প্রাণী-ফুল

Posted by সাপ্তাহিক ২০০০ | বিবিধ | শনিবার 2 জানুয়ারি 2010 8:25 অপরাহ্ন ১৯ পৌষ ১৪১৬

অজগর

অজগর

১৯৬০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের গ্রামীণ বন ও বিল-ঝিল-হাওর পারের জঙ্গলে অজগর টিকে ছিল। আমি জীবনের প্রথম অজগরটি দেখি ১৯৬৪ সালে- আমার গ্রামের বিখ্যাত মল্লিকদের বাগানে। শিয়াল পাকড়াও করেছিল ওটা, শিয়ালটি কাঁদছিল। একই বছরে আমাদের বাগানের পাশের কুটোর পালার তলায় পাওয়া যায় এক জোড়া অজগর- ওখানে ডিম ছিল ৩৫টি। বাল্য-কৈশোর-তারুণ্যে মোট ৮ বারে ২৩টি বয়সী অজগর দেখি আমি বাগেরহাট জেলায়। সদ্য ডিম থেকে বেরুনো ২৮টি বাচ্চাকেও দেখেছিলাম আমার গ্রামের পাশের একটি হিন্দুপ্রধান গ্রামের নির্জন জলাভূমির পাশের বাঁশঝাড়ের গোড়ায়- মা-বাবা অজগরও ছিল ওখানে। বাচ্চাগুলো ছিল ২ ফুট করে লম্বা। বাবার হাত ধরে ভয়ে ভয়ে দেখেছিলাম।
ফকিরহাটের মিরখালি বিলের পারের ব্রাহ্মণরাঁকদিয়া গ্রামের একটি অশ্বত্থ গাছে ১৯৬৮-৬৯ সালের শীতকালে ৫টি অজগর দেখি- গাছের খোঁড়ল থেকে বেরিয়ে রোদ পোহাত ওরা- ডালে শরীর মেলে। ৬-৮ ফুট লম্বা ছিল প্রতিটি। হিন্দুরা পুজো দিত, মনসা দেবীর সাপ মনে করে।সদ্য ডিম থেকে মাথা বের করেছে। কেউবা বের করে দিয়েছে শরীরের আধখানা- কেউবা ডিম থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে- এমন দৃশ্য যেমন বাবার হাত ধরে দেখেছিলাম আমি, তেমনি তানভীর খানও তার বাবার হাত ধরে এমন ভয়ঙ্কর সুন্দর দৃশ্য দেখেছে দুবার- শ্রীমঙ্গলের সিতেশ বাবুর মিনি চিড়িয়াখানায়। ছবিও তুলেছে। সেই ছবিই ছাপা হলো এই লেখাটির সঙ্গে। ২৫ এপ্রিল, ২০০২ সাল ও ১২ মে, ২০০৪ সালে পোষা অজগরে ডিম পেড়েছিল- মা অজগরটি ডিম বেড় দিয়ে অনাহারে পড়ে ছিল টানা ৭৫ দিন। তারপরে বাচ্চারা বেরুতে শুরু করেছিল ডিম থেকে। দুবারই মোক্ষম মুহূর্তে আমি ও তানভীর যাই। ডিম দেখতে ঠিক রাজহাঁসের ডিমের মতো, একটু লম্বাটে বটে।
গালগল্পে মানুষ খাবার কথা শুনলেনও বাস্তবে বাংলাদেশে তা ঘটেনি কখনও! মূল খাবার ধেনোইঁদুর, বুনো খরগোশ, হরিণ শাবক, বন শূকর, শিয়াল, খাটাশ, বিভিন্ন রকম পাখি। অলস। ওত পেতে শিকার পাকড়াও করে, শরীরের পাকে ফেলে শিকারকে মেরে ফেলে। বিপদে পড়লে নারকীয় তা-ব কা- ঘটায়। ১৯৬৬ সালের শীতকালে ফকিরহাটের উত্তরের হাওরে পাখি শিকারের সময় অনিবার্য কারণে আমার বাবা একটি অজগরের হাঁ করা মুখের ভেতরে গুলি করেছিলেন। অজগরটি নারকীয় তা-বে আধাকাঠা হোগলাবন লোপাট করে ফেলেছিল মৃত্যুর আগে। আবাসভূমির মহাসঙ্কট ও খাদ্যাভাবে গ্রামীণ বন থেকে উধাও এখন নিরীহ-নির্বিষ এই বিশালকায় সাপটি। চামড়া মূল্যবান। সে কারণেও গেছে। অথচ মহাউপকারী সাপ এটি; কৃষকের মহাবন্ধু। বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনে প্রায়ই ধরা-মারা পড়ে। অনেক উপজাতি মাংস খায় এদের। হ্যাঁ, সুন্দরবনে এরা আছে মহাআরামে। অজগরের মাতৃ-পিতৃ স্নেহ দেখলে তাজ্জব হতে হয়। মা অজগর ছানা ফোটানের জন্য কী ভয়ানক কষ্টই না করে। লম্বায় অজগর হয় ১২-১৭ ফুট। ওজন ৬০-৭০ কেজি।
অজগরের ইংরেজি নাম ওহফরধহ বা জড়পশ ঢ়ুঃযড়হ.

লেখা : শরীফ খান, ছবি : তানভীর খান

কলাবতী

কলাবতী

গ্রামের পতিত ঝোপঝাড়ে, আবর্জনার ভাগাড়ে আপনাআপনিই কলাবতী জন্মে। এরা সর্বজয়া বা ক্যানা নামেও পরিচিত। বর্ণবৈচিত্র্য ও দীর্ঘ স্থায়িত্বের কারণে অবহেলিত এই ফুল এখন নাগরিক উদ্যানেও স্থান করে নিয়েছে। ইদানীং ঢাকার সড়ক বিভাজকগুলোতে বেশ সহজলভ্য। জিন প্রযুক্তির কল্যাণে আবিষ্কৃত হয়েছে নতুন নতুন জাত। এ কারণে আজকাল গৃহপ্রাঙ্গণ সজ্জায়ও কলাবতী ব্যাপক আদৃত। জন্মস্থান পাক-ভারত উপমহাদেশ ও সংলগ্ন দ্বীপাঞ্চল। তবে কিছু কিছু ভ্যারাইটি দণি আমেরিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বৃষ্টিবহুল অঞ্চলের স্বাভাবিক গাছ। প্রস্ফুটন মওসুম বর্ষা হলেও বর্ষার আগে পরে অনেকদিন ফুল থাকে। তবে শীতকালে ধড় শুকিয়ে অনেকটাই নির্জীব হয়ে থাকে। গাছ ১.৫ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। হলুদ ও লাল ফুলের স্বভাবিক রং। সাধারণত দুধরনের কলাবতী দেখা যায়; একটি অর্কিডের আর অন্যটি ট্রাস ফুলের মতো। প্রথমটির সবকটি ফুল মাথার ওপর থাকে, দ্বিতীয়টি ক্রমান্বয়ে নিচ থেকে ফোটে না। নতুন জাতের গাছগুলো ৪৫ থেকে ১৮০ সেমি পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ছোট জাতের গাছগুলো ৩০ সেন্টিমিটারের বেশি উঁচু হয় না। কলাবতীর রঙের দৌড় অনেক বেশি বিস্তৃত সাদা, ক্রিম সাদা, কালো, লাল, কমলা, হলুদ ও নানান মিশ্র রং। এ সব প্রধান রঙের মধ্যে রয়েছে বেশকিছু ভ্যারাইটি। এ সবের সঙ্গে আবার প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন রং। শুধু রংই নয়, পরিবর্তন হচ্ছে পাতার আকার, আকৃতি, গড়ন এবং বর্ণের।
কলাবতী কন্দজ গাছ। গাছ শুকিয়ে গেলেও মাটির নিচে কন্দ সতেজ থাকে। এ কারণে শীতঘুম শেষে কিংবা কোনও বৈরী অবস্থায় নিজেকে রা করতে পারে। পাতার গড়ন অনেকটা কলাপাতা কিংবা হলুদ বা শটি পাতার মতো। কলাবতী টবেও চাষযোগ্য। তবে ছায়া খুব বেশি পছন্দ নয়। ফুলদানি সাজাতে এ ফুলের জুড়ি নেই। ডাটিগুলো ২-৩ দিন সতেজ থাকে। বাগানে এদের দীর্ঘ বীথি করা যেতে পারে। তাতে রঙের বৈপরীত্য থাকলে তা হবে সত্যিই দারুণ উপভোগ্য। বৈজ্ঞানিক নাম ঈধহহধ রহফরপধ।
লেখা ও ছবি : মোকারম হোসেন