যত বেশি ব্যয়, তত বেশি যানজট শানজিদ অর্ণব
ঢাকার যানজট নিরসনে পরিকল্পিত বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে উড়াল সড়ক এবং সেতু- যেগুলোতে ব্যয়ের পরিমাণও বিশাল। এ রকম ৭টি প্রকল্পের ব্যয়ভার প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত নির্মিতব্য ২৪ কিমি দীর্ঘ উড়াল সড়কটির জন্য ব্যয় হবে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ঢাকায় চলছে তিনটি উড়াল সড়কের কাজ এবং কাজ শুরুর অপেক্ষায় আছে আরো চারটি।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, উড়াল পথে এত বিপুল ব্যয়ের মাধ্যমে যানজট নিরসনের প্রচেষ্টা খুব একটা কাজে আসবে না। এ বিপুল ব্যয়ের প্রকল্পগুলো শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদেরই সুবিধা দেবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমন কুমার মিত্র সাপ্তাহিক ২০০০-কে বলেন, সরকার প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন উড়াল সড়ক নির্মাণের কাজ করছে। কিন্তু এত ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলো ঢাকার মাত্র ১০ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের সেবা দেবে। তিনি বলেন, স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে বাস র্যাপিড ট্রানজিট, মেট্রো সার্ভিস, পথচারীদের জন্য প্রকল্পের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্টরা বেশি ব্যস্ত উড়াল সেতু নিয়ে। বেশি টাকার প্রজেক্টে নানা সুবিধা থাকে বলেই এমনটা হয়। এসটিপিতে পথচারীদের জন্য ০ দশমিক ২১ শতাংশ বরাদ্দ (যদিও এ বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়) ছিল অথচ সে অর্থ এখন ব্যয় শুরু হয়নি। উড়াল সেতু যানজট নিরসনে সহায়ক হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, উড়াল সেতু যানজট নিরসনে খুব একটা ভূমিকা রাখবে না। শুরুতে কিছুদিন হয়তো যানজট কমবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা যানজট বাড়িয়ে দেবে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উড়াল সেতুর কারণে যানজট বেড়েছে এবং অনেক জায়গায় উড়াল সেতু ভেঙে ফেলা হয়েছে।
জানা যায়, ২০ বছরমেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে প্রথম ধাপে বাস্তবায়নের কথা ছিল বাস র্যাপিড ট্রানজিটের। উড়াল সড়কের বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত হলেও এ নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইও হয়নি।
খরচ ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে ঢাকার জন্য বাস র্যাপিড ট্রানজিট এবং বর্তমান গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করার ওপর জোর দিচ্ছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হয় প্রতি কিলোমিটার ১ থেকে ১৫ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ঢাকার উড়াল সড়কগুলো নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩০-৩৫ মিলিয়ন ডলার। এক গবেষণার তথ্যমতে, ঢাকায় ৯ কিলোমিটার ফ্লাইওভারের খরচ দিয়ে ৫৫ কিলোমিটার বিআরটি তৈরি করা সম্ভব। বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক পর্যন্ত ২৬ কিমি উড়াল সড়কের ব্যয় যেখানে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা সেখানে প্রস্তাবিত গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ২০ কিমি বিআরটির খরচ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে বিআরটি ঢাকার বর্তমান রাস্তার ধারণক্ষমতায় চালু করা সম্ভব বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাছাড়া বিআরটি চালু করতে সময়ও অপেক্ষাকৃত কম দরকার। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ২-৩ বছরের মধ্যেই বিআরটি চালু করা সম্ভব হয়।
বিপুল ব্যয়ের পাশাপাশি উড়াল সেতুর বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি আছে নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের। উড়াল সেতু প্রধানত বেশি দূরত্বের যাত্রার জন্য ব্যবহৃত হয় কিন্তু গবেষণা তথ্যমতে, ঢাকার বেশির ভাগ ট্রিপই হয় স্বল্পদূরত্বে। ঢাকার ৭৬ শতাংশ যাতায়াত হয় ৫ কিমির মধ্যে এবং এর অর্ধেক হয় ২ কিমির নিচে। ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের (২০০৫) সমীক্ষা মতে, ব্যক্তিগত গাড়ি ঢাকার যান্ত্রিক বাহনের ৯ শতাংশ এবং এরা রাস্তার ৪০ শতাংশ জায়গা দখল করে রাখে। উড়াল সেতু হলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরা আরো উৎসাহিত হবেন এবং তাদের গাড়ি উড়াল সড়ক থেকে নিচের রাস্তায় নামতে থাকলে যানজট পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ-এর ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি অফিসার মারুফ রহমান বলেন, যানজট নিরসন এবং ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। ঢাকার ৯৫ শতাংশ মানুষ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে, সুতরাং প্রকল্পে এদের সুবিধার কথা বিবেচনা করা উচিত। ঢাকায় এখন দরকার বাস র্যাপিড ট্রানজিট চালু করা এবং বিদ্যমান গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন। সেইসঙ্গে পথচারী সাইকেল ব্যবহারকারীদের উপযুক্ত অবস্থা তৈরি করা উচিত।
ডিইউটিপি ২০০৬-এ বলা হয়েছে, বর্তমান ফ্লাইওভারগুলো নিচের রাস্তায় যানজট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে উড়াল সড়ক ঢাকার ভূমিকম্পজনিত ক্ষতিকেও বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। সম্প্রতি খিলগাঁও ফ্লাইওভারে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং সেখানে ভারী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
উড়াল সড়কের আরো একটি সমস্যাকে আমলে নিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সেটি হলো বিভিন্ন উড়াল সড়ক প্রকল্প এবং অন্য প্রকল্পের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা। ইতিমধ্যে মহাখালী ফ্লাইওভারকে বিআরটি বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জানা গেছে, বিমানবন্দর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়িত হলে কমলাপুর এবং টঙ্গীর মধ্যকার প্রস্তাবিত তৃতীয় ও চতুর্থ রেললাইন বসানো সম্ভব হবে না।
উড়াল সড়কের বিপরীতে বিআরটির কাজ চলছে ধীরগতিতে। জানা গেছে, গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি কাজ শেষ হয়েছে। এ বছর শেষ নাগাদ এর শুরু হওয়ার কথা। অন্যদিকে বিমানবন্দর থেকে সদরঘাট পর্যন্ত প্রস্তাবিত বিআরটি প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ চলছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেছেন, প্রথমে দরকার ছিল বিমানবন্দর থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিআরটি সার্ভিস চালু করা। তাহলে মানুষ এর সুবিধা বুঝতে পারতেন কিন্তু তা না করে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে শহরের বাইরের প্রকল্পটিকে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সারোয়ার জাহান সাপ্তাহিক ২০০০-কে বলেন, উড়াল সেতু যানজট নিরসনে তেমন ভ‚মিকা রাখবে না। এটি সাধারণত ব্যবহার করা হয় শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ও শহরের বাইরে যাতায়াতের জন্য। কিন্তু শহরের ভেতরের ট্রিপ হয় ২ থেকে ৩ কিলোমিটারের মধ্যে অর্থাৎ শহরের মানুষের চলাচলের জন্য দরকার গণপরিবহনÑ যেখানে প্রতি কিলোমিটারে যাত্রী ওঠা-নামার ব্যবস্থা থাকবে। উড়াল সেতুর র্যাম্পগুলো দিয়ে গাড়ি ওঠা-নামার সময় যানজট তৈরি হবে। প্রথম দু-তিন বছর সুবিধা পাওয়া গেলেও পরে এগুলো যানজট বাড়িয়ে দেবে।
ঢাকার যানজট নিরসনে কী ধরনের প্রকল্প প্রয়োজন এ প্রশ্নের জবাবে সারোয়ার জাহান জানান, ঢাকায় দরকার বিআরটি এবং বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ও রেল ক্রসিংয়ে ওভার পাসের মাধ্যমে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা। তবে এটি দুয়েক জায়গায় করলে হবে না। পরিকল্পিতভাবে পুরো শহরকে অন্তর্ভুক্ত করে এমনভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিভাগ: প্রতিবেদন



