এবারের ঈদ এবং জুতা
ফিচার
বাংলাদেশের জুতাশিল্প ক্রমে বিস্তার লাভ করছে। প্রথম অবস্থায় দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান উন্নতমানের জুতা তৈরি করলেও বর্তমানে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন জুতা প্রস্তুত করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বমানের জুতা তৈরি করছে।
বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জুতার বাজার দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৪৫-৪৬ ভাগ জুতা রফতানি হয়। বাংলাদেশ প্রতিবছর রফতানি করে প্রায় ৬০ কোটি জোড়া। স¤প্রতি ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলো জুতা আমদানির জন্য বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ অল্পমাত্রায় জুতা রফতানি শুরু করে ১৯৯৪ সাল থেকে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১৮ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের জুতা রফতানি করা হয়। ২০১০-১১ অর্থবছরে এসে তা দাঁড়ায় ২৫ কোটি ডলারে। চলতি অর্থবছরে এর রফতানি আয় আরো বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের সবচেয়ে বড় জুতা প্রস্তুতকারী কোম্পানি বাটা ৫০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে জুতার আধুনিক একটি কারখানা স্থাপন করেছে গাজীপুরে। এজন্য তারা বিদেশ থেকে আমদানি করেছে উন্নতমানের যন্ত্রপাতি। এতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ডিজাইনার। বাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মার্কেটিং ম্যানেজারের বক্তব্য তারা মানুষের শরীরের জন্য নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জুতা প্রস্তুত করে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের মানুষের চাহিদার বিষয়টি মাথায় রাখেন।
সামনে ঈদ। ঈদে নতুন পোশাকের সঙ্গে চাই নতুন জুতা। প্রতি ঈদে পোশাকের পাশাপাশি জুতার বাজারেও দেখা যায় নজর কাড়া নতুন নতুন ডিজাইন। জুতার কেনাকাটায় বাটার গ্রহণযোগ্যতা সব সময়। আরামদায়ক ও টেকসই জুতা তৈরিতে এ প্রতিষ্ঠানটির সুখ্যাতি রয়েছে। এবারের ঈদেও বাটা নিয়ে আসছে ৬শ নতুন কালেকশন। বাটার পাশাপাশি আরো কিছু জুতা কোম্পানি ক্রেতাদের নজর কেড়েছে। তারাও নতুন নতুন ডিজাইন নিয়ে আসছে এবারের ঈদে। ধারণা করা হচ্ছে, অন্য ঈদের চেয়ে এবারের ঈদে জুতার বিক্রি বেশি হবে।
এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের অনেক অভিযোগ। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী এ শিল্পকে রক্ষা করতে সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং ২০১১-১২ অর্থবছরে এই শিল্প সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ থেকে বৈধ ও অবৈধ পথে জুতা আমদানির সুযোগ দেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, ব্যাংকঋণের অনিশ্চয়তাসহ
বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথাও জানান তারা।সেগুলো অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ভবিষ্যতেও আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে, তাদের মন-মানসিকতা, সময়ের সঙ্গে সমš^য় করে নতুন নতুন সাব-ব্র্যান্ড করার ইচ্ছা আছে, যা সবার ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশেও গ্লোবাল ট্রেন্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার চেষ্টা করি। কারণ বাটা একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। প্রায় ৭০টা দেশে এর অপারেশন। আন্তর্জাতিক ফুটওয়্যার সেক্টর কোনদিকে যাচ্ছে, কী ডিজাইন আসছে এসব ব্যাপারে আমরা আপডেট থাকি। বাংলাদেশকেও আমরা পিছিয়ে রাখি না। এবারের ঈদে ৬শর বেশি নতুন ডিজাইন নিয়ে আসছে বাটা।
২০০০ : বাটার বাজার হিসেবে বাংলাদেশ কতখানি গুরুত্বপূর্ণ?
মুহম্মদ কাইয়ুম : বাটার কাছে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। কারণ বাংলাদেশে বাটা মার্কেট লিডার। তাছাড়া বাটা বাংলাদেশের মানুষের জুতার চাহিদা মিটিয়ে আসছে ৫০ বছর ধরে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাটার কেবল ব্যবসায়িক সম্পর্কই গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছে একটা আত্মিক সম্পর্কও। আমরা বাটাকে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বা বহুজাতিক কোম্পানি মনে করি না। মনে করি বাটা বাংলাদেশের নিজ¯^ পণ্য। তাই গুরুত্বপূর্ণ বা অগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা আমাদের মাথায়ই থাকে না। মনে হয় বাংলাদেশই বাটার আপন দেশ।
‘বাংলাদেশই বাটার আপন দেশ’
মুহম্মদ কাইয়ুম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাটা
সাপ্তাহিক ২০০০ : বাংলাদেশে বাটা যেভাবে কাজ শুরু করেছিল সেই অবস্থা থেকে বর্তমান অবস্থাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মুহম্মদ কাইয়ুম : আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে বাংলাদেশে বাটার যাত্রা শুরু হয়। সে যাত্রা শুরু হয়েছিল সদরঘাটে একটা দোকান দেয়ার মধ্য দিয়ে। শুরু থেকেই মানুষের ভালবাসা আর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল বাটা। মানুষের মুখে মুখে ছিল বাটা মানেই ভালো জুতা। বাটা মানেই টেকসই জুতা। মানুষের সে ভালবাসাকে পুঁজি করে বাটা বিস্তার লাভ করে সারা বাংলাদেশে। সে অবস্থা থেকে আজ আমাদের প্রায় ২৫০টা রিটেইল স্টোর। প্রায় ১ হাজারটা ডিলার স্টোর রয়েছে দেশব্যাপী। আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফুটওয়্যার রিটেইল নেটওয়ার্ক বাটা। এর মাধ্যমে আমরা কাস্টমারের দোরগোড়ায় বাটার পণ্য পৌঁছে দিতে পারছি।
২০০০ : বাংলাদেশের সামাজিক, প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বাটার স্থায়িত্বের ব্যাপারটা আরো বৃদ্ধি করার বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন কি?
মুহম্মদ কাইয়ুম : বাটা টেকসই। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাস আমরা তৈরি করতে পেরেছি আমাদের পণ্যের মানের মাধ্যমে। মানের ব্যাপারটা বাটা সব সময় চিন্তা করে থাকে। এজন্য আমরা সব সময় আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকি। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য বাটা মান নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
২০০০ : জুতার বাজারে এখন অনেক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বাজারে বাটা কি সেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে?
মুহম্মদ কাইয়ুম : বাংলাদেশে একমাত্র বাটাই সব ধরনের ক্রেতা চাহিদা অনুযায়ী জুতা প্রস্তুত করে থাকে। সে কারণে কেবল স্থায়িত্ব বা মান নয় আমরা স্বাচ্ছন্দ্য, ফ্যাশন-সৌন্দর্য ইত্যাদি বিষয়ও মাথায় রাখি। এসব বিষয়ের সমš^য় কেবল আধুনিক প্রযুক্তিতেই সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারব না। তাই আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে সদ্য আসা প্রযুক্তিকে সব সময় প্রাধান্য দিই।
২০০০ : বাংলাদেশের নেক্সট জেনারেশনের জন্য বাটা কেমন হবে?
মুহম্মদ কাইয়ুম : নতুন জেনারেশনের কথা মাথায় রেখে আমরা সব সময় কাজ করেছি। এখনো করছি। এজন্য আমরা এর আগে অনেক সাব-ব্র্যান্ড তৈরি করেছি।
‘কাস্টমার সার্ভিসে সন্তুষ্টির শেষ বলে কোনো কথা নেই’
বিশ্বজিৎ রায়
রিটেইল ম্যানেজার, বাটা
সাপ্তাহিক ২০০০ : বাংলাদেশে বাটার পরিচিতি অনেক। কিন্তু প্রতিযোগিতার বাজারে বিভিন্ন জুতা কোম্পানি ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করেছে। বাটার এই পরিচিতির কারণটা কী?
বিশ্বজিৎ রায় : বাটার ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে এ বছর। কিছু কোম্পানি ছাড়া বাংলাদেশের সব শ্রেণীর মানুষ বাটাকে দেশি কোম্পানি মনে করে। আমরাও তাই মনে করি। কারণ ৫০ বছরে বাংলাদেশের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সঙ্গে বাটার একটা আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছে। যে কারণে বাটার প্রচারের প্রয়োজন হয় না।
আরেকটা বিষয় হলো, প্রচারে অনেক খরচ হয়। প্রচারের খরচটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রেতার কাছ থেকেই তুলে নেয়া হয়। প্রত্যেকটা কোম্পানি তাই করে। আমরা সেই বাড়তি চাপটা ক্রেতাকে দিতে চাই না। আমাদের ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিতে চাই না।
তারপরও প্রচারের প্রয়োজন আছে। যতটুকু প্রয়োজন আমরা ততটুকু চেষ্টা করি। করি তথ্য দেয়ার জন্য। প্রতিবছর আমাদের অনেক নতুন ডিজাইন আসে। আমরা সেই ডিজাইনের তথ্য আমাদের ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য
বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ব্যবহার করি। এছাড়া কিছু ফ্যাশন আর্টিকেল করি। আপনারা জানেন, উঠতি বয়সী ছেলেমেয়ের সংখ্যা বাংলাদেশে বেশি। এদের জন্য বিভিন্ন ফ্যাশন শোর আয়োজন করি। এটাও প্রচারের জন্য নয়, কোন ফ্যাশনের সঙ্গে কোন জুতাগুলো মানায় তা তুলে ধরাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। এর বাইরে গতানুগতিক প্রচারের কোনো চিন্তাভাবনা আমাদের নেই।
আগামীতে একটা কাজ করার চিন্তা করছি, গতানুগতিক মিডিয়া প্রচারের বাইরে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কাছে যাব। যেমনÑ স্কুল, কলেজ ক্যাম্পাসে আমরা ইভেন্ট করব। বাটায় আমাদের চিলড্রেন প্রোগ্রাম আছে। যারা সমাজের অনাথ শিশু তাদের পড়াশোনার জন্য ‘মায়ের আঁচল’ নামে একটা সংস্থা কাজ করছে। সেই সংস্থাকে আমরা বই দিয়ে, টাকা-পয়সা দিয়ে, কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করে সরাসরি সাহায্য করি। এগুলো কিন্তু প্রচারের জন্য নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে করি।
২০০০ : বাটা অনেক বড় বড় আউটলেট করছে। এর পেছনের কারণ সম্পর্কে যদি বলেন…
বিশ্বজিৎ রায় : মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। রুচির পরিবর্তন হয়েছে। তার সঙ্গে তো আমাদের নিজেদেরও পরিবর্তন করা দরকার। আমাদের এখন অনেক ডিজাইন। বাটা জুতা কিন্তু সব ধরনের দামের রয়েছে। আমাদের যেমন ১শ টাকা, ২শ টাকার জুতা রাখতে হয়, তেমনি ৭ হাজার টাকা দামের জুতাও রাখতে হয়। এজন্য সব রকমের জুতা রাখতে হলে আমাদের অনেক বড় জায়গা দরকার। ক্রেতা একসঙ্গে অনেক ডিজাইন দেখে নিজের পছন্দেরটি বেছে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ক্রেতা কিন্তু এখন বড় দোকানে গিয়ে বেশি ¯^াচ্ছন্দ্য বোধ করে। আমরা এসব কারণেই বড় আউটলেট করছি।
২০০০ : বাটা মাঝেমধ্যেই আকর্ষণীয় অফার দিচ্ছে ৪০ শতাংশ, ৬০ শতাংশ ছাড় ইত্যাদি। এছাড়া আর ভিন্নতর কী অফার আপনারা দিতে যাচ্ছেন?
বিশ্বজিৎ রায় : এ ব্যাপারে আমাদের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। যেহেতু বাজারে এখন অনেক প্রতিযোগিতা তাই আমরা এখন এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না। তবে আগামী বছরের মধ্যেই আপনারা সেগুলো দেখতে পাবেন। এটুকুই বলব, আরো আকর্ষণীয় কিছু আমরা দিতে যাচ্ছি।
২০০০ : বাটার রিটেইল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে চাই।
বিশ্বজিৎ রায় : বাংলাদেশে জুতার বাজারের সবচেয়ে বৃহৎ রিটেইল নেটওয়ার্ক আমাদের। তবু বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনুপাতে আমরা বিক্রি করি অনেক কম। আমরা সারা দেশের মানুষের কাছে তাই বাটাকে নিয়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করেছি। গত বছর আমরা ৩০টা নতুন আউটলেট করেছি সারা দেশে। কোম্পানির অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে এতে। আগামী বছরের মধ্যে আরো ৫০টি নতুন আউটলেট আমরা নিয়ে আসব। পুরনো আউটলেটগুলোও আমরা আধুনিকীকরণের কাজ করছি।
২০০০ : সামনে ঈদ। ঈদ উপলক্ষে এবার বাটা নতুন কী আনছে?
বিশ্বজিৎ রায় : ঈদ বাংলাদেশের জন্য একটা সার্বজনীন উৎসব। বাঙালির জন্য ঈদে নতুন জামা-জুতা কেনা একটা ঐতিহ্য। যে কারণে আমাদের দায়িত্ব অনেক। গত বছর আমরা ৪শ নতুন ডিজাইন দিয়েছি। এ বছর আমরা ৬শ নতুন ডিজাইন দিচ্ছি ঈদ উপলক্ষে। সেই সঙ্গে বলে রাখি, এবার বাটার জুতার মূল্য থাকবে অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ।
বিভাগ: প্রচ্ছদ



