সাগরকন্যা কুয়াকাটায় ফারুখ আহমেদ
চর গঙ্গামতি। ঝাউপাতায় ভোরের শিশির বিন্দু, সে বিন্দু ছড়িয়েছে ছোট্ট খেজুর গাছের পাতায়। আমাদের সেসবে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। আমরা কজন তাকিয়ে আছি পূর্ব দিগন্তের অসীম সৌন্দর্য ভরা সমুদ্র জলরাশির দিকে। সে জল ভেদ করে এক সময় ধীরে ধীরে লাল থালার মতো সূর্য আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল। আমরা খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম! দুদিন আগে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত এসেছি কেবল সমুদ্রসৈকত থেকে এমন সূর্যোদয় দেখব বলে। আমাদের সে স্বপ্ন পূরণ হলো! আমাদের ডেরা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটারের দূরত্ব এই চর গঙ্গামতি এসেছি ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে। আগের দিন মোটরসাইকেল ভাড়া করে রেখেছিলাম। মোটরসাইকেল ড্রাইভার আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিয়ে এসেছে। তা না হলে এমন শীতে আমাদের এখানে আসাই হতো না। দেখা হতো না সূর্যোদয়!
কুয়াকাটা হলো এই উপমহাদেশের একমাত্র সমুদ্রসৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। কিন্তু হলে কী হবে, দুর্ভেদ্য পথের জন্য যাই যাই করেও যাওয়া হচ্ছিল না। শেষে গেল শীতে ঢাকা হেরিটেজের আয়োজনে সম্মতি জানাতেই হলো। কিন্তু শর্ত হলো লঞ্চে যেতে হবে। ২৭০ কিলোমিটার পথ আর প্রায় ১৬ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণ বাসে না করে আরাম করে লঞ্চ ভ্রমণের জন্য ঢাকা হেরিটেজের সাইফুলকে এমন শর্ত। চতুর সাইফুল, আমি বেঁকে বসি তাই সে টিকেট কেটে হাতে ধরিয়ে দিল। আমরাও পরদিন বৃহস্পতিবার ৫টায় সদরঘাট লঞ্চঘাটে উপস্থিত হলাম। সে লঞ্চ ছাড়ল সন্ধ্যা সাতটায়। ততক্ষণে ঢাকা শহর অন্ধকারে তলিয়েছে। শীত আরো তীব্ররূপ ধারণ করেছে। আমি লেপের নিচে আশ্রয় নিলাম। এর মধ্যে চয়ন, আব্বাস, সাইফুল রানা আর আরিফরা আমার কেবিনে চলে এসেছে আড্ডার জন্য। আড্ডা চলল। সঙ্গে ডিম আর চানাচুর ভাজা। সাইফুল তার মায়ের হাতের পরোটা আর গরুর মাংস ভুনা করে এনেছে। সেটাও চলল পাশাপাশি। তারপর সিজারের কাছে জানতে চাইলাম আমরা কোথায় এসেছি ভাইয়া? সিজার বের হয়ে সারেং ভাইকে ধরে জেনে এসে বলল, ভাইয়া মুন্সীগঞ্জ। ব্যস, ওই পর্যন্তই। এরপর সাইফুলের ধাক্কাধাক্কি বিগবি আমরা চলে এসেছি। আমি ঘুমের জড়তা নিয়ে বললাম কোথায়? সে রসিকতা করে বলল পৌট্টাখালি! রসিকতা ছিল নামের উচ্চারণে। আমরা সত্যি সত্যি পটুয়াখালী পৌঁছে গেছি। লঞ্চ থেকে নেমে আগে নাশতা সারলাম। তারপর কনকনে শীতে কাঁপতে কাঁপতে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। এখান থেকে প্রতি এক ঘণ্টা পরপর বাস ছেড়ে যায় কুয়াকাটার উদ্দেশে। টিকেট কেটে বাসে চড়ে বসলাম। গলাচিপা অথবা আমতলি পর্যন্ত আমি সম্ভবত ঘুমিয়েই ছিলাম। কিন্তু আমতলী আসার পর অবস্থা বেগতিক হলো। এতদিন যা শুনে এসেছি ঠিক তাই। আমরা ভাঙা রাস্তায় চলছি। উৎকণ্ঠার মাঝেও সৌন্দর্যের পরশ। রাস্তার পাশের মরা খালে নীল শাপলার ছড়াছড়ি। চোখ জুড়িয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। এসব দেখে দেখে আর ধাক্কা ও মানুষের গুঁতায় ২৭ কিলোমিটার পথ সাড়ে ৩ ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে আমরা কুয়াকাটা পৌঁছি।
কুয়াকাটায় বাঙালি ও রাখাইন সম্প্রদায়ের বসবাস। আরাকান বা বার্মা রাজ্য থেকে রাখাইন সম্প্রদায়ের আগমন সেই ১৮শ শতকে। পটুয়াখালীর রাখাইন উপজাতি শীর্ষক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রক্ষা শব্দ থেকে রাখাইন শব্দের উৎপত্তি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন আদিবাসী বাংলাদেশে বসবাসের আগে আরাকান রাজ্যে বসবাস করতেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২৫ থেকে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। ১৮শ শতকে আরাকান রাজা মহাথামাদা বর্মী রাজ বোধপায়ার কাছে পরাজিত হলে বর্মীরা আরাকান দখল করে। বর্মী অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য ১৫০টি রাখাইন পরিবার ৫০টি নৌকাযোগে আরাকান ত্যাগ করে পশ্চিমে যাত্রা শুরু করে। এভাবেই তারা গলাচিপা উপজেলার রাঙাবালী দ্বীপে পৌঁছায় এবং প্রায় ৪৮ বছর পর কুয়াকাটা উপকূল আবিষ্কার করে ও এখানে বসবাস শুরু করে। তখন এর নাম হয় ক্যাংছাই। যার অর্থ দাঁড়ায় ভাগ্যকূল। তাছাড়া প্রচলিত আছে, এখানে সমুদ্র উপকূলে মিষ্টি পানির সন্ধান পাওয়া গেলেও দুর্ভোগ ছিল ভীষণ। এখানে কুয়া কাটা হতো ঠিকই কিন্তু বালি দিয়ে তৈরি বাঁধ ভেঙে যেত। তাই রাখাইনরা নিজেদের দুষত ভাগ্যবঞ্চিত হিসেবে। রাখাইন ভাষায় যার অর্থ দাঁড়ায় ক্যাওয়েছাই। এভাবেই কুয়া কাটতে কাটতে এই উপকূল অঞ্চলের নাম হয়ে ওঠে ক্যাছাইও, যার বাংলা অর্থ কুয়াকাটা। শেষে এক সময় এলাকার নাম কুয়াকাটা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আমরা কুয়াকাটায় শিবলি হ্যাচারি অ্যান্ড ফার্মে ডেরা গাড়ি।
আমাদের ডেরা থেকে সমুদ্র একেবারে কাছে। রাস্তায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে নারিকেল গাছ সারি সারি। মূল সৈকত থেকে একটু দূরে বিধায় বেশ নির্জন আমাদের বালুকাবেলা। এখানে সমুদ্র বেশ উপভোগ্য। মাছ ধরার নৌকা আর জাল টানার দৃশ্য চোখে পড়ল। সব মিলিয়ে যেন ক্যানভাসে আঁকা ঝকঝকে ছবি। এখানে চলাচলের প্রধান বাহন ভ্যানগাড়ি আর মোটরসাইকেল। রিকশাও আছে, তবে সবাই মোটরসাইকেলের ওপরই নির্ভরশীল। আমরা সমুদ্রসৈকত অভিমুখে হেঁটে চলি। নীল আকাশে সাদা মেঘ। আর নারিকেল গাছের সবুজ হাতছানি, সত্যি মনোরম। আমরা সৈকত ধরে হেঁটে চলি। শীতকাল বলে পর্যটকদের ভিড় আছে, তবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মতো নয়। সৈকত পাড়ে সারি সারি কাঠের বিছানা আর ছাতা চোখে পড়ল। আমরা হেঁটে হেঁটে সমুদ্রসৈকত থেকে বাজারে এসে ভ্যানগাড়িতে চড়ে চলে আসি ঝাউবন। ঝাউবনের সে সময়টা আমার কাছে কেমন বিষণ্ন লাগে। রোদের রং রাঙা হয়ে এসেছে। সূর্যের বিদায় আসন্ন। কী এক নির্জনতায় ডুবে গেছে চারদিক। অজানা কোন ব্যথায় বুকটা হুহু করে ওঠে। আমি একাই সৈকত ধরে হেঁটে চলি। পেছন পেছন রানা ছুটে আসে। সে রাতে শিবলি হ্যাচারিতে আমাদের খাবারের বন্দোবস্ত ভালোই ছিল। এখানকার বাবুর্চি জলিলও অসাধারণ মানুষ। তাকে বলতেই সে আমাদের জন্য বিশাল এক কোরাল মাছের ব্যবস্থা করে দেয়। আমরা কোরাল মাছ আগুনে ঝলসে খেয়ে ঘুমাতে যাই। ক্লান্ত শরীর, দুচোখে ঘুম জড়িয়ে আসতে বেশি সময় লাগে না!
পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙে। সকালের নাশতা সেরে সামনের শুঁটকিপল্লী ঘুরে দেখি। তারপর একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করি ফাতরার বনে যাওয়ার জন্য। এখানে আমি আমার রোদ চশমাটিকে সমুদ্রে আত্মাহুতি দিতে সহায়তা করি! আসলে হাত ফসকে চশমাটি সমুদ্রের জলে পড়ে যায়। তারপর বিষণœœ মন নিয়ে এগিয়ে চলি ফাতরার বনে। গায়ে বাতাসের দোল আর সামনে থৈ থৈ জল। এভাবেই সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ের দোলায় এগিয়ে চলল আমাদের নৌকা। প্রায় আধাঘণ্টা এভাবেই চলার পর আমাদের সামনে পড়ে এক চোখ জুড়ানো দৃশ্য। একলাইনে সাতটি মাছ ধরার নৌকা দূর সমুদ্রে এগিয়ে চলেছে। সম্ভবত এটা তাদের মাছ ধরার প্রস্তুতি। এমন দৃশ্য সত্যি বিরল আমাদের জন্য। সে দৃশ্য আড়াল হওয়ার আগেই ফাতরার বন আমাদের নজরে পড়ে। শুনেছি এখান থেকেই শুরু সুন্দরবনের সীমানা। বনের প্রবেশ মুখে বন বিভাগের সাইনবোর্ড। তাতে লেখা টেংরাগিরি সংরক্ষিত বন (ফাতরার বন)। তার পাশে ছোট্ট একটি দোকান। কাঁকড়া ভাজতে দেখে আমার সঙ্গীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। অল্প কিছু সময়ের মধ্যে কাঁকড়া শেষ। এর মধ্যে গণনা শুরু হয়ে গেছে কে বেশি খেয়েছে বা কে কে পায়নি! এভাবেই আমরা সুন্দরী গাছ পেরিয়ে ঝাউবনের ভেতর দিয়ে ফাতরার বনে প্রবেশ করি। বন কর্তৃপক্ষ এখানে একটি পুকুর কেটেছে। শান বাঁধানো সে পুকুর সত্যি খুব চমৎকার। এখানে সমুদ্রসৈকতটি অসাধারণ। আমরা এখানে কী এক মায়ার জগতে হারাই। তারপর শীতের রোদ আর নোনা হাওয়া গায়ে মেখে সমুদ্র স্নানে মাতি! ফাতরার বন থেকে ফেরার আগে সমুদ্রসৈকতে কাঁকড়া কুড়াই।
আমরা ফাতরার বন থেকে ফিরে রাখাইনপাড়া ঘুরে দেখি। পাশেই বিশাল বৌদ্ধমন্দির। অনেকের মতে এটি দেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধমন্দির। বৌদ্ধমন্দির দেখা শেষে ফিরে আসি কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। ঝিনুক-শামুকের মার্কেট ঘুরে বেড়াই এবং শুঁটকি কিনে ফিরে আসি আমাদের ডেরায়। সে রাতে আমরা মহুয়া এনে খাই। রাখাইনদের বাড়ি বাড়ি এই পানীয়টি খুব পাওয়া যায়। জলিল আমাদের জন্য মহুয়ার ব্যবস্থা করে দেন। আর ঝলসে দেন দুটো বিশাল মোরগ। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে রাতে থাকা যায় না। আমরা কুয়াকাটার সৈকতে সে রাত গল্প করে কাটাই। দিনের সৈকতের চেয়ে রাতের সৈকত বেশি সজীব। এখানে সমুদ্রের ভয়ঙ্কর রূপ রাতেই বোঝা যায় তার গর্জনে-তর্জনে। আমরা সেদিন সে গর্জন কানে নিয়ে রুমে ফিরে আসি ভোরের শিশিরের সঙ্গে সূর্যোদয় দেখার আশায়!
চর গঙ্গামতির ঝাউবনে সূর্যোদয় দেখার দৃশ্য আমাদের জীবনভর মনে থাকবে, যেমন মনে থাকবে সৈকতজুড়ে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া দেখা! রাস্তার ঝামেলার জন্য অনেকে কুয়াকাটা যেতে ভয় পান। কিন্তু একবার যাওয়া হলে আজীবন কুয়াকাটায় ডুবে থাকা যাবে। সে গল্পে গল্পে জীবন পার!
¬সদরঘাট থেকে লঞ্চে পটুয়াখালী হয়ে বাসে কুয়াকাটা, সহজ পথ। গাবতলী বা গুলিস্তান থেকে বিআরটিসির বাসেও যাওয়া যায়। বাসের চেয়ে লঞ্চ আরামদায়ক। যেভাবেই যান আমতলি থেকে খানাখন্দ আপনাকে আঁকড়ে ধরবেই। কুয়াকাটায় অসংখ্য হোটেল বা অতিথি ভবন আছে। আছে পর্যটন মোটেল। চাইলে শিবলি হ্যাচারিতে থাকতে পারেন। যেখানেই থাকুন না কেন, আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাবেন। খাবার হোটেল তেমন ভালো না হলেও আপনাকে এখানে চড়া মূল্যে খাওয়া-দাওয়া সারতে হবে। ভুলবেন না লেবু বাগান যেতে আর শুঁটকিপল্লী থেকে শুঁটকি কিনে আনতে!
বিভাগ: ভ্রমণ



