banner ad

মুরগির দাম বাড়ছেই প্রোটিন ঘাটতিতে সাধারণ মানুষ
সায়মা ইসলাম তন্দ্রা

পোল্ট্রি খাতে সঙ্কট চলছে। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়েছে। অস্বাভাবিকভাবে

বেড়েছে মুরগি এবং ডিমের দাম। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে এই দুটি

পণ্য। এ কারণে প্রাণিজ প্রোটিন ঘাটতির মুখোমুখি সাধারণ মানুষ। সঙ্কটের কারণ

অনুসন্ধান করেছেন সায়মা ইসলাম তন্দ্রা

 

দৃশ্যপট : ১

৮ জুন ২০১২ শুক্রবার। রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার। বাজারে মুরগি কিনতে এসে অনেকটাই খেপে গেলেন সরকারি চাকুরে আবদুল মান্নান শেখ। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, আগের সপ্তাহে মুরগি কিনেছেন ১৮০ টাকা কেজি। আর ওইদিন মুরগির দাম ১৯৫ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫ টাকা বেড়েছে মুরগির দাম। আর ডিমের ক্ষেত্রেও তাই। এক ডজন ডিম কিনলেন ১১২ টাকায়।

 

দৃশ্যপট : ২

৮ জুন ২০১২, শুক্রবার। রাজধানীর হাতিরপুল বাজার। এখানেও একই অবস্থা। মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণী শাহীনা আক্তার জানালেন, মুরগি আর ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় রুটিন করে শুধু শুক্রবারেই বাচ্চাদের জন্য মুরগি রান্না করেন তিনি। ‘যেভাবে দাম বাড়ছে এখন হয়তো প্রতি পনেরো দিনে একবার রান্না করে খাওয়াতে হবে। কারণ বাজেটে আর কুলোয় না’ বললেন শাহীনা আক্তার। বাচ্চাদের জন্য ডিম খাওয়া প্রয়োজনীয় হলেও ডিম খাওয়ানো অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানালেন এই গৃহিণী।

রাজধানী এবং সারাদেশের মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বর্তমানে এটি একটি বাস্তব চিত্র। অধিকাংশ পরিবারই খরচ কমাতে প্রাণিজ প্রোটিনের প্রধান এই দুটি উৎস থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

বাজারে মাছ এবং গরু ও ছাগলের মাংসের তুলনায় সস্তা হওয়ার কারণে এত দিন নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রাণিজ প্রোটিনের প্রধান উপাদান ছিল মুরগির ডিম ও ব্রয়লার মুরগির মাংস। অস্বাভাবিক দাম বাড়ার ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে ব্রয়লার মুরগি ও ডিম। এরই মধ্যে অনেকে বাজারের তালিকা থেকে কমিয়ে দিয়েছেন মুরগি ও ডিম কেনা। দাম বাড়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে  মুরগির মাংস কিংবা ডিম খাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠবে সাধারণ মানুষের জন্য।

বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকা। আর এক হালি ডিম কিনতে হচ্ছে ৩৬ থেকে ৪০ টাকায়। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির হিসাব মতে, গত এক মাসের ব্যবধানে মুরগির দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ, এক বছরে ৩৯ শতাংশ।

তাদের তথ্য মতে, এক মাস আগে ছিল ব্রয়লার মুরগির দাম ১৪৫-১৫৫ টাকা। এক বছর আগে যা ছিল ১২৫-১৩০ টাকা।

এদিকে দেশি মুরগির প্রতিকেজির দাম এখন ২৮০-৩২০ টাকা। এক বছর আগে যা ছিল ১৮০-২৫০ টাকা।

দাম বাড়ার এই প্রবণতা কীভাবে থামবে তার কোনো তথ্য দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পোল্ট্রি খাতের সঙ্কট না কাটলে মুরগি এবং ডিমের দাম বাড়ার এই প্রবণতা থামার কোনো সম্ভাবনা নেই। পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়াই দাম বাড়ার মূল কারণ। দেশের প্রায় অর্ধেক পোল্ট্রি খামার বর্তমানে বন্ধ রয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বার্ড ফ্লুর সংক্রমণে খামার বন্ধ হওয়ায় আগের মতো উৎপাদন করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

পোল্ট্রি শিল্প রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি খন্দকার মোহসিন জানান, দেশের ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৬৩টি খামারের মধ্যে ৫৩ হাজার অর্থাৎ ৪৭ শতাংশ খামারে বর্তমানে কোনো মুরগি নেই। গত এক বছরে ২৫ শতাংশ খামার লোকসানের মুখে পড়ে এক রকম বন্ধ হয়ে আছে। আর বার্ড ফ্লুজনিত কারণে ২২ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে গেছে।

খন্দকার মোহসিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে প্রতিসপ্তাহে ৯৩ লাখ মুরগির বাচ্চা উৎপাদিত হতো। ওই সময় বাচ্চাপ্রতি উৎপাদন খরচ ছিল ৩০ টাকা। বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে সপ্তাহে ৫৬-৫৭ লাখে। আর বাচ্চার উৎপাদন খরচ বেড়ে হয়েছে ৮৫ টাকা।

বাচ্চা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পোল্ট্রি খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সরবরাহ না থাকায় জেনারেটর ব্যবহার ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণেই মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ছে বলে দাবি করেন খন্দকার মোহসিন।

বাংলাদেশে পোল্ট্রি খাতের বিকাশ বেশি দিনের নয়। আশির দশক থেকে এই খাতের দ্রুত বিকাশ শুরু হয়। একদল তরুণ উদ্যোক্তার স্বপ্নের ফসল এই খাতটি দেশের চাহিদা মিটিয়ে এক সময় দেশের বাইরেও ডিম এবং মুরগি রফতানি শুরু করে। ২০০২ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত  এই খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এরপর থেকেই শুরু বিপর্যয়ের। এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিপর্যয়ের এই সময় থেকে পোল্ট্রি খাতকে রক্ষার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সমণ্নিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেনি সরকার। মাঝে মাঝে আলোচনায় বসলেও কার্যকর কিছু হয়নি। মুরগির বাচ্চার দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেলে সরকারের পক্ষ থেকে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বাচ্চা মুরগির উৎপাদক ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন।

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী জাহিদুল হাসান  মনে করেন, আলোচনা করেই পোল্ট্রি খাতকে রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে পুরো খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ‘বাচ্চার মূল্য নির্ধারণে সরকারের একতরফা সিদ্ধান্ত কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বছরের চার-পাঁচ মাস অত্যধিক চাহিদা ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাচ্চার দাম কিছুটা বাড়ে, আবার অন্য সময়ের তিন-চার মাস অনেক কমে যায়। হঠাৎ এই ধরনের সিদ্ধান্ত এ সেক্টরের উন্নয়নে বাধার শামিল।’

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনÑফিয়াব-এর সভাপতি সাইফুল আলম খান বলেন, ‘পোল্ট্রি উৎপাদনে মোট ব্যয়ের ৮০ শতাংশই খরচ হয় খাদ্য বাবদ। এই খাতে কর আরোপ করলে খাদ্য আমদানিতে প্রভাব পড়বে। দাম বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফল হিসেবে উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহ হারাবে।’

উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক অ্যাগ্রো অ্যান্ড পোল্ট্রি  প্রোগ্রামের প্রধান ড. এমএ সালেক জানালেন, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ডিম ও মুরগির মাংসের মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। ভারতে দাম সামান্য কম। কারণ তাদের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রায় সব কিছুই নিজেরা উৎপাদন করে। আর বাংলাদেশকে বেশিরভাগ খাদ্য উপাদানই আমদানি করতে হয়। এক্ষত্রে সরকারের নজর দেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু ফজলে রহিম শাহরিয়ার মনে করেন, বর্ধিত জনসংখ্যার প্রোটিনের চাহিদা পূরণে পোল্ট্রি  সেক্টরকে আরো শক্তিশালী ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য প্রোটিনের উৎস জোগানদাতা এই খাতটির উন্নয়নে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এ অবস্থায় সরকারের যে কোনো নেতিবাচক সিদ্ধাš— শুধু পোল্ট্রি  শিল্পে নয়, দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করতে পারে।

পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই খাতে বিনিয়োগকারীরা বারবারই হোঁচট খাচ্ছেন। অথচ তাদের পক্ষ থেকে অনেকবারই ব্যাংক সুদের হার কমানো, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের অনুরোধ  জানানো হলেও সেগুলো কার্যকর হয়নি কখনো।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বন্ধ খামারগুলো চালু করা এবং বার্ড ফ্লু সংক্রমণের হাত থেকে খামারগুলোকে রক্ষার জন্য ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে আহবান জানান সবাই।

তারা মনে করেন এই শিল্পকে কৃষি খাতের উপখাত হিসেবে না দেখে  আলাদা খাত হিসাবে দেখা উচিত। প্রাণিজ প্রোটিনের প্রধান উৎস বিবেচনায় নিয়ে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা মাথায় রেখে নিজ¯^ চিন্তাচেতনা, গবেষণার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

 

অপরিকল্পিত বেশি খামারের চেয়ে পরিকল্পিত

অল্প খামার অনেক ভালো

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী  আবদুল লতিফ বিশ্বাস বলেছেন, বলগা হরিণের মতো আর কোনো পোল্ট্রি  ফার্ম করতে দেয়া হবে না। নতুন কোনো পোল্ট্রি  ফার্ম স্থাপন করতে হলে এখন থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আর রেজিস্ট্রেশনবিহীন যেসব পোল্ট্রি ফার্ম রয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অপরিকল্পিত বেশি খামার থাকার চেয়ে পরিকল্পিত অল্প খামার অনেক ভালো বলে উল্লেখ করে মন্ত্রী আরো জানান, বার্ড ফ্লু মোকাবেলায় পোল্ট্রি ফার্মগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে। এতে সফলতা এলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে।

পোল্ট্রি  ফার্ম আমাদের পুষ্টির জোগান দেয় মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, পোল্ট্রি খামারগুলোকে রক্ষা করতে হবে। পোল্ট্রি  শিল্পকে রক্ষায় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান আবদুল লতিফ বিশ্বাস।

মন্ত্রী আরো বলেন, বার্ড ফ্লু আক্রান্ত দেশ থেকে মুরগির বাচ্চা ও ডিম আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারত থেকে চোরাই পথে ডিম আমদানির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

‘আমি যতদিন মন্ত্রী আছি, ততদিন বিদেশি কোম্পানিকে এ দেশে পোল্ট্রি ফার্ম করার অনুমতি দেইনি’ বলে জানান তিনি।

বিভাগ: প্রতিবেদন

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.