মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হবে কবে?২০০০ প্রতিবেদন
যেন এই মৃত্যুর মিছিল কখনও বন্ধ হবে না। শিপইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় একের পর এক বিস্ফোরণ, ফলাফল শ্রমিকদের মৃত্যু। অথচ জাহাজে কোনও বিস্ফোরক দ্রব্য নেই, জাহাজ কাটার আগে এই মর্মে বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। সেই সবের তোয়াক্কা করেন না শিপইয়ার্ডের মালিকেরা। ফলে জীবন প্রদীপ হাতে নিয়ে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। সরকারের দৃষ্টিও এক্ষেত্রে উদাসীন। না হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় কীভাবে?
সর্বশেষ গত ২৬ ডিসেম্বর সীতাকু-ের মাদাম বিবিরহাটের ‘রহিম স্টিল’ নামের একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের তেলবাহী পুরনো জাহাজ (অয়েল ট্যাঙ্কার) ‘এমটিএ-গেইট’ নামের একটি জাহাজ কাটার সময় প্রচ- বিস্ফোরণ ও অগ্নিকা-ে ৪ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হন। বিস্ফোরিত হওয়া জাহাজটি ছিল সাড়ে ১৪ হাজার টন জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষমতাসম্পন্ন। আড়াই মাস আগে জাহাজটি কাটা শুরু হয়। এর মধ্যেই জাহাজটির বেশিরভাগ অংশ কাটা সম্পন্ন হয়েছিল। এ দিন জাহাজটির শেষ দিকের অংশ কাটার কাজ চলছিল। সকাল পৌনে দশটার সময় জাহাজের শেষের অংশ কাটার জন্য অন্যান্য দিনের মতো যথারীতি কাটারম্যান, কাটার হেলপার ও অন্য শ্রমিকরা ইয়ার্ডে আসেন। গ্যাসশিখা দিয়ে জ্বালানি তেলের তলানিযুক্ত একটি বিশালাকৃতির ট্যাঙ্ক কাটা শুরু হলে হঠাৎ প্রচ- শব্দে সেটি বিস্ফোরিত হয়। তখন ট্যাঙ্কের ওপর কর্মরত শ্রমিকরা বাইরে ছিটকে পড়েন। শ্রমিকদের অনেকের বিভিন্ন অঙ্গ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিস্ফোরণস্থলের ২৫-৩০ ফুট দূরের কাদায় ছিটকে পড়া লোকজনের মৃতদেহ উদ্ধার করার মধ্যেই প্রথম দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখতে হয় এবং আগুন আয়ত্তে আনতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের অনেক সময় লেগে যায়।
নিয়ম অনুযায়ী একটি জাহাজ কাটার আগে সেখানে কোনও বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ নেই মর্মে বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে সনদ নিতে হয়। কিন্তু এই জাহাজটি কাটার আগে এ ধরনের কোনও সনদ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক আবদুস সাত্তার নিজেই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, সনদ না দিলেও জাহাজটি কাটার আগে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লোকজন এসে দেখে গেছেন। তারা জাহাজের পেছনের অংশ কাটার জন্য নিষেধও করেছিলেন। কিন্তু সেই নিষেধ মানা হয়নি। যার নির্মম শিকার হলো নিরীহ শ্রমিকরা। এখন এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?
বাংলাদেশে শিপ ব্রেকিং শিল্প অনেক প্রসার লাভ করেছে। শিপইয়ার্ড মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিএ) মোট সদস্য সংখ্যা ১শ ২৯। এর মধ্যে শুধু সীতাকু- উপকূলে ৩৬টি ও সীতাকু-ের ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা জুড়ে ৮৭টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বেশিরভাগ শিপইয়ার্ডেরই কোনও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে জাহাজ এনে বেশিরভাগ শিপইয়ার্ড সৈকতেই তা কাটে এবং লোহা হিসাবে বিক্রি করে। বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পে কাজ করে প্রায় চার লাখ শ্রমিক-কর্মচারী। জাহাজ ভাঙা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী গত ২০ বছরে সীতাকু-ের শিপ ইয়ার্ডগুলোতে কাজ করতে গিয়ে প্রায় ৪শ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ছয় হাজারেরও বেশি শ্রমিক।
শুধু মৃত্যুই নয়, যেসব শ্রমিক শিপ ইয়ার্ডে কাজ করেন তারা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করেন। কর্কশ শব্দ, অক্সি-অ্যাসিটিলিন গ্যাস কাটারের তীব্র আলোর বিচ্ছুরণ, বাতাসে লৌহকণাসহ ধূলিবালিময় বিষাক্ত পরিবেশে প্রায় কোনও ধরনের নিরাপত্তা ছাড়াই শ্রমিকরা জাহাজ ভাঙা শিল্পে কাজ করে। মালিকেরা বেশি মুনাফার লোভে শ্রমিকদের কাজ করার জন্য আধুনিক উপকরণ কেনেন না। এ ছাড়া শিপইয়ার্ড এলাকার বাতাসে বিপজ্জনক মাত্রায় অ্যামোনিয়া ও কোরোফুরো কার্বন থাকে। আর প্রতিটি জাহাজ থেকে কমপক্ষে পাঁচ টন করে বিষাক্ত বর্জ্য বের হয়ে থাকে। এই বর্জ্যরে সংস্পর্শে এসে জাহাজ ভাঙা শ্রমিকদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাহাজ ভাঙা কারখানায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) ২০০২ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ হাইকোর্টেও একটি বেঞ্চ জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের উপকূলে কোনও জাহাজ আনতে হলে আগেই দূষণমুক্ত করে আনতে হবে। শিপইয়ার্ডগুলোকে পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে হবে। বন্দরে কয়টি জাহাজ আসছে, তাতে কী ধরনের বর্জ্য রয়েছে, তা সুপ্রিমকোর্টকে জানাতে হবে। কিন্তু কার্যত হাই কোর্টের রায়কে উপেক্ষা করে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই অনেক শিপইয়ার্ড তাদের কাজ চালিয়ে আসছে।
অনেক জাহাজ কাটার সময় সৈকত ও সাগরে মারাত্মক রাসায়নিক দূষণও ঘটে থাকে। জাহাজ ভাঙা এলাকায় ১১টি বিষাক্ত ধাতব ও রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জাহাজভাঙা শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলবর্তী এলাকাগুলো মারাত্মক পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের কারণেই ফৌজদারহাট-ভাটিয়ারি এলাকায় ২১ প্রজাতির মাছ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উপকূলের সবুজ বেষ্টনী নির্মূল করে শিপইয়ার্ড তৈরি হচ্ছে।
আরও আশঙ্কার কথা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সদস্য দেশগুলোকে ২০১২ সালের মধ্যে ইউরোপের ২ হাজার ১শ ৭২টি পুরনো ও বিষাক্ত জাহাজ বিক্রি করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। এ সব জাহাজের অন্যতম ক্রেতা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিকরা। মারাত্মক পরিবেশ দূষণের আশঙ্কায় বিশ্বের বেশির ভাগ পুরনো জাহাজের ক্রেতা দেশ আইন করে এমন জাহাজ কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বাংলাদেশে সরকারের এ বিষয়ে উদাসীনতা পরিবেশকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন করবে।
বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলেছেন। তিনি পরিবেশ সংরক্ষণে অতীতের যে কোনও সময়ের চাইতে সরকারের আরও বেশি সোচ্চার হওয়ার কথা বলেছেন। শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য একটি নীতিমালা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যে এ সব যেন কথার কথা না হয়ে যায়। কথাকে কাজে পরিণত করতে হবে।

