banner ad

কিশোরী মালালা তালেবানের চেয়ে শক্তিশালী
শানজিদ অর্ণব

‘সম্ভবত মালালাই জয়া একজন আফগান নায়ক। আমি তার মতো একজন সমাজকর্মী এবং সৎ রাজনীতিবিদ হতে চাই’ -জবাবটি মালালা ইউসুফজাইয়ের। আর প্রশ্নটি ছিল তার নামের কোনো তাৎপর্য আছে কি না। ১৪ বছর বয়সেই নিজের এই লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে অনেক এগিয়ে গেছে মালালা। নিজের সংকল্প বাস্তবায়ন করতে বিরুদ্ধস্রোতের উপত্যকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল মালালা।

 

মালালার আদর্শ মালালাই জয়া, যিনি একজন আফগান লেখক, রাজনীতিবিদ। কারজাই সরকারের নির্বাচিত পার্লামেন্টে ছিলেন তিনি। কিন্তু আফগানিস্তানে ন্যাটোর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কথা বলায় পার্লামেন্ট থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে। ১৪ বছরের কিশোরী মালালা ইউসুফজাই সোয়াত উপত্যকায় তালেবানের হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এক বিবৃতিতে জয়া বলেন, ‘মালালা পাকিস্তানি তালেবানের টার্গেট হয়েছে, কারণ খুবই অল্প বয়স হওয়া সত্তেও নারীর বিরুদ্ধে চলা অন্যায় এবং বর্বরতার বিরুদ্ধে সে চুপ থাকেনি…আমি মালালাকে অভিবাদন জানাই এবং আমি নিশ্চিত তার ত্যাগ বৃথা যাবে না। ইতিহাসের পাতায় সে উজ্জ্বল নাম হয়ে থাকবে আর তার শত্রুরা শিগগিরই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।’

 

‘আমি মালালার জন্য প্রার্থনা করছি’ প্রার্থনা করছে ১৬ বছরের কায়নাত রিয়াজ। মালালার প্রিয় বান্ধবী। স্কুলবাসে মালালাকে গুলি করার সময় কায়ানাতের বাহুতেও গুলি লেগেছিল। শুধু কায়ানাত নয়, দুনিয়ার প্রায় সব প্রান্তের মানুষই প্রার্থনা করছে মালালার জন্য। ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের কোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে এর আগে এত প্রতিবাদ দেখায়নি পাকিস্তানের মানুষ।

 

সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়লেও পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা এ ইস্যুতে পিঠ দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন। মালালাকে গুলি করার দায়িত্ব স্বীকার করেছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। টিটিপি এমন একটি সংগঠন যা সরাসরি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের সংগঠনের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এটি। কিন্তু এখনো কোনো পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত আসেনি এবং মার্কিন আগ্রাসনের অজুহাত দেখিয়ে টিটিপিকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে পাকিস্তানের ধর্মীয় দলগুলো। মালালার ওপর হামলার নিন্দা জানালেও জামায়াত-ই-ইসলামী, জামায়াতে উলেমা-ই-ইসলাম এবং দিফা-ই-পাকিস্তান কাউন্সিল উত্তর ওয়াজিরিস্তানে কোনো সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছে এবং এ বিরোধিতাকে যৌক্তিক করার জন্য নানা প্রশ্ন দাঁড় করাচ্ছে। যেমন : ড্রোন হামলায় নিহত শিশুদের ক্ষেত্রে তাহলে কী হবে? ২০০৭ সালে লাল মসজিদ অপারেশনে নিহত এক ছাত্রীর জন্য কার বিচার হবে? মিডিয়া কেন একটি কিশোরীকে নিয়ে এত মাতামাতি করছে? পরিষ্কারভাবেই এটা পানি ঘোলা করার চেষ্টা। এমনটা বরাবরই পাকিস্তানে হচ্ছে যখন সন্ত্রাস আর উগ্রবাদীদের প্রসঙ্গ আসে। এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। টিটিপি আফগানিস্তানের মার্কিন বিরোধী লড়াইয়ের সমর্থক। এ কারণে তারা কি ভালো? এ রকম ঘোলাটে কথাবার্তাটা বহু বছর ধরে পাকিস্তানের মানুষের কাছে আস্তে হোক বা জোরেই হোক বলা হচ্ছে। ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ হামলার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় টিটিপির নাম এড়িয়ে গেছে। এমনকি পাকিস্তানের সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে দেশটির প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী উভয়ই টিটিপির নাম উচ্চারণ করেননি। রীতি ভেঙে মালালার ওপর হামলার তীব্র সমালোচনা করলেও দেশটির সেনাপ্রধানও এক্ষেত্রে নীরব। প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা নওয়াজ শরীফও চুপ। একমাত্র মুত্তাহিদা কওমি আন্দোলনই টিটিপির বিরুদ্ধে কিছুটা লোকদেখানো শোরগোল করেছে। টিটিপি বিরোধী অভিযানের সিদ্ধান্তের জন্য ঘুটিটি এখন রাজনীতিবিদদের মাঠে গড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। ১৫ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, উত্তর ওয়াজিরিস্তানে অপারেশনের পরিকল্পনা চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক অভিযান পরিচালিত না হওয়ার চেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো উগ্রবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের সদিচ্ছার অভাব। এই সদিচ্ছার অভাবকেই এ সমস্যার কারণ বলে মনে করেন তারা।

 

২০০৭ সালে সোয়াত উপত্যকা তালেবান দখল করে নেয়। নেতৃত্ব দেন মওলানা ফাজলুল্লাহ। বন্ধ করে দেয়া হয় মেয়েদের স্কুলগুলো। বহু মানুষ পালিয়ে যান এ সময়। সে সময় তাদের দেয়া সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ৪০ বছর আগে যৌবনে তারা যতটুকু স্বাধীনভাবে চলাফেরা করেছেন আজ তাদের শিশু বয়সের মেয়েও তার চেয়ে কম স্বাধীনতা পাচ্ছে। যারা এসব মেনে নিয়েছেন তারা চুপচাপ বাস করছিলেন সোয়াতে আর অনেকে পালিয়ে যান। ঠিক এ জায়গাতেই আর সবার থেকে ভিন্ন মালালা ইউসুফজাই। তার বাসভ‚মিতে মেয়েদের শিক্ষার বিরুদ্ধে তালেবানের হুমকির বিরুদ্ধে দাঁড়ায় সে। এ সাহস আর সঙ্কল্পই তাকে দুনিয়াজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়। একই কারণে সে হয়ে ওঠে তালেবানের টার্গেট।

 

১১ বছর বয়সে বিবিসি উর্দুতে ব্লগ লিখে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মালালা। ‘গুল মাকাই’ ছদ্মনামে লিখতে শুরু করে সে সোয়াতের শিশুদের ভয় আর বঞ্চনার কথা। ‘…স্কুলে যেতে ভয় লাগছিল কারণ তালেবানরা মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে…’ এভাবেই শুরু হয় ব্লগে লেখা। ২০০৯-এর মে মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সোয়াত উপত্যকায় তালেবানকে হটিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে আসে মালালা। তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয় সে। গত বছর পাকিস্তানের সরকার দেশের প্রথম ন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড ফর ইয়ুথে ভ‚ষিত করে মালালাকে। টেলিভিশনে মালালা বলে ‘… আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি স্কুলে যাওয়ার পথে আমাকে আটকে দিয়েছে তালেবান। তখন আমি তাদের মুখে স্যান্ডেল মেরে বলছি- তোমরা যা করছ তা ভুল। শিক্ষা আমাদের অধিকার। …আমি সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। যদি তারা আমাকে মেরেও ফেলে, আমি প্রথমে তাদের বলব, ‘তোমরা যা করছ তা ভুল।’

 

মালালা তার কল্পনার চেয়েও বড় হয়ে গেছে। তাকে ঠেকাতে না পেরে ৯ অক্টোবর স্কুলবাসে বাসায় ফেরার সময় তার মাথা আর গায়ে গুলি করে এক তালেবান। পাকিস্তানের তালেবান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নারী অধিকার নিয়ে কথা বলা অনেকটা নিশ্চিত মৃত্যুকেই ডেকে আনা। এ বছর ৫ জুলাই খাইবার পাখতুনখাবায় ফরিদা আফ্রিদি নামের এক নারী সমাজকর্মী গুলিতে নিহত হন। পাকিস্তানে বিভিন্ন জায়গায় মেয়েরা প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন, ‘আমরা সবাই মালালা।’ আর নিষ্ঠুর সত্যকে ভিন্নভাবে বলেছেন পাকিস্তানের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক আলি দায়ান হাসান। তিনি বলেছেন, ‘মালালার ওপর হামলা শুধু একটা উদাহরণ। এ রকম ঘটনা আরো ঘটবে যদি পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো একটি দ্ব›দ্বকে মীমাংসা না করে। দ্ব›দ্বটি হলো তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে, না তালেবানকে মিত্র হিসেবে ব্যবহার করবে?

 

সেরে উঠছে মালালা : গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মালালাকে প্রথমে চিকিৎসা দেয়া হয় রাওয়ালপিণ্ডির সামরিক হাসপাতালে। সেখানে তার মাথার খুলি থেকে গুলি বের করা হয়। ডাক্তারদের মতে, এর মাধ্যমে মালালার জীবন রক্ষা পেয়েছে। ১৫ অক্টোবর উন্নত চিকিৎসার জন্য মালালাকে নেয়া হয় যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে। ডাক্তারদের মতে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে মালালা। কিছুদিন আগে হাসপাতালের পরিচালক ডেভ রজার গণমাধ্যমকে জানান, মালালা নোটবুকে লিখে তার কথা জানাতে পারছে।

 

 

বিভাগ: ফিচার

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.