চরমপন্থিদের উত্থান না অন্য কিছু!
মাহমুদ হোসেন পিন্টু

Posted by সাপ্তাহিক ২০০০ | প্রতিবেদন | শনিবার 31 জুন 2010 1:43 অপরাহ্ন ১৬ শ্রাবণ ১৪১৭

পাবনার বেড়ার চরমপন্থিদের ব্রাশফায়ারে ঢালারচর ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশের এসআইসহ তিন পুলিশ নিহত হওয়ার পর গ্রেফতার আতঙ্কে বেড়ার মাসুমদিয়া ইউনিয়নের অন্তত ৪ হাজার মানুষ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
ঢালারচর ও মাসুমদিয়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী মালদহ হাট এলাকার রাস্তার ওপর নিহত পুলিশ সদস্যদের রক্তের দাগ রয়ে গেছে। ঘটনার স্থান হতে ঢালারচর পুলিশ ক্যাম্পের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। সেখানে মোট ১৬ জন পুলিশ সদস্য কর্তব্যরত ছিলেন।
পুলিশ সদস্যরা জ্বালানিকাঠ সংগ্রহ করে ফেরার পথে হামলার মুখে পড়েন। নদীপথে নৌকায় আসা ২৫ জনের সশস্ত্র চরমপন্থির দল পুলিশদের হত্যা করতে শুরু করে। পুলিশ ঘটনার স্থান থেকে নিহতদের লাশ ও এসএমজির ১১টি গুলির খোসা উদ্ধার করে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ঘটনাস্থান পরিদর্শনের সময় বলেন, সন্ত্রাসী যারাই হোক তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে এমন তথ্য সরকারের কাছে আছে।
হামলার পেছনে কি মৌলবাদী শক্তির হাত? নওগাঁর রানীনগরে তথাকথিত বাংলাভাইয়ের কাছে কাফনের কাপড় পরে আত্মসমর্পণ করেছিল কয়েকশ চরমপন্থি। দুধ দিয়ে গোসল করে মসজিদে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে তওবা পাঠ করে শপথ নিয়ে যোগ দিয়েছিল জেএমবিতে। প্রশ্ন হলো, এখন তারা কোথায়? এ সময়ে তাদের খোঁজ করা জরুরি। তিন পুলিশের মৃত্যুর পরও হত্যাকা-ে জড়িতদের পুলিশ এখনো চিহ্নিত করতে পারেনি। অস্ত্রধারীরা হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করে কোনো প্রচারপত্র ফেলে যায়নি। যাওয়ার সময় তারা কোনো সংগঠনের নামে স্লোগানও দেয়নি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, তারা সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন।
হঠাৎ এ সময়ে চরমপন্থিরা কেন এই হামলা করল? তদের উদ্দেশ্য কি? শুধুই পুলিশ হত্যা না অন্য কিছু? এ বিষয়ে পাবনা জেলা পুলিশ প্রশাসনের এক কর্তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সারাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে ব্যস্ত প্রশাসন। মৌলবাদীরা দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে এ ঘটনার পেছনে থাকতে পারে। আবার অন্য কোনো কু থাকতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থা, র‌্যাব, পুলিশ সবদিকই খতিয়ে দেখছে।
অপরাধ বিশ্লেষক এক ক্রাইম রিপোর্টার মনে করেন স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর একটি পত্রিকার প্রধান শিরোনাম এই ঘটনাকে নিয়ে করায় বিষয়টি অন্য চিন্তার রসদ জোগায়।
উত্তরাঞ্চলে চরমপন্থিদের অবস্থান : পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, উল্লাপাড়া, তাড়াশ উপজেলা এবং নাটোর জেলার গুরুদাসপুর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম উপজেলা এবং বগুড়া জেলার শেরপুর, নন্দীগ্রাম, আদমদীঘি উপজেলা চরমপন্থিদের অভয়ারণ্য। চলনবিলের কমপক্ষে ১৮-২০ ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থান থানা সদর থেকে দূরত্ব ১৫-২০ কিলোমিটার এবং জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০-৫০ কিলোমিটার। পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল, সমাজ, নিমাইচড়া, পার্শ্বডাঙ্গা, ফৈলজানা; ফরিদপুর উপজেলার হাদল, ধানুয়াঘাটা, শরৎগঞ্জ, বাদাল, আয়েনগঞ্জ; ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ, উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর, উধুনিয়া ও রামকৃষ্ণপুর; তাড়াশ উপজেলার তালম ও দেশিগ্রাম; শেরপুর উপজেলার বিশালপুর ও ভবানীপুর; বায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি চরমপন্থিদের অভয়ারণ্য। এই প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে গত দুই দশকে কৃষকের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, সরকারি জলাশয় দখল, চাঁদাবাজির জন্য ভৌগোলিক অবস্থান দুর্গম হওয়ায় চরমপন্থিরা এই এলাকায় তাদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। নওগাঁ জেলার আত্রাই-রানীনগর, রাজশাহীর বাগমারায় তাদের এক সময় শক্ত অবস্থান ছিল।
উত্তরের চরমপন্থিদের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাক্রম : মূলত আশির দশকে বর্ষা মওসুমে পথঘাটহীন প্রত্যন্ত অঞ্চলে চরমপন্থিদের আস্তানা গড়ে ওঠে। চরমপন্থিরা বিভিন্ন নামে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, গত দুই দশকে এ অঞ্চলে চরমপন্থিদের হাতে অন্তত ২৫০ জন খুনের শিকার হয়েছে। ১৯৮৬ সালে দিনের বেলায় নাটোর জেলার গুরুদাসপুর থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট করে। ১৯৮৯ সালে কুন্দাশন গ্রামে পুলিশ ও চরমপন্থিদের মধ্যে ২ ঘণ্টাব্যাপী বন্দুকযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সময় ৩ চরমপন্থি নিহত হয় এবং এলাকায় চরমপন্থি নেতা বাংকেশসহ চারজন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। ১৯৮৯ সালে তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান আলী হাসানকে প্রকাশ্যে গুলি করে চরমপন্থিরা হত্যা করে। একই বছর রানীরহাটে আনু ডাকাত নামে এক ব্যক্তিকে চরমপন্থিরা গুলি করে হত্যা করে। ১৯৮৮ সালে উল্লপাড়া উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল জলিলকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে। ২০০১ সালে একই উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামকে প্রকাশ্যে মাইকিং করে হত্যার হুমকি দেওয়ার পর গুলি করে হত্যা করে। ২০০৭ সালে চরমপন্থিরা সিংড়া উপজেলার বামিহাল পুলিশ ফাঁড়ির অস্ত্র লুট করে একই সালে তাড়াশ উপজেলার পাড়িল বরইচড়া গ্রামে কৃষক আনিছকে চাঁদা না দেওয়ার অপরাধে গুলি করে হত্যা করে। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর উপজেলার গুরপিপুল গ্রামে চরমপন্থিদের সঙ্গে পুলিশের আবারও গুলিবিনিময় হয়। এতে দুই বিভাগীয় চরমপন্থি ক্যাডার বামিহাল পুলিশ ফাঁড়ির লুণ্ঠিত অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়। এ ছাড়া ধানের মওসুমে ধনাঢ্য কৃষকের কাছ থেকে চাঁদা আদায় এবং চরমপন্থিদের নিজস্ব আদালত স্থাপন করে। ভয়ভীতির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে প্রায় প্রতিবছরই। সাধারণত সন্ধ্যার পর এলাকার হাটবাজারে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে এরা ঘোরাফেরা করে আতঙ্কের সৃষ্টি করে তাদের দলীয় কর্মকা- পরিচালনা করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে চরমপন্থিদের প্রকাশনা, লিফলেট সাঁটানো ও বিতরণ একটা সাধারণ ঘটনা।
চরমপন্থিদের সংখ্যা সংবলিত তথ্য : চরমপন্থিদের সদস্য সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন। গুরুদাসপুর, সিংড়া, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, শেরপুর থানায় তালিকা থাকলেও অনেকেই এ তালিকার বাইরে রয়েছেন। ২০০৭ সালের ১ ডিসেম্বর তাড়াশ উপজেলার কাঁপাগাড়ি বাজারে পুলিশের কাছে তথাকথিত ১০৪ চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করে। এই চরমপন্থি সদস্যদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো বড় মামলা নেই।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি, ১৫ চরমপন্থি দলকে দমনের নির্দেশ : ১৫ চরমপন্থি গ্রুপকে দমন করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কঠোর নির্দেশপত্র দেওয়া হয়েছে। ওই পত্রে চরমপন্থি গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, নওগাঁ, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ জেলায় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা), পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল জনযুদ্ধ), কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ জেলায় নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (শৈলেন গ্রুপ), শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন, জাসদ গণবাহিনী, গণমুক্তিফৌজ, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) আবদুর রশিদ গ্রুপ, এমএল জনযুদ্ধের দাদা তপন গ্রুপ, নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির মৃণাল গ্রুপ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির গাজি কামরুল গ্রুপ ও পূর্ববাংলা মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নাসিম গ্রুপ সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এসব গ্রুপের অধিকাংশেরই শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।