বরাক নদীতে এখন প্রভাবশালীদের অবৈধ বসতবাড়ি
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

Posted by সাপ্তাহিক ২০০০ | প্রতিবেদন | শনিবার 31 জুন 2010 1:26 অপরাহ্ন ১৬ শ্রাবণ ১৪১৭


সরকারের নিয়মনীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মৌলভীবাজারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা বরাক নদীর বুকে অবৈধভাবে বসতবাড়ি নির্মাণ করে নদীটি দখল করে নিচ্ছে। বরাক নদীর হতশ্রী চেহারা দেখলে এখন আর মনেই হবে না এক সময় এ নদীতে পালতোলা নৌকা চলাচল করত। নদীখেকো চক্রের আগ্রাসনের কারণে বরাক আজ কালের সাক্ষী হিসাবে কোনোমতে বয়ে যাচ্ছে। অথচ বরাকের দু’পারের জবরদখলকারীদের উচ্ছেদ করে বন্দোবস্ত প্রদানের মাধ্যমে ভূমিহীনদের বরাদ্দ প্রদানের ব্যবস্থা করলে প্রতিবছর সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে পারে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের ফতেপুর, নাসিরপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা বরাক নদী ভরাট হয়ে বর্তমানে নদীটির পানি প্রবাহ অনেকটা থমকে গেছে। পর্যাপ্ত প্রবাহ না থাকায় নদীটিতে নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। আর এ সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে একশ্রেণীর স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা বরাকের বুকে জেগে ওঠা নদীর চর জবরদখল করে নির্মাণ করেছে কাঁচা-পাকা বসতবাড়ি। নদীর উভয় পাড়ের ভূমি অবৈধভাবে দখলে নিয়ে প্রভাবশালীরা সবজি ও ধান চাষের জমি তৈরি করেছে। সরকারের কোটি কোটি টাকার ভূমি প্রভাবশালীরা জবরদখল করে নিলেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। বিভিন্ন সময় দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রদান করা হলেও সাড়া নেই কর্তৃপক্ষের।
সরেজমিনে খলিলপুর ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক কারণে ভরাট হওয়া বরাক নদীর বিভিন্ন স্থানে মাটি এনে ভরাট করে শতাধিক কাঁচা-পাকা ঘর নির্মাণ করেছে শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। এসব বাড়িঘরে বসবাস করছে ২ শতাধিক পরিবার। নদীর বুকে মাটি ভরাট করে দখলে নেয়া ভূমির প্রকৃত মালিক সরকার হলেও স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখলিস্বত্ব বেচাকেনা করছে অবাধে। নব্বইয়ের দশকে বরাক নদী প্রস্থে যে আয়তন ছিল দখলে দখলে হতশ্রী রূপ নেয়া নদীটির বর্তমান আয়তন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। নদীটির বর্তমান অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই মাত্র এক যুগ আগেও এ নদীতে পালতোলা নৌকা চলেছে। বরাকের সৌন্দর্য উপভোগে আসতেন দেশি-বিদেশি পর্যটক। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন মাল নিয়ে যাতায়াত করতেন বরাক নদী দিয়ে।
সাপ্তাহিক ২০০০-এর সঙ্গে আলাপকালে নদীপাড়া গ্রামের শফিকুর রহমান (৪৬), জুনায়েদ হোসেন (৪০), জহিরুল ইসলাম (৩৯), জামাল মিয়া (৫০), ফতেপুর গ্রামের রহিম মিয়া (৫৫), নাসিরপুর গ্রামের জাহানারা বেগম (৩৬), মফিজউল্লাহ (৪৫), শামীম হোসেন (৩৫) অভিযোগ করেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে মৌলভীবাজারের সম্পদ বরাক নদীটি ভরাট হয়ে হতশ্রী রূপ নিয়েছে। একদিকে নদীটি প্রাকৃতিকভাবে ভরাট হচ্ছে অন্যদিকে একশ্রেণীর প্রভাবশালী ভূমিখেকো চক্র অবৈধ প্রভাব বিস্তার করে নদীটির ভূমি ও উভয় প্রান্তের জমি গ্রাস করছে।
তারা জানান, এক সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বরাক নদীর ওপর লোহা ও স্টিলপাতের তৈরি একটি সেতু ছিল। বিএনপি সরকারের শাসনামলে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের ঐকান্তিক চেষ্টায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ নদীটির ওপর নতুন সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বিশাল এ সেতুটি এখন কালের সাক্ষী। কারণ নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়ে ভরাট হয়ে নদীটি এখন মৃতপ্রায়। ফলে এত বিশাল আকারের সেতু তার প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে।
বরাক নদীর উত্তর পাশের কান্দিগাঁওয়ের বাসিন্দা মোঃ জসীমউল্লাহ (৫০) জানান, আজ থেকে ১৫/১৬ বছর আগে তিনি বরাক নদীতে ছোট ডিঙ্গি নৌকা চালিয়ে পরিবার চালাতেন। বর্তমান নদীটি মরা খালে পরিণত হওয়ায় তিনি বেকার জীবনযাপন করছেন।
শফিপুরের বাসিন্দা সাফিয়া বেগম (৩৭) জানান, ১৯৯১ সাল থেকে বৈবাহিক সূত্রে তিনি এ গ্রামের বাসিন্দা। বিয়ের প্রথম দিকে বরাক নদীর এ পার থেকে ওই পারে যেতে নৌকায় লাগত ৭/৮ মিনিট। বর্তমানে লাফিয়ে বরাক নদীর এ পার থেকে ওই পারে যাওয়া যায়। আর কয়েক বছর পর এখানে কোনো নদী ছিল এই চিহ্নটুকু হয়তো থাকবে না।
জেলার শেরপুরের বাসিন্দা মোঃ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রভাবশালীদের কালো থাবায় বরাক আজ ক্ষতবিক্ষত। প্রভাবশালীদের হাত থেকে বরাক নদীকে বাঁচাতে হবে জাতির স্বার্থে, আমাদের স্বার্থে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে জানান, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় প্রভাবশালী মহল বরাক নদীর সরকারি ভূমি দখল করে নিচ্ছে। মাঝে-মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও অভিযানের পর পরই আবারো প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। তাদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না।