banner ad

বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে সিরিয়াল বিড়ম্বনা
সায়মা ইসলাম তন্দ্রা

মূল চিকিৎসা শুরু হতে তিন মাসও লেগে যায়

 

বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজনকে পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের চিত্রই এ ক্ষেত্রে কম-বেশি একই রকমের। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে সিরিয়াল নেয়া থেকে শুরু করে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মূল চিকিৎসা আরম্ভ করতে তিন মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়। ডাক্তারের সিরিয়াল পেতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় রোগী বা রোগীর স্বজনদের। অনেক সময় আগের রাত থেকে চেম্বারের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারপরও দেখা মেলে না চিকিৎসকের। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর ক্ষেত্রে রোগীদের এই বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরেছেন সায়মা ইসলাম তন্দ্রা

 

দৃশ্যপট : এক

রাজধানীর গ্রিন রোডে নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের চেম্বার। তাকে দেখাতে সকালে এসে সিরিয়াল দিতে হয় রোগী বা রোগীর স্বজনদের। তাই ফজরের আজানের পর থেকেই এখানে লাইনে দাঁড়িয়ে যান অনেকে। সকাল ৭টায় এই চিকিৎসকের সহকারী এসে সিরিয়াল নম্বর দেন রোগীদের। যারা আগে আসতে পারেন তারা খুশি মনে ফিরতে পারেন। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, এখানে রোগীরা ওই দিনই ডাক্তারকে দেখাতে পারেন।

 

দৃশ্যপট : দুই

রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডে জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলামের চেম্বার। মেডিসিনের এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে সিরিয়াল নিতে এসেছেন কয়েকজন রোগী। তার মধ্যে একজন রাজশাহীর শাহেদ মিয়া। মাকে দেখানোর জন্য সিরিয়াল নিতে এসেছেন তিনি। ডাক্তার দেখানোর জন্য শিডিউল পেয়েছেন ডিসেম্বর মাসে। তারপরও সন্তুষ্ট তিনি।

 

দৃশ্যপট : তিন

রাত ৯টা। শান্তিনগরের মোড়ে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সিঁড়িতে ব্যাগ হাতে এসে বসলেন একজন। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, তিনি এসেছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সজল ব্যানার্জির সিরিয়াল নিতে। রাত গড়িয়ে চলল, তিনি বসেই থাকলেন। ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে থাকল। এক সময় জায়গা নিয়ে মারপিটও লেগে গেল সেখানে। তিনি ঠায় বসে থাকলেন খবরের কাগজ বিছিয়ে। পরদিন সকাল ৭টায় ডাক্তারের একজন প্রতিনিধি এলে নাম লেখাতে গিয়ে দেখেন তার সিরিয়াল চার নম্বরে, অথচ লাইনে তিনি সবার আগে। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ডাক্তারের প্রতিনিধি জানালেন, ডাক্তার আগে তিনজন ভিআইপি রোগী দেখেন। তাই প্রথমে এলেও সিরিয়ালে তিনি চার নম্বরে। ১০ জনের নাম নিয়ে বাকিদের পরের দিন আসতে বলা হলো। লাইনে দাঁড়িয়েই তিনি শুনতে পেলেন অনেকে ৮/১০ দিন ধরনা দিয়ে তবেই নাম লেখাতে পেরেছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর ক্ষেত্রে বিড়ম্বনার সামান্য কয়েকটি চিত্র এগুলো। রোগী বা রোগীর স্বজনদের প্রতিনিয়তই এই ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় গুরুতর রোগীদের। বিশেষ করে হৃদরোগী, নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জারি, কিডনি সমস্যায় যারা ভোগেন তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক দেখানোই প্রথম কাজ। যারা বিশেষায়িত বেসরকারি হাসপাতালে যান তাদের আর্থিক সামর্থ্যরে কারণে হাসপাতালের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সেবা পেয়ে যান সহজে। ওই হাসপাতালগুলো বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানান ওই বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তরা যেহেতু ওইসব হাসপাতালে যেতে পারেন না সে কারণে তারা ছোটেন ডাক্তারদের চেম্বারে। নিরাশ হন ডাক্তার দেখানোর সুযোগ না পেয়ে। সামর্থ্যবানরা হয়তো তাদের স্বজনদের নিয়ে চলে যান দেশের বাইরে। কিন্তু অন্যদের কী হবে? এ রকম একজন ঢাকার মালিবাগের উল্লাস। তিনি জানালেন, তার বাবার অসুস্থতার সময় বিড়ম্বনার কথা। কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত বাবাকে তিনি ভর্তি করেন একটি সরকারি হাসপাতালে। সেখানে কয়েকজন তাকে পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর। দেশের সেরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ঠিকানা নিয়ে তাদের চেম্বারে সিরিয়াল দিয়ে তার বাবাকে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। প্রায় প্রত্যেকেরই সিরিয়াল পাওয়া যায় দুই থেকে তিন মাস পর। অথচ তাকে দেখাতে হবে জরুরিভিত্তিতে। শেষ পর্যন্ত একজন ডাক্তারের সহকারীকে টাকা দিয়ে সিরিয়াল নিতে হয়েছে এবং তার বাবাকে দেখিয়েছেন ওই ডাক্তারকে।

একই ধরনের অবস্থার শিকার আরেকজন লালমাটিয়ার রেজাউল করিম। তার পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে দেখাতে হবে একজন নিউরো সার্জারি বিশেষজ্ঞকে। বেশ কয়েকবার গিয়ে সিরিয়াল চেয়ে দুই মাসের আগে সিরিয়াল পেলেন না তিনি। ডাক্তারের সহকারীর সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করেও লাভ হলো না। তবে ওই সহকারীই তাকে পরামর্শ দিলেন বাচ্চাকে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করতে। সেখানে গেলে নাকি ওই চিকিৎসকের দেখা পাওয়া খুব সহজ হবে তার জন্য। সত্যিই সন্তানকে ওইদিন ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে সে দিনই ডাক্তার দেখানোর সুযোগ পেলেন। অবশ্য সেবার তাকে সাতদিন থাকতে হয়েছিল সেই ক্লিনিকে।

এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ, জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খানের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার সমস্যার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা হাসপাতালেই পাওয়ার কথা। কিন্তু দেশে রোগী আর হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের অনুপাতে এতটাই ফারাক রয়ে গেছে যে, বিশেষজ্ঞদের পাওয়াই কঠিন। আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা চেম্বারে রোগী দেখেন অনেক কম। অনেক সময় ইচ্ছে থাকলেও তাদের পক্ষে সব রোগী দেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতালের ভাইস চ্যান্সেলর ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসরা হাসপাতালে কাজ করার পর বিভিন্ন ক্লিনিকে সময় দিয়ে চেম্বারে যতটা সময় দেন সেখানে বেশি রোগী দেখা সম্ভব হয় না। এমন অনেক বিশেষজ্ঞ রয়েছেন তারা যদি মনে করেন সারাদিনই চেম্বারে রোগী দেখবেন তারপরও রোগী দেখে শেষ করতে পারবেন না।

এই সমস্যার সমাধান কী জানতে চাইলে ডা. এম আর খান হাসপাতালেই মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। প্রাণ গোপাল দত্ত জানান, এই সমস্যার কথা মাথায় রেখে বঙ্গববন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতালে বিকেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা চেম্বারে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে চান তারা সেখানেই অল্প ভিজিটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারেন। এ ধরনের ব্যবস্থা দেশের সব হাসপাতালে চালু করারও পরামর্শ দেন ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত।

বিভাগ: প্রতিবেদন

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.