বন্দি গোলাম আযম : মরিয়া জামায়াত ফজলুর রহমান
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের প্রধান ‘থিংকট্যাঙ্ক’ গোলাম আযমকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ১১ জানুয়ারি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি নেতারা যখন বঙ্গভবনে সংলাপ করছিলেন রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমানের সঙ্গে তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দিতে আসা জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে গ্রেফতার করে জেলে আটক রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। এ গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ দিনটি পুরো বাঙালি জাতির জন্য অনন্য হয়ে উঠেছে। গোলাম আযমের গ্রেফতারে দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছে। তারা দ্রুত বিচার শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি করেছে।
১৯৭১ সালে গোলাম আযম, তার দল জায়ায়াতে ইসলামী যে অপরাধ করেছে তার তথ্যপ্রমাণ ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। গোলাম আযম যে সে সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এদেশ, এদেশের স্বাধীনতা আর মানুষের বিপক্ষে কাজ করেছে তার সচিত্র প্রমাণ রয়েছে জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের পাতায় পাতায়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালায় এদেশে তার প্রধান সহায়ক শক্তি ছিল জামায়াত। তাই স্বাধীনতার পর থেকেই নানাভাবে গোলাম আযমের শাস্তির দাবি উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, গেরিলাযোদ্ধা রুমীর মা জাহানারা ইমাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে নব্বইয়ের দশকে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠন করে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। গোলাম আযমসহ বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধীর শাস্তির জন্য ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে প্রতীকী গণআদালত। সেই আদালত একাত্তরে গোলাম আযমের মানবতাবিরোধী ভূমিকার জন্যই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায়। বিএনপি তখন গোলাম আযমের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো গ্রহণ করেইনি, উল্টো জাহানারা ইমামসহ গণআদালতের আয়োজক ২৪ বিশিষ্ট নাগরিকের নামে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলা করে। মুক্তিযোদ্ধা রুমী, শত মুক্তিযোদ্ধার মা জাহানারা ইমাম রাষ্ট্রদ্রোহের দায় মাথায় নিয়েই পরপারে চলে গেছেন। তারপর নিকট অতীতে গোলাম আযম এবং তার দল জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অনেক উত্থান ঘটেছে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার করা হয়েছে জামায়াতকে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদ জামায়াত নেতা যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী হয়েছে। তাদের গাড়িতে, বাড়িতে উড়েছে ৩০ লাখ মানুষের রক্তে অর্জিত লাল-সবুজ পতাকা। প্রকাশ্য সভায় মুক্তিযোদ্ধার গায়ে লাথি মেরেছে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে আওয়ামী লীগকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে অঙ্গীকার তারা করে নির্বাচনী ইশতেহারে তা বাস্তবায়নের সুযোগ হয়। তাদের হাতে থাকে সেই অমোঘ অস্ত্র নতুন প্রজন্মের প্রায় ৩ কোটি ভোটারের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে দেয়া রায় । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তা আবারো ব্যক্ত হয়েছে নতুন বছরের ৫ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে। যে কোনো মূল্যে তারা এ বিচার করবেন। যারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে, বিচার বানচালের ষড়যন্ত্র করছে তাদের সাবধান করে দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এই বিচার হবেই।
গোলাম আযমের গ্রেফতারে যুদ্ধাপরাধীদের দাম্ভিকতার অবসান হয়েছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। গোলাম আযমের গ্রেফতারের খবর জানাতে সেদিন ফোন করেছিলাম কবি নির্মলেন্দু গুণকে। তিনিও সৈয়দ আশরাফের মতো একটি বিষয় স্পষ্ট করে বললেন, অপরাধ করে তার শাস্তি না হলে সেই সমাজে মানবতার কোনো চিহ্ন থাকে না। যে সমাজে অপরাধী অবাধে ঘুরে বেড়ায়, দম্ভোক্তি করে তাকে আর যাই বলা হোক ‘সভ্য’ বলা যায় না। কয়েকটি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলে গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার বেশ ফলাও করে দেখানো হয়েছে। গুণ এতে বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। একজন যুদ্ধাপরাধীর সাক্ষাৎকার কেন গণমাধ্যমে এমন করে প্রচার করতে হবেÑ এটা ছিল তার জিজ্ঞাসা।
গোলাম আযমের গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন নিউজ এজেন্সিগুলোতে দেশ-বিদেশ থেকে মন্তব্যধর্মী লেখা ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ হতে থাকে। সেখানে কেউ কেউ দিনটিকে বাঙালির ঈদের দিন বলেও আখ্যা দেন। ফেসবুক, ব্লগে আসতে থাকে নানা মন্তব্য। গোলাম আযমসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যারা দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করেছেন তাদের একজন লেখক শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, গ্রেফতারই শেষ কথা নয়। বিচার করে তার শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।
গোলাম আযমকে যেদিন গ্রেফতার করা হয় সেদিন জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা প্রতিবাদ মিছিল করেছে। জামায়াত-শিবির জঙ্গি মিছিল করেছে পল্টনে। পরের দিন জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা দৈনিক বাংলার মোড়ে অতর্কিতে হামলা করে রক্তাক্ত করেছে এক পুলিশ অফিসারকে। জামায়াত তার অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া। এ নিয়ে আরো বিধ্বংসী ঘটনা তারা ঘটাবে, আশঙ্কা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন।
৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডের সমাবেশ থেকে ১২ মার্চ ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া। ঢাকায় সেদিন মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপি-জামায়াতের। কর্মসূচি শান্তিপ্রিয় হবে ঘোষণা দিয়েছেন খালেদা জিয়া। বাধা দিলে তার দায় দায়িত্বও সরকারকে বহন করতে হবে হুশিয়ার করেছেন তিনি। চট্টগ্রামের সমাবেশে তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনে যে সংলাপ হচ্ছে তা লোক দেখানো। দলীয় সরকারের অধীনে থাকলে ইসি কখনই কিছু করতে পারবে না। সংলাপ দিয়ে কিছুই হবে না, কারণ সবকিছুই তারা আগে ঠিক করে রেখেছে। খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ নতুন ফর্মুলায় আগামী নির্বাচন করতে চাচ্ছে। তারা ক্ষমতায় আসবে। আর এরশাদ হবে বিরোধী দল। কিন্তু আওয়ামী লীগ-এরশাদের নির্বাচন এদেশে হবে না। শেখ হাসিনা জাতীয় পার্টির ঋণ শোধ করতে চাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির সংলাপকে ‘লোক দেখানো’ বলেই তাতে অংশ নিয়েছেন খালেদা জিয়া। আলোচনার এজেন্ডা ছিল ইসি পুনর্গঠন। বিএনপি বলেছে, তত্তাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কথা। এই দাবিতে বিএনপি অনড়। এই দাবি নিয়েই ১২ মার্চের কর্মসূচি। তার সঙ্গে কি জামায়াতের টিকে থাকার বিষয়টি যুক্ত হবে?
১২ মার্চকে ঘিরে রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় বড় কিছু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রমাণ নিকট অতীতে দিয়েছে বিএনপির প্রধান মিত্র যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী। ১৮ ডিসেম্বর জামায়াত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাণ্ডব চালায়, বোমাবাজি করে, বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করে। পুলিশের ওপর চড়াও হয় তারা। এর আগে কয়েকবার পল্টন আর কাকরাইল এলাকায় চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েছে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা।
এর আগে গত ৩ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ অবলম্বন ও বিচার বন্ধের দাবি জানিয়ে বিএনপি জামায়াতের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সমাবেশেও খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন জামায়াত নেতারা।
গোলাম আযম বন্দি। তার আগে বন্দি হয়েছেন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ পাঁচ শীর্ষ নেতা। আটক আছেন বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী)। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। সাকা চৌধুরী ও জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন হয়েছে। তাদের অপরাধের সাক্ষীরা হাজির হচ্ছেন ট্রাইব্যুনালে।
এ পরিস্থিতিতে মরণ কামড় দিতে চায় জামায়াত। তারা দেশে-বিদেশে মিত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর বিএনপিকে কাজে লাগাতে চাইছে সর্বোচ্চ। চট্টগ্রামের জনসভায় বিএনপির চেয়ে বেশি ছিল জামায়াতের নেতাকর্মী। তাই ১২ মার্চকে ঘিরে এত উৎকণ্ঠা গোয়েন্দাদের। গত বছর মার্চে এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, কেবল বিরোধী দল নয়, খোদ সরকারের মধ্যেও একটি অংশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার তৎপরতা চালাচ্ছে। ১৯ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ¯^রাষ্ট্র সচিব আবদুস সোবহান সিকদার, পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস ও আইন সচিব শহিদুল করিমকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়।
‘মানবতাবিরোধীদের বিচার ¯^াধীনভাবে করা প্রসঙ্গে’ শিরোনামের গোপন ওই প্রতিবেদনে ১৭টি পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তার একটিতে বলা হয়েছে, বিএনপির একটি অংশ, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্ররা অনেক আগে থেকেই কোটি কোটি টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছে। তারা এ বিচারের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে জনমত সৃষ্টির জন্য ১৯টি বই প্রকাশ করেছে। ৮টি বই প্রকাশের অপেক্ষায়। ২টি আরবি ও ৪টি ইংরেজিতে নতুন বইয়ের পাÊুলিপি তৈরির কাজ চলছে। বিচার শুরু হওয়ার আগে পরে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, দুষ্কৃতকারীরা আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের বিমান ছিনতাই করে যাত্রীদের জিম্মি করে আটককৃতদের মুক্তি দাবি করতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের জন্য নিরাপদ দেশ হতে পারে মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো দেশ। এ বিষয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা নজরদারিসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পাইলটসহ বিমান ক্রুদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, পারিবারিক ইতিহাস খতিয়ে দেখারও তাগিদ রয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জঙ্গিসহ নানা ধরনের অপরাধ চক্র জেলখানায় আছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তারা যে কোনো আত্মঘাতী ঘটনা ঘটাতে পারে। আটককৃতদের আদালতে আনার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদও দেয়া হয়েছে। ‘সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে সবই সম্ভব’ মন্তব্য করা হয় এ প্রতিবেদনে।
বিভাগ: প্রতিবেদন


