banner ad

নাগরী ও পানজোরার গির্জায়
ফারুখ আহমেদ

কুয়াশায় চাদর মোড়া সকাল। তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত। এমন দিনে ঘরে বসে না থেকে একদিন ভরা কুয়াশায় ভর করে পথে নামলাম। প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম। প্রকৃতি মনে নেশা ধরায়, মাতাল করে দেয়, প্রকৃতির মাঝে অনাবিল সুখ। সেই সুখকে সঙ্গী করে সামনে এগিয়ে চলি। এভাবেই পথ চলতে চলতে চলে এলাম পুবাইলের পথে। টঙ্গীর শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার উড়ালসেতু উড়াল দিয়ে এই পথে এসেছি। কিছুক্ষণ আগে নাগদা সেতু অতিক্রম করে উলুখোলা সেতু পার হয়ে এখন কাঞ্চন সেতুর কাছাকাছি। কিন্তু আমরা কাঞ্চন সেতু পর্যš— যাব না। মোটরসাইকেল উলুখোলা সেতুর ওপর দাঁড় করালাম। নিচে বয়ে চলেছে বালু নদ। বালু নদে আমাদের দৃষ্টি। বর্ষা চলে গেছে। শীতের বালু নদ শুকিয়ে ক্ষীণকায়। অবশ্য যেভাবে ভরাট চলছে, তাতে করে বর্ষা এলেও নদী আগের সে রূপ কখনও ফিরে পাবে বলে মনে হয় না! তবু ঋতুভেদে বর্ষা আসবে, ক্ষীণ প্রবাহের হলেও নদও থাকবে, আর সঙ্গে চলবে বর্ষা আর নদীবন্দনা। যেমন, কবি নির্মলেন্দু গুণ বর্ষা বন্দনায় বলেছেন, ‘বাংলার ঋতুভেদে বর্ষাই হচ্ছে একমাত্র নারী।’ শ্রীকান্ত আচার্যের গানে নারীকে নদীর সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে-

‘তোর সাথে যে নদীর অনেক মিল

নদীর নামে তোকে যে তাই ডাকি

রোদ পড়লে নদীটা ঝিলমিল

তোকে ভেবেই নদীর ছবি আঁকি!’

এভাবে গুনগুন করতে করতে উলুখোলা সেতু থেকে একটু এগিয়ে উলুখোলা বাজারে চলে আসি। এখানে গরুর খাঁটি দুধের চা খেয়ে শীতের জামা গায়ে থাকলেও, বাতাস আটকাবার জন্য উইন্ড ব্রেকার  গায়ে চড়িয়ে বাম দিকে নাগরীর পথে ছুটি।

নাগরী অর্থ কলস কিন্তু এই নাগরী ভাওয়াল রাজ্যের একটি গ্রাম। খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকা। পর্তুগিজ নির্মিত টলেন্টিনুর সাধু নিকোলাসের গির্জাটির অবস্থান নাগরীতেই। নাগরীর সেই গির্জা দেখতেই আমাদের আজকের ছুটে চলা। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক জায়গা আছে, যা এখনও পর্যটকদের ভিড়ে ভারাক্রান্ত হয়নি, নাগরী তেমন একটি ঐতিহাসিক জায়গাও বটে।

পথ চলতে চলতেই পথিককে প্রশ্ন করি ‘ভাই নাগরী কত দূর?’ পথিক উত্তর দেয়, ‘এই তো সামনে।’ কিন্তু পথ আর শেষ হয় না। গ্রামের লোকজনের ‘এই তো সামনে’ বলা যে কত দূর তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। সুতরাং প্রচণ্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে চারদিকে চোখ রেখে চুপচাপ এগিয়ে চলি পথ সৌন্দর্য আর নীরবতাকে সঙ্গী করে। মাঝে মাঝে নীরবতায় ধাক্কা খায় টমটমের আওয়াজ। ধীরগতির নসিমন গাড়ির স্থানীয় নাম টমটম, যা এই রাস্তায় চলাচলকারী একমাত্র বাহন। এখানে রাস্তার দুপাশে বিল এখন পানিশূন্য তবু ফসলের সবুজাভ অনন্য এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। মাছ ধরার প্রচলিত দৃশ্য নেই। আছে আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। অবারিত সবুজের ছায়া। এমন সৌন্দর্য কণ্ঠে গান এনে দেয়-

‘অপরূপ এই জন্মভূমি

নেই তুলনা যার

বন-বীথি পরে যেখায়

ফুলের কণ্ঠহার।’

ডিএল রায় ঠিক কথাই বলেছেনÑ

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি

সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’

কুয়াশা সরে সূর্য ওঠার কোনো নাম নেই। কুয়াশাময় আকাশ সঙ্গে নিয়ে পথ চলছি। অনেকক্ষণ পথ চলছি, তাই একটু অস্থিরতা মনে বিরাজ করছে, সঙ্গে মন বলছে নাগরী আর কতদূর। হঠাৎ কুয়াশা সরিয়ে সূর্য বেরিয়ে এলো। ঝলমল করে উঠল চারদিক। অপরূপ সে দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা নাগরী পৌঁছলাম।

নাগরীতে ঢোকার মুখে মনটা পুলকিত হয়ে ওঠে। নাগরী বাজার থেকে বাম দিকে মোড় নিয়ে একটু সামনে গেলেই গির্জার গেট। গেট সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে দানব আকারের অনন্য এক গির্জা। গির্জার সামনে দুহাত উঁচিয়ে ¯^য়ং যিশু দাঁড়িয়ে। এটিই টলেন্টিনুর সাধু নিকোলাসের গির্জা। ধর্মযাজক সাধু নিকোলাসের নামানুসারে গির্জাটির নামকরণ। এই গির্জাটি নতুন। গির্জাটির সঙ্গে নবাবগঞ্জ হাসনাবাদের গির্জাটির কোথায় যেন মিল খুঁজে পেলাম। ২০০৫ সালের দশ এপ্রিল আর্চ বিশপ মাইকেল রোজারিও গির্জাটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৮-এর ১২ ডিসেম্বর আর্চ বিশপ পৌলিনুস কস্তা ডিডি এর উদ্বোধন করেন। নাগরীতে গথিক স্থাপত্যশৈলীর এমন চমৎকার একটি গির্জা দেখে আমি বিস্মিত। গির্জাটি ঘুরে ঘুরে দেখে সামনে এগোই। এবার মূল ও প্রাচীন গির্জা ভবনটি চোখে পড়ে। তেজগাঁওয়ের জপমালা রানীর গির্জার সঙ্গে এর অনেক মিল। জপমালা রানীর গির্জাটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৬১৭ সাল। আর নাগরীর এই গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৬৬৩ সালে। দুটি গির্জাই সেই সময় পর্তুগিজরা নির্মাণ করেন। মূলত বাণিজ্য পোত ও কুঠি নির্মাণই তাদের উদ্দেশ্য থাকলেও ইউরোপীয়দের মধ্যে তারাই প্রথম ধর্ম প্রচার করেন। এখানে আমরা প্রার্থনা কক্ষ, সমাধিস্থল ঘুরে ফাদারের বাসভবনে যাই। সেখান থেকে আমাদের গন্তব্য দাঁড়ায় পানজোরা গ্রাম। যাওয়ার আগে পাশের বিশাল খেলার মাঠে স্থানীয় দুটি দলের খেলা দেখে পানজোরার দিকে ছুটি। নাগরী ও পানজোরা গ্রাম দুটি পাশাপাশি। এখন আমরা মাদার তেরেসা রোডে। এখানে সাধু এন্তনির নামে একটি মার্কেট রয়েছে। মার্কেটের পথ ধরে আর একটু সামনে গিয়ে পেয়ে যাই সাধু     এন্তনি নিকোলাসের আর একটি গির্জা। এটিকে ভক্তরা তার তীর্থস্থান বা প্রার্থনা স্থান বলে থাকেন।

ক্যাথলিক স¤প্রদায়ভুক্ত যারা ঈশ্বরের সাধনা করেন তাদের সাধু বলা হয়। সাধু নিকোলাস এন্তনি প্রথমে নাগরী মিশনে বা গির্জাতেই ছিলেন। কোনো এক কারণে প্রতিরাতে সাধু পানজোরা গ্রামের এই নির্জনে চলে আসতেন, তখন এলাকাটি প্রায় জঙ্গল ছিল। প্রতিদিন যখন এমন ঘটনা ঘটে চলল, তখন ভক্তরা পানজোরাতে ক্যাথরিন পিরচের দান করা জমিতে আরেকটি গির্জা নির্মাণ করেন। সেটি এই পানজোরার গির্জা, যার নির্মাণকাল ১৯০৬ সাল। আমরা মোটরসাইকেল নিয়েই গির্জায় প্রবেশ করি। এ সময় সূর্য আবার কুয়াশার চাদরে আশ্রয় নিল। নিরীহ মুখ কুয়াশা গড়িয়ে পড়ল চতুর্দিক। আমরা সাধু এন্তনির মাতৃসদন ও শিশু কেন্দ্রের সামনে মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড করলাম। এখানে কথা হয় সাধু এন্তনির এক ভক্তের সঙ্গে। তিনি আমাদের বললেন, ‘এখানে প্রতিবছর নভেনা হয়। মুসলমানদের এজতেমার মতো। নবম দিন বড় অনুষ্ঠান হয়। সারাদেশ থেকে লোক আসে, আসে সারা বিশ্ব থেকে। এখানে সৎ উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করলে তা পূরণ হয়।’ বিশ্বাসে মিলায় বস্তুু-ভাবতে ভাবতে আমরা আরো সামনে যাই। এখানে চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর গির্জাটি দাঁড়িয়ে। আমরা অভিভূত হলাম। পাশেই তীর্থোৎসব উদযাপনের বিশাল মঞ্চ। এই মঞ্চকে ঘিরেই প্রতিবছর ফেব্র“য়ারিতে বসে নভেনা উৎসব। এমন কোনো নভেনা উৎসবে যোগদানের ইচ্ছা মনে পোষণ করে আমি আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশে কুয়াশা ভেদ করে আবার সূর্যালোক জেগেছে। সে আলোয় একাকার হয়ে যাচ্ছে পানজোরার সাধু নিকোলাস      এন্তনির গির্জা।

নাগরী ও পানজোরার পথ

গুলিস্তান থেকে সরাসরি কালীগঞ্জ এক্সপ্রেসে চড়ে কালীগঞ্জ নেমে রিকশায় নাগরী, সেখান থেকে হেঁটে বা রিকশায় পানজোরা। অথবা গুলিস্তান থেকে টঙ্গী নেমে সেখান থেকে টেম্পোতে নাগরী। তবে স্বাধীনভাবে ঘোরার জন্য নিজস্ব যানে যেতে পারলে সবচেয়ে ভালো। নাগরীতে খাবার ভালো কোনো হোটেল নেই। তবে মিষ্টি ভালো পাওয়া যায়। তাছাড়া উলুখোলা বাজার, পুবাইল ও টঙ্গী বাজারেও খাবার খেয়ে নিতে পারেন। ফেরার পথে পুবাইল হয়ে কাঞ্চন সেতু ঘুরে আসতে ভুল করবেন না!

বিভাগ: ভ্রমণ

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.