banner ad

ব্লাসফেমি আর বিদেশি সংস্থা নিয়ে বিব্রত পাকিস্তান
২০০০ ডেস্ক

ধর্মীয় মৌলবাদের আক্রমণ পাকিস্তানে নতুন নয়। সম্প্রতি ব্লাসফেমি ইস্যুতে আবারো প্রকট আকারে প্রকাশিত হয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির এ বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ১১ বছর বয়সের এক খ্রিস্টান বালিকাকে গ্রেফতার করা হয়েছে ব্লাসফেমির দায়ে। খ্রিস্টান এই বালিকার নাম রিমশা মসিহ। গত ১৬ আগস্ট ইসলামাবাদ থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে স্থানীয় জনগণের অভিযোগের ভিত্তিতে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কোরআন শরিফের ১০টি পাতা পুড়িয়েছে সে। সম্প্রতি ৬ হাজার ২শ রুপির বিনিময়ে রিমশার জামিন মঞ্জুর করেছে আদালত। পাকিস্তানে রিমশাই ব্লাসফেমির প্রথম অভিযুক্ত যে আদালত থেকে জামিন লাভ করেছে। পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী ব্লাসফেমিতে অভিযুক্ত কেউ জামিন পান না। কিন্তু বয়সের কথা বিবেচনা করে তাকে জামিন দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।

 

তবে রিমশার কাছে পোড়া কোরআনের পাতা পাওয়া যাওয়ার ঘটনাটি একটি ষড়যন্ত্র বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইমাম চিশতি নামের এক ব্যক্তি এ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন।  ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা জাফরি বলেছেন, চিশতি তাদের বলেছেন, ‘খ্রিস্টানদের এ এলাকা থেকে তাড়ানোর এটাই একমাত্র উপায়।’ অবশ্য কোরআনের পাতা পোড়ানোর দায়ে ইমাম চিশতির বিরুদ্ধেও আনা হয়েছে ব্লাসফেমির অভিযোগ। রিমশার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে জোরালো করতে চিশতি পোড়া কাগজপত্রের সঙ্গে কোরআন শরিফের কয়েকটি পাতা জুড়ে দেন। গত ১ সেপ্টেম্বর ইমাম চিশতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং দুসপ্তাহের বিচার বিভাগীয় রিমান্ডের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

 

রিমশার বসবাস ইসলামাবাদের একটি বস্তিতে। তার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ থানায় দায়ের করেন প্রতিবেশী আল সায়ীদ মোহাম্মদ উম্মাদ। পুলিশ তাকে ‘ধর্মীয় নেতা’ হিসেবে আখ্যা দিলেও তার পরিচিতি রহস্যঘেরা বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। রিমশা গ্রেফতার হওয়ার পর তার এবং নিজেদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন রিমশার বাবা-মা। ব্লাসফেমি আইনে অভিযুক্তকে মেরে ফেলার বহু নজির রয়েছে পাকিস্তানে। রিমশা গ্রেফতার হওয়ার পর তার বাবা-মাকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়া হয়েছে এবং ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন রিমশার অনেক খ্রিস্টান প্রতিবেশী।

 

ব্লাসফেমি ইস্যুটি পাকিস্তানে দারুণ স্পর্শকাতর বিষয়। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বহু ক্ষেত্রেই জনতা খুন করেছে বিভিন্ন ধর্ম, বয়স এবং পেশার মানুষকে। এগুলোর কোনোটারই বিচার বা প্রতিরোধ করতে পারেনি নিরাপত্তা বাহিনী। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ব্লাসফেমি আইন সংশোধনী নিয়ে কথা বলায় হত্যা করা হয় পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে। এর ঠিক দুমাস পর ব্লাসফেমি আইন রদ করা বিষয়ে কথা বলায় খুন হন পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বিষয়কমন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টি।

 

পাকিস্তানের পার্লামেন্টের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘যখন প্রথমবারের মতো আইনটি পরিবর্তন করার জন্য আমরা উদ্যোগ নিই, তখন গভর্নর সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তা স্থবির হয়ে পড়ে। ধর্মীয় চরমপন্থী গ্রুপগুলোর প্রতিশোধ নেয়ার ঘটনাকে সরকার দেখেও দেখছে না।’

 

একই সময়ে গত ২৭ আগস্ট রাতে বন্দরনগর করাচিতে পাকিস্তানি একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য নিউজ ডেইলির একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জয়নুল আবেদিনকে টেলিভিশন দেখা ও কাওয়ালি গান শোনার অপরাধে মারধর করেছে চারজন উগ্রবাদী। পুলিশের কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ করেও কোনো কাজ হয়নি। এ ঘটনার মধ্য দিয়েও পাকিস্তানে মৌলবাদী জঙ্গিদের সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটেছে।

 

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শিশু সাহায্য সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেনের’ সব বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দুসপ্তাহের মধ্যে পাকিস্তান ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার তরফ থেকে ‘সেভ দ্য চিলড্রেনের’ বিরুদ্ধে সিআইএ’র পক্ষে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওসামা হত্যার পর থেকেই সংস্থাটি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার চাপের মুখে ছিল। সরকারের অনুমতি না নিয়েই মার্কিন বাহিনী পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ওসামা হত্যার মিশন চালানোর পর থেকে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সতর্ক রয়েছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা। সম্প্রতি সিআইএ-এর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে এক ডাক্তারকে। অভিযোগ করা হয়, ওসামাকে খুঁজে পাওয়ায় সিআইএকে সহায়তা করেছিলেন শাকিল আফ্রিদি নামের এই ডাক্তার। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ডা. শাকিলকে বন্ধু হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার মুক্তি দাবি করেছে। সরকারের দাবি, ডা. আফ্রিদি সেভ দ্য চিলড্রেনের কাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ডা. আফ্রিদির সঙ্গে সম্পর্কের কথা অ¯^ীকার করেছেন সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, ডা. আফ্রিদির কোনো কাজে তারা অর্থ সহায়তা দেননি। যদিও গ্রেফতারের কিছু আগে তিনি তাদের এক সেমিনারে অংশ নিয়েছিলেন। সেভ দ্য চিলড্রেনের মুখপাত্র বলেন, ‘সিআইএ বা অন্য কোনো নিরাপত্তা সংস্থার হয়ে কাজ করছেন এমন কাউকে আমরা নিয়োগ দিই না।’

 

শুধু সেভ দ্য চিলড্রেন নয়, পাকিস্তানের অন্যান্য বিদেশি সংস্থার কার্যক্রমও দিন দিন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে ওসামা হত্যাকাণ্ডের পর থেকে। বিদেশিদের ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রেও চলছে কড়াকড়ি। সব মিলিয়ে সেখানে মৌলবাদী তৎপরতার মুখে আবারো দেখা দিয়েছে থমথমে নীরবতা।

 

 

 

বিভাগ: আন্তর্জাতিক

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.