banner ad

আরবান স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এ কী হাল
ফয়জুল সিদ্দিকী

নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৯৮ সালে নগর স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প চালু হয়। সেবা প্রদানের

কার্যক্রম শুরু হয় ২০০০ সাল থেকে। ২০০৫ সালের জুনে প্রথম প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে একই বছরের জুলাই থেকে দ্বিতীয় মেয়াদে কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলে তা এখনো চলছে। এই প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৫৩১ কোটি টাকা। সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সহযোগী হিসেবে নেয়া হয় বিভিন্ন পেশাদার ও অপেশাদার এনজিওকে। কিন্তু বাড়েনি সেবার মান। নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কখনো কাজ করেছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এজেন্ট হয়ে। প্রচারণার নামে এরা ব্যয় করেছে

কোটি কোটি টাকা। অবকাঠামোগত সঙ্কট, অদক্ষ জনবল, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনায়

জর্জরিত চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো।

 

‘সেবার আলো সবার কাছে’ এই স্লোগান ও রংধনু মনোগ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সিকিভাগও অর্জন করতে পারেনি। শর্ত অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রে একজন চিকিৎসক, একজন সহকারী চিকিৎসক, একজন কাউন্সিলরসহ ১৯ জন কর্মচারী থাকার কথা। সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ কেন্দ্রেই অর্ধেক জনবল নেই। ফলে সেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের আহবায়ক করে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী চারজন ডিপ্লোমা চিকিৎসক, চারজন সার্ভিস প্রমোটর, চারজন বহিরাঙ্গন কর্মী প্রত্যেক ওয়ার্ডে থাকবে। তাদের কাজ হলো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে বিশেষ করে বস্তি, অনুন্নত এলাকায় সপ্তাহে একদিন করে চিকিৎসা দেয়া। স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদনগুলোতে শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজননসেবা, মায়ের যত্ন, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, সংক্রমণ ব্যাধি, চক্ষু রোগ, এইডসসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা স্বল্পমূল্যে দেয়ার কথা। পাশাপাশি দরিদ্রদের ফ্রি চিকিৎসা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন বিশেষ লালকার্ড ছাড়া সেবা পাওয়া যায় না।

 

নানা অভিযোগ

অবিভক্ত-ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৬২ নং ওয়ার্ডের বসিন্দা লায়লা বানু, পায়ের সেলাই ড্রেসিং করাতে গিয়ে তা না করিয়েই ফিরে আসেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ড্রেসিংয়ের যন্ত্রপাতি মরিচা পড়া ছিল। তাই তিনি ডেসিং করাননি। অভিযোগ রয়েছে, মাতৃসদনগুলোতে নরমাল ও সিজারিয়ান প্রসূতি সেবার ব্যবস্থা থাকলেও ঘুষ ছাড়া এই সেবা পাওয়া যায় না। আজিমপুর মাতৃসদন সেবা গ্রহণকারী এক গৃহবধূর স্বামী বাবলু জানান, সেবা নিতে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। এছাড়া উপায় ছিল না। অন্যখানে গেলে আরো বেশি টাকা লাগত। রোগীর শারীরিক অবস্থাও ভালো ছিল না। আগারগাঁও বস্তির হাসিনা বেওয়া, মইনুল ইসলামসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন, অনেক সময় নগর স্বাস্থকেন্দ্রে সুচিকিৎসা হয় না। ফলে রোগীদের অনেকেই ডায়রিয়া, আমাশয়ে ভুগছেন। শেওড়াপাড়ার নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে আসা বিলকিস জানান, কেন্দ্রগুলোতে জন্মবিরতির ওষুধ পাওয়া যায় না। পুরুষদের ভেসেকটমি করানোর পর লুঙ্গি ও পাঁচশ টাকা, নারীদের লাইগেশন করানোর পর শাড়ি ও পাঁচশ টাকা পাওয়ার কথা থাকলে তা অনেক সময় পাওয়া যায় না।

 

এনজিওনির্ভর নগর ¯^াস্থ্যকেন্দ্র

অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৬৩টি আরবান স্বাস্থ্যকেন্দের সবই পরিচালিত হয় এনজিওর মাধ্যমে। এনজিওগুলো হলো সীমান্তিক, নারীমৈত্রী, মেরিস্টোপস ক্লিনিক সোসাইটি,  প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ ওমেন্স হেলথ কোয়ালিশন। জানা যায়, আরবান স্বাস্থ্যকেন্দ্র সরকারের পাশাপাশি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), ডিএফআইডি, সিডা ও ইউএনএফপিএ-এর অর্থায়নে পরিচালিত হয়ে থাকে। তবে নানান দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ওমেন্স হেলথ কোয়ালিশনকে এই প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কোয়ালিশনের এক পরিচালক জানান, ঘটনাটি সত্য এবং এর সঙ্গে তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও অর্থ পরিচালক জড়িত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার এবং সিডাকে টাকা ফেরত দেয়া হয়।

 

অবকাঠামোগত সঙ্কট ও অদক্ষ জনবল

নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হওয়ার অন্যতম কারণ নগর ¯^াস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত সঙ্কট ও অদক্ষ জনবল কেন্দ্রগুলোয় নেই পর্যাপ্ত ওষুধসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় ৬৩টি নগর ¯^াস্থ্যকেন্দ্র, ১০টি মাতৃসদন কেন্দ্র ছাড়াও রয়েছে একটি মহানগর জেনারেল হাসপাতাল ও মহানগর শিশু হাসপাতাল। সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ ঢাকার নয়াবাজরে অবস্থিত ৫০ শয্যাবিশিষ্ট মহানগর জেনারেল হাসপাতালে কোনো চিকিৎসাই হয় না। এখানে নেই প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স কিংবা যন্ত্রপাতি। একজন ডাক্তার বলেন, শুধু যন্ত্রপাতির অভাবে ডেন্টাল, চক্ষু এবং প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তিনি আরো বলেন, বিশেষজ্ঞ সার্জনের অভাবে বেশিরভাগ সময়ই অপারেশন থিয়েটার ব্যবহৃত হয় না। রোগীদের অন্য সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।

মহানগর শিশু হাসপাতালের চিত্রও অনেকটা একই রকম। চকবাজারের এই শিশু হাসপাতালটিতে ৮ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরিবর্তে মাত্র তিনজন দিয়ে কাজ চলছে।

 

বেসরকারি হাসপাতালের এজেন্ট

নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন সেবাগ্রহীতা সাপ্তাহিক ২০০০কে অভিযোগ করেন, ডাক্তাররা চিকিৎসার নামে দেয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনিস্টক সেন্টারের নাম বলে থাকেন। তাদের কথামতো ওইসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করালে তারা রিপোর্ট দেখতে চান না। অনেক সময় পরীক্ষার রিপোর্ট ভুল বলে পুনরায় তাদের নির্দেশনা মতো নির্দিষ্ট ডায়াগনিস্ট সেন্টার থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়।

আজিমপুর মাতৃসদনে চিকিৎসা নেয়া রহিমা তার ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে বলেন, পরীক্ষাগুলো পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করতে বলা হয়েছে। চিকিৎসক মামুন জানান, রোগী জানতে চেয়েছিল পরীক্ষাগুলো কোথায় করালে ভালো হয়। তাই তিনি পপুলারে পরীক্ষা করাতে বলেছেন। ঢাকার একটি ¯^নামধন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একজন ব্যবস্থাপক এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। এভাবে সবগুলো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তাররা বেসরকারি হাসপাতালের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।

 

পুরুষদের জন্য বৈকালিক সেবা

আরবান স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিশেষ ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এনজিও নির্ভর এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম অনুযায়ী রাতে খোলা থাকবে। কারণ অধিকাংশ পুরুষ দিনে কর্মব্যস্ত সময় কাটায়। তাই রাতে তাদের পক্ষে চিকিৎসা নেয়া সহজ। অথচ কোনোটিই নিয়মিত খোলা থাকে না। কর্তৃপক্ষের কোনো তদারকি নেই এসব কেন্দ্রে।

 

নেই জনসচেতনতার ব্যবস্থা

ঢাকার অনেক নাগরিকই জানেন না এই আরবান স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর কথা। অথচ সেবার আলো সবার কাছে পৌঁছে দিতেই আরবান স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনের তথ্য মতে, মাসে গড়ে ৩২৪ জন রোগী সেবা নিয়েছে এক একটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। অথচ এক কোটির বেশি বাসিন্দার এই ঢাকায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ার কথা। ঢাকার একাধিক বস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অর্ধেকের বেশিই জানে না সরকার কর্তৃক পরিচালিত এই নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র সম্পর্কে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল প্রচারণার অভাবে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সম্পর্কে মানুষের এমন ধারণা বিরাজ করছে।

 

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভগের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মাত্র দুদিন আগে তিনি এই দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি দাবি করেন আরবান স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদনসহ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভালোই চলছে। তবে কেন এত অভিযোগ এমন প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারেননি তিনি। তিনি জানান, ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগে ভাগ হওয়ায় আরবান স্বাস্থ্যকেন্দ্র ৬৩ থেকে ৬৫টি করা হচ্ছে। পুরুষদের জন্য সান্ধ্যকালীন চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি সঠিক জবাব দিতে পারেননি। তিনি নিজেও জানেন না কতটি কেন্দ্র কোন কোন সময় খোলা থাকে কিংবা আদৌ খোলা থাকে কি না। ৫৩১ কোটি টাকার এই প্রকল্পটিকে এখনো সাধারণ নাগরিকদের নাগালের বাইরে রাখা হয়েছে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। তিনি স্বীকার করেন নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর প্রচারাভিযান দরকার। মহানগর হাসপাতালে অপারেশনের ব্যবস্থা থাকলেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম এখনো পাস হয়নি। তাই জটিলতা এড়াতে অনেক পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। ডাক্তাররা বেসরকারি ডায়গনস্টিক সেন্টারের এজেন্ট হিসেবে কমিশনে কাজ করে। এ বিষয়ে তিনি জানান, ডাক্তারদের নৈতিক স্খলনের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। তবে এমন অভিযোগ পেলে প্রমাণসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিভাগ: প্রতিবেদন

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.