banner ad

হুমায়ূন আহমেদ যে চ্যালেঞ্জ রেখে গেলেন
আলী রীয়াজ

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের শিল্পমান নিয়ে অতীতে অনেক আলোচনা হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। প্রচলিত অর্থে যারা ‘সাহিত্য সমালোচক’ তারা হুমায়ূনের প্রতি খুব বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন না বলেই আমার মনে হয়েছে, ইংরেজিতে যাকে Unkind বলে। আমি বলব তারা অধিকাংশ সময়েই খুব আন-কাইন্ড হয়েছেন। তার লেখার এবং লেখক হিসেবে তার নিজের একটা বড় ভূমিকা আমার কাছে মনে হয়েছে যে তিনি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের পাঠকদের স্বদেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সাধারণ পাঠকরা হুমায়ূনের লেখালেখির আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় লেখকদের পাঠক ছিলেন। যে কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় পাইরেট বইয়ের একটা বড় বাজার ছিল। বাংলাদেশের লেখকদের একাংশ এই পাঠকদের কাছে পৌঁছলেও তাদের আবেদন পাঠকদের কাছে তুলনামূলকভাবে সীমিতই ছিল। হুমায়ূন সেই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন নিজের অজ্ঞাতেই। সৃষ্টিশীল মানুষেরা অঙ্ক করে সৃষ্টি করেন না, তাই হুমায়ূন আহমেদও সেভাবেই এই কাজটা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন। হুমায়ূন কেবল ঢাকায় বসে লিখেছেন বলে, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশ করেছেন বলে আমি বলছি না, বলছি এই কারণেও যে তিনি বাংলাদেশের বাইরে থেকে স্বীকৃতির প্রতি কখনই পক্ষপাত দেখাননি বলে। হুমায়ূনের লেখা পড়ে, তার অন্যান্য কথাবার্তায় আমার মনে হয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আর কোনো কেন্দ্র তার বিবেচনায় ছিল না। কিন্তু তার চেয়েও বড় যে কারণে আমার মনে হয় যে তিনি বাংলাদেশের পাঠকদের স্বদেশে ফিরিয়েছিলেন তা হলো তার বিষয়। তার সৃষ্টি একান্তভাবেই বাংলাদেশের ভেতর থেকে উৎসারিত। তার লেখায় যে মুক্তিযুদ্ধ ফিরে ফিরে আসে সেটাই পাঠকদের মনে করিয়ে দেয় যে এই অভিজ্ঞতা কেবল বাংলাদেশের পাঠক, বাংলাদেশের লেখকের অভিজ্ঞতা। তার পাঠকেরা, যারা বয়সে তরুণ, যারা এই অভিজ্ঞতা বঞ্চিত হয়েছেন তাদের হুমায়ূন সেই সময়টাতে নিয়ে যান এবং তাদের এই অর্জনের গৌরবের অংশীদার করে তোলেন। তার সঙ্গে তার পাঠকেরা বুঝতে পারেন ওই অর্জনগুলো হারিয়ে ফেলার বেদনা। হুমায়ূনের লেখায় যারা ‘শিল্পীর সামাজিক দায়িত্বের অনুপস্থিতি’ দেখতে পান তারা সম্ভবত এই দিকটাকে অবহেলাই করে এসেছেন।

 

হুমায়ূনের লেখার প্রধান চরিত্রগুলো স্বপ্নবান একই সঙ্গে তারা বাস্তবের এবং অবাস্তব এবং তারা খুব সাধারণ। সাধারণ জীবনের মধ্যেই তারা অসাধারণ। যে কারণে হুমায়ূনের পাঠকরা চান এই চরিত্রগুলো হয়ে উঠতে। স্বপ্নবান হওয়াটা সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠার প্রথম শর্ত। হুমায়ূন তার পাঠককে সৃষ্টিশীল করে তোলেন। স্বপ্নবান মানুষেরা হতাশ হতে পারে না। হুমায়ূন তার তরুণ পাঠকদের হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো আশার দিকে নিয়ে যান। হুমায়ূন বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রথম বংশীবাদক। হুমায়ূন আহমেদের তিরোধানে বাংলাদেশের সাহিত্যে, নাটকে, চলচ্চিত্রে কেবল যে একটা শূন্যতাই সৃষ্ট হলো তা নয়, একটা চ্যালেঞ্জও তৈরি হলো। হুমায়ূন যে লাখ লাখ পাঠককে স্বদেশে ফিরিয়ে আনলেন, লাখ লাখ তরুণকে স্বপ্ন দেখতে শেখালেন তাদের তিনি রেখে গেলেন বাংলাদেশের হাতে, দেশের অন্য সব লেখকের হাতে; এখন তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ এই সৃষ্টিশীল, স্বপ্নবান তরুণদের তারা কী স্বপ্ন দেখাবেন। হুমায়ূন পাঠকদের সামনে চ্যালেঞ্জ তারা এই লালিত স্বপ্ন দিয়ে কী করবেন।

 

 

 

হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো

 

 

 

বিশ্বজিত সাহা

 

 

 

এ বছর নিউইয়র্কের বইমেলা নিয়েও ছিল হুমায়ূন ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন। একদিন নিজে থেকেই বললেন বিশ্বজিত এবারের বইমেলায় একটি অনুষ্ঠান হবে ‘শতবর্ষের বাংলা গান’। টপ্পা থেকে শুরু করে হাল আমলের গান পর্যন্ত। প্রতিটি গানের শুরুতে গানটির ইতিহাস হুমায়ূন ভাই বলবেন। তখন আলো পড়বে হুমায়ূন ভাইয়ের ওপর। এরপর গান করবেন মেহের আফরোজ শাওন, তখন আলো থাকবে তাঁর ওপর। গান শেষে আলো পড়বে যন্ত্রীদের ওপর। হুমায়ূন ভাইয়ের স্বপ্নের অনুষ্ঠানটি হলো না, হলো না তাঁকে সম্মাননা জানানোর অনুষ্ঠানটি। হয়েছিল তাঁর আঁকা প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী। ২০টি ছবি স্থান পায় এই প্রদর্শনীতে। এটিই হলো হুমায়ূন ভাইয়ের জীবদ্দশায় তাঁর ছবির প্রথম ও শেষ প্রদর্শনী। সে সময় তিনি ছিলেন বেলভ্যু হাসপাতালের সিসিইউতে। আসতে পারলেন না হুমায়ূন ভাই বইমেলায়।

 

১৯৯৭ সালে আমেরিকায় বইমেলা উদ্বোধন করলেন হুমায়ূন আহমেদ। সারাদিন মুষলধারে বরফ পড়ছে। তখন বইমেলা হতো ফেব্রুয়ারির শেষদিকে। প্রচণ্ড তুষারপাতের মধ্যে (১২ ইঞ্চির ওপর তখন বরফ পড়েছিল)  উদ্বোধনের সময় লোকজন থাকবে কি না সন্দেহে ছিলাম। সন্ধ্যা ৮টায় উদ্বোধন। হুমায়ূন আহমেদ পৌনে ৭টায়  মিলনায়তনে এলেন। ৩০ মিনিটের মধ্যে শত শত হুমায়ূন ভক্ত ঘিরে ধরলেন তাদের প্রিয় লেখককে। অটোগ্রাফ শিকারিদের কবল থেকে উঠে ফিতা কেটে বইমেলা উদ্বোধন করলেন তিনি। আবার অটোগ্রাফ দিতে বসলেন। একজন পাঠক গোটা ৩০টি বইতে স্বাক্ষর করালেন। অপেক্ষারতরা ছিলেন ভীষণ বিরক্ত। কিন্তু সেই লাইন আমি কখনো ভুলব না। সেদিন একজন কিশোরী এসে বলেছিল স্যার আপনাকে আমি একটু ছুঁয়ে দেখতে পারি? আরেকজন মুখে বলতে পারেননি কিন্তু তাঁর প্রিয় লেখককে স্পর্শ করতে গিয়ে লেখককে ফেলেছিলেন বেকায়দায়। সে যাত্রায় রক্ষা পাওয়ার জন্য হুমায়ূন আহমেদকে সিগারেটের অজুহাতে অটোগ্রাফ দেয়া থেকে উঠে যেতে হয়।

 

হঠাৎ করে একদিন বিশেষ খামে একটি চিঠি এলো মুক্তধারায়। চিঠিটা খোলা হলো। আমেরিকার লসঅ্যাঞ্জেলেসের একটি জেলখানা থেকে। একজন বাঙালি জেলখানা থেকে মুক্তধারায় চিঠি লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদের ২০১০ সালে প্রকাশিত বই চেয়ে। মানে পাঠকের আগের বইগুলো পড়া। জেলখানা থেকেও হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ার আকুতির কথা কি কখনো ভোলার?

 

পাদটীকা : ২৬ জুন অনেক রাতে গিয়েছিলাম বেলভ্যু হাসপাতালে। রাত ১১টা বেজে গেছে। আমি আর আমার স্ত্রী। প্রায় দেড়ঘণ্টা ছিলাম হুমায়ূন ভাইয়ের পাশে। ২৯ জুন নিউইয়র্কের বইমেলা শুরু। তাই নানান ঝামেলায় দিনে যেতে পারতাম না।  যতবারই চলে আসতে চেয়েছি, হুমায়ূন ভাই হাত দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কপালে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার জন্য। দেড়ঘণ্টায় তিনবার চাইলেন পানি, পানি, পানি। আমরা পানি পান করালাম। এরপর যতবারই গিয়েছি, হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে আর কথা হয়নি। চিনতে পারেননি আমার উপস্থিতি। হুমায়ূন ভাই আর কখনো বলবেন না আর কিছুক্ষণ থাকো।

 

 

বিভাগ: বিবিধ

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.