আদমশুমারি চায় না ব্রিটেন শফিকুর রহমান
ব্রিটেনের লোকজন কখনই আদমশুমারির ব্যাপারে উৎসাহ প্রকাশ করেনি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে হাজার হাজার মানুষ এই গণনা পরিহার করতে গিয়ে রাত কাটিয়েছিল রেলওয়ে স্টেশনে। ব্রিটেনে প্রথম বিশদ আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয় ১৮৪১ সালে। সেবার অনেক অঞ্চলেই গণনাকারীরা গিয়েছিল পুলিশ প্রহরায়। কারণ দেয়া হচ্ছিল হাড্ডি-মাংস এক করে ফেলার হুমকি। কিন্তু এ ধরনের সব প্রতিরোধ সত্তেও ১৮০১ সাল থেকে প্রতি ১০ বছর অন্তর আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্রিটেনে। ব্যতিক্রম কেবল ১৯৪১। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তা হয়ে ওঠেনি। গত বছর হয়ে যাওয়া নির্ধারিত আদমশুমারিটি হতে পারে সে দেশের ইতিহাসে শেষ আদমশুমারি, যার রিপোর্ট এখনো প্রকাশিত হয়নি। বর্তমান কোয়ালিশন সরকার বিশ্বাস করে, ৪৮০ মিলিয়ন (৪৮ কোটি পাউন্ড) খরচ করে মানুষ গোনাগুনতির কাজটা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, খরচের বিবেচনায় লাভও আসবে না খুব একটা। ২০০১ সালের আদমশুমারির রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার আগেই এর কপালে জুটেছিল ‘প্রায় মেয়াদোত্তীর্ণ’ অপবাদ। সব দিক বিবেচনা করেই উন্নত, দ্রুত এবং ঘন ঘন তথ্য সংগ্রহের জন্য বিকল্প উৎসের কথা চিন্যা করা হচ্ছে। যদি তাই হয়, অর্থের সাশ্রয় হবে প্রচুর।
আদমশুমারি বিষয়ক বিতর্ক : ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটেনে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আদমশুমারি। এর সমাপ্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় সেখানকার তাত্তিকরা চিন্তায় পড়ে গেছেন। কপালে ভাঁজ পড়েছে সরকারি কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদেরও। হাসপাতাল ও স্কুলসহ অন্য পরিসেবাগুলোর বরাদ্দ পরিকল্পনার কাজে আদমশুমারির উপাত্ত ব্যবহার করে স্থানীয় ও জাতীয় সরকারের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও বিপণনের কাজে এর জুড়ি নেই। ব্রিটিশ সমাজকে বোঝার জন্য ভূবিজ্ঞানীরাও সাহায্য নিচ্ছেন আদমশুমারি থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের। তারা জেনে নিচ্ছেন, মানুষ কত বছর বাঁচে, কোন ঈশ্বরে তারা বিশ্বাসী, কতজন বিদেশে জন্ম নিয়েছে এবং কীভাবে এগুলোর পরিবর্তন হচ্ছে। উৎস বদলে গেলে একই স্তরের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে কি না সেই বিষয়ে শঙ্কিত তারা। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব ভূতত্ত¡ বিভাগের অধ্যাপক ড্যানি কার্লিং এ প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘অনেকেই আদমশুমারিকে মনে করেন অনধিকার প্রবেশ কিন্তু এটি কেউই অস্বীকার করবেন না যে, পূর্ব-সতর্কতা পদ্ধতি হিসেবে দেশের নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে আদমশুমারির বিভিন্ন উপাত্ত।’ ১৯৮৯ সালের পরবর্তী সময়ে রাশিয়ায় অ্যালকোহলে আসক্তির কারণেই যে তরুণ-তরুণীরা ব্যাপকহারে মারা যাচ্ছিল, এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিল জনগণনার বিভিন্ন ফিগার।
বাস্তবতা পরীক্ষা করতে জনগণনার বিকল্প নেই। ড্যানি কার্লিংয়ের মতে, এটি ভয় ও কুসংস্কার দূর করতেও সাহায্য করে। ব্রিটেনে এর আগের দুই আদমশুমারি না হলে জানাই যেত না যে লোকসংখ্যা ৭০ মিলিয়ন থেকে ৬১ মিলিয়নে নেমে গেছে। অতি আতঙ্কিত হওয়ার হাত থেকেও মানুষকে বাঁচিয়ে দেয় এই আদমশুমারি। এর প্রাপ্ত উপাত্ত ব্যবহৃত হয় শত শত কোটি পাউন্ড কর রাজস্ব বণ্টনে। ভূ-জনসংখ্যাগত শ্রেণীবিন্যাস পদ্ধতি উপাত্তের সাহায্য নেয় গৃহ ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে অঞ্চল বিভক্ত করতে। উদাহরণস্বরূপ বিত্তবানরা বসবাস করেন ম্যানশনে আর জাতিগত সংখ্যালঘুরা বেছে নেন সারিবদ্ধ বাড়ি। স্থানীয় ও জাতীয় সরকার উপাত্তের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে পারে, কোন এলাকায় নির্দিষ্ট পরিসেবাগুলো বিশেষ প্রয়োজন। লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক তথ্যবিজ্ঞানী অ্যালেক্স সিঙ্গলটন বলেন, ‘আদমশুমারির উপাত্ত ছাড়া ভূ-জনসংখ্যাগত বিন্যাস খুবই কঠিন। আমি মনে করি, এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এটি ছাড়া সরকারি ক্ষেত্রকে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, তা আমি জানি না।’
পরিবর্তনের সময় : অনেকেই সরকারের পরিকল্পনাকে উঁচু গলায় সমর্থন করছেন; কিন্তু কেউই এ কথা বলছেন না, আমাদের প্রয়োজন নেই এমন তথ্য-উপাত্তের এমনই বলছিলেন সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্তি¡ক ও আদমশুমারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডেভিড মার্টিন। বিশ্বে তথ্য সংগ্রহের জন্য জনগণনা সেরা পদ্ধতি নাও হতে পারে কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ বিশদ ভৌগোলিক জনসংখ্যার উপাত্ত সংগ্রহের জন্য এটিই একমাত্র উৎস। যদিও জনগণনা চালিয়ে যাওয়া দিনে দিনে আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রথম প্রতিবন্ধকতাটি হলো তথ্য সংগ্রহের জন্য বাড়িতে পৌঁছানো। অনেকেই প্রাচীরযুক্ত বাড়িতে বসবাস করেন, ঢুকতে গেলে সাহায্য নিতে হয় এন্ট্রি ফোনের। সন্ধ্যায় সবাই বাড়িতে থাকেন না। কেউ কেউ কাজের দিনে এক বাড়িতে থাকেন, আর ছুটির দিনে চলে যান অন্যত্র। প্রশ্নের সঠিক উত্তরও অনেক সময় পাওয়া যায় না। যেমন- সাধারণ আবাসস্থল কোনটি, এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কেউ কেউ বলেন, ঠিক নেই।
যুক্তরাজ্যে বিশ্বাসেরও কমতি রয়েছে। ডোলিংয়ের তথ্যানুসারে, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের অন্য দেশের লোকেরা সরকারকে তথ্য জানাতে উদগ্রীব থাকে; কিন্তু যুক্তরাজ্য তার ব্যতিক্রম। তথ্য জানিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার ব্যাপারে ব্রিটিশ নাগরিকরা ক্রমেই আরো বেশি অনিচ্ছুক হয়ে পড়ছে। ফলে টনক নড়েছে সরকারের। কম ‘অনধিকার প্রবেশমূলক’ পদ্ধতি খুঁজে বের করতে তারাও আগ্রহী। যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যানবিদ জিল মাথিসন এরই মধ্যে ‘বিয়ন্ড ২০১১’ শিরোনামের একটি প্রকল্প উদ্ভাবন করেছেন, যা কি না বিকল্প উপায়ে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। প্রকল্পটি জনসংখ্যা ও আর্থিক পরিবর্তনের হিসাব বের করতে প্রশাসনিক উপাত্ত উৎসকে কাজে লাগাবে। জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রথাগত আদমশুমারি শেষ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে নাতিদীর্ঘ আদমশুমারি, ঘূর্ণায়মান আদমশুমারি, চলমান তথ্য সংগ্রহ নাকি এগুলোর সমš^য়কে বেছে নেয়া হবে, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি।
উপাত্ত : অনেক দেশটি ইতিমধ্যে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চালু করেছে স্বল্প পরিসরের লোকগণনা। সম্প্রদায় জরিপ সেখানে সব সময়ই চলমান থাকে। মার্টিনের তথ্য মতে, ফ্রান্স ব্যবহার করে, ঘূর্ণায়মান আদমশুমারি। প্রতিবছর তারা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় জরিপ কাজ চালায়। পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব অঞ্চলকে এর অš—র্ভুক্ত করে। নেদারল্যান্ডসে শেষ আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। এখন আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে জরিপ চালানো হয় না। তথ্য সংগ্রহ করা হয় প্রশাসনিক রেকর্ড থেকে। বিকল্প উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ যুক্তরাজ্যেও নেয়া হতে পারে। পেনশন ও বেনিফিট, কর অফিস, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো তথ্যাবলী একত্রিত নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাজটাও সহজ নয়। বিকল্প পদ্ধতিতে লোকগণনা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
সমস্যা আরো রয়েছে। চলতি প্রশাসনিক রেকর্ডে ধর্ম ও জাতিসত্তা বিষয়ক তথ্য থাকে না। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছেন তথ্য প্রাইভেট ক্রেডিট এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে নিতে। নিঃসন্দেহে পরামর্শটি ভালো কিন্তু সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কারণ, লোকজন সরকারের সংশ্লিষ্টতা টের পেয়ে গেলে প্রাইভেট ক্রেডিট এজেন্সিগুলোর কাছে তথ্য দিতে গিয়ে গোপন করবে। সবকিছু মিলিয়ে সরকারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বেশিরভাগ লোকই বলছেন, বিশদ আদমশুমারি পদ্ধতিটি ধরে রাখতে। কিন্তু বর্তমান কোয়ালিশন সরকার জনগণের মতামত এবং সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শকে আমলে নিতে চাচ্ছে না। ব্যয় সঙ্কোচনের কথা চিš—া করে হলেও তারা বিশদ আদমশুমারি পরিচালনা করতে চায় না।
যদি পার আমাকে ধর : গত বছরের আদমশুমারি ফরম অনেকেই পূরণ করেননি। ব্রিটেনে এমন বর্জনের ইতিহাস খুবই পুরনো। ১৯৯১ সালে ১০ লাখ লোক জনগণনা এড়িয়ে গিয়েছিল এই ভেবে যে, এর মাধ্যমে নতুন নির্বাচনী কর আরোপ করা হতে পারে। শত বছর আগে মহিলাদের ভোটাধিকার না থাকার প্রতিবাদ জানিয়ে অসংখ্য নারী আদমশুমারিতে অš—র্ভুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বাড়িতে লেখা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিল, ‘নো ভোটস ফর উম্যান, নো সেনসাস’। এর সাত বছর পরেই ব্রিটেনে অর্জিত হয় নারীদের ভোটাধিকার। যারা গণনা এড়িয়ে যায় তাদের ধরতে বর্তমানে সরকার পাকড়াও-পুনঃপাকড়াও কৌশল প্রয়োগ করে। লন্ডনের জনসংখ্যার হিসাব জানতে ১৯৬২ সালে এ কৌশল প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রাণীদের সংখ্যা জানার জন্যও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। কিন্তু পাকড়াও-পুনঃপাকড়াও কৌশল খুব একটা কাজে আসে না। আদমশুমারির সময় হলেই অনেকের হদিস থাকে না।
ঈশ্বর অখুশি হবেন : ২১১ বছর আগে ব্রিটেনে পূর্ণমাত্রার আদমশুমারি পরিচালনার সিদ্ধাš—টি ছিল বেশ বিতর্কিত। যদিও ১০৮৬ সাল থেকেই বিক্ষিপ্তভাবে চলছিল লোকগণনার কাজ। তারও আগে, সপ্তদশ শতাব্দীতে স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের কিছু অংশে জনগণনার কাজ হয়েছিল। ১৭৫৩ সালে হাউস অব লর্ডসে বার্ষিক আদমশুমারি বিলটি উত্থাপিত হওয়ার পর বাতিল হয়ে গিয়েছিল। ঈশ্বর অসন্তুষ্ট হবেন, এ ভয়েই বেশিরভাগ সদস্য বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এখনো অনেকেই এমনটি মনে করেন। তার পেছনে যুক্তিও রয়েছে। বাইবেলে উল্লেখ আছে, রাজা ডেভিডের নির্দেশে আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হওয়ার পরই প্লেগে মারা গিয়েছিল ৭০ হাজার লোক। ১৭৯৮ সালে থমাস ম্যালথাস জনসংখ্যা বিষয়ক প্রবন্ধ লেখার পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক গতিতে, আর মানুষ বাড়ে জ্যামিতিক গতিতে, এ তত্ত¡ পড়ার পর অধিকাংশ লোকের টনক নড়েছিল। এর পরপরই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্বীকার করে নেয়া হয়েছিল আদমশুমারির প্রয়োজনীয়তা।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অনুসরণে
বিভাগ: ফিচার



