নরকমুখী যাত্রা ফেরার উপায় নেই সায়মা ইসলাম তন্দ্রা
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা যখন মারা যান তখন তার বয়স মাত্র চার। রুবিনা এবং তার মা সুবায়দা (সবই ছদ্মনাম) প্রতিবেশীদের ফুটফরমাশ খেটে এবং স্থানীয় ছোট্ট একটি বেকারিতে কাজ করে কোনোমতে চলছিলেন। সামান্য যেটুকু জমি ছিল তাও বিক্রি করে দিতে হয়েছিল রুবিনার বড় বোনের বিয়ের খরচ জোগাতে। ভারতের কেরালার থিরুভানাথাপুরাম জেলার কাজাকুত্তম গ্রামের এই পরিবারটি তাদের মানবেতর জীবন থেকে উদ্ধারের পথ খুঁজছিল। হঠাৎ করেই একটি সুযোগ এলো। রুবিনার বয়স তখন ১৯। প্রতিবেশী শান্তা যেন দেবদূতের মতোই হাজির হলো! সে প্রস্তাব দিল রুবিনাকে সে মাসকাটে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর একটি চাকরি পাইয়ে দেবে তার বন্ধু লিজি সুজানের মাধ্যমে। সুজানকে সে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। মাসে পঁচিশ হাজার রুপি বেতন এবং পাসপোর্ট ভিসা তৈরিতে সহায়তার প্রস্তাবটি সত্যিই বেশ লোভনীয় ছিল রুবিনাদের কাছে। এ প্রস্তাবে সায় দিতে তাই আর দেরি করেনি রুবিনার পরিবার। এ বছরের ১১ জুন রুবিনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান বিমানবন্দরে পৌঁছে গেল। কিন্তু রুবিনা বুঝতেই পারেনি তাকে জাল পাসপোর্টে সেখানে পাঠানো হয়েছে। কেরালার নেদুমবাসারি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে রুবিনাকে ভারত পার করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একই অবস্থা আজমান বিমানবন্দরেও। লিজির বন্ধু নেসি আজমান বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানায়। সেখানেও আগে থেকে ঠিক করা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তাদের সহায়তা করে। যদিও তাকে বিমানবন্দর ছাড়তে হয়েছিল গাড়ির বুটে লুকিয়ে। যাই হোক নেসি তাকে নিয়ে যায় লিজি সুজানের কাছে। রুবিনা প্রথম দেখা পায় সুজানের। পরদিন তাকে পাঠানো হয় একটি বাসায় পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য। সেখানে একজন অপরিচিত ব্যক্তির ধর্ষণের শিকার হয় রুবিনা। আর এটাই তার দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের শুরু। প্রতিদিনই তাকে অপরিচিতদের ধর্ষণের শিকার হতে হয়। রুবিনা এবার বুঝতে পারে তার স্পন্সর লিজি সুজান তাকে পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত করেছে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না তার। পুলিশের কাছে অভিযোগ করারও উপায় ছিল না। কারণ তার পাসপোর্টটি ছিল জাল। বাধ্য হয়েই তাকে সইতে হচ্ছিল নরক যন্ত্রণা। এমনও দিন গেছে যেদিন তাকে পঞ্চাশজনের বেশি অপরিচিত পুরুষের যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু কিছুই করতে পারছিল না রুবিনা। এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। আর তখনই রুবিনাকে কেরালায় তার বোনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ দেয় লিজি সুজান। তাকে দেশে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বোনের আকুতির জবাবে দুই লাখ রুপি দাবি করে বসে সুজান। অবশেষে রফা হয় পঁচিশ হাজার টাকায়। ২৫ দিন অসহ্য নির্যাতন সয়ে দেশে ফিরে আসে সে। রুবিনা মনে করেছিল যন্ত্রণা থেকে এবার বুঝি মুক্তি পেল। কিন্তু তার ভাবনা ছিল ভুল। ৫ জুলাই, ২০১২ দেশে ফিরে মুম্বাই বিমানবন্দরে গ্রেফতার হয় সে। অপরাধ জাল পাসপোর্টে বিদেশ যাওয়া। তবে তার এই গ্রেফতারের মাধ্যমে পুলিশ সন্ধান পায় আন্তর্জাতিক এক মাফিয়া চক্রের। কেরালা পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই চক্রটি কেরালার বিভিন্ন গ্রাম থেকে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বড় বেতনের লোভ দেখিয়ে মধ্যপ্রাচের বিভিন্ন দেশে পাচার করে। আর তাদের নিয়োজিত করে যৌন ব্যবসায়। রুবিনার পাচার হওয়া এবং তার ওপর লোমহর্ষক নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর এই চক্রের বিরুদ্ধে অনেকেই অভিযোগ করতে থাকেন। নির্যাতিত নারীরা উৎসাহিত হন তাদের মুখোশ খুলে দিতে। কেরালার ডেপুটি পুলিশ সুপার পিএম ভার্গশি জানান, রুবিনার ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে সুজানের বিরুদ্ধে রুবিনা ছাড়াও আরো চার তরুণীকে পাচারের প্রমাণ পেয়েছেন তারা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিজু কুমার জানান, একইভাবে ১৫০ নারীকে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করেছে সুজান। পলাতক সুজানকে ধরতে মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ান দেশগুলোর পুলিশের সহায়তা চেয়েছেন এই তদন্ত কর্মকর্তা। তার ধারণা, সুজানকে ধরতে পারলে আরো অনেক রহস্য জানা যাবে। অক্টোবরের ১৯ তারিখে পুলিশ ত্রিশুর থেকে সেতুলাল ওরফে বশির এবং সাজি নামে এই সংঘবদ্ধ চক্রের আরো দুই সদস্যকে আটক করে। পুলিশ জানিয়েছে, সুজান তার কাজে সহায়তায় এবং জাল পাসপোর্ট তৈরি এবং ভিসা পাওয়ার কাজে সহায়তার জন্য বেশ কয়েকজনের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। রুবিনাকে পাচারে সহায়তাকারী সুজানের দালাল শান্তাকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। শান্তা পুলিশকে জানিয়েছে, সুজান আয়ের টাকায় ত্রিশুরে তার গ্রামের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে। সুজানের ছোটবেলাও কেটেছে অনেক অভাব অনটনে। সেখানকার অন্য নারীদের মতো সেও নিপীড়নের শিকার হয়েছে ছোটবেলা থেকেই। কাজ করেছিল ত্রিশুরের একটি ছোট্ট বেকারিতে। সেখানে পরিচয় তার তার স্বামীর সঙ্গে। তারপর বেকারির কাজ ছেড়ে সবজি ব্যবসা করেছে স্থানীয় বাজারে। কয়েক বছর পর মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার সুযোগ এসে যায় তার কাছে। সেখানে গিয়ে যোগাযোগ হয় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এই চক্রটির সঙ্গে। সুজান প্রথমে তার গ্রামের একটি দরিদ্র মেয়েকে পাচারের মধ্য দিয়ে এই কাজ শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যে সেলসগার্ল, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ইত্যাদি কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েদের পাচার করত সুজান। তবে এক সময় তার গ্রামের মানুষজন সুজানের এই কাজটি সম্পর্কে সচেতন হয়ে যায়। বর্তমানে কেরালার কারুমাথরা গ্রামে ঘৃণিত একটি নাম সুজান। পুলিশ কর্মকর্তা বিজয় কুমার জানান, সুজান অনেক ধুরন্ধর হওয়ায় তাকে অনেকদিন ধরেই আটক করতে পারছে না পুলিশ। কেরালায় আসা-যাওয়া করলেও একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করার কারণে সহজেই পুলিশের চোখকে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়েছে সে। ভারতের কেরালার উপকূলীয় অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নারী পাচারকারীদের সংঘবদ্ধ এই চক্রটির কথা প্রথম পুলিশের নজরে আসে ২০০৭ সালের আগস্টে। সওদা বিবি নামে এক নারীর বিরুদ্ধে ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে মধ্যপ্রাচের শারজাতে পাচার করার অভিযোগ ওঠে। ওই নারী সেখান থেকে এক খদ্দেরের সহায়তায় পালিয়ে এসে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। তিনি সে সময় জানিয়েছিলেন, শারজাতে তিন শতাধিক নারীকে জোর করে দেহব্যবসায় নিয়োজিত করেছে পাচারকারীরা। ওই সময় পুলিশ সওদা বিবির বিরুদ্ধে অভিযোগ নিতে গড়িমসি করলে ক্ষতিগ্রস্ত নারীটি কেরালা হাইকোর্টে রিট আবেদন দাখিল করেন। আদালতের আদেশে পুলিশ সওদা বিবি, তার মেয়ে সামিয়া এবং তার সহযোগী আলমদি আহমেদকে গ্রেফতার করে। কেরালার উন্নয়নকর্মী আজিথা মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের এই যৌন বাণিজ্য চক্রটি অব্যাহতই থাকবে। তার অভিযোগ কেরালা এবং আমিরাতের কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে কোনোই উদ্যোগ নিচ্ছে না। নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন এবং হয়রানির বিপক্ষে কাজ করা এই উন্নয়নকর্মীর মতে দুই সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে শুধু সাময়িকভাবে থমকে যাবে পাচারকারীদের কাজ। দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান হবে না। বন্ধ হবে না এই ঘৃণ্য অপরাধ। যারা ঘটনার শিকার হয়েছেন তারাও এই বিষয়ে অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত হবেন। নীরবে কষ্ট সয়ে যাবেন। মালয়ালাম কবি নামমোহন পালিয়াত মধ্যপ্রাচ্যে তার ১২ বছর থাকার অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, সেখানে পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত ৯০ শতাংশ মালয়ালাম নারীকে দাসী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাদের কিছুই করার উপায় থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যৌন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করছে পাচারকারীরা। এর মধ্যে পাচারকারীদের কিছু কিছু হয়তো আটক হয়ে কারাগারে গেছে। কিন্তু মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। নারীপাচার বিষয়ে গবেষণা করেন এমন একজন ভারতীয় গবেষক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পতিতালয়গুলোতে ভারতীয় নারীদের সংখ্যা অনেক বেশি। এসব জায়গায় মধ্যপ্রাচের কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকরাই যান। মধ্যপ্রাচ্যের পুলিশও যেন এইসব পতিতালয় সম্পর্কে এক রকম নীরব। রুবিনার ভাগ্য ভালো, সে কারণেই সেখান থেকে ফিরতে পেরেছেন। কিন্তু এখনো কত নারী দুবাই, শারজাহ, মাসকাট এবং আজমানের পতিতালয়ে বাধ্য হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তার প্রকৃত তথ্য কারো কাছেই নেই। অনেকে দেশে ফিরতে নীরবে বা প্রকাশ্যে চোখের পানি ফেলছেন। কিন্তু তারাও জানেন না, আদৌ তারা ফিরতে পারবেন কি না। জানেন না ভবিষ্যতে তাদের ভাগ্যে কী আছে? (ভারতের কেরালা রাজ্যের নারী পাচারের ওপর ইন্ডিয়া টুডের একটি ফিচারে উঠে আসা এই চিত্রটি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতেও অনেকটা একই রকমের।)
বিভাগ: ফিচার



