চলচ্চিত্র ও পর্নোগ্রাফি
জামিউল আলম

Posted by সাপ্তাহিক ২০০০ | প্রতিবেদন | শনিবার 31 জুন 2010 2:58 অপরাহ্ন ১৬ শ্রাবণ ১৪১৭

সারা বিশ্বে পর্নোগ্রাফির রমরমা ব্যবসা। এর যেন শেষ নেই। একে কেবল একরূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তর করা হয় মাত্র। আমেরিকা, ব্রাজিল, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ এমনকি বাংলাদেশও এই তালিকায় অনেক আগেই নাম লিখিয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্র, যাদের বিস্তার সিডি-ডিভিডি থেকে শুরু করে অনলাইন পর্যন্ত। লাখ লাখ মানুষ তাদের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে সংগ্রহ করছে নানা রঙের, নানা আকৃতি-বিকৃতির শত শত পর্নো ছবি।
আজকাল পর্নোসিডি বাজারে ভালোই বিক্রি হচ্ছে, আর তাই বিশ্বে আর্থিক মন্দার সময়ও পর্নোসিনেমার জন্য দর্শকদের সিনেমা হলে ভিড় করতে দেখা যায়। এক সময় পর্নোছবি বিক্রি  এবং প্রদর্শন করা হতো শহরের প্রায় অন্ধকার গলিতে, আড়ালে-আবডালে; এখন সেগুলো সরাসরি প্রবেশ করেছে বেডরুমে। এই পরিবর্তনের সবটুকু হয়েছে প্রযুক্তির কল্যাণে। ইন্টারনেটে এখন সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হয় পর্নোকিপ। বিশেষত ইন্টারনেটের কারণে পর্নোগ্রাফি এখন সহজলভ্য পণ্য। পর্নোগ্রাফি এখন আর অপরাধী-মনোভাব নিয়ে ব্যক্তির বা বন্ধুগোষ্ঠীর উত্তেজিত অভিযানের বিষয় নয়। বরং ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা বা সিডি-ডিভিডি আকারে পর্নোগ্রাফি সংগ্রহ করা অনেক সহজ হয়ে  গেছে। ইন্টারনেটে এখন এমনকি ইন্টারঅ্যাক্টিভ পর্নোরও দেখা মেলে। এক সময় পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্র প্রোগৃহে দেখানো বা পাড়ার ভিডিও কাব থেকে ভাড়া করা  সামাজিক ও নৈতিক দৃষ্টির বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা চারদেয়ালের গৃহে নিরাপদে ও অনায়াসে উপভোগ করা যায়। তাই পর্নোগ্রাফিকে বোঝা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। কেবল চলচ্চিত্রেই নয়, পর্নোগ্রাফির অস্তিত্ব পেইন্টিং, আলোকচিত্র এবং সাহিত্যে অনেক আগেই শুরু হয়েছে।
পর্নোগ্রাফিক সাহিত্য ও আলোকচিত্রের আস্তিত্ব বহুকাল ধরে দেখা গেলেও চলচ্চিত্রে এর আগমন ১৯২০-এর দশক থেকে। পরে চলচ্চিত্রই হয়ে ওঠে পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে ব্যবহৃত মাধ্যম। অনেক দেশে পর্নোগ্রাফি থেকে সেন্সর প্রথা উঠে গেলে এটি ব্যাপকভাবে বিকাশ লাভ করে। ১৯৭০ দশকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ফ্রান্সে পর্নোচলচ্চিত্র বিকাশ লাভ করে। এ সময় ফ্রান্সে বেশিরভাগ চলচ্চিত্র ছিল পর্নোগ্রাফিক এসেন্সে ভরা।
তবে এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের েেত্র উচ্চহারের কর নির্ধারিত ছিল। ১৯৭০ দশকের শেষ দিকে এসে যখন হোম ভিডিও প্রযুক্তি আবিষ্কার হলো তখন থেকে করের ঝামেলা আর থাকল না। ফলে ছবি নির্মাণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেল। কারণ ভিডিও প্রযুক্তিতে নির্মিত ছবির ব্যয় অনেক কম। তখন পর্নো ছবির দর্শক বেড়ে যাওয়ায় হলিউড এসব সস্তা ভিডিও ছবির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য নিজস্ব পথ বের করার চেষ্টা করে। এরপর ‘রেস্ট্রিকটেড’ সনদ নিয়ে পর্নোর কাছাকাছি উপাদান নিয়ে হলিউডেও ছবি নির্মিত হতে লাগল। আড্রিয়ান লিনের ফ্যাটাল অ্যাট্রাকশন (১৯৮৭) এই ধারার প্রথম বিখ্যাত ছবি। এই ধারায় আন ফেইথফুলসহ আরও অনেক ছবি নির্মিত হয়েছে। বর্তমানেও এই ধাঁচের ছবি নির্মাণ করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলো দর্শক শ্রেণীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
আন্দ্রিয়া দোরকিন  বলছেন, পর্নোগ্রাফি (ঢ়ড়ৎহড়মৎধঢ়যু) শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘পর্নো’ (ঢ়ড়ৎহব) ও গ্রাফোস (মৎধঢ়যড়ং) শব্দদ্বয় থেকে যার অর্থ ‘বেশ্যাদের নিয়ে লেখালেখি’। পর্নো অর্থ বেশ্যা, বিশেষত অতি নীচু স্তরের, যাদের প্রাচীন গ্রিসের বেশ্যালয়গুলোতে পাওয়া  যেত এবং সব পুরুষ নাগরিকের জন্য সহজপ্রাপ্য ছিল। পর্নোগ্রাফির অস্তিত্ব অনেক আগে থেকে পৃথিবীতে বিদ্যমান থাকলেও কেবল ভিক্টোরিয়ান যুগে একে ঘিরে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়, বিশেষত একে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে।
পর্নোগ্রাফি, ইংরেজি শব্দ ইরোটিকা বলতে যা  বোঝায়, তা থেকে আলাদা। ইরোটিকার উদ্দেশ্য হতে পারে  যৌনতার মতো স্বাভাবিক ও মৌলিক বিষয় নিয়ে ও তাকে ঘিরে মানবিক সম্পর্কের ঘটনাবলীকে অবলম্বন করে পেইন্টিং, চলচ্চিত্র বা সাহিত্যকর্ম নির্মাণ। সাহিত্য, আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র সকলেেত্রই পর্নোগ্রাফির প্রয়োগ দেখা যায়। পর্নোগ্রাফিনির্ভর অনেক পত্র-পত্রিকায় যেমন স্থিরচিত্র প্রকাশিত হয়,  তেমনি সেলুলয়েড বা ভিডিও ফরম্যাটে অনেক পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়ে থাকে, যার বিপণন ইন্টারনেট কিংবা সিডি-ডিভিডির মাধ্যমে বিস্তৃত হচ্ছে। সত্যি বলতে, পর্নোগ্রাফি সময়ের হাত ধরে এখন একটি বিরাট শিল্প এবং বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয় এখানে। পশ্চিমা দেশগুলোতে এই শিল্পের প্রসার সবচেয়ে বেশি, তবে এর গ্রাহক বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান। পশ্চিমা দেশসমূহে পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্র গ্রেডিং পদ্ধতিতে আইনের আওতায় প্রকাশ্যে পরিবেশিত হয়ে থাকে। আর বাংলাদেশের মতো দেশে পর্নোগ্রাফির নির্মাণ ও পরিবেশনা গোপনে পরিচালিত হয়, তবে এর উৎপাদন খুব সীমিত। জনপ্রিয়ধারার চলচ্চিত্রে নব্বই দশকের শেষ থেকে ও শূন্য দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত— ‘কাটপিস’ আকারে পর্নোগ্রাফির এক ধরনের বিকাশ ঘটেছিল। প্রাচীন ভারতে সচিত্র কামসূত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যা এক ধরনের সেক্স-ম্যানুয়েল বলে বিবেচিত। তবে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে পর্নোগ্রাফির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে পশ্চিমা দেশসমূহেই।
গত বছর চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পর্নো ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে বার্ষিক আয় ছিল যথাক্রমে ২৭.৪০, ২৫.৭৩, ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পর্নো ইন্ডাস্ট্রি বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতির একটি বিশেষ অংশ। একটি জরিপে দেখা যায়, বিশ্বে পর্নো বিনোদনের জন্য মানুষ প্রতি সেকেন্ডে ৩ হাজার ডলার ব্যয় করে। হাজার হাজার মানুষ এই ব্যবসার  সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এমনকি মাফিয়া গ্রুপগুলোর লোকজনকেও এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে দেখা যায়। পর্নো ইন্ডাস্ট্রিগুলো শুধু চলচ্চিত্র তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ম্যাগাজিন, স্থিরচিত্র, অডিও এবং ভিডিও গেমসের পর্নো সংস্করণেরও চাহিদা রয়েছে। পর্নো ব্যবসার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ইন্টারনেট। অপোকৃত সহজলভ্য হওয়ার কারণে পর্নো ব্যবসায়ীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পর্নো প্রোডাক্টগুলো ডিস্ট্রিবিউটর ও দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। ইন্টারনেটে এ রকম হাজার হাজার ওয়েবসাইট রয়েছে, যেখানে পর্নোছবি কেনাবেচা করা হয়।

বিভিন্ন দেশে পর্নোগ্রাফি
লাতিন আমেরিকায় পর্নোছবি প্রদর্শনীতে কোনো সরকারি বাধা নেই। পর্নো ইন্ডাস্ট্রিগুলোর কার্যক্রমও খুব সীমিত। কিন্তু ইউরোপ, আমেরিকায় নির্মিত পর্নোছবিগুলো পাইরেটেড হয়ে বড় বড় শহরে অবাধে বিক্রি হয়। ব্রাজিলে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে পর্নোছবি দেখা ও অংশগ্রহণ করতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু পর্নো ম্যাগাজিন, ডিভিডি, গেমস দোকানগুলোতে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা যাবে না।
ইউরোপ : ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে নিজস্ব পর্নো ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে, যেগুলো হলিউড পর্নো ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, পোল্যান্ড, পর্তুগালসহ অনেক দেশে প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নির্মিত ছবিগুলো অনেক দেশেই বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কারণ এসব ছবির কাহিনীগুলো একটু ড্রামাটিক। জনপ্রিয় সেলিব্রিটিদের  পর্নো ভিডিও কিপ ইন্টারনেট অথবা ব্ল্যাক মার্কেটে ভালো বিক্রি হয়। অনেক সময় এসব ভিডিও অভিনেতা-অভিনেত্রীর অজান্তেই প্রকাশ করা হয়ে থাকে। আবার কোনো উঠতি মডেল নিজের পাবলিসিটি পাওয়ার জন্য এসব ভিডিওকে অবলম্বন হিসাবে ব্যবহার করেন।
ইংল্যান্ড : ১৯৯৯ সালের আগে এখানে পর্নোছবি নিষিদ্ধ ছিল। তখন পর্যন্ত পর্নোগ্রাফি ম্যাগাজিন, সিডি, ভিসিডি গোপনে বিক্রি করা হতো। যখন  এই বাধা তুলে দেওয়া হলো তখন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত পর্নোভিডিও বিভিন্ন দোকানে বিক্রির অনুমতি মিলল কিন্তু শর্ত ছিল আলাদাভাবে লাইসেন্স নিতে হবে।
এশিয়া : এশিয়ার বড় বড় পর্নো ইন্ডাস্ট্রি জাপান, হংকং, থাইল্যান্ডে অবস্থিত। জাপানের পর্নো ইন্ডাস্ট্রির মার্কেট বেশ বড়। এখানে নির্মিত ছবিগুলো এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই বাজারজাত করা হয়। এছাড়া হংকং, থাইল্যান্ডের নির্মিত পর্নো ম্যাগাজিন ও পর্নোসাহিত্যের  কাটতি গোটা বিশ্বে। চীনে ২০০২ সালে ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফির মাত্রা খুব বেড়ে গিয়েছিল। তখন সে দেশের সরকার পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়ন করে এবং যেসব ওয়েবসাইটে পর্নো ভিডিও প্রচার করা হতো সেগুলো নিষিদ্ধ করে। তারপরও বিভিন্ন প্রদেশে পর্নোছবি গোপনে নির্মিত হতো। পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে সেদেশের সরকার সব সময়ই সোচ্চার। ২০০৮ সালে নতুন আইনে বলা হয়  যেসব অভিনেতা-অভিনেত্রী, মডেল ও পরিচালক পর্নো চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকবে তারা সব ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকা- থেকে নিষিদ্ধ হবে এবং ৩ বছরের কারাদ- ভোগ করতে হবে এবং ২০ হাজার চীনা মুদ্রা জরিমানা গুনতে হবে। এখনো সেদেশে পর্নোছবি ইন্টারনেট ও ব্ল্যাক মার্কেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
দণি এশিয়া : ভারতে পর্নোছবি বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ কিন্তু পর্নো ছবি নির্মাণের বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। ভারতীয় উপমহাদেশে পর্নোছবিকে ‘ব্লু-ফিম’ বলা হয়। তবে ইন্টারনেটে অসংখ্য ওয়েবসাইট রয়েছে, যেখানে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ বিশেষ করে মহারাষ্ট্র, দণি ভারত ও মাদ্রাজে নির্মিত পর্নো ভিডিও কিপ নামানো যায়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে, ভারতের অষ্টম বৃহত্তম শহর পুনেতে বছরে ১শটির বেশি পর্নোছবি নির্মিত হয় এবং সেখানে দুটি সিনেমা হল রয়েছে যেখানে প্রতি সপ্তাহ অন্তর পর্নোছবি দেখানো হয়। তবে এসব পর্নো ছবির দর্শকদের বয়স ৩৫-৪০ বছরের মধ্যে। তরুণ দর্শক অপেক্ষাকৃত কম থাকে। কারণ তারা ইন্টারনেটে পর্নোছবি ডাউনলোড করতে পারে।
বাংলাদেশ : বাংলাদেশে ৯০-এর দশকে পর্নোছবি আমদানি শুরু হয়। এ সময় জাপান, হংকং থেকে পর্নোছবি আমদানি করা হতো  এবং বিভিন্ন সিনেমা হলে পরিবেশন করা হতো। এছাড়া দেশীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গে এসব ছবির কাটপিস জুড়ে দেওয়া হতো। নব্বই দশকের শেষের দিকে এসে সরকার একটু কঠোর হলে পর্নোছবি আমদানি কিছুটা কমে যায়। কিন্তু চোরাইপথে এখনো পর্নোছবি এদেশে আসে বলে জানা যায়। এছাড়া বড় শহরের শপিংমল, প্লাজা, ছোট-বড় মার্কেট থেকে শুরু করে ফুটপাথ পর্যন্ত এমনকি মফস্বল শহরেও পর্নোছবি দেদার বিক্রি হচ্ছে। মাঝে মধ্যে এসব ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করা হলেও তাদের কর্মকা- থেমে থাকেনি। এসব ভিডিও ছবির বেশিরভাগ ভারত ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা হয়। আমাদের দেশে পর্নোছবি নির্মিত হয় কিন্তু এসব ছবির মান বেশি ভালো হয় না। এদেশের পর্নোছবির নায়ক-নায়িকাদের কেউ পেশাদার আবার কেউ প্রতারণার শিকার। তবে এসব ছবি যারা নির্মাণ করছে তারা সবাই পেশাদার বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এসব নির্মাতা তাদের দুর্দান্ত সব নির্মাণকৌশল প্রয়োগ করে পর্নোছবি নির্মাণ করে।
একটি গ্রুপ এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বলে ধারণা করা হলেও আসলে এর একক নিয়ন্ত্রণ কারও হাতে নেই। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন  পেশাদার গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে  পর্নো সিডির বাজার। এদের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের জড়িত থাকার কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। এই ছাত্ররা ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন বিদেশি পর্নো কিপ ডাউনলোড করে সিডিতে রাইট করে পৌঁছে দিচ্ছে বিক্রেতাদের হাতে। সারাদেশে ভিডিও ভাড়া দেয় এমন অধিকাংশ দোকানে পর্নো সিডি ভাড়ায় পাওয়া যায়, কিনতে পাওয়া যায়। রাজধানীর গুলিস্তান, নিউমার্কেট, ফার্মগেট পর্নো সিডির বাজার হিসাবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্র : হলিউড পর্নো ইন্ডাস্ট্রি
যুক্তরাষ্ট্রের পর্নোগ্রাফির ইতিহাস খুব পুরনো। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং দাপুটে পর্নো ইন্ডাস্ট্রির নাম হলিউড পর্নো ইন্ডাস্ট্রি। এর বাজার বিশ্বব্যাপী। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এখানে নির্মিত পর্নোছবিগুলো শুধু হলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ভিসিআর এবং কেবল টিভি আসার পর থেকে পর্নোছবি ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে। ফলে এই ইন্ডাস্ট্রির কার্যক্রম আরো বাড়তে থাকে। আমেরিকান পর্নো ইন্ডাস্ট্রি প্রতিবছর সরকারকে বিশাল অঙ্কের ট্যাক্স দেয়। এটা থেকে ধারণা করা যায় এই খাতে লাভের পরিমাণ কত। প্রতি সপ্তাহে এখানে প্রায় ২১১টি প্রফেশনাল পর্নোছবি তৈরি করা হয়।
লাসভেগাসে প্রতিবছর পর্নো ইন্ডাস্ট্রির যে বার্ষিক সম্মেলন হয় সেদিকে তাকালে এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে খানিকটা ধারণা পাওয়া যাবে। প্রতিবছর দুই শতাধিক কোম্পানি এখানে এক ছাদের নিচে মিলিত হয়। শুধু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আসেন তা নয়, আসেন দর্শক ও ফ্যান। প্রিয় তারকাকে দেখতে লাইনে দাঁড়িয়ে ৪০ ডলারের টিকেট কাটার জন্য ভক্তদের অভাব হয় না কখনো।  নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নিজস্ব স্টার-সবই রয়েছে এই পর্নো ইন্ডাস্ট্রির ।  রয়েছে ভিসিএ, ভিভিভ ভিডিও কিংবা উইকেড পিকচার্সের মতো বড় বড় পর্নোছবি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠার কারণে পর্নো ইন্ডাস্ট্রির আইনগত বৈধতা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। ইন্ডাস্ট্রির আইনগত দিক দেখাশোনা করার জন্য কিংবা বাজারজাতকরণের জন্য আলাদা লোক রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ১৫ হাজার লোক এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। পর্নো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছে ছোট-বড় ৯শ প্রতিষ্ঠান। পর্নো চলচ্চিত্রের অধিকাংশ অভিনেতা-অভিনেত্রী এসেছেন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে। যোগ্যতা ও ভাষাগত সমস্যার কারণে অন্যান্য পেশা বাছাইয়ের সুযোগ না থাকায় তারা এ পেশা বেছে নিয়েছেন। পর্নো ছবির একটি দৃশ্যের জন্য একজন পুরুষ অভিনেতা পান ৩শ ডলার। পান্তরে একজন নারী অভিনেত্রী ৩শ থেকে ১২শ ডলার পর্যন্ত আয় করে থাকেন। এছাড়া অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছেন যারা নিজেরাই ছবি তৈরি করে বাজারজাত করেন।
শুধু চলচ্চিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কেবল টিভি কোম্পানিগুলো বয়স্কদের উপযোগী প্রোগ্রাম তৈরির দিকে ঝুঁকছে। পাশাপাশি অনেক হোটেলও টাকার বিনিময়ে রুমে রুমে পর্নোছবির সংযোগ দেয়। এসব হোটেলে প্রায় ৫০ ভাগ দর্শক এসব সুবিধা গ্রহণ করেন। হোটেলগুলো ভাড়ার অর্থ ছাড়া অন্য যেসব সার্ভিস থেকে আয় করে তার ৭০ ভাগই আসে পর্নোছবি সরবরাহ করে।
৩০-এর দশকেও মার্কিন চলচ্চিত্রে যৌনতা খুব একটা দেখা যেত না। অথচ বর্তমানে পর্নো ইন্ডাস্ট্রি এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে, হলিউডের মূলধারার ছবিগুলো খোলামেলা দৃশ্যের দিকে ঝুঁকছে। দর্শকরাও তা গ্রহণ করছে স্বাভাবিকভাবে। সামাজিক গবেষকরা বলছেন, পর্নো ইন্ডাস্ট্রির ফলে সমাজ বদলে গেছে পুরোপুরি। মাদক, পতিতাবৃত্তি, নারী ও শিশু পাচার এবং ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির বিস্তার ঘটেছে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ার কারণেই উন্নত দেশগুলোসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে প্রতিনিয়ত পৌঁছে যাচ্ছে। নারীর অবস্থান চরমভাবে অবমূল্যায়িত  হচ্ছে এইসব ছবিতে। চলচ্চিত্রের আগমনে পর্নোগ্রাফি বিষয়টা চলচ্চিত্রের একলার অধিকারে চলে গেছে যেন। পুরুষ প্রাধান্যের সেসব সাহিত্যে অবশ্যই নারীর অবমাননা হয়েছে, পর্নোগ্রাফি হলো মূলধারার বাইরের চলচ্চিত্র যা পুরুষ দর্শকদের জন্য নির্মিত এবং পুরুষ প্রযোজক-পরিচালক দ্বারা সৃষ্ট। এসব চলচ্চিত্রে নারীরা কেবল প্রোডাক্ট। পর্নোগ্রাফির কাঁচামালই হলো নারী ও তার শরীর, যা পুরুষের কামনা জাগ্রত করার জন্য ও পুরুষ প্রযোজকদের মুনাফার জন্য ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি এই দুই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে গিয়ে নারী পুরুষের আধিপত্য-পীড়ন-অধস্তনতার শিকার হচ্ছে। তাত্ত্বিকরা বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, পর্নোগ্রাফি নারীকে বস্ত্রহরণ করে, পীড়ন করে, অপদস্থ করে। অন্যদিকে পুরুষের সহিংসতা ও প্রাধান্যকে বন্দনা করে। আর নারীর এমন একটি ইমেজ উপস্থাপন করে যেখানে সে পুরুষের প্রতি অনুগত। ক্যাথরিন ম্যাককিনন এবং আন্দ্রিয়া দোরকিন নামের দুজন নারীবাদী তাত্ত্বিক বলেছেন, পর্নোগ্রাফি সমাজের পুরুষদের আগ্রাসী আচরণের স্বীকৃতি দেয় এবং প্রাধান্য বিস্তার করতে সহায়তা করে।

৫টি দেশের পর্নোগ্রাফিতে বার্ষিক রেভিনিউ
ক্রমিক নং    দেশের নাম    বার্ষিক রেভিনিউ (ডলার)
১.    চীন    ২৭.৪০
২.    সাউথ কোরিয়া    ২৫.৭৩
৩.    জাপান    ১৯.৯৮
৪.    যুক্তরাষ্ট্র    ১৩.৩৩
৫.    ইতালি    ১.৪০
সূত্র : উইকিপিডিয়া

অনলাইনে মোট ১২% ওয়েবসাইট পর্নোগ্রাফিক। অর্থাৎ এর সংখ্যা প্রায় ২,৪৬,৪৪,১৭২টি।
পর্নোগ্রাফিতে প্রতি সেকেন্ড ৩.০৭৫.৬৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এবং ২৮,২৫৮ জন দর্শক ইন্টারনেটে পর্নো কিপ উপোভাগ করে। ৪০ মিলিয়ন আমেরিকানরা নিয়মিত ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি উপভোগ করে।
প্রতিমাসে মাসে ১.৫ বিলিয়ন পর্নো ভিডিও ডাউনলোড হয় যা মোট ডাউনলোডের ৩৫%।
প্রতিমাসে ইন্টারনেটে ৪.৯ বিলিয়ন পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট বিক্রি হয়।
ইন্টারনেট পর্নো ব্যবসায় বিশ্বে বার্ষিক রেভিনিউ ৪.৯ বিলিয়ন ডলার। শুধু আমেরিকাতেই ২.৮৪ বিলিয়ন ডলার।
ইন্টারনেটে প্রতিদিন ৬৮ মিলিয়ন সার্চ রিকোয়েস্ট আসে যা মোট সার্চের ২৫%। প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ সার্চ হয় শিশু পর্নোগ্রাফি নিয়ে।
প্রতি ৩৯ সেকেন্ড একটি পর্নোভিডিও কিপ ইন্টারনেটে আপলোড করা হয়।
প্রতিদিন প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ইমেইল-এর বিষয়বস্তু ‘পর্নোগ্রাফিক’ যা মোট ইমেইল-এর ৮%।
কর্মক্ষেত্রে ইন্টারনেট পুরুষ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২০% পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন। নারী ব্যবহারকারীর হার ১৩%। বিশ্বে প্রতি ৩ জনের একজন নারী পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে।
গড়ে ১১ বছর বয়সে একজন শিশু প্রথম ইন্টারনেটে পর্নো ওয়েবসাইট ভিজিট করে।
সূত্র: িি.িরহঃবৎহবঃড়িৎষফংঃধঃং.পড়স