আফগান সঙ্কটের শেষ কোথায়মোহসীন আব্বাস
আফগানিস্তান এখন দণি এশিয়ার দেশ। রাজনৈতিকভাবে বললে দণি এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান সার্কের সদস্য রাষ্ট্র। দণি এশিয়ার সবচেয়ে সঙ্কটপূর্ণ দেশ। বর্তমানে দেশটিতে চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো দখলদারিত্ব। আফগান সঙ্কট অবসানের লক্ষ্যে বেশ কটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত কবছরে। এ বছরই অনুষ্ঠিত হলো দুটি। একটি লন্ডনে, অন্যটি আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে। কাবুল সম্মেলনে বলা হয়েছে যে, ২০১৪ সালে আফগানিস্তান ফিরে পাবে তাদের পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। যদি প্রশ্ন করা হয় আফগান সঙ্কটের শুরু কবে? এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। যদি প্রশ্ন করা হয় আফগান সঙ্কটের শেষ কবে? এ প্রশ্নেরও উত্তর মেলে না। আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটন এবং জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সমঝোতা ও আশ্বাসের পরও আফগান সঙ্কটের সমাধান সম্পর্কে সন্দিহান বিশ্বজনমত।
আফগানিস্তানের এ সঙ্কটময় পরিস্থিতির কারণ কী? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের অনেক পেছনে। বোধ করি আফগান সঙ্কটের মূল গ্রোথিত আছে এর বেড়ে ওঠার মধ্যেই।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমেই দৃষ্টি দিতে হবে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে। বর্তমান আফগানিস্তান আসলে এশিয়ার কোন অঞ্চলের দেশ? মধ্য এশিয়া, দণি এশিয়া নাকি পারস্য অঞ্চলের দেশ? কোন ভাষাভাষীর দেশ? দারি নাকি পশতুনদের? তবে আফগানিস্তানের জনগণের মধ্যে যে প্রধান ঐক্য বিরাজ করে তা হলো ধর্ম। দেশটির ৯৯ শতাংশ মানুষ ইসলামের অনুসারী। এ ছাড়া দক্ষিণের পশতুনরা দণি এশীয়, দারি ভাষাভাষীরা অনেকখানি পারসিক। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য নৃ-সম্প্রদায় হলো তাজিক। তাজিকরা মধ্য এশিয়া ঘনিষ্ঠ। এ বিচারে বর্তমান আফগানিস্তান যতটা দেশ, তারচেয়ে বেশি অঞ্চল। বহুকাল আগে থেকেই আফগানিস্তান অঞ্চল। ২২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকেই আফগানিস্তান অঞ্চল। আধুনিক প্রশাসনিক বিভাজনেও এর প্রতিফলন বিদ্যমান। দেশটি এখন ৩৪টি প্রদেশ এবং ৩৯৮ জেলায় বিভাজিত। জনসংখ্যা এবং আয়তনের বিচারে এই বিভাজন কতটা যুক্তিসঙ্গত তার বিবেচনার ভার সরকার ও রাজনীতির বিশেষজ্ঞদের। তবে এ কথা অবশ্যই বলা যায় যে, এ বিভাজন নিশ্চিত করা হয়েছে মূলত গোত্রপতি ও সামন্তদের অধিকারে থাকা অঞ্চলের অবস্থানের নিরিখে। যা শত শত বছর ধরে চর্চিত হয়ে আসছে। একটা কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, আফগান সামন্তরা যতটা না ল্যান্ড লর্ড তারচেয়ে বেশি ওয়ার লর্ড। ঐতিহ্য সূত্রেই আফগান গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধবাজ, স্বাধীনতাপ্রিয় এবং তাদের মতো করে শান্তিতে বসবাস করতে আগ্রহী। আফগান জনগণের কাছে তাদের গোত্রপতির আদেশ মান্য করা একাধারে গোত্রাভিমান, আত্মসম্মান ও সৃষ্টিকর্তার আদেশ মান্য করা। কেননা গোত্ররীতি অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার পর গোত্রপতির আদেশ শিরোধার্য। কেননা তিনিই দৃশ্যমান নেতা। তার নেতৃত্বেই আফগানরা আনন্দ ও বেদনা ভাগাভাগি করে। তাদের কাছে কেন্দ্র ও প্রদেশের অস্তিত্ব সুদূরের বিষয়।
আফগানিস্তান হলো এমন এক দেশ যা ইতিহাসের পর্বে পর্বে শাসিত হয়েছে বাইরের শক্তির দ্বারা। প্রাচীন পারস্য, মগধ, উত্তরের মধ্যএশীয় রাজশক্তিÑ এই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল শাসন করেছে নানা সময়ে। ইউরোপীয় মেসিডোনিয়ানরাও হানা দিয়েছে আফগান অঞ্চলে, গড়ে তুলেছে রাজ্যপাট। আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতায় আছে ভলগা পার থেকে নেমে আসা নানা জাতিগোষ্ঠীর আক্রমণ, ইসলামের বিজয় পতাকা ওড়ানো আরব ও তুর্কিদের হামলা, মোঙ্গলদের ধ্বংসযজ্ঞ, চেঙ্গিস খানের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রাজ্য দখলের জন্য হানাহানি, মধ্য এশিয়ার তৈমুরি শাসকদের দৌরাত্ম্য। এ ছাড়া আফগানিস্তান প্রাচীন বাণিজ্য পথ সিল্ক রোডের অংশীদার হওয়ায় এখানে প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে ইতিহাসের সব বাঁকের সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। ফলে অখ- আফগানিস্তান বলে কিছুই দাঁড়ায়নি এ বিশাল দুর্গম ভূভাগে। দাঁড়ায়নি এক অখ- জাতিসত্তার ভিত্তিভূমিতে। ফলে আক্রান্ত হওয়া, কখনো আক্রমণ মোকাবেলা করা, কখনো পশ্চাদপসারণ করাই ছিল গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজের মানুষগুলোর নিয়তি। কিন্তু কী আশ্চর্য, এই ভূখ- জন্ম দিয়েছে অনেক দার্শনিক, সুফি সাধক, কবি ও ইতিহাসবেত্তাকে।
আফগান ও পশতুনরা একÑ এ ধারণা বেশি দিনের নয়। আধুনিক আফগানিস্তানের ধারণাও বেশি দিনের নয়। মূলত পারস্য প্রাধান্যের আফগান এবং দণি এশিয়া প্রাধান্যের পশতুনরা এক এবং অভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীরÑ এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই আধুনিক আফগান জাতি এবং আধুনিক আফগানিস্তানের ধারণা সামনে আসে। আর পারস্য সংলগ্ন নগর ও মধ্য এশিয়া সংলগ্ন নগরগুলোর চেয়ে দক্ষিণের কাবুল কান্দাহার গজনী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে বিকশিত হতে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক সঙ্কট পিছু ছাড়েনি আফগানিস্তানের।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি দণি এশিয়ায় ইউরোপীয়দের আনাগোনা বেড়েছে অনেক। এ অঞ্চলে তারা, বিশেষ করে ইংরেজরা বাণিজ্য শক্তিতে অদ্বিতীয়, রাজশক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠার জন্য উন্মুখ । এমন এক সময়ে, ১৭৪৭ সালে আফগান গোত্রপতিদের সভা আহমদ শাহ দুররানি নামের এক পশতুন যোদ্ধাকে রাজা মনোনীত করে। এর আগে হত্যা করা হয় পারস্য রাজ নাদির শাহকে। দুররানি শক্তি সংহত করেন এবং দিল্লি, কাশ্মীর থেকে মাশহাদ, আরব সাগর থেকে আমু দরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করেন তার সাম্রাজ্য। আর এর মধ্য দিয়ে সঞ্চারিত হয় আফগান জাতীয়তাবোধ। যদিও গোত্র প্রথার প্রতাপ একবিন্দু প্রশমিত হয়নি।
এদিকে ১০ বছর পার হতে না হতেই দণি এশিয়ার পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলবর্তী বাংলা বিহার উড়িষ্যা চলে যায় ইংরেজদের দখলে। অন্যদিকে আফগানিস্তানে শুরু হয় দুররানিদের শাসন। ইতিমধ্যে গজনী থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় কাবুলে। কিন্তু সামাজিক বিন্যাসে কোনো পরিবর্তন আসেনি। গোত্র প্রাধান্যের সমাজব্যবস্থা অব্যাহত থাকে আগের বিধি-নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই। আহম্মদ শাহ দুররানির মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীরা আর তত দক্ষতায় ও প্রতাপ-প্রতিপত্তির সঙ্গে রাজ্য শাসন করতে পারেনি এবং রাজ্য ধরেও রাখতে পারেনি। ওই সময়ের নিয়ম অনুসারে দুররানি বংশের পতন হয় এবং আবারো বিশৃঙ্খলা ফিরে আসে আফগান জনপদে। এর এক পর্যায়ে উত্থান ঘটে খান রাজবংশের। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন আমানুল্লাহ খান। এ সময়টাও আফগান ইতিহাসের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান পরিচিত হতে থাকে ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে। একদিকে পুরো দণি এশিয়ায় ব্রিটিশ শাসন অন্যদিকে জারের রাশিয়া। উভয়ের কলেবর স্ফীত হতে হতে আফগান সীমান্তে এসে উপনীত হয়। আর ব্রিটেন ও রাশিয়ার টানাপড়েনে আফগানিস্তান অনেকটা বাফার অঞ্চলের মর্যাদায় আবির্ভূত হয়। ইতিমধ্যে ভারতের ব্রিটিশ শক্তি আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং ডুরান্ট লাইন নামের এক প্রায়-পরিমাপ অযোগ্য ও প্রায়-অনির্দিষ্ট সীমান্তের উদ্ভব হয়। এই সীমান্তই এখনো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত বলে পরিচিত। তবে কেবল রাষ্ট্র মেনে চলতে চেষ্টা করে এই সীমানা, উভয় দেশের মানুষের মধ্যে সীমানার কোনো অস্তিত্ব নেই। দুদেশে বসবাসকারী পশতুনরা একে অপরের ভাইÑ এটাই তাদের কাছে ধ্রুব সত্য।
আমানুল্লাহ খান তার দেশকে পর্দার অন্তরাল থেকে বের করে এক চেতনার মুক্তভূমি হিসাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। ভ্রমণ করেন নানা দেশ। স্বদেশে ছড়িয়ে দেন পশ্চিমের চিন্তা ও সংস্কৃতি। তার এই উদ্যোগ রুষ্ট করে অশিক্ষিত, গোঁড়া ও গোত্রাভিমানে ভরপুর আফগানবাসীকে। এ অভিধাগুলো কেবল পাখতুনদের জন্য প্রযোজ্য নয়, অন্য বড় নৃ-গোষ্ঠী তাজিকদের জন্যও প্রযোজ্য। আফগান রোষানলে আমানুল্লাহর পতন হয়। অল্প সময়ের জন্য কাবুল দখল করে নেয় এক তাজিক গোত্রপতি বাচ্চা-ই-শাখাও। এর পর ক্ষমতায় আসেন আমানুল্লাহ খানের জ্ঞাতি মুহাম্মেদ নাদির শাহ। নাদির শাহ নিহত হলে তার স্থলাভিষিক্ত হন জহির শাহ। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত। এ সময়টা আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার কাল।
১৯৭৩ সালে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাদশাহ জহির শাহর আত্মীয় দাউদ শাহ নিজেকে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং দেশকে প্রজাতন্ত্র হিসাবে ঘোষণা করেন। আফগানিস্তান সোভিয়েত সমর্থিত দেশ হিসাবে আবির্ভূত হয়। এ রাজনৈতিক আবর্তনের মধ্য দিয়ে সামনে আসে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তান (পিডিপিএ) নামের একটি রাজনৈতিক দল। পিডিপিএর প্রভাবশালী নেতা নুরমোহম্মদ তারাকি, বারবাক কারমাল এবং হাফিজুল্লাহ আমিনের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালের ২৮ প্রপ্রিল সংঘটিত হয় এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানে দাউদ খান সপরিবারে নিহত হন। তারাকি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন। আর আফগানিস্তানের রাজনীতিতে শুরু হয় অস্থিরতা। তবে আফগানিস্তান ঘোষিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী আফগানিস্তান হিসাবে। আর পিডিপিএর অন্তঃপার্টি সংঘাত চরমে ওঠে। আর কাবুলের বাইরের গোষ্ঠীগুলো আগের মতোই থেকে যায় গোত্রপতিদের নিয়ন্ত্রণে। তারা কাবুল সরকারকে সমর্থন করেনি কখনই। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশটিকে গণপ্রজাতন্ত্রী ঘোষণা করা হলেও পিডিপিএ কখনো গণতান্ত্রিক চর্চার রাজনৈতিক দল ছিল না। বরং দলটির চর্চা ছিল সর্বাত্মকবাদী এবং স্বৈরতান্ত্রিক। আর সারাদেশে তখন বিরাজমান এক সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থা যেখানে ধর্র্মীয় অন্ধত্ব, মোল্লাতন্ত্র এবং গোত্রাভিমান একসঙ্গে বিরাজমান। এমন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তান-পাকিস্তান বিরোধও তুঙ্গে ওঠে। আফগানিস্তান-পাকিস্তান বিরোধ মূলত ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের বিরোধের উত্তরাধিকার। আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্কের ধরন, বিশ্বরাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধকালের কূটনীতি ও রণনীতি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কÑ সবকিছু বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটা শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করে। আর এ জন্য রণকৌশল নির্ধারণ করা হয় আফগানিস্তানের দণিাঞ্চলের সশস্ত্র গোত্রগুলোকে আরো সশস্ত্র করে গড়ে তোলা। পাকিস্তানের সহযোগিতায় আফগান সীমান্তে প্রায় নাকের ডগায় মার্কিন উপস্থিতি এবং গোপন সামরিক তৎপরতার কারণে ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সামরিকভাবে উপস্থিত হয়। যুক্তি যাই থাকুক না কেন এটা ছিল আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের পর থেকে দেশটির জনগণ আর স্থিতিশীলতার মুখ দেখেনি। পশতুন, তাজিক এবং শিয়া গোত্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত সরকার এবং সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে আর সার্বিক সামরিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান এবং অন্যান্য মিত্রশক্তি। মিত্রশক্তির মধ্যে ছিল এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্র, সংগঠন ও মার্সেনারি গ্রুপ। এদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সামরিক সাহায্য এতটাই বেড়ে যায় যে আফগান গেরিলা গ্রুপগুলোকে স্ট্রিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়।
যুদ্ধের পটভূমিতে হাজার হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে, উদ্বাস্তু জীবনযাপন করতে বাধ্য হয় অজস্র মানুষ। এ রকম পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ে, এক পর্যায়ে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের এ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। তখন অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজ, রাষ্ট্র এবং পার্টির ভেতরেও চলছিল এক অদৃশ্য সংস্কার। চলছিল এক চাপা অস্থিরতা। এমন সময় আফগানিস্তানের নেতৃত্বে আসেন নজিবুল্লাহ। তিনি ১৯৯২ সালে যুদ্ধে হেরে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন। এর পর তাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। আফগানিস্তানে গঠিত হয় ওয়ার লর্ডদের সরকার। কিন্তু অস্থিতিশীলতা পিছু ছাড়ে না এই বিপদসঙ্কুল প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা বহু গোত্রে বিভক্ত আফগান জনগোষ্ঠীর।
১৯৯৪ সালের দিকে একটি ধর্মীয় সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে তালেবান। প্রধানত মাদ্রাসা শিক্ষক ও ছাত্রদের নিয়ে তালেবান আন্দোলনের সূচনা হলেও এদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে পাকিস্তান সহায়তা করেছে। পাকিস্তানের মদদে তারা ১৯৯৬ সালে কাবুল দখল করে নেয় এবং আফগানিস্তানকে ইসলামী আমিরাত বলে ঘোষণা করে। ২০০০ সালের দিকে আফগানিস্তানের ৯৫ শতাংশ অঞ্চলে তালেবান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, মোল্লাতন্ত্র ও গোত্রপতিদের অভিন্ন স্বার্থ, এ অঞ্চলে পাশ্চাত্য দুনিয়ার, বিশেষ করে মার্কিন স্বার্থের উপযোগী পরিবেশ এবং পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের জনগণ ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও সমর্থন। কিন্তু অস্থিরতা থামেনি। থামেনি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব।
মেঘে মেঘে বেলা বেড়েছে অনেক। বিশ্ব মানচিত্র থেকে বিদায় নিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। অবসান হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের। বিশ্বময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় এককেন্দ্রিক সামরিক বলয়, যার একমাত্র নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; ব্রিটেনসহ ন্যাটোর অন্য সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের অনুগামী মাত্র। এমন বিশ্ব পরিস্থিতিতে আরো এক দানবের উত্থান ঘটে বিশ্বব্যাপীÑ ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিপুষ্ট জঙ্গিবাদ। আর আফগানিস্তানের তালেবান শাসকরা হয়ে ওঠে এই সর্বগ্রাসী জঙ্গিবাদের একনিষ্ঠ মদদদাতা। জঙ্গিবাদের চরম প্রতিফলন ঘটে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের মধ্য দিয়ে। এ ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিকেই পাল্টে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ আর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গিবাদ। আফগান জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হয় আরেকবার বিদেশি শক্তির দ্বারা।
বর্তমানে প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের নেতৃত্বে একটা সরকার থাকলেও দেশটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেলের মতো কাজ করেন ন্যাটো বাহিনীর সামরিক কমান্ডার। এমন পরিস্থিতি আফগানিস্তানজুড়ে এখন সহিংস পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তালেবানদের সশস্ত্র তৎপরতা, অন্যান্য ওয়ার লর্ড নিয়ন্ত্রিত বাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা এবং আফিম যোদ্ধাদের তৎপরতাÑ সব মিলিয়ে আফগানিস্তান এক যুদ্ধক্ষেত্র।
সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আফগানিস্তান এক খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চল। এ অঞ্চলের এই সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিদেশিদের উপস্থিতি এখানে দীর্ঘদিন থাকবে, এ কথা মনে করা অসমীচীন হবে না। আর আফগানিস্তানে শান্তির জন্য প্রথমে দরকার যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের জন্য মোতায়েন করা বিদেশি সেনা প্রত্যাহার। সাম্প্রতিক আফগানিস্তান বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন তো সেই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছে। তবে দেশটির যুদ্ধবাজ গোত্রপতিদের এ বিষয়টি বুঝতে হবে।


