banner ad

সাহারার বিনিয়োগে ‘নতুন ঢাকা’ মৃত্যুঘণ্টা বাজছে আবাসন শিল্পের
শানজিদ অর্ণব

শুধু আবাসন প্রকল্প নয়, সাহারার লক্ষ্য একটি জীবনধারা গড়ে তোলা। কিন্তু এ প্রকল্প কি আদৌ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোনো সুফল বয়ে আনবে? নাকি ধস নামাবে দেশি আবাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্পে? অনুসন্ধান করেছেন শানজিদ অর্ণব

 

 

 

গত ১১ জুলাই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্পন্সর হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে ভারতের সাহারা ইন্ডিয়া পরিবারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাম্বিভ্যালি (মরিশাস) লিমিটেড। সেই সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অংশ ও যন্ত্র এন্ডিংয়ের চুক্তিও হবে সাহারার সঙ্গে। এদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের স্পন্সরশিপের মাধ্যমে একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছে সাহারা গ্রুপ এমনটাই অনেকের ধারণা। কিন্তু এদেশের আবাসন খাতে সাহারা গ্রুপের বিনিয়োগ নিয়ে আছে নানা শঙ্কা। ভারতে সাহারা গ্রুপের বিরুদ্ধে থাকা নানা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সে শঙ্কাকে আরো জোরাল করেছে।

 

ভারতের শীর্ষ ১০ প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন সুব্রত রায় সাহারা। এ মূল্যায়ন ইন্ডিয়া টুডের। তার সাহারা ইন্ডিয়া পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত মে মাসে ঢাকা ঘুরে গেছেন সুব্রত রায় সাহারা। উদ্দেশ্য এদেশের আবাসন খাতে বিনিয়োগ। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে সুব্রত রায় সাহারা গঠন করেছেন সাহারা মাতৃভূমি উন্নয়ন করপোরেশন নামের এক যৌথ উদ্যোগের কোম্পানি। এ কোম্পানির বাংলাদেশে পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির ছেলে শেখ ফজলে ফাহিম। এদেশে সাহারা গ্রুপের আগমনের সূত্র যে শেখ সেলিম সেটা পরিষ্কার করে গেছেন সুব্রত রায় সাহারা। এ দেশে অবস্থানকালে প্রথম আলোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘গত বছরের জুন মাসে ভারতের দিল্লিতে ফাহিম সাহেবের বাবার (আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম) সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি একটা টিম নিয়ে গিয়েছিলেন সে সময়। তিনিই প্রথম আমাকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাবে আমি বিনিয়োগের ব্যাপারে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এরপর আমাদের টিম বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলা শুরু করে।’

 

এ বছর ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখ ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘সাহারা সেট টু ব্যাগ এইট্টি থাউজেন্ড ক্রোর নিউ বাংলাদেশ ক্যাপিটাল প্রজেক্ট’ শিরোনামে। এ প্রতিবেদনে সুব্রত রায় সাহারার বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃত করা হয় কিছু কথা ‘আমরা বড় কিছু নিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছি। আমি ৮০ হাজার কোটি রুপির প্রকল্প চ‚ড়ান্ত করেছি। এ দেশে আমাদের অনেক কিছু করতে হবে। নতুন ঢাকা প্রকল্পের প্রস্তাব আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছি এবং আগামী মাসে তার সঙ্গে দেখা করার আশা করছি।’

 

এ প্রতিবেদনে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সার্বভৌম অধিকারের নিশ্চয়তা দিন এবং আমাদের টাকার দরকার হবে না। আমরা ঢাকা থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে ৪০ বর্গকিলোমিটার জমি বাছাই করেছি।’ এ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় সাহারা গ্রুপ নীরবে বেশ বড় গেমপ্ল্যান তৈরি করেছে, যার মধ্যে আছে শিক্ষা, খনি, তেল উত্তোলন, ব্যাংকিং খাত এবং বাংলাদেশ ও আফ্রিকায় বিনিয়োগ। অর্থাৎ সাহারার সামগ্রিক নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনার একটি অংশ এদেশে বিনিয়োগ এবং এ প্রক্রিয়া বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। কিন্তু সাহারার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সরকার এদেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। এ বিষয়ে গত ২ জুন এদেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, ‘আমরা মনে করি বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠিত শিল্পে বিনিয়োগের জন্য বিদেশি একটি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করার পূর্বে বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপক আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন ছিল।’

 

ভারতের এই বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানটি কিছু বিষয়ে নিজ দেশে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা এবং বিতর্কের মুখে পড়েছে। ভারতের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, ইন্স্যুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এবং মিনিস্ট্রি অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সবাই কম-বেশি গত বছর সাহারা গ্রæপকে আর্থিক অপরাধী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া  ২০০৮ সালের শুরুতে সাহারা ইন্ডিয়া ফিন্যান্সিয়াল করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়টি শনাক্ত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ জুন তারা এসআইএফসিলকে নতুন কোনো ডিপোজিট সংগ্রহ না করার নির্দেশ দেয়। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া (এসইবিআই) সাহারা গ্রুপের আবাসন সংক্রান্ত কোম্পানি সাহারা প্রাইম সিটি লিমিটেডের বিরুদ্ধে অর্থ সংগ্রহের উপায়ে নানা অভিযোগ পায়। বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে তারা নানা অসাধু উপায় অবলম্বন করে। এসইবিআই এ প্রকল্পে অর্থসংগ্রহ বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়। ২০০৮ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ২০১১ সালের ১৩ এপ্রিলের মধ্যে সাহারা ইন্ডিয়া রিয়েল এস্টেট করপোরেশন লিমিটেড প্রায় ১৯ হাজার ৪শ কোটি টাকা সংগ্রহ করে বিভিন্ন বন্ড এবং ডিবেঞ্চারের মাধ্যমে। এসব বন্ড এবং ডিবেঞ্চারের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না তাদের। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে সাহারা গ্রæপের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে দিল্লির কোর্ট। অভিযোগ ছিল তার হাউজিং প্রকল্পের প্রতারণা। গ্রাহকের অভিযোগ ছিল টাকা নিয়েও হাউজিং প্রজেক্টের কাজ শুরু না করার। এসইবিআই যথাযথ নিয়ম না মেনে জনগণের কাজ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ আনে সাহারা গ্রুপের বিরুদ্ধে এবং তাদের অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। সিকিউরিটিজ অ্যাপেলিয়েট ট্রাইব্যুনাল ২০১১ সালের অক্টোবরে এই আদেশ বহাল রাখে। সাম্প্রতিক ভারতের সব থেকে আলোচিত দুর্নীতির মামলা ছিল টুজি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি। এ মামলার তদন্তে অনুপ্রবেশ এবং মামলাকে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ ওঠে সুব্রত রায় সাহারার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে সুব্রত রায় সাহারা এবং সাহারা ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্কের দুজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তদন্তে হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার নোটিশ জারি করে সুপ্রিমকোর্ট।

 

সাহারা গ্রুপ এদেশে আসছে এমন এক খাতে বিনিয়োগ করতে যে খাতটি বহু বছরের চেষ্টায় এখন বিকশিত। এ দেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে নিযুক্ত আছেন প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। এ খাতের ওপর নির্ভর করে এদেশে বিকশিত হয়েছে আরো অনেক শিল্প খাত যেমন : ইট, সিমেন্ট, রড ইত্যাদি। বাংলাদেশের আবাসন খাতের বর্তমান টার্ন ওভার প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এ ধরনের একটি খাতে এত বড় বিদেশি বিনিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না অনেকে। সাহারা গ্রুপ যে নতুন ঢাকা গড়ার প্রস্তাব দিয়েছে তা এদেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের পক্ষেই করা সম্ভব বলে জানিয়েছে রিহ্যাব। রিহ্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘সাহারা গ্রুপ বর্ধিত আবাসন প্রকল্পের যে ধারণা দিয়েছে তা কিন্তু একেবারেই নতুন বা বৈপ্লবিক ধারণা নয়। বাংলাদেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সংগঠন রিহ্যাব বিগত অনেক বছর ধরেই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এই ধারণাটি প্রস্তাব আকারে দিয়ে এসেছে। … বিগত তিন দশকের অভিজ্ঞতায় আমাদের আবাসন ব্যবসায়ীরা সরকারের সহযোগিতায় এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক এবং কারিগরি সম্পূর্ণভাবেই প্রস্তুত আছে।’ জানা যায়, সাহারা গ্রুপ সরকারের কাছে প্রায় এক লাখ একর জমি চেয়েছে এবং সরকার তা দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। সুব্রত রায় সাহারা ঢাকায় অবস্থানকালে জানিয়ে গেছেন, ‘আমরা ঢাকা থেকে ১৮ বা ২৫ কিলোমিটার দূরে কিছু জায়গা দেখেছি।’ তবে ঠিক কোন জায়গা কি প্রক্রিয়ায় সাহারাকে দেয়া হবে তা এখনো পরিষ্কার করে জানানো হয়নি। সাহারার প্রাথমিক বিনিয়োগ হবে ৯৬০ থেকে একশ ২০ কোটি টাকা।

 

আবাসন খাতে এই বিনিয়োগ একদিকে যেমন এ খাতের দেশি উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্টদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এ ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের ফলে মুনাফা চলে যাবে বিদেশে। অন্যদিকে দেশের জমির মালিকানা কোনোভাবেই বিদেশি কোম্পানির হাতে দেয়া উচিত নয় বলে জানিয়েছেন দেশের একজন অর্থনীতিবিদ। সাম্প্রতিক এদেশের কয়েকটি গার্মেন্টস এবং উত্তরাঞ্চলের সব থেকে বড় পোল্ট্রি ফার্ম কিনে নিয়েছেন ভারতীয় বিনিয়োগকারী পুঁজিবাদীরা। এভাবে বিভিন্ন বিকাশমান খাতে বিদেশি বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মতপ্রকাশ করেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। এ খাতে সাহারা বিনিয়োগ করলে এদেশের অনেক প্রকৌশলী এবং শ্রমিক কাজ হারাবেন এবং এ খাতের ওপর নির্ভরশীল অনেক শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুব্রত সাহারা বলেছেন, তারা শুধু আবাসন প্রকল্প করবেন না, বরং একটি জীবনধারা গড়ে তুলবেন এবং প্রকল্পের অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাইরে থেকে আনতে হবে।

 

এ ধরনের বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগার ঘটনা ঘটতে পারে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা অন্য নানা কারণেও প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে জমিদানকারীরা বিরাট সমস্যায় পড়বেন। কম দামে ফ্ল্যাট দেয়ার  সিদ্ধান্ত বা ঘোষণাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাওয়া এবং কার্যকর না হওয়ার নজির দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে তো বটেই, বাংলাদেশেও আছে।

 

অনেকে বলছেন, এ ধরনের বিরাট প্রকল্প এদেশে বর্তমানে আদৌ প্রয়োজন আছে কি না। প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই হয়নি বলে মত দিয়েছেন অনেকে। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে এদেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা করেনি সরকার। অন্যদিকে দেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ কেন দরকার সে প্রশ্নও করছেন অনেকে।

 

 

 

‘জমি কেনাবেচা বা ফ্ল্যাট তৈরির সুযোগ বিদেশি কোম্পানিকে দেয়া ঠিক হবে না’

 

-আবু আহমেদ

 

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

বিদেশিদের জমি কেনাবেচা বা ফ্ল্যাট তৈরির সুযোগ দেয়া উচিত নয়। এ জন্য আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরাই যথেষ্ট। এ ধরনের প্রকল্পের কোনো প্রয়োজনীয়তাই আমাদের নেই। এ প্রকল্পে আমাদের লাভ কী! আর আমাদের দেশে এত বেশি জমি নেই যে বিদেশি কোম্পানিকে দেয়া যাবে। জমির মালিকানা কোনোভাবেই বিদেশি কোম্পানিকে দেয়া উচিত হবে না।

 

 

 

‘সাহারার বিনিয়োগ কিছু ব্যক্তির ও রাজনৈতিক স্বার্থে’

 

-পিয়াস করিম

 

অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিভাগ

 

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

 

আমরা বিদেশি বিনিয়োগের বিপক্ষে নই। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের স্বার্থের বিষয়টি রক্ষিত হচ্ছে কি না সেটা নিশ্চিত হতে হবে। সাহারার বিনিয়োগের ব্যাপারে বিভিন্ন বিষয়ে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। সাহারার প্রস্তাবিত প্রকল্প আমাদের আবাসন ব্যবসায়ীদের পক্ষেই করা সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের উচিত এই জাতীয় পুঁজির বিকাশকে সহযোগিতা করা। সাহারার এ বিনিয়োগ দেখে মনে হচ্ছে এটা কিছু ব্যক্তির এবং রাজনৈতিক স্বার্থে করা হচ্ছে। আর যদি দু দেশের ব্যবসায়ীদের জয়েন্টভেঞ্চারে প্রকল্প করা হয় তাহলে আমাদের এই বিনিয়োগের শর্তগুলো দেখতে হবে। গত বছর এদেশে যা বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মুনাফা দেশের বাইরে চলে গেছে। এদেশের গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন খাতে ইতিমধ্যে ভারতীয় পুঁজির প্রবেশ ঘটেছে। এভাবে অবাধে বিদেশি পুঁজিকে ঢুকতে দেয়া আমার মনে হয় দেশের অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

 

 

 

 

‘তাদের এই প্রকল্প বিনিয়োগ নয়’

 

-আনিসুজ্জামান ভুঁইয়া রানা

 

প্রকৌশলী; সাধারণ সম্পাদক, রিহ্যাব

 

সাহারার এদেশে আসাকে আমি বিনিয়োগ বলব না। তারা এদেশে জমি চায়। আবাসন খাতে জমি হচ্ছে প্রধান বিনিয়োগ। এদেশে জমির অভাব অত্যন্ত প্রকট। আমাদের ফ্ল্যাটের দামের প্রধান অংশই থাকে জমির দাম। গুলশানে আমাদের একটা ফ্ল্যাটের দামে শতকরা ৮৫ ভাগ থাকে জমির দাম এবং ১৫ ভাগ নির্মাণ খরচ। মুক্ত বাজারে যে কেউই এদেশে বিনিয়োগ করতে পারেন, কিন্তু তাদের এই প্রকল্পকে আমি বিনিয়োগ বলতে চাই না। এদেশের ব্যবসায়ীরা তাদের শ্রম, দক্ষতা এবং মেধা দিয়ে আবাসন খাতের সব প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। আমাদের প্রকৌশলী, স্থপতিরা শিয়ার্স টাওয়ারসহ বহু উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। সরকার যদি রিহ্যাবের মাধ্যমে দেশি আবাসন ব্যবসায়ীদের জমি দেয়, তাহলে আমরা দেশের যে কোনো জায়গায় ৩ হাজার টাকা বর্গফুট দরে ফ্ল্যাট দিতে পারব। জমির দামের কারণেই আমাদের ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংকে তারল্য সঙ্কটের কারণ ফ্ল্যাট কেনার জন্য গ্রাহকদের ঋণ দেয়া হচ্ছে না। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে আমাদের ফ্ল্যাটের বিক্রি ৪০ শতাংশ কমে গেছে। শহরে বাড়ি ভাড়া বাড়ছে লাগামহীনভাবে। ফলে মানুষের আবাসন সঙ্কট নিরসনে দরকার ফ্ল্যাট নির্মাণ। সাহারা গ্রুপ ১ লাখ একর জমি চেয়েছে। জমির সমস্যায় এদেশে বিমানবন্দর নির্মাণ করা যায়নি। এ রকম অবস্থায় দেশি কোম্পানি বাদ দিয়ে সাহারা গ্রুপকে এত বেশি জমি দেয়াকে আমরা সঠিক মনে করি না। ঢাকার আশপাশে স্যাটেলাইট সিটি করার মতো ফাঁকা জায়গা নেই। বরং পার্শ্ববর্তী শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে সেসব জায়গায় দেশি কোম্পানিকে জমি দিলে আমরা আমাদের শ্রম, মেধা, দক্ষতা দিয়ে ফ্ল্যাট তৈরি করতে পারব। সরকার চাইলে আমরা প্রাইভেট-গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপে কাজ করতে পারি। সরকার জমি দিলে আমরা ফ্ল্যাট তৈরি করতে পারি।

 

 

 

দেশি কোম্পানিগুলোকেই সুযোগ দেয়া উচিত

 

-নসরুল হামিদ বিপু এমপি

 

সভাপতি, রিহ্যাব

 

বাংলাদেশের আবাসন খাত এখন বিশ্বমানের। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা বিশ্বমানের বিল্ডিং এখন তৈরি করছে। আজকের ঢাকা শহরের যে সৌন্দর্য তার অনেকটাই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা করেছে। তাছাড়া ঢাকা শহরের উন্নয়নে ও প্রসারে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে যে কেউ বিনিয়োগ করতে পারে। যারা বিনিয়োগ করবে তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা তথা সুনাম এই বিষয়ে আছে কি না সেটা যাচাই-বাছাই করা উচিত। নিজস্ব প্রচেষ্টায় আবাসন শিল্প মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। সাহারা গ্রুপ হঠাৎ করে এই খাতেই বিনিয়োগ করতে চায় কেন? আমি মনে করি সাহারার চেয়ে বাংলাদেশেই আরো ভালো আবাসন কোম্পানি রয়েছে। সরকার সহযোগিতা করলে দেশি কোম্পানি আরো ভালো ফল দিতে পারবে। তাছাড়া দেখুন আগে দেশের ¯^ার্থ দেখতে হবে। এই ক্ষেত্রে যদি সরকার নিতান্তই সাহারা গ্রুপকে দিয়ে কাজ করাতে চায়, তাহলে দেশি কোম্পানিগুলো যাতে তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে পারে তার বিধান রাখা উচিত। আমি মনে করি দেশি কোম্পানিগুলোকেই সুযোগ দেয়া উচিত।

 

 

 

‘আমাদের শহর কেমন হবে তা নির্ধারণ করছে নাগরিকরা নয়, বিনিয়োগকারীরা’

 

-মোশাহিদা সুলতানা ঋতু

 

শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

বিনিয়োগ বাড়লে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। কিন্তু কোন বিনিয়োগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে আর কোন বিনিয়োগ থেকে দেশের উপকার হবে তা বুঝতে হলে বুঝতে হবে বিনিয়োগের রাজনৈতিক অর্থনীতি। আমাদের দেশে সাহারার বিনিয়োগের কারণে কিছু মানুষের জীবিকার সংস্থান হতে পারে অস্থায়ীভাবে, কিন্তু স্থায়ীভাবে কোনো কর্মসংস্থান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। শুধু তাই নয়, সাহারা চাইলে নিজের সুবিধা দেখিয়ে ভারতের ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে শ্রমিক বা বিশেষ দক্ষতার কথা বলে বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন লোকও নিয়োগ করতে পারে। কাজেই যেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা কর্মসংস্থানের কথা বলা হচ্ছে তার পুরোটাই রয়ে যেতে পারে অবাস্তবায়িত। এই বিনিয়োগ আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কতটুকু ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সন্দেহটা আবার এমনি এমনি তৈরি হয়নি, হয়েছে আমাদের বিদেশি বিনিয়োগের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে এবং সাহারার নিজ দেশেও তাদের অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং নানান কাজ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ভারতে তাদের অনিয়মের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।

 

সাহারার প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বেশ সময় সাপেক্ষ এবং না চাইলেও এধরনের প্রকল্পে নানা কারণে সময়সীমা বাড়তে থাকে। ফলে যারা সাহারাকে জমি দেবেন তারা নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারেন। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে বা অন্য কোনো কারণে এত বড় প্রকল্পে বাস্তবায়নে জটিলতার কারণে প্রকল্প বিলম্বিত হতে পারে। এছাড়া সাহারা বলছে কম দামে ফ্ল্যাট দেয়ার কথা। কিন্তু আমেরিকাসহ দুনিয়ার অনেক দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, এসব প্রকল্প স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নির্মাণ করা হবে বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে না। এ ধরনের স্যাটেলাইট শহর গড়ে ওঠার চাহিদা মূলত তৈরি হয় বিভিন্ন উপায়ে বিত্তশালী হওয়া মানুষদের জন্য। আমাদের শহর কেমন হবে সেটা আসলে আমরা নাগরিকরা ঠিক করছি না, করছে আবাসন খাতের বিনিয়োগকারীরা। আর তাই স্বপ্ন ঠিক করে দেয়ার দায়িত্বও নিয়েছেন এই বিনিয়োগকারীরাই। শহরে বসবাস করেও এই শহরবাসী এই শহরকে নিজের মনে করে না। তাই যে যার সুবিধা মতো আবাসন প্রকল্প তৈরি করছে। সাহারার বিনিয়োগের বিরুদ্ধে এদেশের ব্যবসায়ীরা শক্ত অবস্থান নিচ্ছেন না। এ বিনিয়োগে সরকারি দলের সংশ্লিষ্টতার কারণে তারা এটা করছেন।

 

 

 

বিভাগ: প্রতিবেদন

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.