সিরিয়াতে কেন এই ম্যাসাকার ২০০০ ডেস্ক
একদিকে রাশিয়া, চীন ও ইরান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং সৌদি আরব দুটি আন্তর্জাতিক
পক্ষের আধিপত্যবাদী স্বার্থে সিরিয়ায় ম্যাসাকারের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ
আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় সিরিয়ায় প্রায় বছর দেড়েক আগে শুরু হয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদবিরোধী আন্দোলন। কিন্তু এ আন্দোলনের চরিত্র অন্য দেশগুলোর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে পৃথক। আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আধিপত্যকে জোরদার করতে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছেন এ আন্দোলনকে। আন্দোলন থেকে এটি এখন গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। অস্ত্র আর লোকবল দিয়ে এ যুদ্ধ চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক শক্তি। ফলে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন শ শ সাধারণ সিরিয়াবাসী। বহু সাধারণ সিরীয় নাগরিক ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক, জর্ডান, লেবানন ও ইরাকে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এখন প্রধান ভ‚মিকা রাখছে দুপক্ষে বিভক্ত আন্তর্জাতিক পরাশক্তি। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতায় রাখতে চাইছে রাশিয়া, চীন ও ইরান আর আসাদবিরোধীদের সমর্থন করছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো এবং সৌদি আরব।
দেড় বছরের এ গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। গত ১৩ জুলাই হামা প্রদেশের ত্রেমশেহ গ্রামে প্রেসিডেন্ট আসাদের সরকারি সেনা এবং মিলিশিয়ারা প্রায় ২০০ সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে গত দেড় বছরের গৃহযুদ্ধে এটাই সব থেকে বড় ম্যাসাকার। নারী, পুরুষ, শিশু কেউই রেহাই পাননি এ হত্যাযজ্ঞ থেকে। ৩০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট বাশারের পিতা হাফেজ সুন্নি মুসলমান গরিষ্ঠ সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থান ঠেকাতে এই হামাতেই ১০ হাজার সুন্নিকে হত্যা করেছিলেন। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট বাশার শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে বিরোধ সিরিয়ার সাধারণ মানুষের বিভক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আসাদ বাহিনীর এই হামলাকে নিছক প্রতিশোধ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা; বরং এ ধরনের পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে আসাদ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে ধর্মীয় গৃহযুদ্ধে রূপ দিতে চাইছেন বলে মনে করছেন তারা। অন্যদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিল আসাদকে ‘অপরাধী’ বলছে। এই দুই পাল্টাপাল্টি পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া তাদের নিজেদের আধিপত্যকে সিরিয়ায় প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। আসাদবিরোধী সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর হাজারো শিশু, নারী-পুরুষের লাশ সবই চাপা পড়ে গেছে এই আধিপত্য বিস্তারের রেষারেষিতে।
গৃহযুদ্ধে আসাদবিরোধী প্রধান শক্তি হলো সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিল (এসএনসি)। এটি প্রধানত গঠিত হয়েছে প্রবাসী সিরীয় নেতাদের দ্বারা। সাধারণ মানুষদের মতে, এই কাউন্সিল জনগণের প্রকৃত চাহিদা থেকে দূরে সরে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসএনসি পশ্চিমা শক্তির স্বার্থ সংরক্ষণ করছে। উইকিলিকসের ফাঁস করা একটি বার্তা থেকে জানা যায়, আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জর্ডান ও তুরস্কের সেনাদের নিয়ে গঠিত একটি যৌথ বাহিনী বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিলে সরকারবিরোধী সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। অন্যদিকে হাইথাম-আল-মালেহর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি। আসাদের সেনাবাহিনী থেকে আগত অনেক সদস্য রয়েছেন এ দলে। তবে এই দলটি বেশি সংগঠিত নয়। তবে অনেক বিশ্লেষক এই দলকে দেখছেন আসাদবিরোধী আন্দোলনের একমাত্র আশা হিসেবে। এসটিসির বিদ্রোহীদের হাতে রয়েছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, যা কাতার এবং সৌদি আরব থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানা যায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আসাদ সরকারকে উৎখাত করতে চাইলেও মার্কিন কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের অস্ত্র দেয়ার পক্ষপাতী নয়। কারণ এ অস্ত্র আল কায়েদাসহ বিভিন্ন মার্কিনবিরোধী মৌলবাদী সংগঠনের হাতে পড়তে পারে। তাই মার্কিনিরা চাইছে রাজনৈতিক সমাধান।
সঙ্গে সঙ্গে এটাও সত্য, মার্কিনিরা আসাদের সিরিয়াকে মনে করে রাশিয়ার অনুগত দেশ হিসেবে। তাই এ দেশটিতে যে কোনো মূল্যে তারা মার্কিন কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চায়। কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত জি-এইট সামিটের সময় ক্যাম্প ডেভিডে রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে বলেছেন, তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল কর্তৃক সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সেনা অভিযান চান না। সিরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার বিভিন্ন সামরিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সিরিয়ায় রয়েছে রাশিয়ার একটি ছোট নৌঘাঁটি, যা ভূমধ্যসাগর এলাকায় তাদের একমাত্র নৌঅবস্থান। সিরিয়ার তেল এবং গ্যাস খাতে রাশিয়ার বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে এবং সিরিয়া রাশিয়ার অস্ত্র ক্রেতাদের অন্যতম।
মার্কিনিরাও বসে নেই। তারা সিরিয়ায় সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগে আগ্রহী এবং সে প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে মার্কিনিদের থিয়েটার হিসেবে ভূমিকা রাখছে জর্ডান। গত মে মাসের মাঝামাঝি সিরিয়ার প্রতিবেশী জর্ডানে গত এক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অনুষ্ঠিত হয় সব থেকে বড় সামরিক মহড়া। মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের নেতৃত্বে ১৮টি দেশের ১২ হাজার সেনা অপারেশন এগার ঈগল ২০১২ নামের এ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। মে মাসে মার্কিন সেনাবাহিনীর চেয়ারম্যান অব দ্য জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ জেনারেল মার্টিন ডেমপসে বলেন, ‘আমাদের বলা হলে আমরা যে কোনো মুহুর্তে সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত।’
বর্তমান ক্ষমতাসীন আসাদ ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্যদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহ নির্ভর করে আসাদের ওপর। মার্কিন এবং রাশিয়ার আধিপত্যের একটি ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে পুরো সিরিয়া। সিরিয়ায় শিয়া-সুন্নি দ্ব›দ্ব প্রবল। প্রেসিডেন্ট বাশার শিয়া এবং এ কারণে তার ও তার পিতার আমলে সিরিয়ায় সুন্নিরা বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিত হয়েছে। এ কারণে বর্তমানে আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের বেশিরভাগই সুন্নি। এই বিভক্তির কারণে সৌদি আরব আসাদ সরকারের ঘোর বিরোধী। আবার হিজবুল্লাহকে সহায়তা দেয়ায় ইসরায়েলও চায় আসাদ সরকারের পতন। সিরিয়াকে ঘিরে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক লক্ষ্য এভাবে অভিন্ন হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ে এখন লাশ হচ্ছেন সিরিয়ার নারী, পুরুষ আর শিশুরা, ব্যর্থ হয়েছে কফি আনানের শান্তি মিশন।
তাই সহসাই সমাধান হচ্ছে না এ গৃহযুদ্ধের। কারণ তা প্রধানভাবেই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর ওপর।
বিভাগ: আন্তর্জাতিক



