banner ad

কতটা কার্যকর স্কুলের অভিভাবক সংগঠন
জেড এম সাদ

রাজধানীর স্কুল-কলেজগুলোর ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বেশ কয়েকটি অভিভাবক সংগঠন রয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীর প্রয়োজনে তাদের দেখা না গেলেও স্কুলে ভর্তির সময় কার্যক্রম বেড়ে যায় অভিভাবকদের নামে গড়ে ওঠা ভুঁইফোড় সংগঠনগুলোর। অভিযোগ আছে এসব সংগঠন অবৈধ ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত। সাধারণ অভিভাবকদের দাবি, এসব সংগঠন কাজ করবে শুধু ছাত্র-ছাত্রী আর তাদের অভিভাবকদের সমস্যাগুলো নিয়ে।
অভিযোগ আছে, গত ১৬ ডিসেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক ফোরামের সভাপতি মোশারফ হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম রানার নেতৃত্বে কিছু লোক বিনা অনুমতিতে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে যান। তারা অধ্যক্ষকে হুমকি দিয়ে একটি তালিকা দিয়ে আসেন। বলা হয় এ তালিকা অনুসারে ভর্তি করা না হলে স্কুলের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হবে এবং অধ্যক্ষকে ও স্কুলের শিক্ষকদের স্কুলে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। তারা ‘বোন কোটা’ ১০ ভাগের বদলে শতভাগ করার দাবি জানান। এ সময় তারা অধ্যক্ষ এবং উপস্থিত অন্য শিক্ষকদের হুমকি দিয়ে বলেন, তাদের তালিকা অনুসারে ভর্তি করা না হলে শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করে দেয়া হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। ঘটনার পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মঞ্জু আরা বেগম সেদিনই রমনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অধ্যক্ষের সঙ্গে স্কুলে উপস্থিত ৫১ শিক্ষকও জিডিতে সই করেন।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অভিভাবক ফোরামের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে। ফোরামের সভাপতি মোশারফ হোসেন ঘটনাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, সেদিন অধ্যক্ষ তাদের ডেকে নিয়ে যান ভর্তি সংক্রান্ত আলোচনা করার জন্য। সেই আলোচনায় তারা তাদের দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবির মধ্যে একটি ছিল শতভাগ ‘বোন কোটা’। অধ্যক্ষ এই দাবির সঙ্গে একমত না হয়ে উত্তেজিত হয়ে তাদের অপমানসূচক কথাবার্তা বলেন। এমনকি দারোয়ান ডেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেন। তাদের চরিত্র হনন করার জন্য পরে থানায় জিডি করেন। তারা নানা দাবিতে আন্দোলন করলেও তাদের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। তাদের ফোরামটি ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করলেও এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়নি। এ প্রসঙ্গে ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম রানা এ প্রতিবেদককে জানান, ‘তারা সব কাগজপত্র ঠিক করে রেখেছেন। কয়েকদিনের মধ্যেই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হবে। বর্তমানে তাদের ফোরামের কার্যকর সদস্য রয়েছে ১০১ জন।’ শতভাগ বোন কোটা চালু হলে অন্য অভিভাবকরা তাদের বাচ্চাদের ভর্তি করাতে পারবে না। ২০১১ সালে বোন কোটা ছিল এক ভাগ। ২০১২ শিক্ষাবর্ষে সেটি বাড়িয়ে করা হয় তিন ভাগ। আর ২০১৩ শিক্ষাবর্ষের জন্য সেটি আরো বাড়িয়ে করা হয় দশ ভাগ। কলেজে প্রথম শ্রেণীতে মোট আসন আছে ১৪৮৪টি। বোন কোটায় লটারিতে অংশগ্রহণ করবে ৭৮১ জন। যদি দাবি অনুযায়ী শতভাগ বোন কোটায় ছাত্রী ভর্তি করা হয় তবে নিতে হবে সবাইকে। উল্লেখ্য, গত ১৩-১২-২০১২ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের ১৭ অনুচ্ছেদে বোন কোটা সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনটিতে উল্লেখ করা আছে প্রতিষ্ঠানে যাদের বোন অধ্যয়নরত তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের আজিমপুর এবং বেইলি রোড শাখার কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানা যায়। এসব সংগঠন আবার কবে হলো এমন কথাও শোনা গেছে কোনো কোনো অভিভাবকের কাছ থেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘এসব সংগঠন কীভাবে অবৈধ টাকা কামাবে শুধু সেই ধান্দায় থাকে। সব সময় তাদের দেখা না গেলেও ভর্তির সময় সবাই অ্যাকটিভ হয়ে যায়। লটারি যেহেতু সরকারের নির্দেশ, তাই এ বিষয় নিয়ে আন্দোলন করাই তো সরকারি নির্দেশের বিরুদ্ধে যাওয়া।’ এ প্রসঙ্গে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু জানান, ‘এক কথায় এগুলো ধান্দাবাজ সংগঠন। রাজধানীর এমন একটি স্কুলে কীভাবে এমন সংগঠন হয় সেটিই প্রশ্নের বিষয়।’ তিনি আরো যোগ করেন পরিমলের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনায় কোনো সংগঠনকে দেখিনি প্রতিবাদ করতে। উল্লেখ্য, তাদের সংগঠনটিও নিবন্ধিত নয়। এ প্রসঙ্গে দুলু বলেন, ‘অভিভাবক ঐক্য ফোরামের কার্যক্রম ২০১০ সালের শেষের দিকে শুরু হয়। এর আগে আমাদের সংগঠনের নিবন্ধন ছিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নামে।’ তিনি দাবি করেন বর্তমান ভর্তি সংক্রান্ত নীতিমালা তাদের আন্দোলনের পরিশ্রমের ফসল। কোটা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমরা বরাবর কোটার বিপক্ষে। কেননা কোটা পদ্ধতি থাকলেই সেখানে দুর্নীতির সুযোগ থাকে। এ বছর ভর্তি কার্যক্রম শেষ হলেই পরবর্তী বছরে যেন কোটা পদ্ধতি না থাকে সে বিষয়ে আমরা আন্দোলনে নামব।’ রাজধানীর অন্যান্য শীর্ষ স্কুলে আলাদা কোনো কোটা পদ্ধতি নেই। চলতি বছর এসএসসিতে ঢাকা বোর্ডের দ্বিতীয় সেরা স্কুল শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্কুলটিতে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটা রয়েছে। মতিঝিল মডেল ও আইডিয়াল স্কুলে রয়েছে কলোনি কোটা। এদিকে ‘ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ গার্ডিয়ানস অ্যাসোসিয়েশন’ নামে আরো একটি অভিভাবক সংগঠন রয়েছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান জাহিদ জানান, ‘আন্দোলনের নামে কয়েকজন ফায়দা লুটতে চাইছেন। অভিভাবক ফোরামের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সভাপতি মোশারফ সম্ভবত সোনারগাঁয়ের যুবদলের নেতা। তার বড় ভাই ছিলেন সাবেক অভিভাবক প্রতিনিধি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার পক্ষের সঙ্গে এক হয়ে নিজেদের স্বার্থের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা যখন সেশন ফি, বেতন বাড়ানোর প্রতিবাদে আন্দোলন করেছিলাম তখন তো তাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এমনকি যখন পরিমলের ঘটনা নিয়ে আমরা আন্দোলন করেছি, তখনো তাদের দেখিনি। গার্ডিয়ানস অ্যাসোসিয়েশনের একটাই দাবি স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তার হারানো গৌরব ফিরে পাক, এখানে কোনো প্রকার অস্বচ্ছতা আমরা চাই না।’ এর আগে অভিভাবক ফোরামের নামে আরেকটি সংগঠন ছিল কিন্তু ২০০৬ সালের দিকে সেটি আনুষ্ঠানিক বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। সেটি বিলুপ্ত হওয়ার পরই গার্ডিয়ানস অ্যাসোসিয়েশন কাজ শুরু করে। ২০০৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা এ সংগঠনটির বর্তমান কার্যনির্বাহী সদস্য ১০১ জন। সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত আছেন মনোয়ার হোসেন। কার্যক্রম শুরু করার পর থেকেই নিবন্ধনের আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত নিবন্ধন পায়নি সংগঠনটি। তবে চলতি বছরের শুরুতেই নিবন্ধন হয়ে যাবে বলে প্রতিবেদককে জানান গার্ডিয়ানস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। রাজনীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অভিভাবক ফোরামের সভাপতি মোশারফ হোসেন জানান, ‘আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ 

আমরা নিরাপত্তাহীনতায় আছি
মঞ্জু আরা বেগম
অধ্যক্ষ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
অযৌক্তিক একটা দাবি নিয়ে আমাকেসহ ৫১ শিক্ষককে তারা হুমকি দিয়ে গেছে। তারা ১০০ শতাংশ বোনের কোটা দাবি করেছে এ দাবি মানলে তো বাইরের কোনো অভিভাবক তাদের সন্তানদের ভর্তি করতে পারবে না। তারা অভিভাবক ফোরাম আর যা-ই হোক আমরা কোনো সংগঠন বা ফোরাম জানি না, আমরা শুধু বুঝি তারাও অভিভাবক। অভিভাবকদের যৌক্তিক কোনো দাবি থাকলে অবশ্যই আমরা আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করব। কিন্তু তা না করে তারা আমাদের হুমকি দিয়ে যায় চাকরি থেকে বহিষ্কার করবে আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছি। তাদের দাবি না মানায় তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে।

 

 

বিভাগ: প্রতিবেদন

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.