অর্থনীতি: ঈদ উৎসবের অর্থনীতি লেনদেন হতে পারে ২০ হাজার কোটি টাকা
কাওসার রহমান

Posted by সাপ্তাহিক ২০০০ | প্রতিবেদন | শনিবার 31 জুন 2010 12:42 অপরাহ্ন ১৬ শ্রাবণ ১৪১৭


শবেবরাতের পর থেকেই দেশে শুরু হচ্ছে ঈদ উৎসবের বাণিজ্যযজ্ঞ। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। এক মাসের বাণিজ্যিক কর্মকা-ের জন্য খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে পোশাক-জুতো সব পণ্যেরই পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার ভালো ব্যবসা আশা করছে ব্যবসায়ী মহল। তবে তাদের শঙ্কা হচ্ছে যানজট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে। এ দুটি কারণ ঈদের কেনাকাটায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। বিদ্যুতের কারণে এবার রাজধানীর শপিং সেন্টারগুলোতে এসি বন্ধ থাকবে। থাকবে না কোনো আলোকসজ্জা। ইফতার এবং তারাবিহর নামাজের সময়ও দোকানগুলোতে কম বাতি জ্বালানো হবে। ১৫ রোজা পর্যন্ত রাত ১০টা তারপর সারারাত দোকান খোলা থাকবে।
আসছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসবের পেছনে যেমন আনন্দ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য কাজ করে, তেমনি একে কেন্দ্র করে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কর্মকা- আবর্তিত হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশই পরিচালিত হয় ঈদকে কেন্দ্র করে। লেনদেন হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। যা ব্যবসা-বাণিজ্যের পুঁজি গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।
ঈদ উৎসবে দেশের অর্থনীতি আবর্তিত হয় দুভাবে। একটি হলোÑ রোজায় ইফতার ও সেহরিকেন্দ্রিক এবং অপরটি হলোÑ ঈদের জন্য নতুন পোশাক কেনাকাটা বাবদ। এই দুই কর্মকা-কে ঘিরেই প্রতিবছর দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। আর এ জন্য সারা বছর ধরেই ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি গ্রহণ করে। রোজার সময় সব খাদ্যপণ্যের চাহিদাই বেড়ে যায়। এটাকে সুযোগ হিসাবে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের জিম্মি করে বাড়তি মুনাফা লুটে নেয়।
মূলত শবেবরাতের পর থেকেই ঈদ উৎসবের কর্মকা- শুরু হয়ে যায়। শেষ হয় ঈদের আগের দিন গভীর রাতে। যাকে ‘চান রাত’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। এই পুরো সময়জুড়ে মানুষ বাড়তি কেনাকাটা এবং খাওয়া দাওয়া করে। এর সব কিছুর পেছনেই অর্থনৈতিক কর্মকা- আবর্তিত হয়।
শবেবরাতের পর থেকেই ঈদের নানা প্রস্তুতি শুরু হলেও, মূল কেনাকাটা শুরু হয় মধ্য রোজার দিকে। ঈদ উৎসবের কেনাকাটায় মূল ভূমিকা পালন করে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী। তারাই ঈদের বাজারের বড় ক্রেতা। আমাদের সমাজে ঈদের বাজারে প্রথম কেনাকাটায় নামে উচ্চবিত্তরা। মূলত উচ্চবিত্তরাই শবেবরাতের পর থেকে ঈদের কেনাকাটায় নেমে পড়ে। তারপর বাজারে নামে মধ্যবিত্ত শ্রেণী তথা চাকরিজীবীরা। সর্বশেষ কেনাকাটায় নামে নিম্ন আয়ের মানুষ। এই নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে বড় ক্রেতা হলো গার্মেন্ট শ্রমিক।
প্রতিবছর শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায়ই ঈদের বাজার তুঙ্গে ওঠে। বাহারি পোশাক আর ক্রেতার পদচারণায় ঈদের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে জৌলুস। বৈশ্বিক মন্দা ছাপিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠছে দেশের অর্থনীতি। বেড়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এই দুইয়ে মিলে এবার ঈদের কেনাকাটা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙ্গা করে তুলবে। এমন আশা ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, এবার ঈদে ভালো ব্যবসা হবে। কেনাবেচা বাড়বে। তাদের আশা ঈদের কেনাকাটায় এবার আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। ফলে এ বছর ঈদ উৎসবের অর্থনৈতিক লেনদেন  ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রোজা এবং ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা এবার আগেভাগেই পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ঈদের কেনাকাটার জন্য সারাদেশের শপিং সেন্টার ও শপিংমলগুলোতে বিভিন্ন ডিজাইনের জামা-কাপড় ও জুতার পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। একইভাবে রোজা উপলক্ষে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা খেজুর, ছোলা থেকে শুরু করে ডাল, তেল, পেঁয়াজ ও মসলা পর্যন্ত সব খাদ্যপণ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ আমদানি করেছে। রোজায় এ সব পণ্যের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। ফলে দামও বাড়ে। ইতিমধ্যে রোজার আগেই বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। যদিও পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছে।
রাজধানীর শপিং সেন্টার কিংবা শপিংমলগুলোতে ঈদের বাজার বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। অভিজাত শপিং সেন্টারগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। মানুষের ভিড় উপচে পড়ে। এবারের ঈদেও কেনাকাটায় একই অবস্থার সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, এবার ঈদ উৎসবের কেনাকাটার বৈশিষ্ট্য হবেÑ শবেবরাতের পর থেকেই কেনাকাটা শুরু, কেনাকাটায় দেশি পণ্যের প্রাধান্য এবং রাজধানীজুড়ে ঈদের বাজার। দিন দিন দেশি পোশাকের মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এবারও দেশি পোশাকের কাটতি বেশি থাকবে। উন্নত মান এবং বাহারি ডিজাইনই এবার দেশি পোশাক ক্রেতাদের আকর্ষণ করবে। বিদেশি পোশাকের আকর্ষণ ক্রমেই কমে যাচ্ছে অন্তত উৎসবগুলোতে। মূল্য বেশি থাকায় উচ্চবিত্ত ছাড়া আর কারো পক্ষে বিদেশি পোশাকের মুখাপেক্ষী হওয়া সম্ভব নয়। ফলে ঈদের কোনাকাটায় এবার ৮০ ভাগই দেশি বস্ত্রের পোশাক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করবে। দেশি পোশাকের পাশাপাশি চীন এবং ভারত থেকেও প্রচুর পোশাক আমদানি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আমির হোসেন খান বলেন, ‘রোজা এবং ঈদ উৎসবকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা এবার দারুণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। বাজারে সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত পণ্য মজুদ করেছে। কোনো পণ্যেরই কোনো সঙ্কট হবে না।’
তিনি বলেন, এবার ঈদের কেনাকাটা ভালো হবে। এর কারণ হচ্ছে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে। মানুষের মধ্যে কোনো অস্থিরতা নেই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়েছে। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। বর্তমানে বাজারের যে গতি দেখা যাচ্ছে, তাতে ঈদ উৎসবের লেনদেনের পরিমাণ গত বছরের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে পারে।
আমির হোসেন খান বলেন, এবার দেশি কাপড়ই ঈদের বাজারে প্রাধান্য বিস্তার করবে। এর কারণ হচ্ছে দেশি কাপড়ের মান অনেক উন্নত হয়েছে। বিদেশি ডিজাইনে দেশি পোশাক তৈরি হচ্ছে। এজন্য দেশে অনেক তৈরি পোশাকের কারখানাও গড়ে উঠেছে। এ সব কারখানার কাপড় দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। ২০০৭-০৮ সালে যেখানে মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ৬০৮ মার্কিন ডলার। গত ২০০৯-১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০ ডলারে যা ভোগ-বিলাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, ঈদের উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো ঢাকা শহরে ঈদের বাজার ছড়িয়ে পড়ে। কেনাকাটাও হয় এলাকাভিত্তিক। ঈদের কেনাকাটার এই বহুমুখীকরণের অন্যতম কারণ হচ্ছে যানজট। ফলে রাজধানীর এলাকায় এলাকায় গড়ে ওঠা শপিং সেন্টারগুলোও ঈদের কেনাকাটায় জমে ওঠে। পুরান ঢাকা থেকে নতুন ঢাকা, গুলিস্তান থেকে মিরপুর, ধানমন্ডি থেকে খিলগাঁও তালতলা সর্বত্রই শপিং সেন্টারগুলোতে চলে জমজমাট ঈদের কেনাকাটা। বাকি থাকে না ফুটপাথও। নিম্ন আয়ের মানুষের কেনাকাটার কেন্দ্রস্থল  হলো রাজধানীর ফুটপাত ও বঙ্গবাজার। রোজার শেষ দিকে এসে ফুটপাথ ও বঙ্গবাজারে ক্রেতাদের ভিড় উপচে পড়ে। এবার সেই কেনাকাটায় বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, এ আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০০৭ সালে রোজার ঈদে সার্বিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০০৮ সালে এই লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ২০০৯ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকায়।
শপিং এলাকাগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইদানীং রাজধানীতে ছিনতাই অনেক বেড়ে গেছে। উঠতি সন্ত্রাসীরাও বেশ বেপরোয়া। তবে ইতিমধ্যে রাজধানীর ৮শ স্পটে পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মহানগর পুলিশ। সেই সঙ্গে সাদা পোশাকে বিভিন্ন শপিং এলাকায় নিরাপত্তা কর্মীরা টহল দেবে। পুলিশের সঙ্গে রাজধানীর নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করবে র‌্যাব।
ব্যবসায়ীরা সারা বছর ধরেই ঈদুল ফিতরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী সারা বছর তেমন কেনাকাটা করে না। তাদের কেনাকাটা ঈদেই। সারাদেশের মোট ব্যবসার তিন ভাগের এক ভাগই হয় ঈদুল ফিতরে। তাই এবারও  ঈদকে সামনে রেখে তারা তিন মাস আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ পোশাকের চাহিদা পূরণের জন্য দেশে প্রায় ৫ হাজার তৈরি পোশাকের কারখানা গড়ে উঠেছে। রাজধানীর আশপাশে নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জে গড়ে ওঠা এ সব কারখানায় বাচ্চাদের পোশাক, স্যালোয়ার কামিজ, শার্ট-প্যান্ট, পায়জামা-পাঞ্জাবি তৈরি হচ্ছে। সেই সঙ্গে পুরান ঢাকার পাইকারি বাজার থেকে এসব কাপড় সারাদেশে চলে যাচ্ছে। এসব কারখানা থেকে এবার প্রায় ১৫ কোটি পিস পোশাক সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তিন কোটি পিস বাচ্চাদের পোশাক এবং চার কোটি পিস পাঞ্জাবি। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন এই ১৫ কোটি পিসের মধ্যে ১০ কোটি পিস কাপড় বিক্রি হয়ে যাবে। যার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
পোশাকের বাইরে ঈদের অন্যতম পণ্য হলো জুতো। ঈদে চাই নতুন জুতো। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় জুতোর দোকানগুলো বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। জুতোর বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে আছে চীনা জুতো। জুতোর পাশাপাশি ঈদে কসমেটিকস ইমিটেশন ও স্বর্ণালঙ্কারও কেনাবেচা হয় প্রচুর। তবে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের কারণে এবার স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
বৈশ্বিক মন্দা কেটে যাওয়ায় ঈদ বাজারের এ গতিশীলতা আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতিকে সচল রাখবে বলেই আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।