দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ ২০০০ প্রতিবেদন
বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে বেসরকারি প্রাইম এশিয়া ও সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সংঘর্ষে অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত ও ব্যাপক গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। সংঘর্ষের সময় উভয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮টি ভবনে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। এ সময় কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
ভালবাসা বা প্রেম নিবেদন নিয়ে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত। এ নিয়ে ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনা নতুন নয়। তবে প্রেমকে ঘিরে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা হয়তো নেই।
প্রাইম এশিয়া ও সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ মার্চ যা ঘটেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন কিন্তু ছাত্র সমাজের একটি অংশের ধারাবাহিক উচ্ছৃক্সখলতার সফল এ ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংস্কৃতি, বিবেচনা ও পরিমিতিবোধ না থাকলে যা ঘটে, এখানে তাই ঘটেছে।
প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রিন্সিপাল ড. গিয়াসউদ্দিন এ সম্পর্কে বলেন, ‘তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কথাকাটাকাটির জের ধরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।’ তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথাকাটাকাটির কারণ কী এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি। মাদক সেবন ও যৌন হয়রানির বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেছেন।
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির পাবলিক রিলেশন অফিসার মাসুদ আলম বলেছেন, ‘সাউথইস্টের এক ছাত্রীকে প্রথমে টিজ ও পরে অশ্লীল প্রস্তাব দেয় প্রাইম এশিয়ার এক ছাত্র। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রাইম এশিয়ার ছাত্রদের মাদক সেবনে বাধা দেয়ায় তারা ভাঙচুর করে।’
গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘হয়রানি, অশ্লীল প্রস্তাব ও মাদক গ্রহণ নিয়ে দুই ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এসেছে। এ ব্যাপারে মামলা করা হয়েছে। তদন্ত করে জানা যাবে কারা দোষী।’
বনানী সি ব্লকের ১৭ নম্বর রোডের ১ নম্বর বাড়িতে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগ অবস্থিত। এর তিন বাড়ির পর আরেকটি বাড়িতে প্রাইম এশিয়ার টেক্সটাইল বিভাগের ভবন। প্রাইম এশিয়ার টেক্সটাইল বিভাগের সবুজ, পাভেল, ফয়সাল, সুজন, আবদুল্লাহর মতে, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রাইম ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল ভবনের সামনে মদ, সফট ড্রিংকস ও গাঁজা টানছিলেন। তারা এর প্রতিবাদ করলে গাঁজা সেবনকারীরা তাদের ওপর চড়াও হয়। অন্যদিকে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির বিবিএ বিভাগের শিক্ষার্থী আদি, রাকিব, ওমর ফারুক বলেন, ‘তাদের ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করে প্রাইমের ছাত্ররা। খবর পেয়ে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির কয়েক ছাত্র প্রাইম এশিয়ায় গিয়ে এর প্রতিবাদ করে। এ সময় প্রাইম এশিয়ার ছাত্ররা তাদের মারধর করে। খবর পেয়ে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক ও যৌন হয়রানির সমস্যা আক্রান্ত করেছে অনেককেই। এ উপসর্গ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। কয়েক দিন আগে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে নিজেই অভিযোগ করেন। বিষয়টি নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মাদক ও যৌন হয়রানি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ সাংস্কৃতিক চিন্তার চর্চা লোপ পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটছে।
যৌন হয়রানির বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায় রয়েছে, সামাজিকভাবে প্রতিবাদ করা হচ্ছে। তারপরও তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, বন্ধ হচ্ছে না। একই অবস্থা মাদকের ক্ষেত্রে। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ছেলেমেয়েরাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। অভিভাবকদের টাকার জোরে এরা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। অভিযোগ উঠেছে, কফি হাউসের ব্যানারে অন্ধকারে মাদক সেবন ও যৌনচর্চা কোনো কোনো শিক্ষার্থীর একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বেশ আগেই। একই ভবনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ক্ষেত্রে সরকার যে নিয়মনীতি চালু করেছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। মানোন্নত না হওয়াতে কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো আবার চালু হয়েছে। ছাত্র নেই, তারপরও চলছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুষ, দুর্নীতি, সার্টিফিকেট বাণিজ্য চলছে প্রকাশ্যেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছাত্ররা ক্লাসে উপস্থিত না হয়ে শুধু সেমিস্টার ফি দিয়ে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করছে। অর্থাৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যতটা না মানুষ গড়ার কারখানা হিসেবে কাজ করছে তার চেয়ে বেশি বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে গঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটছে না। ফলে ইয়াবা, সিসার মতো ভয়ঙ্কর মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়তেও দ্বিধা করছে না তারা। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. একে আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ। এখানকার ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ উঠেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যারা সার্টিফিকেট বাণিজ্য করছে, তাদের চিহ্নিত করে অচিরেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো নিয়মনীতি ছাড়া পরিচালিত হচ্ছিল। আবাসিক এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় দেখার কেউ ছিল না। আমরা এগুলোকে একটা নীতির মধ্যে আনার চেষ্টা করছি। এ জন্য নতুন আইন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ¯^ ক্যাম্পাসের জন্যও সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে।’
দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে তাতে পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা ¯^চ্ছ ছিল না। তারা সূচনাতেই পদক্ষেপ নিলে এ ধরনের ঘটনা নাও ঘটতে পারত। প্রারম্ভেই স্তিমিত হতো। নিজ¯^ ক্যাম্পাসহীন বাজারি শিক্ষা ভবনও সম্ভবত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এ রকম হালচালের একটি কারণ। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শিক্ষার্থী হয়রানি বন্ধ করা উচিত।
বিভাগ: ঘটনাপ্রবাহ


