুরু করেছে। থারু আদিবাসীসহ অন্য স্থানীয়রা এর সুফলও পাচ্ছে বেশ। পার্কের ভেতরের ন্যাচার গাইড, হাতির মাহুত ও নিয়মিত স্টুয়ার্ডদের ৯৫ শতাংশই বারদিয়ার স্থানীয় লোকজন। এ প্রসঙ্গে নেপালের পরিবেশবিদ বীরু খাণ্ডারে বলছিলেন, ‘প্রাকৃতিক পরিবেশ, পর্যটন ও ব্যবসার মধ্যে রয়েছে প্রগাঢ় সম্পর্ক। পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পর বারদিয়া অঞ্চলের তরুণরা দলে দলে ছুটছিল শহরের দিকে। ফলে চাপ বাড়ছিল আশপাশের শহরগুলোর ওপর। এখন তারাই আবার আসতে শুরু করেছে।
বারদিয়া ফিল্ড গাইড সুবাস গুরুং জানান, বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক পুরনো রূপ ফিরে পাওয়ায় স্থানীয় আদিবাসীরা দারুণ খুশি। তার হাতির পিঠে সওয়ার হন মূলত জীববৈচিত্র্য গবেষক এবং এরা সবাই বিদেশি। সুবাস গুরুং নিয়মিতই ট্রিপ পান এখন। গত ৬ মাসে তিনি ৪০টি বাঘ ও ১০০টি গণ্ডারের দেখা পেয়েছেন, অথচ কয়েক বছর আগে এগুলো যেন উধাও হয়ে গিয়েছিল। পর্যটক না পাওয়াতে একটা সময়ে তিনি দিন কাটাতেন একবেলা খেয়ে। তা সত্তেও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ‘খারাপ অবস্থা যে বেশিদিন থাকবে না, তা আমি জানতাম। পর্যটন ছাড়া নেপালের কথা ভাবাই যায় না। বৈদেশিক মুদ্রার কথা চিন্তা করেই আবার বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয়েছে। এটিই স্বাভাবিক।’
থারু আদিবাসীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বনের সান্নিধ্যে বসবাস করলেও তারা মূলত কৃষি ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। শিকারকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু বিদ্রোহের কারণে নেমে আসা অভাব-অনটনের সুযোগটা গ্রহণ করেছিল বন্যপ্রাণী পাচারকারীরা। স্থানীয় কেউ একটি বাঘ কিংবা গণ্ডারের খোঁজ দিতে পারলেই তারা হাতে ধরিয়ে দিত কয়েক হাজার রুপি। বারদিয়া ন্যাশনাল পার্কের প্রধান গাইড রাজন চৌধুরী মনে করেন, অবৈধভাবে বন্যপশু শিকার ও পাচার ঠেকাতে নেপাল সরকার খুব বেশি কিছু করেনি। এসব নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ও এনজিওগুলোর অনুদানের কারণে। বর্তমান সরকারের একটি উদ্যোগ তাকে খুশি করেছে বেশ। পার্কের পাশাপাশি বাফার জোন সম্প্রসারণের চেষ্টাও চলছে। এতে করে বারদিয়া ও প্রতিবেশী বাংকে ন্যাশনাল পার্কের প্রাণীদের অভিবাসন বৃদ্ধি পাবে। বারদিয়া ও বাংকে যৌথভাবে বাঘ সংরক্ষণ ইউনিট হিসেবে পরিচিত। এক সময় এর আয়তন বেড়ে দাঁড়াবে ১৫১৮ বর্গকিলোমিটার। তখন এটিই হবে এশিয়ার সর্ববৃহৎ বাঘ সংরক্ষণ অঞ্চল। বারদিয়া, বাংকে ও ভারতের দুধাওয়া টাইগার রিজার্ভের মধ্যে গ্রিন করিডর স্থাপনের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন।
পুদিনা চাষে সাফল্য
বারদিয়া ন্যাশনাল পার্কে এক হাজার সেনাসদস্য নিয়মিত টহল দেয়। কাজেই পার্কের ভেতরে অবৈধ কিছু করা এখন খুব মুশকিল। ডব্লিউডব্লিউএফ-এর সহযেগিতায় স্থানীয়রা ধানের বদলে পুদিনা চাষের দিকে ঝুঁকেছে। এই অর্থকরী ফসলে শুধু যে লাভ বেশি তা কিন্তু নয়, পুদিনা চাষে ধানের চেয়ে অনেক কম জমির প্রয়োজন হয়। এর ফলে বন্যপ্রাণী বারদিয়ার ভেতরেই থাকছে; উঠে আসছে না লোকালয়ে। যার মাধ্যমে কমেছে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত।
এক কিলোগ্রাম নেপালি পুদিনা অথবা ক্যামৌমাইল বিক্রি করলে হাতে আসে কমসে কম হাজার রুপি, গুণগত মান খুব ভালো হলে পাওয়া যায় ৩ হাজার ৫শ রুপি। কাজেই বনের দিকে চোখ পাকানোর সুযোগ কোথায়। থারু আদিবাসী নারীরাও সচেতন হয়ে উঠেছে। জ্বালানি কাঠের জন্য সুযোগ পেলেই আর গাছ ফেলে না ইদানীং। পুদিনা চাষ প্রকল্পের আওতায় তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে ফলের খোসা, ধানের কুঁড়া, শুকনো পাতা ও কাঠের গুঁড়োকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে।
মূল লক্ষ্য পর্যটন
মাওবাদী বিদ্রোহ শেষ হওয়ায় পর্যটকদের জন্য নেপাল এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ। সরকার ২০১১ সালকে ঘোষণা করেছিল ‘ভিজিট নেপাল ইয়ার’ হিসেবে। রাজন চৌধুরী বলছিলেন, ‘বারদিয়া ন্যাশনাল পার্কে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এখানকার হাতি, বাঘ ও গণ্ডার দেখার পর অনেকেই স্বর্গ বলে মন্তব্য করেন।’ নেপালের সেই স্বর্গটিই হরিয়ে যেতে বসেছিল। অনেক কষ্টে সম্ভব হয়েছে তা পুনরুদ্ধার করা। আর পুনরুদ্ধারকৃত স্বর্গের সুফল ভোগ করছে নেপালের সবাই। কেননা দেশটির আয়ের প্রধান খাত হলো পর্যটন।
জিওগ্রাফিক্যাল ম্যাগাজিন অনুসরণে
বিভাগ: ভ্রমণ



