স্বপ্নের মোসেস মাভিদা স্টেডিয়ামে আজাদ তালুকদার,
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা প্রয়াত মোসেস মাভিদার নামে গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্বখ্যাত মোসেস মাভিদা স্টেডিয়াম। ডারবানের স্টামফোর্ড হিলস এলাকায় নির্মিত এই স্টেডিয়ামটি উদ্বোধন করা হয় ২০০৯ সালের ২৮ নভেম্বর। ৬৯ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়ামটি নির্মাণে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের খরচ হয় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। পাশেই নির্মিত হয়েছে চোখ ধাঁধানো ক্যাবল কার, যেখান থেকে দেখা যায় পুরো ডারবান সিটি। নান্দনিক কারুকাজ, চমৎকার নির্মাণশৈলীর পাশাপাশি ক্যাবল কারটি এই স্টেডিয়ামকে এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা, স্বতন্ত্র পরিচিতি।
সেই স্টেডিয়ামের হলরুমে আয়োজন করা হয়েছে মোস্ট ভালনারেবল ফোরামের (জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদেশগুলোর সংগঠন) সাইড ইভেন্ট। তারিখ ৭ ডিসেম্বর ২০১১। বাংলাদেশসহ ভালনারেবল কান্ট্রিগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন সেখানে। জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে এর আগেও বাংলাদেশের কয়েকটি সাইড ইভেন্ট হয়েছে আইসিসি সেন্টারসহ ডারবানের অভিজাত হোটেলে। কিন্তু সব ছাপিয়ে এবারকার ইভেন্টের একটা আলাদা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে। যেন একই সঙ্গে ‘রথ দেখা, কলা বেচা’ দুটোই। কারণ এটা যে মোসেস মাভিদা স্টেডিয়াম!
এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালসহ ৭টি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, বসেছিল বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কাড়ার পসরা। এই স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম খেলা অনুষ্ঠিত হয় জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে। এ খেলায় জার্মানি ৪-০ গোলে পরাজিত করে অস্ট্রেলিয়াকে। ফুটবলপ্রেমীরা কখনো ভুলতে পারবেন না সুইজারল্যান্ড-স্পেনের শ্বাসর“দ্ধকর সেই ম্যাচটি, যে খেলায় স্পেনকে ১-০ গোলে পরাজিত করে সুইজারল্যান্ড। শক্তিশালী জাপানকেও ১-০ গোলে এই মাঠেই হারিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। নামিবিয়া ও কোরিয়ার ২-২ গোলে ড্র-এর উত্তেজনাপূর্ণ এবং ব্রাজিল ও পর্তুগালের গোলশূন্য ম্যাচ, নেদারল্যান্ডস (২)-স্লোভাকিয়া (১)-এর কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনালে জার্মানিকে ১-০ গোলে স্পেনের পরাজিত করার সেই অসাধারণ ম্যাচটিও অনুষ্ঠিত হয়েছিল মোসেস মাভিদা স্টেডিয়ামে।
এছাড়াও আফ্রিকায় ভারতীয়দের দেড়শ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০১০ সালে আয়োজিত টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট ম্যাচে ভারতের কাছে দক্ষিণ আফ্রিকার পরাভ‚ত হওয়ার ছান্দসিক খেলাটিও হয়েছিল এই স্টেডিয়ামে। যে স্টেডিয়ামটি বিশ্বফুটবলের সাক্ষী কিংবা পায়ে পায়ে যে স্টেডিয়াম মাতিয়েছে বিশ্বফুটবলার ও ক্রিকেটের বরপুত্ররাÑ সেই স্টেডিয়ামে যাব, তার মাটি স্পর্শ করব- সে এক রোমাঞ্চকর মুহূর্ত!
দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টায় দল বেঁধে সবাই চেপে বসি কপ-১৭-এর গাড়িতে। ডারবানের সাউথ বিচের পাড় ঘেঁষে ছুটে চলে গাড়ি। আমার পাশের সিটে পাশা ভাই (পাশা মোস্তফা কামাল, পরিবেশ ও বনমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা)। পাশা ভাইকে কিছুটা চিন্তি—ত মনে হচ্ছিল সাইড ইভেন্ট সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা নিয়ে। কিন্তু এসব কিছুই ঢুকছিল না আমার কানে। পুরোটা সময় আমাকে ব্যাকুল করে রেখেছে ওই স্টেডিয়াম। পারলে এখনই যেন উড়াল দিই!
আঁকাবাঁকা পথ মাড়িয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাই কাক্সিক্ষত সেই স্টেডিয়ামে। গেট পেরিয়ে লিফটে উঠেই প্রবেশ করি গ্যালারিতে। বিদেশি অতিথি অর্থাৎ আমাদের সম্মানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আগে থেকেই খুলে রাখা হয়েছে প্রবেশদ্বার। স্টেডিয়ামে প্রবেশ করার পর বাংলাদেশের এমপি, পদস্থ আমলা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিকবৃন্দ, এনজিও প্রতিনিধি কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না! সবাই যে যার মতো হারিয়ে গেলেন। কেউ ব্যস্তফটোসেশনে, কেউবা নেমে পড়লেন মাঠের তলা স্পর্শ করতে, কেউবা গ্যালারিতে বসে নিজেকে জিজ্ঞেস করছেন ‘আমি কি সত্যি সত্যি মোসেস মাভিদা স্টেডিয়ামে, নাকি এটা ঘুমের ঘোরে দেখা কোনো এক স্বপ্ন!’
এদিকে শুরু হয়ে গেছে অনুষ্ঠান, কিন্তু সেদিকে কারোরই খেয়াল নেই। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাচ্ছে, শেষের দিকে স্টেডিয়াম ঢুঁ মারবেন বলে যিনি প্রথমে ঢুকতেই চাননি, সে পাশা ভাইকেই ফটোসেশন থেকে ফেরাতে হলো অনেকটা জোর করেই। সারাক্ষণ ফটোসেশনে মেতে ছিলেন তরুণ তিন এমপি ইকবালুর রহিম, জুনাইদ আহমদ পলক, তানভির শাকিল জয়সহ অনেকেই।
পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদেরও যে ইচ্ছা ছিল বিশ্বখ্যাত এই স্টেডিয়ামের সখ্যে মেতে ওঠার, সেটা বোঝা গেল অনুষ্ঠানের পর তার অভিব্যক্তি দেখে। সম্মেলনে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ইত্তেফাকের রফিকুল বাশারসহ কয়েকজন হাছান ভাইয়ের কাছে বায়না ধরলেন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে গিয়ে তার সঙ্গে ছবি তোলার। কিন্তু ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে প্রবেশপথ। অগত্যা স্টেডিয়ামের হলরুমে দাঁড়িয়ে হাছান ভাইকে পোজ দিতে হলো, রক্ষা করতে হলো ছবিজ্বরে আক্রান্তদের আবদার। একইভাবে তাদের আবদার রাখতে হলো মালদ্বীপের পরিবেশমন্ত্রী মোহাম্মদ আসলামকেও।
সফলভাবে শেষ হলো সাইড ইভেন্ট। শেষ হলো ফটোসেশন, ভোজনপর্ব। কিন্তু শেষ যেন হতে চায় না মোসেস মাভিদার সখ্য, ভালোলাগা! তাই তো দুপুর গড়িয়ে গেলেও ফেরার কথা বেমালুম ভুলে যান সাংবাদিক কাওসার রহমান, রফিকুল বাশার, মাহমুদ মনি, শিবলি রেজা আহমেদসহ অনেকে।
প্রথমোক্ত তিনজন ক্যাবল কারে উঠে আকাশে মিলিয়ে গেলেন! আর পুরো স্টেডিয়ামকে ব্যাকগ্রাউন্ড করে পিটিসি (পিস টু ক্যামেরা) দিতে ব্যতিব্যস্তহয়ে পড়লেন এটিএন নিউজের শিবলি। আমিও সঙ্গী হলাম তার। পিটিসি শেষে শিবলির কণ্ঠে ভেসে ওঠে- শিবলি রেজা আহমেদ, এটিএন নিউজ, মোসেস মাভিদা স্টেডিয়াম, ডারবান, দক্ষিণ আফ্রিকা। ভাবলাম, ইস্ আমিও যদি ঐতিহাসিক এই স্টেডিয়ামকে ব্যাকগ্রাউন্ড করে কিছু একটা বলতে পারতাম! বন্দি হতে পারতাম ভিডিও ফ্রেমে!
এরপর আরো কিছু সময় আমরা স্টেডিয়ামের আশপাশে কাটালাম। টুকটাক কেনাকাটা করলাম। মোসেস মাভিদা স্টেডিয়ামের লোগো সংবলিত ভুভুজেলা (গোল দেয়া, নৈপুণ্য প্রদর্শন অর্থে এটা বাজিয়ে উৎসাহ দেয়া হতো গেল বিশ্বকাপ ফুটবলে) কিনলাম ৫৫ রেন্ট (বাংলাদেশি প্রায় ৬শ টাকা) দিয়ে। কেউ কেউ আমাদের নিরুৎসাহিত করলেন এত দাম দিয়ে এটা কিনতে। তাদের মতে, বিচের ধারে এরকম ভুভুজেলা ৫-১০ রেন্টে পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে যে মাভিদা স্টেডিয়ামের কথা লেখা নেই! বললাম, যত টাকাই হোক মাভিদা স্টেডিয়াম লেখার ভুভুজেলাই কিনব আমি। কিনলেন শিবলিও। তখনও কি জানতাম সেই ভুভুজেলাই জন্ম দেবে রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা! পরে কোনো একসময় বলা যাবে সেই অভিজ্ঞতার কথা।
বিভাগ: ভ্রমণ



