banner ad

ফ্রান্সের নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে কঠিন সময়
শানজিদ অর্ণব

ব্যয় সঙ্কোচন থেকে মুক্তি ও কর্মসংস্থানের আশায় দীর্ঘ তিন দশক পর আবারো প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমাজতন্ত্রী ওলাঁদকে বেছে নিয়েছেন ফ্রান্সের জনগণ। আর ফার্স্ট লেডি হিসেবে উঠে এসেছেন রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্রী কর্মজীবী সাংবাদিক ভ্যালেরি। পারবেন কি তারা ফ্রান্সের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পাড়ি দিতে?

 

পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে ফ্রান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। প্যারি কমিউন ও ফরাসি বিপ্লবের মতো ইতিহাসের দুটি তৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এ দেশটি। সম্প্রতি দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি। জিতেছেন ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। ১৯৮১ সালের পর আবারো একজন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পেল ফ্রান্স। একই সঙ্গে ১৯৫৮ সালে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বার কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের পরাজয় ঘটল। কট্টর সমাজতন্ত্রী না হলেও ওলাঁদ বামপন্থী শিবিরের সদস্য বলেই পরিচিত।

 

নির্বাচনী প্রচারে ওলাঁদ প্রধানত আক্রমণ করেছিলেন ব্যাংকার ও ধনীদের এবং ফরাসিরা তাকে দেখেছেন অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ওলাঁদের এ বিজয় বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, ঋণ সঙ্কট, ব্যয় সঙ্কোচন ইত্যাদির বিরুদ্ধে জনগণের রায়। নির্বাচনী প্রচারে ওলাঁদের মূল স্লোগান ছিল ‘পরিবর্তন আসছে’, ‘তারুণ্য এবং ন্যায়বিচার’। ওলাঁদ ফরাসিদের কথা দিয়েছেন তিনি বৃহৎ কর্পোরেশন এবং বছরে মিলিয়ন ইউরো উপার্জনকারীদের ওপর ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়াবেন। ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো, প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ জনগণ যে ব্যয় সঙ্কোচনের বিরুদ্ধে এবং অবস্থার পরিবর্তন চাচ্ছিল তাই প্রকাশিত হয়েছে নির্বাচনের ফলে।

 

তবে কোনো কোনো রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাঠামো ভাঙা ব্যাতীত ফ্রান্স বা ইউরোপের বর্তমান সঙ্কট কাটানো সম্ভব নয়। সংস্কারপন্থীরা মনে করেন পুঁজিবাদকে না ভেঙেই সঙ্কট কাটানো সম্ভব। কিন্তু এটি ইউরোপীয় কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যালান উডের ভাষায়, মি. ওলাঁদ ব্যয় সঙ্কোচনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন ভালো কথা, কিন্তু পুঁজিবাদের বৈশ্বিক সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে তিনি যদি পুঁজিবাদকে ভাঙার জন্য প্রস্তুত না থাকেন তাহলে ব্যয় সঙ্কোচনই একমাত্র নীতি।

 

ওলাঁদের এই বিজয়ে ফ্রান্স এবং ইউরোপের অনেক মানুষের মনেই বিপুল আশার সঞ্চার হয়েছে। একদিকে ব্যয় সঙ্কোচনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, অন্যদিকে জার্মানির সঙ্গে ফ্রান্সের ব্যয় সঙ্কোচনে সারকোজি আমলের চুক্তিÑ শিগগিরই এ দুয়ের মধ্যে দ্ব›েদ্ব নামতে হবে ওলাঁদকে। এ বিষয়ে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছেন ওলাঁদ। কিন্তু ব্যয় সঙ্কোচন নীতির ব্যাপারে পুনর্বিবেচনা সম্ভব নয় বলে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। অন্যদিকে, বার্লিন এবং প্যারিসের মধ্যে দ্ব›দ্ব শুরু হলে তা পুরো ইউরোপ এবং তার অর্থনীতি, মুদ্রা সবকিছুকেই বিপদগ্রস্ত করবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ওলাঁদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ইউরোপে অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের জন্য ‘প্রজেক্ট বন্ড’ চালু করা, ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক কর্তৃক ইউরোপের দেশগুলোকে সরাসরি ঋণ দেয়া কিন্তু  মার্কেল পরিষ্কার করে দিয়েছেন এগুলো তার পরিকল্পনায় নেই। ফ্রান্সে এখন বাজেট ঘাটতি আছে পিপিপির ৩ শতাংশ। আইএমএফের আশঙ্কা ২০১৩-তে তা ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছবে।

 

আবার শিক্ষক নিয়োগসহ যেসব পরিকল্পনার কথা ওলাঁদ ঘোষণা করেছেন তার জন্য দরকার প্রচুর অর্থ। অর্থনীতিবিদদের অভিমত, ওলাঁদের সামনে তাই কঠিন সময়। এখানেই ওলাঁদকে মুখোমুখি হতে হবে সব থেকে কঠিন প্রশ্নের। তিনি কি ফরাসিদের দেয়া প্রতিশ্রæতি রক্ষা করবেন নাকি মার্কেল এবং বাজারের চাপের মুখে নতি¯^ীকার করবেন? ওলাঁদ চান ইউরোপীয় নীতিকে প্রবৃদ্ধির দিকে পরিবর্তন করতে। মার্কেল হয়তো কিছু পদক্ষেপকে মেনেও নেবেন, কিন্তু পরিণতি হবে আরো ব্যয় সঙ্কোচন। তার কথায়, সবকিছু থাকবে আগের মতোই। ফরাসি ভাষায় Plusca change, pluscest la meme chose (অর্থাৎ যতই পরিবর্তন হবে, ততই তা আগের মতোই থাকবে) ওলাঁদের আগে ১৯৮১ সালে ফ্রান্সে বামপন্থী প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ। মিতেরাঁর কর্মসূচি ছিল ওলাঁদের কর্মসূচির চেয়ে অনেক নরম, কিন্তু তারপরও ক্ষমতায় বসার ১৮ মাসের মধ্যে তাকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চাপে কর্মসূচি বদলাতে হয়। ফলে জনগণের বিশ্বাস হারান তিনি এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে পরাজিত হন। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, যদি ওলাঁদ তার প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে ধনবাদী পার্টি ফ্রন্ট ন্যাশনালসহ পুঁজিবাদের অনুগামী দলগুলো শক্তিশালী হবে। আবার একই সঙ্গে সম্ভাবনা থাকবে কমিউনিস্ট পার্টি এবং বামপন্থী পার্টি দে গুচের মধ্যকার ঐক্য শক্তিশালী হওয়ার, যারা এবার নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে ১১ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সব মিলিয়ে ঘরে বাইরে ওলাঁদের সামনে বিরাট লড়াই ।

 

ফার্স্টলেডির বিবেচনায় সুপারস্টার কার্লাব্রæনির বিপরীতে ফ্রান্স এবার পেয়েছে কর্মজীবী, সাংবাদিক ফার্স্টলেডি ভ্যালেরি ট্রিয়েভেইনারকে। ভ্যালেরি প্যারিসে এসেছিলেন রাজনীতি নিয়ে পড়তে। এক সময় শুরু করেন সাংবাদিকতা। এরপর ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি ‘প্যারিস ম্যাচ’-এ রাজনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন।

 

 

বিভাগ: আন্তর্জাতিক

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.