আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সর্বশেষ অবস্থা ও চিকিৎসা
ডা. মোঃ বজলুল গণি ভূঁইয়া

Posted by সাপ্তাহিক ২০০০ | প্রতিবেদন | শনিবার 31 জুন 2010 12:39 অপরাহ্ন ১৬ শ্রাবণ ১৪১৭

আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার বয়স এখন ৬৭-এর কিছু বেশি। গত বছর ডিসেম্বর মাসে ধরা পড়ে তার ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে। ডান ফুসফুসের নিচের লোবে (খড়নব) প্রায় ৪.৫ী৩.৮ সেমি সাইজের একটি টিউমার (ডিসেম্বর, ০৯) নিয়ে তিনি সিঙ্গাপুর যান। ফুসফুসে কয়েক ধরনের ক্যান্সার হতে পারে। তার হয়েছে ননস্মলসেল (ঘঝঈখঈ) ক্যান্সার। এটা ছিল অফবহড়পধৎপরহড়সধ ধরনের ক্যান্সার, যা সাধারণত ফুসফুসের গ্ল্যান্ড থেকে উৎপত্তি লাভ করে।
যা বলা হয়েছে তার বাইরে ডাক্তারি মতে লাং ক্যান্সারকে ৪টি পর্যায়ে ভাগ করা হয়ে থাকে। টিউমারের সাইজ, আশপাশের লিমফ নোডে ছড়িয়ে পড়া ও দূরবর্তী স্থানে ছড়িয়ে পড়ার ভিত্তিতে এই কিনিক্যাল পর্যায় (ঝঃধমরহম) করা হয়ে থাকে। ধরা পড়ার সময়ই তার ক্যান্সার ছিল ংঃধমব ৩ধ যার অর্থ হলো তার সাইজ ছিল ৩ সেমির বেশি, আশপাশে নোডে সংক্রমিত ছিল তবে দূরবর্তী স্থানে ছড়িয়ে পড়েনি। এই পর্যায়ে কোনো ব্যক্তির অপারেশন করা-না করা নির্ভর করে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনার ওপর। যেখানে ঝঃধমব-ও ও ওও তে সার্জারির পর ৩-৫ বছর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যথাক্রমে ৮০ শতাংশ ও ৬০ শতাংশ, সেখানে ঝঃধমব-৩ধ-তে অপারেশনের পর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ৩০ শতাংশ। এপ্রিল ২০১০-এ স্ক্যান করেও দেখা যায় তার ক্যান্সার ঝঃধমব-৩ই. সার্জিক্যাল পরিভাষায় এই পর্যায়ে টিউমার অপারেশনযোগ্য থাকে না। ঝঃধমব-৪ অবস্থায় কোনো অপারেশনই চলে না। তাছাড়া তার ছিল দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাই ব্লাডপ্রেসার ও প্রস্টেট বৃদ্ধিজনিত সমস্যা। তার রক্তের চর্বির মাত্রা অস্বাভাবিক ছিল। এসব সমস্যার জন্য ও রোগ ধরা পড়ায় কিছুটা বিলম্ব হওয়াতে ডাক্তাররা তাকে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। ওষুধ (ঈযবসড় ঞযবৎধঢ়ু) দিয়ে প্রথম চিকিৎসা শুরু করেন। প্রথমে ২টি ওষুধ দিয়ে তার কোমোথেরাপি শুরু হয়। ৪টি সাইকেল দেওয়ার পর গত এপ্রিল মাসে আবারো চবঃ ঝপধহ করা হয়। এতে দেখা যায় মূল ক্যান্সারের আকার একটু বেড়ে ঝঃধমব-৩ন তে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যে বিষয়টি অপারেশনের সম্ভাবনার বাইরে চলে যায়। চিকিৎসকরা কেমোথেরাপির ওষুধ একটু পরিবর্তন করেন ও তা দিতে থাকেন। মে মাসের ডোজ নেয়ার আগে তিনি সিঙ্গাপুর থেকে আমাকে ফোনে জানতে চান এই ওষুধ ঢাকায় পাওয়া যায় কি না ও কেমো নেয়া যাবে কি না। আমি ডাক্তার কামরুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলে তাকে জানিয়ে দেই যে, ঢাকায় এই সেবা নেয়া যাবে, কোনো সমস্যাই নেই। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় কেমো নেয়ার পর (১৩/৫/২০১০) তিনি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েন, একটু জ্বর হয় ও পাতলা পায়খানা হয়। তিনি নিজেই স্থির করেন বাকি কয়েকটি ডোজ তিনি সিঙ্গাপুরে নেবেন। ইতিমধ্যে দেশবাসী পত্রিকার মাধ্যমে জেনে যান যে, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সর্বশেষ ডোজ তিনি জুনের ৩ তারিখে নেন, ২২ জুন থেকে তার রেডিওথেরাপি নেয়ার কথা ছিল।
ঢ-জধু-তে তার দুই ফুসফুসেই সমস্যা দেখা যায়। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ও পরীক্ষা করা হয়। তার রক্তে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম একটু কম পাওয়া যায়। হিমোগ্লোবিন কিছুটা কম ছিল (১০.৫), তবে প্লাটিলেট স্বাভাবিক পর্যায়ে ছিল। রক্তের কালচার করে কোনো ধরনের জীবাণু পাওয়া যায়নি। জুনের ১৭ তারিখে তার বুকের সিটি স্ক্যান করা হয়।
এতে তারা অঃুঢ়রপধষ চহবঁসড়হরধ াং চহবঁসড়হরঃরং সন্দেহ করেন এবং ক্যান্সারের ঝঃধমব ৩ন নির্ণয় করেন। এতে দেখা যায় মূল ক্যান্সারের সাইজ কিছুটা ছোট হয়েছে (২.৭ী৩.৩) তবে ইতিমধ্যে দুই ফুসফুসেই অপাসিটি বেড়ে যায়, বাম দিকে একটু বেশি। সেই সঙ্গে দুই অংশেই ওপরের দিকে কিছুটা পরিবর্তন ধরা পড়ে যা সাধারণত শ্বাস ফেলতে না পারার জন্য হয়ে থাকে।
তাদের মতামত ছিল :
১. এপ্রিল মাসের তুলনায় দুই ফুসফুসেই অপাসিটি বেড়ে গেছে।
২. আগের তুলনায় ডান দিকের ফুসফুসের মূল টিউমার কিছুটা ছোট।
৩. দুই ফুসফুসের মাঝে নোডের বৃদ্ধি ও দুই ফুসফুসেই স্থায়ী পরিবর্তন যা কি না আগের মতোই রয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষিতে নিউমোনিয়ার কারণ ধরার জন্য রক্তের ও ফুসফুসের সম্ভব সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা তারা করেন। কিন্তু কোনো জীবাণু অথবা কারণ নির্ণয় করতে পারেননি। চিকিৎসা হিসাবে অক্সিজেন, অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েডসহ যাবতীয় ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করেন। তথাপি তার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
ইতিমধ্যে তার অবস্থার সন্তোষজনক উন্নতি না হওয়ায় ও শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় এক পর্যায়ে তাকে মেশিনের সাহায্যে ঙ২ সাপোর্ট দেওয়া হয় ৫/৭/২০১০ তারিখে। তার আগে তার মতামত নেয়া হয়। বর্তমান চিকিৎসার ধরন ও ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেয়া সম্ভব কি না তিনি জানতে চান। চিকিৎসকরা ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি তাকে দ্রুত বাংলাদেশে স্থানান্তরের অনুরোধ করেন।
সেই প্রেক্ষিতে গত ৭/৭/২০১০ তারিখে তাকে অক্সিজেন সাপোর্টসহ ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেই থেকে তার শরীরের অবস্থার সন্তোষজনক উন্নতি হয়নি। বরং ফুসফুসের অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা, রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কিছুটা ও প্লাটিলেটের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বর্তমানে তাকে শ্বাসনালীতে বিশেষ অপারেশনের মাধ্যমে (ঞৎধপযবড়ংঃড়সু) অক্সিজেন প্রদান করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাকে ১৫-২০ ব্যাগ প্লাটিলেট, এফএফপি ও ফ্রেশ ব্লাড দেওয়া হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড, অ্যালবোমিন ও অন্যান্য ওষুধপত্র বিশেষ কেনুলার মাধ্যমে (ঈঠচ) দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত বুকের ঢ-জধু করা হচ্ছে। দেশের কয়েকজন সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ইতিমধ্যেই তার অবস্থা পর্যালোচনা ও তাদের মতামত প্রদান করেছেন। সেই মতে চিকিৎসা অব্যাহত আছে।
লেখক : ভাসকুলার সার্জন