banner ad

আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন মেরুকরণ

২০০০ প্রতিবেদন

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিনে বের হয়ে আসায় আন্ডার ওয়ার্ল্ডে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নানা কৌশল অবলম্বন করেও তাদের জামিন রুখতে পারছে না। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিনে বের করে আনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসব সন্ত্রাসীকে জামিনে বের করে দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে যেসব সন্ত্রাসী জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে এসেছে তাদের তালিকা তৈরি করেছে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা। গোয়েন্দাদের তথ্য মতে, গত ৬ মাসে শতাধিক সন্ত্রাসী জামিনে বের হয়ে এসেছে। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তারা আবার অপরাধ জগতে সক্রিয় হয়েছে। অনেকের আদালতে হাজিরা দেয়ার কথা থাকলেও তারা তা দিচ্ছে না। প্রায় সবাই ঠিকানা বদলেছে। কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছে। এ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে র‌্যাব-পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ কুমার বিশ্বাস সব মামলায় জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর রাজধানীর আন্ডার ওয়ার্ল্ডে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। বিকাশ গত ১৫ বছর কারাগারে ছিল। ১৯৯৭ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। ২০০৯ সালে জামিন পেলেও সরকার ফের গ্রেফতার করে। ২০০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন জোট সরকার যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করেছিল বিকাশ তাদের একজন। তার ভাই প্রকাশ কুমার বিশ্বাসও এ তালিকায় ছিল। সে দীর্ঘদিন বিদেশে (বর্তমানে ফ্রান্সে) অবস্থান করছে। আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণকারী অদৃশ্য গডফাদাররা অন্য শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও বের করে আনার তৎপরতা শুরু করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিকাশ বের হওয়ার পর আরো ১১ সন্ত্রাসী মুক্তির অপেক্ষায় আছে। এই ১১ সন্ত্রাসী বর্তমানে ঢাকা ও কাশিমপুর কারাগারে অবস্থান করছে। তারা ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে কারাগারে আছে। তাদের বিরুদ্ধে ১৫ থেকে ২৫টি মামলা রয়েছে। তারা জামিনের অপেক্ষায় রয়েছে। আদালত ও কারাগার সূত্রে জানা যায়, অন্যতম সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে। ১৭টি মামলায় জামিন নিয়ে ২টি মামলায় আটক আছে সে।
১২টি হত্যা মামলার আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালকে আর একটি মামলায় জামিন নিতে হবে। একই বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড মনার বিরুদ্ধে ৫টি মামলা রয়েছে। সে ৪টি মামলায় জামিন পেয়েছে। সন্ত্রাসী বদরুলের বিরুদ্ধে ৫টি হত্যা মামলা। সে ৪টি মামলায় জামিন পেয়েছে। একইভাবে সন্ত্রাসী ইলিয়াসের বিরুদ্ধে ৫টি মামলা রয়েছে, তারও আর একটি মামলায় জামিন নিতে হবে। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুরের আলোচিত সন্ত্রাসী পাভেলুর রহমান রতন ২৭টি মামলার মধ্যে ২৬টিতেই জামিন পেয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজেদুল ইসলাম ইমনের বিরুদ্ধে ৯টি মামলা রয়েছে। সে ৭টিতে জামিন পেয়েছে। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড মামুন। মামুনের বিরুদ্ধে ৯টি হত্যাসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। ১৬টি মামলায় সে জামিন পেয়েছে। পুরস্কার ঘোষিত খোরশেদ আলম রাশুর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে, ১১টি মামলায় জামিন পেয়েছে। ফ্রিডম সোহেল ও কিলার আব্বাসের বিরুদ্ধে ৯টি করে মামলা রয়েছে। তারা ৭টি মামলায় জামিন পেয়েছে। উত্তরার শীর্ষ সন্ত্রাসী মোশাররফের বিরুদ্ধে  ৪টি হত্যা মামলাসহ ১৩টি মামলা থাকলেও এখনো ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছে। আর মাত্র একটি মামলায় জামিন পেলে কারাগার থেকে বের হয়ে আসবে সন্ত্রাসী ন্যাটা বাবু, ক্যাট বাবু, ডগ বাবু, ফারুক, শাহিন, মুন্না, মনির, মিলন, লম্বু সেলিম, বেলাল, ডালিম, নাসির, দাদা ফারুক, মিয়া রহমান, জাবেদ, রনি, পেটকাটা আলম, সাজু সোবহান, আনিস, তাজউদ্দিন ওরফে তাজু, ইব্রাহিম আনোয়ার, সাদেক, মজিবুর, টিটন, ব্যাঙ বাবু, টিপু, পিংকু প্রমুখ। এসব সন্ত্রাসীর সহযোগী, সহধর্মিণী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে কারাগারে যারা আর একটি মামলায় জামিন পেলে বের হয়ে আসবে তারা হলো ফাতেমা, নূরজাহান, মর্জিনা বেগম, পারুল বেগম, রোশিদা, রুবিনা আক্তার, হনুফা, লিপি, মোর্শেদা, ফেন্সি শাম্মি, লাইলি, কারাতে বিলকিস, গুলবাহার, শাম্মি আক্তার, খালেদা আক্তার, বিউটি ও রানী।
যারা কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছে : পুরস্কার ঘোষিত সন্ত্রাসী বিকাশ, মশিউর রহমান কচি ও হোয়াইট বাবু কারাগার থেকে বের হয়েছে জামিনে। পুরস্কার ঘোষিত নয় কিন্তু আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে র‌্যাব-পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিল, কিন্তু সম্প্রতি জামিনে বের হয়ে এসেছে মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডিশ শাহিন, কায়উম, ঘটি বাবু, পল্টন জসিম, রুবেল, রেজু দেওয়ান, কম্পিউটার সোহেল, ড্রাইভার আলম, হাতকাটা রমজান, আইজি গেটের ওমর ফারুক, শ্যামপুরের সুজিত দাস, উজ্জ্বল, মহিত, দয়াগঞ্জের বিপ্লব, পিচ্চি হায়দার, মনির হোসেন, সোহেল, এমরান, খোকা, এরফান আলী, নুরুল ইসলাম ওরফে নুরা, সায়েদাবাদের দীন ইসলাম, সুমন, হাদী, আশরাফ উদ্দিন, নীলাভ, খোকন কাজী, মহসিন, আঙুল কাটা সুমন, টু-া কাসেম, সুলতান, দেলোয়ার ওরফে দেলু, পলাশ, কাইল্যা মিন্টু, নাফিজ খান, রগকাটা লিটন, চিটার লিটন, ফরিদ, আওলাদ, কাশি, দেবাশীষ, সুমন, ফ্রিডম মফিজ, পোস্তাগোলার পিচ্চি শাহাদৎ, গে-ারিয়ার রাজু, ইকবাল, মামুন, কদমতলীর গ্রিল দেলোয়ার, শওকত, জুম্মন, মাহবুব, রেজা, টেরা মাহমুদ, কাইল্যা নজরুল, ময়দা কবির, যাত্রাবাড়ীর টিটু, ইউসুফ, মিঠু ও ফাহিম।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন মেরুকরণ : শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ ও মশিউর কচি মুক্ত হওয়ায় রাজধানীর আন্ডার ওয়ার্ল্ডে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। এর আগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় কারাগার থেকে বের হয়ে এসেছেন ধানম-ি-মোহাম্মদপুরের আলোচিত সন্ত্রাসী আমজাদ হোসেন মিয়া। ভারতের কারাগারে আটক আছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, ভারতে অবস্থান করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাৎ, খোরশেদ, ইমাম হোসেন। এ ছাড়া টেরর নাসিরও ভারতে অবস্থান করছে। দেশ-বিদেশে থেকে এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী তাদের বাহিনী পরিচালনা করে। এদের ঘিরে সন্ত্রাসীরা নানা গ্রুপে আবার পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া পুরনো সেভেন স্টার ও থ্রি স্টার গ্রুপও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, যেসব সন্ত্রাসী জামিনে মুক্ত হয়ে বের হয়ে এসেছে তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। অপরাধীরা যাতে আদালত থেকে বের হতে না পারে সে জন্য কাজ শুরু হয়েছে। তবে আদালত যদি এসব সন্ত্রাসীকে জামিন দেয় তাহলে পুলিশের কিছু করার থাকে না। আদালতের নির্দেশ আমাদের মেনে চলতে হয়।
আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কা : শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দাগি আসামিরা কারাগার থেকে বের হয়ে আসায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী জাতীয় নির্বাচন ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন। কারাগার থেকে বের করে আনার আশ্বাসও দিচ্ছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে বের হয়ে এসেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিপরীতে বিরোধী দল থেকে যিনি নির্বাচন করবেন তিনি সতর্ক হয়ে উঠছেন। বিকাশ যাতে তার কোনো ক্ষতি না করতে পারে তার বিকল্প ব্যবস্থা তিনি খুঁজছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ রাজধানীর আলোচিত সন্ত্রাসীদের বের হয়ে আসায় খুন-খারাবিসহ অপরাধ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমদ বলেন, পুলিশ সতর্ক রয়েছে। সন্ত্রাসীরা যাতে কোনো ঘটনা ঘটাতে না পারে তার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
ঘটনা এক, প্রশ্ন অনেক : আন্ডার ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ কাশিমপুর কারাগার থেকে পুলিশ পাহারায় মুক্ত হওয়ার পর নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিকাশের মুক্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিকাশ মুক্তি পেয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই জামিন পাওয়ায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সরকার পক্ষের আইনজীবীর কী ভূমিকা ছিল? যে মামলায় বিকাশ ২০০৯ সালে গ্রেফতার হলো, সে মামলায় এখন কীভাবে জামিন পেল? আদালত ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন বাইরের জগৎকে নিরাপদ মনে না করায় বিকাশ গত তিন বছর কৌশলে কারাগারে অবস্থান করে। এখনো যেমন অবস্থান করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম ও আরমান। বিকাশ নিরাপদ জেনেই হাজতি পরোয়ানা প্রত্যাহার করে বের হয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের ইচ্ছায় কঠোর গোপনীয়তায় বিকাশকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। বিকাশের মতো একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়ার আগে পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগে অবহিত করার রীতি থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এ বিষয়ে গাজীপুর পুলিশের এসপি আবদুল বাতেন বলেন, বিকাশের মুক্তির ব্যাপারে আমাদের কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিকাশ ১৫ বছর জেলে ছিল। এই ১৫ বছর তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়েছে। বিকাশ এসব মামলায় জামিন নিয়ে বের হয়েছে। যদি তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকে তাহলে সে জেলে থাকবে কেন। আদালত জামিন দিলে আসামি বের হয়ে আসবেই। আমরা বিকাশের ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলেছি। প্রশাসন আইন অনুযায়ী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে।

বিভাগ: প্রতিবেদন

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.