banner ad

মিসরে সামরিক জেনারেল ও ইসলামপন্থীদের গোপন সমঝোতা!
শানজিদ অর্ণব

মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে গেলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি। শপথ নেয়াও শেষ হয়েছে তার। ৫১ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন তিনি। সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট প্রার্থী আহমেদ শফিক পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২৭ শতাংশ ভোট। আরব বসন্তের পরিণতি এসে ঠেকল কট্টর ইসলামপন্থী মুরসির জয়ে। হতাশা তাই মিসরীয় কিংবা অমিসরীয় বিভিন্ন দেশের বহু পরিবর্তনকামী মানুষের চোখেমুখে। তবে সব মিসরীয়ই মুরসিকে চেয়েছেন, বিষয়টি এমন নয়। নির্বাচন কমিশনের দেয়া তথ্যমতে, নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছে ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, এ পরিমাণ প্রকৃতপক্ষে এর চেয়ে অনেক কম। তারপরও নির্বাচন কমিশনের তথ্য মেনে নিলেও দেখা যায়, মুরসি ভোটারদের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের সমর্থন লাভে সমর্থ হয়েছেন। তাহরির স্কয়ারে অংশ নেয়া অনেক বামপন্থী মুরসিকে সামরিক শাসনের চেয়ে কম ক্ষতিকর মনে করে তাকে ভোট দিয়েছেন। আবার ফল ঘোষণার পর তাহরির স্কয়ারে সমবেতদের বিপুল উল্লাস সব মিলিয়ে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, বহু মিসরীয়ই বিশেষত গত ১৮ মাসে আন্দোলনরতদের  অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং শিগগিরই তার লক্ষণ প্রকাশিত হবে।

সামরিক প্রশাসন শেষ মুহ‚র্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছে তাদের প্রার্থী শফিককে জয়ী ঘোষণা করতে। ফল ঘোষণাতেও বিলম্ব হচ্ছিল। অন্যদিকে উত্তেজনা বাড়ছিল তাহরির স্কয়ারে জমায়েত মানুষের মধ্যে। শফিককে বিজয়ী ঘোষণা করলে তাহরির স্কয়ার থেকে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হওয়া ছিল নিশ্চিত এবং তা গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত হতো বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাই শেষ মুহ‚র্তে পিছু হটে সামরিক প্রশাসন। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই বিভিন্ন ঘটনায় মনে হচ্ছে মুরসি এবং সামরিক প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের আপস হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে সরকার গোছানোর কাজ শুরু করেছেন মুরসি এবং নিজেকে সব মিসরীয় নাগরিকের প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা করেছেন। তার এই ঘোষণাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে মুরসি সবাইকে খুশি রাখতে চাইছেন, যা আদৌ সম্ভব নয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের জয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দেশটির খ্রিস্টান সম্প্রদায়। আরো আছে মোবারক জমানার বেকারত্ব, দারিদ্র্য একনায়কত্ব থেকে মানুষের মুক্তি পাওয়ার আকাক্সক্ষা।

মুরসি প্রেসিডেন্ট হলেও দেশটির বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র এখনো জেনারেলদের দখলে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার ঠিক আগ মুহ‚র্তে তারা দেশটির পার্লামেন্ট বিলীন করে দিয়েছে। অন্যদিকে মুরসি সম্প্রতি বলেছেন, তিনি সব আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাবেন এবং দ্ব›দ্ব-সংঘাতের আর জায়গা নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সাঙ্কেতিক কথাটির মাধ্যমে মুরসি দেশের সেনাবাহিনী এবং ওয়াশিংটন উভয়কেই আশ্বস্ত করেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল উভয়ই সমর্থন জানিয়েছে মুরসিকে। হোয়াইট হাউস বলেছে, মিসরের নির্বাচনের ফল গণতন্ত্রিক সংগ্রামের একটি মাইলফলক। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নতুন মিসরীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করার আশা প্রকাশ করেছেন।

মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ হুসেন তাতাবি সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, সামরিক বাহিনী নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের পাশে থাকবে এবং দেশের স্থিতিশীলতার জন্য তাকে সহায়তা করবে। অর্থাৎ মুরসি এবং সামরিক কাউন্সিল প্রায় একই সুরে কথা বলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মুরসি ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং কেবিনেটের অন্য সদস্যদের নিয়োগ দেবেন সামরিক কাউন্সিলের পছন্দমতো।

নিয়মানুযায়ী মিসরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার কথা পার্লামেন্টর সামনে। কিন্তু সামরিক কাউন্সিল নির্বাচনের ফলের কয়েকদিন আগেই এই পার্লামেন্টে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। এই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু না করে নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেন সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালতের সামনে। আর এই সাংবিধানিক আদালত একদিন ছিল মোবারকের স্বৈরতন্ত্রের সহায়তাকারী। অর্থাৎ সব মিলিয়ে মুরসি সামরিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে না গিয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই সরকার পরিচালনা করতে চাইছেন। বিশ্লেষকদের মতে, মিসরের বিপ্লবীদের গত ১৮ মাসের ত্যাগ এবার ইসলামপন্থী এবং সামরিক প্রশাসনের সমঝোতার নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদিও শপথ নেয়ার একদিন আগে মুরসি তাহরির স্কয়ারে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের সব অধিকারকেই তিনি ছেড়ে দেবেন না।

অন্যদিকে সিরিয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। সামরিক, বেসামরিক নির্বিশেষে মানুষ মারা যাচ্ছেন। আরব বসন্তের সঙ্গে সুর মিলিয়ে সিরিয়াতেও আসাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। অবশ্য বিশ্লেষকদের মতে, সমাজের সংস্কার নয় বরং আসাদ সাম্রাজ্যকে ছুড়ে ফেলতেই এই আন্দোলন শুরু হয়, যা এখন গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। সিরিয়ার বর্তমান গৃহযুদ্ধের প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে আন্তর্জাতিক শক্তি। মার্কিন এবং আরবের অনেক দেশ চাচ্ছে আসাদের অপসারণ কিন্তু আসাদের এই অপসারণের মাধ্যমে তারা ইসলামী মৌলবাদকে স্বাগত জানাচ্ছেন বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। কারণ বর্তমান সরকারবিরোধী বিদ্রোহীদের মধ্যে রয়েছে আল কায়েদাসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠনের সদস্যরা। তাই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের এই খেলায় সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সিরিয়ার সাধারণ মানুষ এমনটাই মনে করেন সিরীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আরব বসন্ত পরিবর্তনের আকাক্সক্ষার শুরু হলেও স্থানীয় মানুষদের নানা ভুল এবং আন্তর্জাতিক নানা তৎপরতায় তা আজ অনেকটাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। কোথাও ইসলামী কট্টরপন্থী আর কোথাও সামরিক জেনারেলদের উত্থান দেখছে আরবের মানুষ।

বিভাগ: আন্তর্জাতিক

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.