banner ad

বিদেশের কারাগারে অসহায় বাংলাদেশির আটটি বছর
আব্দুল্লাহ্ নূহ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য নির্মাণ শেষ করেছেন- মনে তাই দারুণ আনন্দ। এছাড়া অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র সেতুর কাছের ভাস্কর্যসহ মুক্তিযুদ্ধের ওপর বেশ কিছু ভাস্কর্যের নকশা তৈরি ও নির্মাণকাজের স্মৃতি। হাতে আছে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ। দুই ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে সাজানো সংসার তার। মনের আনন্দে তিনি বেড়াতে বের হলেন ভারত। সঙ্গে নিয়ে গেলেন একমাত্র পুত্রবধূকে। ইচ্ছা আজমির শরিফ জিয়ারত করবেন। কিন্তু কে জানত এই ভ্রমণ তার জীবনে ঝড় নিয়ে আসবে, তছনছ করে দেবে সাজানো সংসার!

 

ঘটনাটি বাংলাদেশের ভাস্কর রশীদ আহমেদ আর তার পুত্রবধূ নুরুন নাহারের। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ভাস্কর রশীদ আহমেদ ভারতে গিয়েছিলেন পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে। তখন তার বয়স ৭০ বছর। দিল্লি পৌঁছে পাহাড়গঞ্জের একটি হোটেলে উঠেছিলেন তারা। সেখানেই শুরু হয় তাদের দুর্ভোগের দিন।

 

 

 

হোটেলের ব্যবস্থাপক ভাড়া দাবি করেন ১ কামরার জন্য ১ হাজার টাকা। ভাড়া নিয়ে ব্যবস্থাপকের সঙ্গে তখন বচসা হয় ভাস্কর রশীদের। পরদিন লবিতে বসে চা খাওয়ার সময় একদল লোক এসে তাদের জালনোট পাচারকারী চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ এনে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যায় আরো দুজন লোকের সঙ্গে। পরে জানতে পারেন, ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) হাতে তারা গ্রেফতার হয়েছেন। পরে সিবিআই জাল টাকা পাচারকারী চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ এনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। বিচার চলাকালীন তাদের বন্দি থাকতে হয় দিল্লির কুখ্যাত তিহার কারাগারে। এরপর মামলাটি চলতে থাকে শুধু তারিখ দেয়া না দেয়ার মধ্যে। তাদের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া অন্য দুই ভারতীয়কে ২ বছর পর মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু তাদের মুক্তির বিষয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে আদালত। সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যম, বিশেষ করে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদক ইন্দ্রানী বসু ও দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলার মিনিস্টার নজিবুর রহমানের কার্যকর ভ‚মিকায় তাদের মামলা সচল হয়। অবশেষে ২০১২ সালের অক্টোবরের ১০ তারিখে দেয়া রায়ে তাদের ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং দুজনের জন্য দেড় লাখ করে মোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো দেড় বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ইতিমধ্যে প্রায় আট বছর কারাভোগ করতে হয়েছে তাদের। তাদের হয়ে জরিমানাও জোগাড় করে দিয়েছেন ইন্দ্রানী বসু। সাজা খাটা হয়ে গেছে- এ বিবেচনায় আদালত তাদের মুক্তির আদেশ দেয়।

 

১৯৬১ সালে চারুকলা মহাবিদ্যালয় (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে পাস করা ভাস্কর রশীদ আহমেদ ভারতের তিহার জেল থেকে বিনা অপরাধে, বিনা বিচারে সাজা ভোগ করে ফিরে এসেছেন কিছু ভালো মানুষের সহায়তায়। তিনি এখন চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তবুও আশা প্রকাশ করেছেন, নতুন করে শুরু করতে চান তার জীবন। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরে পাওয়া সম্ভব না হলেও কাজই পারবে তাকে জীবনের দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা ভুলিয়ে দিতে।

 

সাপ্তাহিক ২০০০-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন তার জেলজীবনের কথা। তার ছোট মেয়ে লিপি আহমেদ বলেছেন সে সময়ে তার জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। বলেছেন বর্তমান অসহায়ত্বের কথা।

 

 

 

 

 

‘আদালতের কোনো নির্দেশ ছাড়াই

 

আমাদের আটকে রাখা হয়েছে ৮ বছর’

 

ভাস্কর রশীদ আহমেদ

 

 

 

 

 

সাপ্তাহিক ২০০০ : হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে তর্কটা কীভাবে শুরু হয়েছিল?

 

রশীদ আহমেদ : আমরা হোটেলে পৌঁছলে হোটেল ম্যানেজার বললেন, কোনো কামরা খালি নেই। তখন তাকে বললাম, এখন রাত সাড়ে ১১টা। কামরা না পেলে এত রাতে আমরা দুজন মানুষ কোথায় যাব?

 

শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের বললেন, ঠিক আছে কামরা একটা দিতে পারি, কিন্তু তার জন্য ১ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হবে। আর ৫ হাজার টাকা জমা রাখতে হবে। তখন আমি বললাম, আমাদের পাসপোর্ট আছে, বাংলাদেশি হিসেবে বৈধ ভিসায় ভারত এসেছি। আমাদের কেন ৫ হাজার টাকা জমা দিতে হবে? তাছাড়া আমরা এক রাত থাকব।

 

কেন কাল কোথায় যাবেন? তিনি প্রশ্ন করলেন।

 

আমি বললাম, আগামীকাল আমরা আজমির শরিফ যাব।

 

তিনি বললেন, আমাদের গাড়ি আছে, তাতে করে যেতে পারবেন।

 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কত ভাড়া পড়বে তাতে?

 

তিনি বললেন, দুজনের জন্য ৫ হাজার টাকা।

 

আমি বললাম, আমার কাছে এত টাকা নেই। আমরা লোকাল ট্রেনে চড়ে যাব।

 

তারপর অনেক দরকষাকষির পর একটি কামরা তিনি আমাদের ভাড়া দিলেন ৬শ টাকায়।

 

২০০০ : সেই হোটেলে কামরা ভাড়া আসলে কত তা কী জানতে পেরেছিলেন?

 

রশীদ আহমেদ : না, তা জানতে পারিনি।

 

২০০০ : তারপর…

 

রশীদ আহমেদ : তারপর কামরায় যাওয়ার আগে তারা আমাদের পাসপোর্ট রেখে দিল। সেখানেও একটু বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল। কিন্তু পাসপোর্ট ছাড়া তারা থাকতে দেবে না। কাজেই বাধ্য হয়ে দিয়ে দিলাম পাসপোর্ট।

 

এরপর যে কামরা আমাদের জন্য বরাদ্দ হলো সেটিতে গেলাম। গিয়ে দেখি অনেক জিনিসপত্র সেখানে গাদা করে রাখা। দেখে মনে হলো, কোনো গ্যাং সেখানে ছিল। থাকার মতো অবস্থা নেই। তবুও নিরুপায় হয়ে রাতটা পার করলাম সেখানে।

 

সকালে হোটেলের কাউন্টারে গিয়ে পাসপোর্ট চাইলাম। সেখান থেকে বলা হলো, রাতে আপনাদের পাসপোর্ট ফটোস্ট্যাট করা হয়নি। তাই এখন পাঠিয়েছি। ১০ মিনিট অপেক্ষা করেন। দিচ্ছি।

 

লবিতে সোফায় ৪-৫ জন লোক বসা ছিল। তাদের মধ্য থেকে দুজন আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। একজন জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কোথায় এসেছি? বাংলাদেশি শুনে বসতে বললেন, চা খাওয়ার প্রস্তাব করলেন। আমরা বসে চা খেতে লাগলাম তাদের সঙ্গে।

 

এমন সময় সাদা পোশাকে কিছু আর্মির লোক ঢুকল। আমাদের সঙ্গের লোকদের বলল, তোমাদের নামে ওয়ারেন্ট আছে। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।

 

ওরা উঠে দাঁড়াল। আমরাও উঠে দাঁড়ালাম। আমাদের কামরার দিকে যখন হাঁটা দিয়েছি, তখন আর্মিদের একজন আমাদের প্রশ্ন করল তোমরা কোথায় যাচ্ছে?

 

আমি বললাম, ‘আমরা আমাদের কামরায় যাচ্ছি’।

 

তারা বলল, ‘না, তোমরাও এদের সঙ্গের লোক’।

 

আমি বললাম, ‘আরে না, আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এরা এখানকার লোক। আমাদের কথা বিশ্বাস না হলে আমাদের পাসপোর্ট দেখ’।

 

তারা বলল, ‘ওগুলো পরে দেখা যাবে। এখন চলো আমাদের সঙ্গে’।

 

আমাদের কোনো কথাই শুনল না তারা। জোর করে গাড়িতে উঠিয়ে নিল। আমাদের দুজনকে এরপর সারাদিন একটা ঘরে আটকে রাখল। সন্ধ্যাবেলা একজন এসে আমাদের খাবার দিয়ে গেল। রাতটাও সেখানে ছিলাম। ডিসেম্বরের সেই প্রচণ্ড শীতে আমাদের কোনো কম্বল বা কোনো কিছু দেয়া হয়নি। জামা-জুতো পরে, খবরের কাগজ বিছিয়ে শুয়েছিলাম।

 

পরদিন সকালে একজন অফিসার এসে আমাদের বললেন, ‘আগামীকাল সকালে আমাদের বড় স্যার আসবেন। তার কথা মতো কাজ করলে তোমাদের ছেড়ে দেবে।’ আমি বললাম ‘ঠিক আছে’। পরদিন সকালে আমাদের নেয়া হলো এক কোনায় এক চেম্বারে। প্রায় আধা ঘণ্টা পার হলো। কিন্তু কেউ এসে আমাদের কোনো কিছু জিজ্ঞেস করল না। অবশেষে একজন এসে বলল, ‘ফলো মি’। আমরা তাকে অনুসরণ করলাম। সে আমাদের নিয়ে গেল নিচে। তারপর গাড়িতে করে গেলাম একটা হাসপাতালে। সেখানে আমাদের নানা ধরনের পরীক্ষা করা হলো। তারপর তারা আমাদের আদালতে নিয়ে গেল। সেখানে তাদের আচরণ থেকে আমরা আন্দাজ করলাম, আমাদের নামে সম্ভবত মামলা করা হলো।

 

বিকেল ৪টা পর্যন্ত আদালতে ছিলাম। তারপর একটা গাড়ি এলো। তাতে করে আমাদের পাঠিয়ে দেয়া হলো তিহার জেলে।

 

২০০০ : জেলে যাওয়ার পর আপনাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছিল?

 

রশীদ আহমেদ : জেলে যাওয়ার পর থেকে আমি আমার বৌমাকে আর দেখতে পারিনি। তাকে আলাদা রাখা হয়েছিল। জেলখানায় আমাকে যে কামরায় রাখা হয়েছিল তা ছিল একটি ছোট কামরা। সেখানে এক কামরায় গাদাগাদি করে থাকে কয়েদিরা। এমন গাদাগাদি যে চিত হয়ে শোয়া যায় না। কাত হয়ে গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে শুতে হয়।

 

পরদিন সকালে আমার হাতে একটা ঝাড়– ধরিয়ে দিল একজন গার্ড। বলল, ল্যাট্রিন সাফ কর, যাও। বাধ্য হয়ে সেদিকে গেলাম। কিন্তু কাজ করতে পারছিলাম না। এক ভদ্রলোক আমাকে দেখে বুঝতে পারলেন। তিনি এগিয়ে এলেন। গার্ডকে অনুরোধ করে বললেন, ‘এ তো ভদ্রলোক, এসব কাজে অভ্যস্ত নয়। তোমরা একে দিয়ে এসব কাজ করিও না।’ আমাকে তিনি সরিয়ে দিলেন।

 

২০০০ : আপনার পুত্রবধূর সঙ্গে জেলখানায় কি আপনার দেখা হতো?

 

রশীদ আহমেদ : না। তার সঙ্গে আমার দেখা হলো প্রায় ৩ মাস পর। আদালতে যখন চার্জশিট দিল পুলিশ। চার্জশিট দেয়ার সময় একটা ঘটনা ঘটল। বিচারক চার্জশিট এক রকম ছুড়ে ফেলে দিলেন। আইওকে বললেন, ‘তুমি কি কখনো চার্জশিট বানিয়েছ? এটা কী বানিয়েছ? যাও নতুন করে চার্জশিট করে নিয়ে এসো’।

 

নতুন চার্জশিট আদালতে দাখিল করতে আরো এক মাস সময় নিল পুলিশ। সে সময় আমরা জানতে পারলাম, আমাদের বিরুদ্ধে নকল মুদ্রা বহনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

২০০০ : আপনারা কতদিন জেলে থাকার পর এই চার্জশিট দাখিল করা হলো?

 

রশীদ আহমেদ : প্রায় ৬ মাস পর। এ সময় একদিন একদল অফিসার এসে জানাল, তোমাদের বিরুদ্ধে আরেকটি কেস দাঁড় করানো হয়েছে। আমি তো অবাক। বললাম যে, আমরা জেলে রয়েছি। এর মধ্যে কেন আমার বিরুদ্ধে কেস হবে? কেমন করে হবে?

 

তারা এরপর একটা কাগজ বের করে বলল, এখানে সই করো। আমি রাজি হলাম না। তখন আমাকে হুমকি দিল, সই না করলে আমাকে পেটানো হবে। বাধ্য হয়ে সই করলাম।

 

এখন দুটা কেস হয়ে গেল। একটা হলো পাটিয়ালা হাউস কোর্ট, আরেকটা হলো ত্রিশহাজারি কোর্ট।

 

২০০০ : এর মধ্যে আপনি কি ঢাকায় আপনার আত্মীয়-স্বজনের কাছে কোনো সংবাদ দিতে পারেননি?

 

রশীদ আহমেদ : না। তিন মাস পর এক মেথরের হাতে একটা চিঠি দিয়ে অনেক অনুরোধ করে দেশে পাঠাতে পেরেছিলাম। মানবিক কারণেই সে চিঠিটা পোস্ট করে দিয়েছিল। না হলে আমার আত্মীয়-স্বজন জানত না যে, আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি। যে কারণে ঢাকা থেকে আমার ছোট মেয়ে লিপি আর আমার এক চাচাত ভাই দিল্লিতে গিয়েছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। এর দুই মাস পর আরেকবার তারা গিয়েছিল সেখানে।

 

২০০০ : বাংলাদেশে তো আপনি অনেক পরিচিত। এখানে নিশ্চয় আপনার অনেক বন্ধু-বান্ধব আছে। আপনি যখন ভারতে এমন একটা বিপদে পড়লেন, তখন তারা কী আপনার সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন?

 

রশীদ আহমেদ : না। তারা তো আসলে জানতেই পারেনি। যখন আমার মেয়ে ঘুরে এলো তখন তারা জানতে পারলেন। কিন্তু তার আগে বা পরে আমি সরাসরি তাদের কারো কাছে মুখের ভাষায় বা লিখিত আকারে কোনোভাবে কোনো সাহায্য চাইনি। আমি ভেবেছি যে, এটা তো মিথ্যা কেস। আমি হয়তো তাড়াতাড়ি ছুটে যাব। কিন্তু তা তো হলো না। এরা ঘুরে এলো। ঢাকায় এসে এরা অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সেসব কথা আমার মেয়েই ভালো বলতে পারবে।

 

ওর চেষ্টায় একটা চিঠি ভারতে বাংলাদেশের যে দূতাবাস আছে সেখানে পৌঁছায়। এর দু-মাস পর এক ভদ্রলোক আসেন সেখান থেকে। তিনি এসে আমাকে দেখে চিনতে পারেন। তিনি এসে আমাকে বলেন, ‘কিছু করার নেই। বন্দি যেহেতু হয়েছেন, তিন-চার বছর খামোখা রেখে দেবে। এটাই নিয়ম এখানকার। তারপর যদি কিছু হয়। আমি আপনার কাছে আসার জন্য দুই মাস ধরে চেষ্টা করছি। তবেই আসতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আবার কবে আসতে পারব বলতে পারি না। এই বলে তিনি চলে গেলেন। তারপর তিনি আর আসেননি।

 

২০০০ : এর মধ্যে আপনার পরিবার থেকে আর কেউ যায়নি?

 

রশীদ আহমেদ : না। পরিবারের সদস্য বলতে তো আমার ছোট মেয়েটাই। বড় ছেলে নেই। মেজো ছেলের অবস্থা তত ভালো না। বিভিন্ন সমস্যার কারণে সে যেতে পারেনি। যার মধ্যে অন্যতম বড় সমস্যাটি হলো আর্থিক। এর সঙ্গে রয়েছে ভিসা পাওয়ার সমস্যা। তারপর সেখানে গিয়ে থাকবে কোথায়? জানাশোনা কেউ নেই।

 

মাঝে মাঝে দুই-চার মাস পরপর একটা চিঠি আদান-প্রদান ছাড়া আর কিছুই সম্ভব হয়নি। এরপর ২০০৭-এ সম্ভবত আমরা হাইকোর্টে দরখাস্ত করলাম। আবেদন করলাম যে, আমরা বিনা বিচারে এতদিন আটক রয়েছি, আপনি ব্যবস্থা করুন। হাইকোর্ট আমাদের চিঠি দিল দুই মাস পর। আমাদের জানানো হলো, তোমাদের কেস জলদি ফয়সালা করা হবে।

 

এরপর আমরা কোর্টে গেলাম। ম্যাজিস্ট্রেটকে কাগজপত্র দেখালাম। তিনি বললেন, আমি আপনাদের কাগজপত্র দেখেছি। হাতে অনেক কেস। আপনাদের কেসটাও শেষ করতে হবে। একটার পর একটা ধরব। একটু অপেক্ষা করুন। আমি দেখছি। এই দেখছি বলেই আরো দুই বছর কাটিয়ে দিল।

 

২০০০ : শুরুতে যখন আপনাকে আদালতে হাজির করা হলো এবং পরবর্তী সময়ে যখন আপনি আদালতে গেলেন, তখন কি আপনাকে কোনো আইনজীবী দেয়া হয়নি? এ রকম কোনো সুযোগ তারা কি দেয়নি?

 

রশীদ আহমেদ : সুযোগ তো সেখানে রয়েছেই। তোমার পয়সা থাকলে তুমি আইনজীবী নিয়োগ কর। কোনো বাধা নেই। পয়সা না থাকলে কোনো আইনজীবী নেই।

 

২০০০ : বাংলাদেশ দূতাবাস কোনো সহযোগিতা করেনি?

 

রশীদ আহমেদ : কিছুই না। তারা দেখাই করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ম্যাজিস্ট্রেটকে আমি বললাম, আমাকে আইনজীবী দাও। তখন তারা একটা সরকারি আইনজীবী দিলেন।

 

২০০০ : সেটা কতদিন পর?

 

রশীদ আহমেদ : প্রায় ১ বছর পর।

 

২০০০ : তাহলে তো আইনজীবী একটা পেয়েছিলেন। তিনি আপনাকে কী ধরনের সহযোগিতা করলেন যে, এত দেরি হলো আপনার ছাড়া পেতে?

 

রশীদ আহমেদ : তিনি সরকারি আইনজীবী হলেও আমার কাছে টাকা চাইতেন। তার কথা হলো, পয়সা দাও, না হলে আসছি না কোর্টে। কিন্তু আমি টাকা দেব কোথা থেকে? তাই তিনি আন্তরিকতা দেখাতেন না। তবে এ কথা ঠিক যে, শেষ পর্যন্ত তিনিই আমার আইনজীবী হিসবে কাজ করেছেন।

 

তাকে অনেক মিথ্যা কথা বলেছি আমি অনেক সময়। বলেছি, আমার লোক আসবে দেশ থেকে, আমার কাজ করে দাও। আমার লোক এলেই তোমার পয়সা দিয়ে দেব। এভাবে মিথ্যা কথা বলে তাকে দিয়ে মাঝে মধ্যে কাজ করিয়ে নিয়েছি।

 

মাঝে মাঝে বাইরের আইনজীবীরও সহায়তা নিয়েছি। তারা বিদেশ থেকে আসতেন আইনজীবীদের অ্যাডভাইস দিতে। তাদের ধরে একদিন বলেছিলাম, দেখুন আমি বাংলাদেশি, এ রকম বিপদে পড়েছি। আমাকে একটু সাহায্য করুন। আমার কথা শুনে তারা এ নিয়ে লেখালেখি করেছেন। বিভিন্ন কাজ করে দিয়েছেন। কলকাতার এক বাঙালি ভদ্রলোক ছিলেন, তিনি কম্পিউটারে কাজ করতেন। তিনিও খুব সহযোগিতা করেছেন। বিনা পয়সায় আমাকে কম্পোজ করে দিতেন কাগজপত্র। তারপরও দুই বছর কেটে গেল।

 

তারপর যখন দেখলাম কোনো উপায় হচ্ছে না তখন জেলের সুপারিনটেন্ডেন্টকে অনেক অনুরোধ করলাম, আমাদের জন্য কিছু করতে। বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে তিনি আমাকে সমীহ করতেন। আমার কথা শুনে তিনি অবশেষে বাংলাদেশের দূতাবাসকে খবর দিলেন।

 

এ বছরের জুলাই-আগস্টের দিকে দূতাবাস থেকে মিনিস্টার (কনস্যুলার) নজিবুর রহমান এলেন আমাকে দেখতে। তিনি এসে বললেন, আমি চেষ্টা করব। তিনি সঙ্গে করে আইনজীবী নিয়ে এসেছিলেন। আমাকে দিয়ে ওকালতনামায় সই করিয়ে নিলেন। কিন্তু তারপর আবারো যোগাযোগহীন অবস্থা দেখা দিল।

 

আমি আমার মেয়েকে নজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বললাম। মেয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম, তিনি চেষ্টা করছেন কিন্তু আমার কাছে আসতে পারছেন না। সুপারিনটেন্ডেন্টকে জানালাম। তিনি বললেন, মিডিয়ার সহায়তা পাও কি না দেখ। কিছু করতে পারলে মিডিয়াই পারবে।

 

তার কথা মেয়েকে জানালাম। বললাম, নজিবুর রহমানকে বলো, তিনি যেন মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নজিবুর রহমান যোগাযোগ করেছিলেন নিশ্চয়। কয়েকদিন পর দেখলাম, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় বড় হরফে প্রথম পাতায় আমাকে নিয়ে সংবাদ ছাপা হলো। তাতে একটু আলোড়ন সৃষ্টি হলো।

 

এরপর ভারতের ইউনিয়ন মিনিস্টার প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী আমাকে একটা চিঠি পাঠালেন। তিনি আমাকে চিনতেন মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই। তিনি আমার ব্যাপারে সুপারিশ করে একটা চিঠিও লিখেছিলেন বিচারককে। চিঠিটা বিচারককে দেখালাম। বিচারক বললেন, এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই এটা কার্যকর হবে না। তিনি সেটা আমলেই নিলেন না। তবে একটা ব্যাপার হলো, বিচারকরা আমাদের যে একের পর এক তারিখ দিচ্ছিল আর পেছাচ্ছিল পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর সেটা আর করল না। তারা অক্টোবরের ১০ তারিখে একটা রায় দিয়ে দিল। আমাদের সাজা ঘোষণা করল ৭ বছর। আর সঙ্গে জরিমানা দেড় লাখ করে দুজনের জন্য তিন লাখ রুপি। অনাদায়ে আরো দেড় বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু ততদিনে আমাদের ৭ বছর ১০ মাস জেলখানায় কেটে গেছে।

 

এর মধ্যে নজিবুর রহমান ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র ইন্দ্রানী বসুর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তিনি জেলখানায় এলেন, আমাদের সঙ্গে কথা বলে একটা প্রতিবেদন লিখলেন। এরপর সাড়া পড়ে গেল। ইন্দ্রানী বসু কেবল আমাদের জন্য সংবাদ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হলেন না। তিনি দৌড়াদৌড়ি করে আমাদের জরিমানার তিন লাখ রুপি জোগাড় করলেন। তারপর আমাদের জন্য দিল্লি-কলকাতা, কলকাতা-ঢাকা বিমান টিকেটেরও ব্যবস্থা করলেন। যেদিন আমি বিমানে উঠব, সেদিন আমার পকেটে ঈদ খরচের এক হাজার টাকা দিয়ে দিলেন। মেয়েটি খুবই ভালো মানুষ। আমার আজীবন দোয়া ও শ্রদ্ধা থাকবে তার জন্য।

 

২০০০ : রায় তো হলো ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর। আপনারা আটক হয়েছিলেন ২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। সে সময় থেকে এতদিন আপনাকে এবং আপনার পুত্রবধূকে যে জেলখানায় আটকে রাখা হলো, এই আটকে রাখার ব্যাপারে তখন আদালতের কোনো রায় ছিল না? আদালতের বিনা নির্দেশেই কি আটকে রাখা হলো এতদিন?

 

রশীদ আহমেদ : আদালতের কোনো নির্দেশ ছাড়াই আমাদের আটকে রাখা হয়েছে আট বছর।

 

২০০০ : এ সময়ের মধ্যে আপনারা কি কোনো মানবাধিকার সংগঠনের কাছে সহায়তা চেয়েছেন?

 

রশীদ আহমেদ : আমাদের তেমন কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। কারো সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়নি আমাদের।

 

২০০০ : জেলখানায় আপনাদের সঙ্গে কি কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করা হয়েছে?

 

রশীদ আহমেদ : কথাবার্তা বলা হতো খুব খারাপভাবে। থাকতে দেয়া হতো মেঝেতে। দুইটা কম্বল দেয়া হতো। একটা মাথায় দেয়ার জন্য, একটা গায়ে দেয়ার জন্য। খাবারও কম দেয়া হতো। সকালে দুটো রুটি, আলু অথবা কুমড়োর ঘণ্ট। দুপুরে ভাত আর আলু অথবা কুমড়োর ঘণ্ট। সপ্তাহে একদিন বা পক্ষে একদিন সামান্য মাছ। আর কিছু না।

 

২০০০ : এ দেশে আপনার যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে। সেটা বাদ দিলেও বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে বিদেশে বিনা বিচারে আপনি আটক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে ভ‚মিকা পালন করা উচিত ছিল তা পালন করা হয়েছে বলে কি আপনি মনে করেন?

 

রশীদ আহমেদ : একদমই না। আমরা বছরের পর বছর একটা দেশের কারাগারে আটক আছি। সেখানে আমাদের দূতাবাসের যে দায়িত্ব পালন করার কথা তা একদম পালন করা হয়নি। হয় বলতে হবে তারা ইচ্ছা করে করেনি অর্থাৎ দায়িত্বে অবহেলা করেছে। অথবা বলতে হবে তারা ভয়ে করেনি যে, ভারত একটা বড় দেশ, বাংলাদেশ একটা ছোট, দেশ কী হবে না হবে! মোট কথা, তারা ইচ্ছা করে করেনি এমনটি নয়। আসলে তারা ভয়ে করেনি।

 

২০০০ : তার মানে আপনার কাছে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রের দুর্বলতার কারণে আপনি বঞ্চিত হয়েছেন আপনার প্রাপ্য অধিকার থেকে?

 

রশীদ আহমেদ : ঠিক তাই।

 

২০০০ : এখন আপনি একজন ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক হিসেবে কী প্রত্যাশা করেন?

 

রশীদ আহমেদ : সময় চলে গিয়েছে। সেটা তো আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আমার সুখ্যাতি ছিল। তা এখন কুখ্যাতি হয়ে গেছে। আমার জায়গা-জমি, সম্পদ যা ছিল তা সব হারিয়েছি। উপরন্তু আমি আমার জীবনের সঞ্চয় বলতে যা কিছু বোঝায় সবই হারিয়েছি। সেগুলো তো আর ফিরে আসবে না। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হলেও মেয়ের কাছে টাকা চাইতে হচ্ছে। এখন আমার প্রয়োজন আর্থিক সহযোগিতা। আর প্রয়োজন মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই। আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করেছি। আমার ভাস্কর্য অনেক উচ্চ পর্যায়ের কাজ। এগুলোর জন্যও তো অন্তত আমাকে একটা সহায়তা করা উচিত সরকারের।

 

২০০০ : আপনার বিচার করা হয়েছিল কি সামরিক আদালতে না সিভিল আদালতে?

 

রশীদ আহমেদ : সিভিল আদালতে।

 

২০০০ : আপনার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী অভিযোগ দাখিল করা হলো?

 

রশীদ আহমেদ : জাল টাকা বহনকারী।

 

২০০০ : এটা প্রমাণিত হলো কীভাবে?

 

রশীদ আহমেদ : কিছুই না। কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি আমাদের বিরুদ্ধে। কেবল একটা ফেলে রাখা জিনিস দেখিয়ে বলা হলো এটার বহনকারী আমরা। কিন্তু মুখের সেই কথাটা ছাড়া আর কোনো প্রমাণ তারা উপস্থাপন করেনি। আমি মুখে বারবার বলেছি, এগুলো আমার না। তা সত্তে¡ও আমাদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হলো।

 

আমার পক্ষে বরং অনেক যুক্তি ছিল। কিন্তু সেগুলো তারা শুনতে চায়নি। আমি ভারতে গিয়েছিলাম বাসে। বিমানে যাইনি। বাসে যেতে পথে চারবার চার জায়গায় চেক করা হয়। যদি আমার সঙ্গে জাল টাকা থাকত সেগুলো নিশ্চয় ধরা পড়ত।

 

 

 

 

 

‘সরকার সদয় হয়ে বাবার

 

চিকিৎসার খরচটা অন্তত বহন করুক’

 

লিপি আহমেদ

 

 

 

 

 

 

 

সাপ্তাহিক ২০০০ : আপনার বাবা বলছিলেন ভারতে তার আটক হওয়ার কারণে আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে। আপনার কাছ থেকে সেই ভোগান্তির অর্থাৎ একজন সন্তান হিসেবে আপনি কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সংগ্রাম করেছেন সেসব কথা শুনতে চাই। প্রথমে আপনার বর্তমান অবস্থার কথা বলুন।

 

লিপি আহমেদ : আমরা চার ভাইবোন। হারিয়ে যাওয়া ভাইটা ছাড়া এক ভাই এবং এক বোন বিবাহিত। আমি এখনো অবিবাহিত। মাস্টার্স করছি। হোস্টেলে থাকি। বাবা চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার আমিই হয়েছি। বাবাকে দেখতে যাওয়ার জন্য টাকার জোগাড় করতে জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়া, বাসা ছেড়ে দেয়া, লোনের জন্য বিভিন্ন হুমকি-ধমকি আমি সহ্য করেছি। বাবা চলে যাওয়ার মাসখানেকের মধ্যে ডিবির লোক, এসবির লোক আসতে শুরু করে। আব্বুর ব্যাপারে নানাজনের কাছে বারবার নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, আব্বু কেমন মানুষ, তার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ আছে কি না? এগুলো সব আমিই ফেস করেছি। কারণ, আমি একেবারে একা ছিলাম। আব্বু আর আমিই তো থাকতাম বাসায়। তিনি চলে যাওয়ার পর একমাত্র মানুষ তো আমিই।

 

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এবং নিজের টিকে থাকার জন্য টাকার জোগাড় করতে সংগ্রামটা আমাকে একাই করতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত টিউশনি করেই টাকার জোগাড় করছি। এখন থাকি ছাত্রী হোস্টেলে। সেখানে তো আর বাবাকে নিয়ে ওঠা সম্ভব না।

 

২০০০ : আপনার ভাই-বোনদের সম্পর্কে আরো একটু বলুন।

 

লিপি আহমেদ : আমার বড় ভাই-ভাবির আলাদা সংসার। খুব সুখের সংসার ছিল। তাদের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তারা আলাদা বাসায় থাকতেন। ভাবি ভারতে আটক হওয়ার এক মাস পর মেয়ে মারা যায়। মেজ ভাই আকিজ গ্রুপে চাকরি করতেন। থাকতেন মিরপুরে। আমার বড় বোন থাকতেন তার শ্বশুরবাড়িতে। আমি থাকতাম বাবার সঙ্গে। যেহেতু ওরা খুব স্বল্প আয়ের মানুষ, কাজেই আব্বু চলে যাওয়ার পর ওদের কাছে গিয়েও উঠতে পারিনি। ডিসেম্বরে বাবা ভারত যান। তার কোনো খবর না পেয়ে আমি নিজেই রোজগারের চিন্তা করতে থাকি। ফেব্রুয়ারি থেকে টিউশনি শুরু করি। কিছুদিন বোনের বাসায় ছিলাম। তারপর হোস্টেলে উঠে যাই।

 

২০০০ : বড় ভাই কেন বাবাকে দেখতে যাননি?

 

লিপি আহমেদ : তার পাসপোর্ট করা ছিল না। কেবল আমার পাসপোর্ট করা ছিল। তাই  আমিই গিয়েছিলাম।

 

২০০০ : এখানেও তো যত যোগাযোগ আপনিই করেছেন?

 

লিপি আহমেদ : হ্যাঁ। সবাই লিপিকেই চেনে এ ব্যাপারে।

 

২০০০ : ভারতে বাবার সঙ্গে প্রথমবার দেখা করে আসার পর আপনার বাবার পরিচিতজনদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন কি?

 

লিপি আহমেদ : বাবার নিষেধ ছিল। বাবা বলছিলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের তো কোনো সত্যতা নেই। কোনো চার্জশিটও হয়নি। কাজেই বোধহয় দেরি হবে না। আমি ছাড়া পেয়ে যাব। খামোখা কাউকে জানানোর দরকার নেই। একটা বদনাম হবে শুধু শুধু। আমি এক-দুই মাসের মধ্যে চলে আসব। তোমার চিন্তা করার দরকার নেই। তারপর চলে আসছি, চলে আসব করে করে সময় পার হয়ে গেল।

 

তাছাড়া আরেকটা কথা আছে, বিপদে পড়লে বন্ধু বন্ধুকে ছেড়ে চলে যায়। আমি আমার বাবার যারা সহযোগী ছিলেন, তাদের দিন-রাত আমাদের বাসায় আসা-যাওয়া করতে দেখেছি। আব্বু চলে যাওয়ার পর একেবারে ভোজবাজির মতো তারা উধাও হয়ে গেলেন। তাদের দুয়েকজন মারাও গিয়েছেন।

 

২০০০ : দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ কবে থেকে শুরু করেছিলেন?

 

লিপি আহমেদ : দূতাবাসে তো বাবাই যোগাযোগ করতেন। আমি তো তখন মাত্র উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। এতটা আমার বুদ্ধিতেও কুলায়নি যে, দূতাবাসে যোগাযোগ করা উচিত। তবে আমার সঙ্গে যোগাযোগটা সাম্প্রতিক। নজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমি। নজিবুর রহমানই মিডিয়ার মাধ্যমে কাজটি করেন। পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পরই একটা আলোড়ন হয়।

 

সাপ্তাহিক ২০০০ : আপনাকে বাড়ি বিক্রি করতে হলো কোন সময়?

 

লিপি আহমেদ : আমি বাবাকে দেখে এসে বাড়ি বিক্রি করি। কারণ, বাবার টাকার দরকার ছিল। সেটাকে আসলে বাড়ি বলা যাবে না। একটা প্লট ছিল। আমরা থাকতাম ভাড়া বাসাতে। সে বাড়িতে তিন-চার মাসের ভাড়া বাকি পড়ে যায়। বাড়িওয়ালা সাংঘাতিক খারাপ আচরণ শুরু করে। এক পর্যায়ে আমাকে বলে, যেভাবে আছ ওভাবেই বের হয়ে যাও বাসা থেকে। আমি তো তখন ছোট। কী সিদ্ধান্ত নেব বুঝতে পারতাম না। তারপর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জিনিসপত্র সব বিক্রি করে দিয়ে বের হয়ে আসি বাসা থেকে।

 

২০০০ : দ্বিতীয়বার ভারতে যাওয়ার সময় কি বাবার জন্য টাকা-পয়সা নিয়ে গিয়েছিলেন?

 

লিপি আহমেদ : তেমন কিছু নিতে পারিনি। কারণ, সবকিছু বিক্রি করে ৩০ হাজার টাকার মতো হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বার ভারত গেলে ল-ইয়ার বলল, বাবা এবং ভাবি দুজনের জন্য ৫ লাখ করে দশ লাখ রুপি দিলে তারা জামিনের ব্যবস্থা করে দেবে। আমার সঙ্গে তখন মাত্র ১০-১৫ হাজার টাকা। যা হোক ঢাকায় ফিরে এসে ভাই-বোনদের বললাম। কিন্তু সবাই তো ছোটখাটো অবস্থার মানুষ। তারা ১০ লাখ রুপি কোথা থেকে জোগাড় করবে।

 

ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতাম। অনেক দিন পরপর একটা চিঠি পাই। আমরা চিঠি দিলে তিনি পান কি না বুঝতে পারি না। পোস্ট অফিসে যেখান থেকে চিঠি পোস্ট করি সেখানেও নানা প্রশ্ন, ‘কী ব্যাপার, জেলে কে থাকে? কাকে চিঠি পোস্ট করেন?’

 

তাছাড়া বাবার অনুপস্থিতিতে একা একটা মেয়ের পক্ষে থাকা, বুঝতেই পারেন কত অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়। এমন অনেক অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি, যা বাবার সামনে বা আপনাদের সামনে উল্লেখ করতে পারব না।

 

এক-এক সময় তো নিরাশ হয়ে পড়েছি। মনে হয়েছে বাবার মুক্তি হবে না। এর মধ্যে নজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। একদিন তাকে বললাম, ভাইয়া, যদি তিনি মারা যান, তবে আমাদের দয়া করে জানাবেন। আর যদি আমি মারা যাই, তবে খবরটা তার কাছে অনুগ্রহ করে পৌঁছে দেবেন।

 

তিনি আমার কথা শুনে চুপ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘তুমি আর এ রকম কথা বলো না কখনো, আমি দেখি কী করতে পারি। আমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে দিয়ে ব্যর্থ। তবুও শেষ একটা চিঠি দেব। তুমি একটু দোয়া করো।’ তারপর ৮ জুলাই তিনি ফোন করে বললেন, ইন্টারনেটে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসটা দেখ। বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাগুলোও একটু দেখ। এই তখন একটা সংবাদ প্রকাশিত হলো।

 

২০০০ : বিনা অপরাধে সাজা ভোগ করে আসা বাবার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ বা কোনো কিছু প্রত্যাশা করেন কি আপনি?

 

লিপি আহমেদ : তা তো চাই-ই। কিন্তু জানি তা সম্ভব হবে না। ভোগান্তি একা তো বাবার হয়নি, আমারও হয়েছে। যেসব ভোগান্তির কথা আপনাদের সামনে তো নয়ই, বাবার কাছেও বলতে পারব না। আটটা বছর তো আর কম সময় নয়। কিন্তু সেসবের কোনো ক্ষতিপূরণ আমি চাইছি না।

 

তবে বাবা ফিরে আসার পর তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। আজো একগাদা টেস্ট করতে দিয়েছেন ডাক্তার। তার অনেক ওষুধ লাগছে। আমি চাইব তার চিকিৎসার খরচটা অন্তত সরকার একটু সদয় হয়ে ব্যবস্থা করুক। ক্ষতিপূরণ হিসেবে নয়, আমাদের সাহায্য করার জন্য বলব।

 

 

 

কেবল এক ভাস্কর রশীদ আহমেদ নয়, বাংলাদেশের আরো অনেক নাগরিক আটক রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন কারাগারে। অবশ্য তাদের বেশিরভাগই অবৈধ উপায়ে, দালাল ধরে বিদেশে গিয়েছিল। এ অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ৯ বাংলাদেশি ভারত থেকে ৫ বছর সাজা শেষে ১২ অক্টোবর দেশে ফিরেছে। জানা গেছে, ভিসা প্রতারণার দায়ে মিসরে আটক রয়েছে ৮ বাংলাদেশি। মোজাম্বিকে রয়েছে ৪২ বাংলাদেশি। তাঞ্জানিয়ায় রয়েছে ৫ বাংলাদেশি। বিদেশে জেল খেটে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি কিছু নাগরিকের কাছ থেকে জানা গেছে, তাদের সঙ্গে সেসব দেশে খুব অমানবিক আচরণ করা হতো। দূতাবাস থেকে তাদের কাউকে কোনো ধরনের সহায়তা কখনো করা হয়নি। তারা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিনযাপন করেছেন। পরে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু ততদিনে তাদের সব স্বপ্ন, সব সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব, অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা।

 

ভাস্কর রশীদ আহমেদের তিহার জেলের দিনগুলোর বর্ণনা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে মুক্ত করার জন্য কোনো ধরনের বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। উপরন্তু বাংলাদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানকার কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতিও জোগাড় করতে হিমশিম খেয়েছেন। ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (কনস্যুলার) নজিবুর রহমানের বক্তব্যও তা সমর্থন করে। তিনি জানিয়েছেন, ভাস্কর রশীদ আহমেদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও তিনি দেখা করতে পারেননি। দশবার চেষ্টা করলে একবার দেখা মিলত। এমনকি ঢাকা থেকে মেয়ের পাঠানো চিঠিও ১০টি পাঠালে ১টি পৌঁছুত বা আদৌ পৌঁছুত কি না তা বুঝতে পারতেন না লিপি আহমেদ। বাবার চিঠিও লিপি পেতেন না। অনেক দিন পরপর চিঠি আসত। কিন্তু তার বক্তব্য পড়ে লিপি বুঝতে পারতেন এর আগে বাবা অনেক চিঠি পাঠিয়েছেন, যা তার হাতে এসে পৌঁছায়নি।

 

এ অবস্থায় ভারতের বাংলাদেশ দূতাবাসের করণীয় কী ছিল, যা করেছে তা বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকের অধিকার কতটুকু সংরক্ষণ করে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালের কাছে। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পর্যায়ক্রমে এখানে উপস্থাপন করা হলো :

 

 

 

ড. মিজানুর রহমান

 

চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

 

 

 

ভাস্কর রশীদ আহমেদ তার ভোগান্তির যে কথা বলেছেন তা যদি সত্যি হয়ে থাকে এবং ভারতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভ‚মিকা যদি এমন হয়ে থাকে, তবে তা সত্যিই দুঃখজনক। এ অবস্থায় আমার বক্তব্য হলো, সরকারের উচিত এ ভোগান্তির ব্যাপারটা ভালোভাবে শুনে, বিদেশে বাংলাদেশের ক‚টনৈতিক কার্যালয়গুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করে তাকে আরো শক্তিশালী করা। কারণ তারা সেখানে দুর্বল হয়ে থাকলে তাতে দেশের ভাবমূর্তিই শুধু ক্ষুণ্ন হবে না। সেখানে যাওয়া বাংলাদেশি মানুষগুলো, সেখানে ভোগান্তির শিকার হওয়া বাংলাদেশি মানুষগুলো যদি তাদের যথোচিত সেবা না পায় তবে সেগুলো সেখানে রাখার তো কোনো মানে হয় না। কারণ একটা দূতাবাসের তো অনেক খরচ। যার ব্যয়ভার বহন করে থাকে এখানকার জনগণ।

 

 

 

সুলতানা কামাল

 

নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র

 

 

 

ব্যাপারটা সত্যিই দুঃখজনক। আমরা চাই না বাংলাদেশের কোনো মানুষ বিদেশে গিয়ে এমন ভোগান্তির শিকার হোক। আরো দুঃখজনক যে, একটা নিরপরাধ মানুষ বছরের পর বছর সাজা খাটল আর তাকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য তার রাষ্ট্র তাকে কোনোপ্রকার সাহায্য করল না, সেটা বিখ্যাত হোক আর অখ্যাত হোক আমার রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য দেশে গিয়ে বিপদে পড়লে তার তো নিজের রাষ্ট্রের দূতাবাস ছাড়া সাহায্য চাওয়ার কোনো জায়গা নেই। কারণ, সেখানে সে তো একা, অসহায়। কিন্তু সেখানে দূতাবাসের লোকজনই যদি দুর্বল ভ‚মিকা পালন করে তবে কেমন করে হবে। ভারতে বাংলাদেশ দূতাবাসের লোকজন যদি দুর্বল হয়ে থাকে বা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারে তবে আমার মতে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কারণ তাদের সেখানে দায়িত্ব পালন করার জন্য পাঠানো হয়েছে, পাঠানো হয়েছে তার রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা দেখার জন্য। সেটা তাদের দায়িত্ব। তাদের এই দায়িত্বে অবহেলার জন্য একটা মানুষের জীবন থেকে ৮টি বছর হারিয়ে গেল আর তারা সবাই পার পেয়ে যাবে তা হতে পারে না। আর রাষ্ট্রও এর দায়ভার এড়িয়ে যেতে পারে না।  রাষ্ট্রের উচিত ভাস্কর রশীদ আহমেদের ব্যাপারটা থেকে একটা শিক্ষা নেয়া। যাতে করে পরবর্তী সময়ে আর কোনো বাংলাদেশির জীবনে এমনটি না ঘটে।

 

 

 

ভাস্কর রশীদ আহমেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি আটক হওয়ার তিন মাস পর আটকের কথা দূতাবাসকে জানিয়েছিলেন। সে সময় ভারতে বাংলাদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তা আসাফুদ্দৌলা তার সঙ্গে  একবার দেখা করেছিলেন। তারপর তার সঙ্গে আর কেউ যোগাযোগ করেননি। অর্থাৎ বাংলাদেশি দূতাবাসের পক্ষ থেকে তিনি কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। যে কারণে অসহায় অবস্থায় ভাস্কর রশীদ আহমেদ নিজের পক্ষে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীও নিয়োগ করতে পারেননি। পারলে হয়তো তিনি জামিন পেতে পারতেন। ভাস্কর রশীদ আহমেদ ও তার মেয়ে লিপির বক্তব্য থেকে জানা যায়, ব্যক্তিগতভাবে তারা একজন উকিলের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই উকিল ৫ লাখ রুপির শর্তে জামিনের ব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছিলেন।

 

এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য এবং জাল টাকা বহনের অভিযোগে শাস্তি কী তা জানতে চাওয়া হয়েছিল আইনজীবী মনজিল মোরসেদের কাছে। তিনি বলেন, এই আইনের শাস্তি অনেক ভয়াবহ। বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(এ-বি) ধারা অনুযায়ী আমাদের দেশে এ অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত রয়েছে। অবশ্য পেনাল কোর্টে ৮ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং আর্থিক জরিমানা রয়েছে।

 

ভারতের এ সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরির সময়ের মধ্যে খোঁজ নিয়ে জানতে পারা যায়নি। কিন্তু ধরা যাক, সেখানেও আইন একই ধরনের। সে ক্ষেত্রে হয়তো ভাস্কর রশীদ আহমেদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতো। কিন্তু রশীদ আহমেদের দাবি অনুযায়ী যদি সত্যিই তিনি নির্দোষ হয়ে থাকেন, তবে একজন নির্দোষ মানুষের মৃত্যুদণ্ড হতো।

 

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এই সাজাকে চ্যালেঞ্জ করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। কারণ তিনি দোষী সাব্যস্ত ও সাজাপ্রাপ্ত।

 

ভাস্কর রশীদ আহমেদের মেয়ে লিপি আহমেদের কাছ থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে এসবির পক্ষ থেকে তার কাছে লোক এসেছিল। তারা ভাস্কর রশীদ আহমেদের সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল কি না, তিনি কেমন মানুষ ছিলেন ইত্যাদি। এর বেশি কোনো কিছু তারা জানতে চাননি। এমনকি পরবর্তী সময়ে আর কখনই তারা আসেননি ভাস্কর রশীদ আহমেদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে।

 

এ ব্যাপারে এসবির সুপারিনটেন্ডেন্ট নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি এ কেসটির ব্যাপারে কিছু জানেন কি না? তিনি বলেন, এটি অনেক আগের কেস। তাছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া যায়নি বলে পরবর্তী সময়ে এটা তেমন গুরুত্ব পায়নি। তাছাড়া এ কেস নিয়ে কোথাও থেকে কিছু বলাও হয়নি। এমনকি তিনি দেশে ফেরার পরও আমাদের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি বলেই আমি জানি। এর বেশি কিছু জানি না।

 

 

 

 

 

কতজন বন্দি আছেন

 

ভারতের জেলগুলোতে

 

 

 

কয়েকটি সূত্র থেকে জানা গেছে, ভারতে বন্দি বাংলাদেশিদের মধ্যে গরু ব্যবসায় সীমান্ত পারাপারের প্রলোভনে পড়া মানুষই বেশি। এ রকম কয়েক হাজার বাংলাদেশি যুবক সীমান্তের ওপারে গিয়ে আটক হয়ে পড়েছেন। আবার বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচার জন্য রাতের আঁধারে বাঁশ দিয়ে কাঁটাতার পেরিয়ে কিংবা কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত এলাকা দিয়ে গরু আনার সময়ও অনেকে বিএসএফের হাতে আটক হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই বৃহত্তর রংপুরের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ ও দিনাজপুর জেলার মানুষ। এরা ভারতের বিভিন্ন জেলহাজতে বন্দি রয়েছেন।

 

জানা গেছে, বিএসএফের হাতে গ্রেফতার  হয়ে  এসব বাংলাদেশি ভারতের বিভিন্ন কারাগারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তারা কোনোভাবেই মুক্তি পাচ্ছেন না। এমনকি সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও অনেকে মুক্তি পাচ্ছেন না বা দেশে ফিরতে পারছেন না। জানা গেছে, সরকার থেকে প্রয়োজনীয় কোনো উদ্যোগই নেয়া হয় না এদের ফিরিয়ে আনার জন্য।

 

জানা গেছে, গরু পাচার কাজে সাহায্য করলে গরুপ্রতি ২ হাজার টাকা করে দেয়া হবে এমন কথা বলে বাংলাদেশি যুবকদের ভারতে নেয় কিছু গরু ব্যবসায়ী। অনেকের পাসপোর্ট-ভিসা না থাকায় তারা বাঁশের সাহায্যে কাঁটাতারের বেড়া পার হয়। অনেকে কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত পথে প্রবেশের সময় বিএসএফ কিংবা পুলিশের হাতে আটক হয়। বিএসএফের হাতে আটক হলে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

 

সম্প্রতি ভারতের জেল থেকে ফিরে আসা পাটগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জসিমউদ্দিনের ছেলে ফরিদুল ইসলাম এক সাংবাদিককে জানিয়েছিলেন, তার ৩ বছরের সাজা হলেও দুর্ভাগ্যবশত তাকে অতিরিক্ত আরো ৯ মাস ভারতের জেলে বন্দি থাকতে হয়েছে। তিনি জানান, দহগ্রাম সীমান্ত দিয়ে এক ব্যক্তি তাকে ভারতের মেখলিগঞ্জে নেন গরু আনার জন্য। সেখানে পুলিশের হাতে আটকা পড়েন তিনি। মেখলিগঞ্জ জেলহাজতে কিছুদিন থাকার পর তার ৩ বছরের সাজা হয়। তখন সাজা ভোগ করতে তাকে কুচবিহার জেলহাজতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি অনেক বাংলাদেশিকে পান, যারা বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ভোগ করছেন। এদের মধ্যে আছেন অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশু বন্দি।

 

ভারতের জেলগুলোতে মোট কতজন বাংলাদেশি বন্দি হিসেবে রয়েছে সে তথ্য জানার চেষ্টা করে যোগাযোগ করা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু সেখান থেকে কোনো তথ্য জানা যায়নি। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে খোঁজ করে ভারতের জেলের অন্যান্য নানা বিষয়ে জানা গেলেও কোন দেশের কতজন নাগরিক বন্দি রয়েছে সে সংখ্যা জানা যায়নি। কেবল জানা গেছে, ভারতে বিদেশি বন্দীদের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে নাইজেরিয়ানরা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশিরা।

 

 

 

বিভাগ: প্রচ্ছদ

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.