ধামরাই কথা ফারুখ আহমেদ
আমার বন্ধুর বাবা বাংলাবাজারের একজন টায়ার ব্যাবসায়ী। তার দোকান থেকে বেশ কিছু টায়ার চুরি হয়ে গেছে। যার বাজার মূল্য প্রায় লাখ টাকা। ১৯৯২ সালে এই পরিমাণ টাকা কম নয়। টায়ার চোর ধরতে না পেরে আমার বন্ধু ফকিরের শরণাপন্ন হলো। তারপর সে আমাকে নিয়ে গেল ধামরাই। সেখানকার এক ফকির (এখন নাম মনে নেই) গাছের সঙ্গে কথা বলে আমার বন্ধুকে তাবিজ-কবজ দিল। বলল, দুই দিনে চোর ধরা পড়বে। কিন্তু চোর আর ধরা পড়েনি। তবে ধামরাই আমার স্মৃতিপটে রয়ে গেছে। স্মৃতি বলতে এক ঝড়বৃষ্টির রাতে আমাদের ধামরাই ঘুরে আসা। পরে আর কখনো ধামরাই যাওয়ার চেষ্টা করিনি।
ধামরাই যাত্রা এবং : ধামরাই বংশী নদীর শাখা কাকলাজানি নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। খবরের কাগজে ধামরাইয়ের কাঁসা-পিতল শিল্প নিয়ে লেখা পড়ে ধামরাই যাব যাব করছিলাম। ঢাকার কাছে ধামরাই এক ঘণ্টার পথ। যানজটে পড়লে আলাদা কথা। শুক্রবার ছুটির দিন সুতরাং যানজটের সম্ভাবনা ক্ষীণ। মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ধামরাইয়ের উদ্দেশে। পথে যেতে আজিজ মার্কেটে নাশতা সারলাম। তারপর বাইক মিরপুরের পথে ঘোরালাম। আমিনবাজার সেতু পার হলাম কোনো ঝামেলা ছাড়াই। ভাকুর্তার কাছে এসে স্মৃতিকাতর হলাম। গত বছর এখানে এসেছিলাম বাবুই পাখির খোঁজে। একটু এগিয়ে আজিবরদের বাসায় গেলে তাল গাছ আর কত্ত কত্ত বাবুই! আমরা ভাকুর্তা পেরিয়ে গেণ্ডা হয়ে চলে আসি সাভার, এখানে বিরতি দিয়ে মিষ্টির দোকানে বসে টকদই খাই। খাওয়া-দাওয়া শেষে আবার পথ সঙ্গী হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আর জাতীয় স্মৃতিসৌধ পেছনে ফেলে এগিয়ে যাই। কাছেই পড়ে বংশী নদী। নদীটি কেমন যেন ভালো লাগল না। অথচ সাপের গ্রামে গিয়ে বংশী নদীতে বেড়ানোর মধুর স্মৃতি আছে আমাদের। আমরা মাঝিকে বলেছিলাম আবার আসব। সেই আসা আর হয়নি। ব্যস্ততা আমাদের কখন কোথায় নিয়ে যায় বলতে পারি না। ভাবতে ভাবতে দেখি ধামরাই চলে এসেছি।
ধামরাইয়ের ইতিবৃত্ত : ধাম শব্দের অর্থ বাসস্থান বা তীর্থস্থান। রাই শব্দার্থ হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ প্রণয়িনী, শ্রীরাধিকা বা কিশোরী রাধিকা। সুতরাং ধামরাই হচ্ছে পবিত্র তীর্থ আর রাধিকার সংক্ষেপ রাই শব্দের মিলিত রূপ ধামরাই। অন্য মতে, ধামা এবং রাই নামের কোনো এক গোপ দম্পতির নামানুসারে এই স্থানের নাম ধামরাই হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এখানে ধামার হাট নামের একটি মহল্লা রয়েছে। ধামরাই সেভাবেও হতে পারে। সে যা-ই হোক, ধামরাই অতি প্রাচীন জনপদ। এদেশে আর্যদের আগমনেরও আগে ধামরাই ছিল একটি উর্বর ও সমতল ভ‚মির জনপদ। সেই মাটির টানেই দ্রাবিড়রা ধামরাই বসতি স্থাপন করেন। সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য যে ৮৪ হাজার গ্রাম বেছে নিয়ে ছিলেন, ধামরাই ছিল তার অন্যতম। এ সব ধর্ম প্রচার কেন্দ্রগুলোকে বলা হতো ধর্মরাজিক বা ধর্ম রাজিয়া। ধামরাই সে সময় অন্যতম একটি প্রধান ধর্ম রাজিয়া বা প্রচার কেন্দ্র ছিল। ধর্ম রাজিয়া শব্দের অর্থ ধর্মরথ। ধর্ম রাজিয়া দিনে দিনে বিবর্তনের মাধ্যমে ধর্ম রাজিয়া বা ধর্মপুর এবং শেষমেশ ধামরাই নাম গ্রহণ করে। আমার অনেক আগে আসা সেই ধামরাইয়ের সঙ্গে এই ধামরাইয়ের কোনো মিল খুঁজে পেলাম না। অবশ্য সে সময় আমরা রাতের অন্ধকারে এখানে এসেছিলাম। এবার এলাম দিনের বেলা, চিত্র ঠিক বিপরীত। এখানে এসে একটি বটগাছের নিচের ছোট চায়ের দোকানে বসে চা খেয়ে আরো সামনে এগিয়ে যাই। আমাদের পেছনে স্কুল তার পাশে একটি পুরনো বাড়ি। একটি শিশুকে দেখলাম মজা করে কাদা মাটি মাখামাখি করতে। আরো এগিয়ে দেখতে পাই রাস্তার দুধারে লাইন ধরে বাজার বসেছে। শাক-সবজি বিক্রি হচ্ছে। কেউ দুধ নিয়ে বসেছে। এ সব কিছুর সামনে রথ দাঁড়িয়ে।
ধামরাই রথ : ধামরাইয়ের রথ খুব বিখ্যাত। এখানে হিন্দু দেবতা জগন্নাথের প্রতি উৎসর্গকৃত একটি রথ মন্দির রয়েছে। প্রথমে ধামরাইয়ে একটি বাঁশের রথ ছিল। পরবর্তী সময়ে বালিয়াটির জমিদাররা মিলে এখানে বিশাল এক কাঠের রথ তৈরি করেন। রথ তৈরি হলো এবার রথ চলার জন্য বিশাল রাস্তা দরকার। কাশিমপুরের জমিদার ধামরাই এলে তিনি রথ চলার সে রাস্তা তৈরি করে দিতে চাইলেন। কিন্তু ধামরাইয়ের আঁনীর জমিদার রামশংকর মিত্র মজুমদার ও বিষ্ণুপদ মজুমদার, জমিদার শ্যামরায় চৌধুরী ও ভবানী চৌধুরীদের সম্মিলিত চেষ্টায় বাসুদেব বাড়ি হতে লাকুড়িয়াপাড়া পর্যন্ত রাস্তা রথ চলার উপযোগী করা হয়। ধামরাইয়ের রথযাত্রাটি বাংলাদেশের প্রাচীন এবং বৃহত্তম রথযাত্রা। প্রতিবছর রথযাত্রার দিন একটি বিশাল ৬ তালা রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মূর্তি আরূঢ় করে এখানে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। রথটি হিন্দু দেব-দেবীর নানা রকম মূর্তিতে সজ্জিত থাকে। সারাদেশ থেকে পুণার্থীরা এই রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। এখানে উত্থান একাদশী এবং মাঘী পূর্ণিমাতে মেলা বসে। সে মেলায় সারাদেশ থেকে প্রচুর লোকের আগমন ঘটে। এই মেলা ধামরাইয়ের রথ মেলা নামে বিখ্যাত। আমরা এখন যে রথটির সামনে দাঁড়িয়ে সেটি নির্মাণ করা হয় স্বাধীনতার পর। বালিয়াটির জমিদারদের তৈরি রথটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাক হানাদাররা ভেঙ্গে ফেললে নতুন এই রথটি নির্মাণ করা হয়। আমরা রথটি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাই। তারপর একটু এগিয়ে শ্রীশ্রীরাধাশ্যাম জিউর মন্দিরের সামনে আমাদের মোটরসাইকেল দাঁড় করাই। মন্দিরটির নির্মাণ সাল ১৩৪৫ বাংলা। এটি নির্মাণ করেন শ্রীমতী সুরবালা বণিক। আমরা মন্দিরটি ঘুরে বারান্দায় বসে সঙ্গে করে আনা খাবার খেয়ে পাশের গৌড়ভবনে প্রবেশ করি। গৌড়ভবনে প্রবেশ মুখের ঘরটি বৈঠকখানা। বর্তমানে তামা-কাঁসার তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র।
ধামরাইয়ের কাঁসা শিল্প : সত্তরের দশক পর্যন্ত ধামরাইয়ে এন্টিকের জিনিসপত্র বিক্রি হতো। এন্টিকের সেসব দ্রব্য শেষ হয়ে গেলে আশির দশকে কাঁসা-পিতলের ভাস্কর্য নির্মাণ ও বিক্রি শুরু হয়, যা এখন পর্যন্ত চলছে। আমরা গৌড়ভবনে প্রবেশ করে এর বিক্রয় কেন্দ্রটি ফাঁকা দেখতে পাই। কাউকে না পেয়ে নিজেরাই ঘুরে দেখি, ছবি তুলি। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করি। ভেতরেও কাউকে পাওয়া গেল না। পেলাম ফুলে ফুলে ভরা একটি কাঞ্চন গাছ। এখানে আমরা প্রায় চিৎকার করে ডেকেও কাউকে না পেয়ে গৌড়ভবন ত্যাগ করে চলে যাই পাশেই সুকান্ত বণিকের বাড়িতে। বিশাল বাড়ি, সুদৃশ্য অট্টালিকা। বাড়িটি যে কাউকে দূর অতীতে ফিরিয়ে নেবে। এর স্থাপতশৈলী অসাধারণ। আমরা এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। শতবর্ষের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটি। আমরা বাহির বাড়ির বারান্দায় বসে কিছু সময় কাটিয়ে বাড়ির অন্দরে প্রবেশ করি। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই বাড়িটির বিশালতা। সরু একটি গলি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে পেয়ে যাই বিশাল উঠোন। উঠোনের একপাশে কুয়া, এমন কুয়া সচরাচর চোখে পড়ে না। কুয়াতে টলমলে পানি। আমার সঙ্গী পাশে বাঁধা বালতি ছেড়ে কুয়া থেকে পানি তোলে। হাত-মুখ ধুয়ে নেয়। আমিও তাতে হাত লাগাই। কুয়ার শীতল পানির পরশে নিমেষে আমাদের ভ্রমণজনিত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। এর মধ্যে বাড়ির কর্ত্রী বের হয়ে আসেন। তিনি সুকান্ত বণিকের মা। আমরা মাসির সঙ্গে কথা বলে কুয়ার পাশে যেখানে কারিগর মাটি দিয়ে সাঁচ বানাচ্ছিলেন সে ঘরটাতে প্রবেশ করি। তাদের হাতের কাজ অসাধারণ। এরা আসলে কারিগর নয়, শিল্পী। যারা সব সময় অন্তরালে থেকে যান। এরাই নিখুঁতভাবে কাঁসা, পিতলের তৈরি নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি আর ভাস্কর্য নির্মাণ করে থাকেন। আমরা কারখানা থেকে বের হয়ে পাশের বারান্দায় একজন কারিগরকে একটি পিতলের বানানো হরিণের ভাস্কর্য ঘষতে দেখে দাঁড়িয়ে দেখি। তারপর মূল বিক্রয় কেন্দ্র ও প্রদর্শনী কক্ষে প্রবেশ করি। এখানেই দেখা হয় সুকান্ত বণিক ও তার স্ত্রী মানসী বণিকের সঙ্গে। তারা তখন চারজন বিদেশি ক্রেতা নিয়ে ব্যস্ত। দেশি ক্রেতাও দেখা যায়। এক দম্পতি এসেছে রংপুর থেকে গহনা কেনার জন্য। আবার একজন বয়স্ক হিন্দু মহিলাকে দেখলাম দেবদেবীর মূর্তি পছন্দে ব্যস্ত। এর বাইরে দর্শনার্থী বলতে আমরা দুজন। প্রদর্শনীর বিশাল ঘর দুটি ঘুরে দেখি, ছবি তুলি। হিন্দু পৗরাণিকের সব চরিত্র যেন বাস্তব রূপ পেয়েছে রোঙ্গ পিতল ও তামার মধ্যে। হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি, থালাবাটি, গহনাসহ নিত্যব্যবহার্য কি নেই এখানে। রাধা-কৃষ্ণ, অবতার, নটরাজ, চড়কের নীলপাট, উমা মহেশ্বর, কালিয়া কৃষ্ণ, সর্পছায়ায় বিষ্ণু, তারা, ত্রিনাথ, শিব, পার্বতী, ধুপদানি, পঞ্চপ্রদীপ, ঘণ্টা, নীলকমল আর দুর্গা চলেছেন অসুর বধে। আমার সঙ্গীর অনেক গহনা কিনতে ইচ্ছে করে, এর মধ্যে সে কানের দুখানা দুল আর হাতের এক জোড়া বালা কিনে ফেলে। আর বিদেশিদের দেখি ওরা পারে তো পুরো বাড়িটাই কিনে নিয়ে যায়। এর মধ্যে মাসি আমাদের হাতে রং চা আর বিস্কিট ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা চা পান করি আর এসব শিল্পকর্ম দেখি। তারপর একটি বিশাল দাবা বোর্ডের সামনে এসে থমকে যাই। এক সময় ভিড় কমলে সুকান্ত বণিককে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলি।
কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য ধামরাইয়ের এই তামা-কাঁসা শিল্প। ব্রিটিশদের সময় এখান থেকে করাচি ও কলকাতায় তামা-পিতল-কাঁসার মালামাল যেত। সুকান্ত যখন ছোট তখন সে অবাক হয়ে এসব দেখত। এভাবেই তার তামা-কাঁসার প্রতি দুর্বলতা জন্মে। সুকান্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করলেও তার মন সব সময় পূর্ব পুরুষদের এ ব্যবসায় পড়ে থাকত। সুকান্ত তার পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টায় নিজেকে সমর্পণ করেন এক সময়। তার সহায়তায় এগিয়ে আসেন তার স্ত্রী মানসী ও তার মা। শুরু করেন নকশা সংগ্রহ। ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের জাদুঘর ঘুরে তিনি ধারণা নেন। তারপর সে সব যাচাই-বাছাই করে নিজের একটা রূপ দাঁড় করান। সেভাবেই তার কারিগররা এখন এসব ধাতু নির্মিত দ্রব্যাদি তৈরি করে চলেছেন। খুব চাহিদা এসবের বলে সুকান্ত বণিক হেসে ওঠেন। তবে এ কথাও বলেন, দেশের চাইতে বিদেশেই চাহিদা বেশি। সুকান্ত বণিক বলে চলেন, তামা-কাঁসার তৈজসপত্র পরিবেশবান্ধব। দেশের মানুষ এসব ব্যবহার না করলে শিল্পটি বেশি দিন টিকবে না। আলাপে আলাপে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে টের পাইনি। আমরা প্রদর্শনী ঘরটি থেকে বের হয়ে দেখি মাসি মা তুলসী তলায় পুজো দিচ্ছেন। সূর্যের শেষ আভা তখন কুয়োতলায় পড়ে পুরনো এই বাড়িটিকে করে তুলেছে মোহনীয়!
প্রয়োজনীয় তথ্য : ঢাকার কাছে ধামরাইয়ের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। যাতায়াতের জন্য সার্বক্ষণিক বাস রয়েছে। এ পথে বিআরটিসি বাসও যাতায়াত করে। দিনে গিয়ে দিনেই ফেরত আসা যায়। তবে নিজস্ব যান সবচেয়ে ভালো। তাহলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ অনেক কিছুই এক সঙ্গে ঘুরে দেখা যাবে। চাইলে সাভারের কাছে সাপের গ্রামও বেড়িয়ে আসতে পারবেন। ফেরার পথে সাভারের মিষ্টি আনতে ভুল করবেন না। ধামরাইয়ে খাবার ব্যবস্থা ভালো। সুতরাং খাবার নিয়ে টেনশন করবেন না। তবে মনে করে অবশ্যই ক্যামেরা নেবেন!
বিভাগ: ভ্রমণ



