ইসরায়েলের আগাম নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ ২০০০ ডেস্ক
নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেভাগেই নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। আগামী বছরের জানুয়ারি মাসেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা দেশটির নির্বাচন। নেতানিয়াহুর এই আগাম নির্বাচনের পেছনে দুটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। প্রথমত, দেশটিতে বিরোধী দল এখন কঠিন সময় পার করছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন হিসেবে নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে ভোটারদের মন জয় করার সুযোগ থাকছে নেতানিয়াহুর। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের নির্বাচনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো নেসেটের মেয়াদ শেষের দিকে চলে এলে অনেক ছোট পার্টি জোট ভেঙে বেরিয়ে বিভিন্ন জনপ্রিয় ইস্যু নিয়ে ভোটারদের সামনে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে অন্য দলগুলোকে এ সুযোগ দিতে চাচ্ছেন না নেতানিয়াহু। ইতিমধ্যে ইসরায়েলের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, একত্রে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেইনু (ইঊওঞঊওঘট) পার্টি। একত্রে নির্বাচন মানে দুদলের একীভ‚ত হওয়া নয় বলে বিষয়টিকে পরিষ্কার করেছেন লিকুদ পার্টির প্রতিনিধি। লিকুদ পার্টির মন্ত্রী জিলাদ এরডান চ্যানেল টু-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি কোনো যুক্ত পার্টি নয় বরং একটি যুক্ত তালিকা’ এবং পার্টির এই পদক্ষেপ সম্পর্কে নেতানিয়াহু তাকে আগেই অবহিত করেছিলেন বলে জানান তিনি।
এই পরিকল্পিত একত্রীকরণ আগামী নির্বাচনে বিশেষ প্রভাব রাখবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন এর মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে সেক্যুলার এজেন্ডা এগিয়ে নিতে হবে। কারণ এটি বেইতেইনু পার্টির গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ এই একীভূত হওয়ার জন্য নেতানিয়াহুকে অবশ্যই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
অবশ্য নেতানিয়াহুর এ সিদ্ধান্তে নাখোশ লিকুদ পার্টির অনেক সিনিয়র সদস্য। পার্টির এক সিনিয়র সদস্য এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘নেতানিয়াহু কেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলেন? তিনি কি নির্বাচনে পরাজয়ের ভয় করছেন? এটি অত্যন্ত সমস্যাজনক একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
নেতানিয়াহুর এই নির্বাচন প্রস্তুতি যে একেবারে ভুল হয়েছে এমনটা মনে করছেন না পর্যবেক্ষকরা। কারণ অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে হারটজ পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, এহুদ ওলমার্ট, জিপি লিভনি এবং ইয়াইর লিপিদ কর্তৃক গঠিত নতুন রাজনৈতিক দলটি সামনের নির্বাচনে নেসেটে ২৫টি আসন পেতে পারে। আর লিকুদ পার্টির সম্ভাবনা ২৪টি আসনের। আসনের হিসাব যা-ই হোক না কেন এ জরিপের বিশ্লেষণ মতে, নেসেটে ডানপন্থী ব্লকের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খর্ব হতে যাচ্ছে। নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্তকে ঝুঁকিপূর্ণ বললেও এর মাধ্যমে নেতানিয়াহু এবং লিবারম্যান আগামী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে ফেলেছেন বলে মনে করেন হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের অধ্যাপক আব্রাহাম ডিসকিন।
বিশেষজ্ঞরা আরো মনে করেন, আগামী নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বিশেষত অর্থনীতি প্রাধান্য পেতে যাচ্ছে। সত্যিই যদি এমনটা হয় তাহলে বামপন্থী দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশজুড়ে সামাজিক ন্যায়ের জন্য সংগঠিত আন্দোলনে অর্থনীতির ইস্যুটি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহু তার নির্বাচনী প্রচারে জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষত ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইস্যুকে সামনে আনতে চাচ্ছেন। আরো একটি ইস্যু নির্বাচনে গুরুত্ব পেতে পারে, সেটি হলো বিয়ে। বর্তমানে সব ইসরায়েলি জনগণকে বিয়ে করতে হয় ধর্মীয় পদ্ধতিতে। সেক্যুলার ভোটাররা এ অবস্থার পরিবর্তন চাইছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির প্রভাব রয়েছে ইসরায়েলের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি ভোটারদের মধ্যে রমনির চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ওবামা। গ্যালাপের দেয়া তথ্যমতে এক্ষেত্রে ওবামা রমনির চেয়ে ৭০-২৫ মার্জিনে এগিয়ে আছেন। মার্কিন নির্বাচনে অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক ইরানে হামলা ইস্যুতে ওবামার সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে নেতানিয়াহুর। আর রমনির দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর মতো। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা শাউল মোফাজ ইতিমধ্যে অভিযোগ করে বলেছেন, নেতানিয়াহু মার্কিন নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইটান জিলবোয়ার মতে, এবারের মতো মার্কিন নির্বাচনে ইসরায়েল কখনো এত প্রভাবশালী ভ‚মিকা রাখেনি। তার মতে, এটা প্রধানত ঘটেছে রিপাবলিকান শিবিরের জন্য। কারণ এর মাধ্যমে তারা ইহুদি ভোটারদের মন জয় করতে চেয়েছে। জিলবোয়া বলেন, ইসরায়েলকে নিজের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখানোর জন্য ওবামা-রমনির প্রতিযোগিতা দেখে অনেক ইসরায়েলি খুশি হলেও আমার মতে এটি নেতিবাচক। বরং দুপ্রার্থীর স্বাভাবিক সমর্থন থাকলে সেটা ইসরায়েলের জন্য বেশি লাভজনক হতো।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ইসরায়েলের বেশিরভাগ মধ্যবিত্তকে বর্তমান সরকারের বিরোধী করে তুলেছে। বামপন্থী লেবার পার্টি চাইছে এ ইস্যুকে কাজে লাগাতে। এতসব অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক প্রবণতার মধ্যে ইসরায়েলে কারা জিতবে তা স্পষ্ট নয়। তবে যে-ই জিতুক মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে এর প্রভাব খুব বেশি পড়বে না বলেই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
বিভাগ: আন্তর্জাতিক



