গোলটেবিল
শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন জরুরিআপেল মাহমুদ ও হারুনুজ্জামান
গত ২৯ ডিসেম্বর ২০০৯ সাপ্তাহিক ২০০০ ও আমাদের স্কুল প্রকল্প, কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের উদ্যোগে রিপোর্টার্স ইউনিটির ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সকলের অংশগ্রহণে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাপ্তাহিক ২০০০ সম্পাদক মঈনুল আহসান সাবেরের পরিচালনায় এ গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয়, কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডেভিড হ্যাম্ফ্রে, সুভাষ সিংহ রায়, ব্যারিস্টার জাকির আহমেদ, মীর মেহেদী হাসান টিটু, পঙ্কজ সাহা, আরিফুল ইসলাম, দিদারুল আলম, মারুফা আজিজ খান, কামাল আহমেদ, কুন্তল বড়–য়া ম-ল, সাইদুর রহমান, শশাঙ্ক সাদীসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন কনসার্নের অ্যাডভোকেসি প্রধান এম আনোয়ার হোসেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী বলেন, সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষার ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। শিক্ষানীতির খসড়াও চূড়ান্ত করেছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশ সফলভাবে সম্পূর্ণ করা হয়েছে। বর্তমানে কনসার্ন শিক্ষার জন্য কাজ করছে। এসএমসি ও পিটিএ যেন আরও ভালোভাবে অগ্রসর হয় সেই দিকে সরকার গুরুত্ব দেবে। তিনি প্রকল্পের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এই প্রকল্পে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। তাদের অংশগ্রহণ যেন সুনিশ্চিত হয় সেই দিকটি দেখতে হবে। উপবৃত্তির মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়ার প্রতি কীভাবে আগ্রহী করা যায় সরকার সেই চেষ্টা করছে। এ ছাড়া তিনি মায়েদের সচেতনতা বাড়াতে এবং স্কুলে বাথরুম ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য সরকারের উদ্যোগের কথা জানান।
মূল প্রবন্ধে কনসার্নের এম আনোয়ার হোসেন বলেন, শরীয়তপুর জেলার বেদেরগঞ্জ ও গোসাইরঘাট উপজেলায় কাজ করেছি। এখানে ১৫০টি নিবন্ধিত স্কুল আছে, যার মধ্যে ১২০টি সরকারি। এই প্রজেক্টের মেয়াদ ২০০৬ সালের অক্টোবরে শুরু হয়েছে এবং শেষ হবে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে। আমাদের প্রজেক্টের উদ্দেশ্য ছিল শিশুরা যেন স্কুলে যায় এবং ঝরে না পড়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে। এখানে এটি বাস্তবায়নের জন্য ৪টি প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে। তিনি আরও বলেন, এখানে কাজ করতে গিয়ে আমরা যে বিষয়গুলো দেখেছি তার মধ্যে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে মায়েদের সম্পৃক্ত করতে হবে, সরকার ও জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
স্কুলে শিক্ষার্থীদের মননশীলতা বিকাশের ব্যাপারে বলেন, শিক্ষার্থীদের মননশীলতা বিকাশের জন্য বিনোদন দরকার এবং আমাদের প্রজেক্টের মাধ্যমে তাদের বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করি। নিচের কাসের ছাত্ররা যেন এটা নিয়মিত করতে পারে সেই দিকটাও লক্ষ্য করা হচ্ছে।
স্কুল কমিটিতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বলেন, বর্তমানে স্কুলে ৭৩ শতাংশ দরিদ্রের সন্তান কিন্তু মাত্র ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী কমিটিতে অংশগ্রহণ করছে। এখানে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
স্কুলে বৃত্তি প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, স্কুলে ১০০ শতাংশ গরিব শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে না। ৮৫ শতাংশ উপস্থিত হলে বৃত্তি দেওয়া হয় কিন্তু গরিব শিক্ষার্থীরা উপস্থিতি কমের কারণে বৃত্তি পাচ্ছে না।
অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার জাকির আহমেদ বলেন, আমাদের অভিভাবকরা অসচেতন। যারা সচেতনতার জন্য কাজ করছে, তারা ভালো কাজ করছে। অশিক্ষিত জাতি দিয়ে আমরা কোনও লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। শিক্ষার্থীরা যেন স্কুলে আসে সে জন্য বাবা-মাকে সচেতন করতে হবে। আর্থিক অভাবের কারণে বাবা-মা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারছে না। তাই তাদের দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এ জন্য শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য ও উপবৃত্তির মাধ্যমে আগ্রহী করতে হবে।
সোনালী ব্যাংকের পরিচালক সুভাষ সিংহ রায় বলেন, এ সরকার নির্বাচনে জনগণের ব্যাপক সমর্থনের পর নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষানীতি কেমন হবে তা স্পষ্ট করে। কিন্তু বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি তাদের অবহেলা রয়েছে। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যত সরকার এসেছে তারা শিক্ষার উন্নয়নের নামে ফাজলামি করেছে। বর্তমানে শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষার মূল সমস্যা দরিদ্রতা ও শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য। আমাদের সমাজে শিক্ষিত শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা পাচ্ছে না। আমরা প্রাথমিক শিক্ষা খাতের পাশাপাশি অভিভাবকদের গুরুত্ব দিই না। ফলে তাদের সন্তানদের স্কুলে আনা যাচ্ছে না। এখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে গুণমান মান উন্নয়ন দরকার।
সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় বলেন, আমরা স্কুলে ম্যানেজমেন্ট কমিটির ক্ষেত্রে রাজনীতি করি। যারা কমিটিতে থাকার কথা তাদের না রেখে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সদস্য করা হয়। তাই যারা শিক্ষার উন্নয়নে সম্পৃক্ত তাদের কমিটিতে রাখার ব্যাপারে নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলে বৃত্তির ব্যবস্থা থাকলেও গরিব শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পাচ্ছে না। তারা যেন সঠিকভাবে পায় সেই দিকটিও দেখা দরকার। চরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির পাশাপাশি স্কুলগুলো উঁচুতে নির্মাণ করতে হবে, যাতে বন্যার সময় সমস্যার সৃষ্টি না হয়।
সেভ দি চিলড্রেনের দিদারুল আলম বলেন, এখানে হতদরিদ্রদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শুধু অংশগ্রহণ নয় তারা যেন প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে সেই দিক দেখতে হবে। আমাদের মায়েরা তার সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে জমিতে কাজে পাঠায়। এখানে অভিভাবককে অসচেতন বললে ভুল হবে। কারণ অভিভাবক অর্থনৈতিকভাবে সচেতন। তারা যেন শিক্ষার ক্ষেত্রে সচেতন হয় সেই দিকে সহযোগিতা করতে হবে।
বৈঠকে শশাঙ্ক সাদী বলেন, শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নের জন্য মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে সে মোতাবেক কাজ করতে হবে। তবে কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করছেÑ যেমন দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্কট, যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নয়ন ইত্যাদি। এ বিষয়গুলোতে সবাইকে নজর দিতে হবে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অনেক সময় শিক্ষকরা মনোযোগী হন না, কারণ তাদের বেতন সঠিকভাবে দেওয়া হয় না। তাই তাদের বেতন সুনিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
কেয়ার বাংলাদেশের মারুফা আজিজ খান বলেন, এসএমসি প্রজেক্টের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা চাই যে সব মহিলা কথা বলতে চায় না তাদের সচেতন করে নেতৃত্বে নিয়ে আসতে।
অনুষ্ঠানে প্রজেক্ট ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম বলেন, যারা শিক্ষার জন্য স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করছে তারা আগে জানত না কীভাবে শিক্ষাদান করতে হবে। আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যাতে তারা সঠিকভাবে শিক্ষা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক ঘাটতি দেখা দিলে নিজেরাই শিক্ষকের ব্যবস্থা করছে। মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পাশাপাশি কীভাবে মায়েদের সচেতন করা যায় সেই চেষ্টা করছি।
সাবেক ছাত্রনেতা ও শিক্ষক প্রতিনিধি মীর মেহেদী হাসান টিটু বলেন, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ৮টি বিষয়ের মধ্যে ৫টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাকি তিনটির দেওয়া হয় না। এই তিনটি বিষয়ের সমান গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিকে সচেতন করতে হবে। প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা পঙ্কজ সাহা বলেন, স্কুলগুলো রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার।


