সার্কাসের সাত-পাঁচ শানজিদ অর্ণব
সার্কাস বলতে বোঝায় একটি ভ্রাম্যমাণ দলকে, যেটিতে থাকেন ভাঁড়, অ্যাক্ট্রব্যাট, বাজিকর, সংগীতশিল্পীসহ নানা ধরনের স্ট্যান্ট প্রদর্শক। অবশ্য এসব মানুষের দেখানো প্রদর্শনীকেও সার্কাস বলা হয়। পুরো প্রদর্শনীর নিয়ন্ত্রক বা সঞ্চালককে বলা হয় রিং মাস্টার। সার্কাস প্রদর্শনের জন্য প্রথাগতভাবে ব্যবহার করা হয় ৪২ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তাকার ক্ষেত্রকে। এই ক্ষেত্রের বাইরে থাকে দর্শকদের বসার আসন। ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের শুরুতে সার্কাসের প্রদর্শনী শুরু হয় ক্যানভাসের তলায় এবং সাম্প্রতিক প্রদর্শনী চলে প্লাস্টিকের তাঁবুর তলায়, যাকে বলা হয় ‘দ্য বিগ টপ’। সার্কাস শব্দটি ইংরেজি অভিধানে প্রথম যুক্ত হয় চতুর্দশ শতকে। শব্দটি এসেছে লাতিন সার্কাস থেকে, যার অর্থ বৃত্ত বা রিং।
প্রাচীন রোমের সার্কাস কথা
প্রাচীন রোমে সার্কাস বলতে বোঝাত একটি ভবনকে, যেখানে ঘোড়া এবং রথদৌড়, বাজিকর, যোদ্ধাদের লড়াই, বাজিকর এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণীদের খেলা দেখানো। ধারণা করা হয় রোমানদের সার্কাসের এই প্রচলন গ্রিকদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। রথযাত্রা এবং প্রাণীদের প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে ছিল গ্রিকদের ঐতিহ্যগত আকর্ষণ। রোমান সার্কাসে মানুষদের পদযর্মাদা অনুসারে আসন নির্দিষ্ট থাকত। প্রাচীন রোমে সার্কাস ছিল একমাত্র প্রদর্শনী, যেখানে নারী ও পুরুষ আলাদা করা হতো না।
প্রথম রোমান সার্কাস বা স্টেডিয়াম ছিল ‘সার্কাস ম্যাক্সিমাস’। এখানে রথদৌড়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। এটি প্রথমে নির্মিত হয়েছিল কাঠ দিয়ে। এরপর আরো কয়েকবার পুনর্নির্মাণের পর সবশেষে এটি নির্মাণ করা হয় পাথর দিয়ে। রোমান ম্যাক্সিমাসের আসন সংখ্যা ছিল আড়াই লাখ। এটি ছিল ৪শ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৯০ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট।
ম্যাক্সিমাসের পর অন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ সার্কাস ছিল সার্কাস ফ্লামিনিয়াস এবং সার্কাস নিরোনিস। রোমানদের পতনের পর ইউরোপে বড় এবং প্রাণীসমৃদ্ধ সার্কাসের অভাব দেখা দেয়। এ সময় প্রাক্তন সার্কাসের সদস্যরা ইউরোপে ভ্রাম্যমাণ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এসব মানুষের মনে তখনো জ্বলজ্বল করছিল রোমান নস্টালজিয়া। এরা শহরে শহরে এবং মেলায় ঘুরে বেড়িয়ে প্রদর্শনী দেখাত। রোমান এবং আধুনিক সার্কাসের মধ্যে সম্পর্কের আরো একটি সূত্র হিসেবে ভাবা হয় ইউরোপের ভ্রাম্যমাণ জিপশিদের, যাদের ছিল সার্কাস খেলার দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণী।
আধুনিক সার্কাস
আধুনিক সার্কাসের জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয় ফিলিপ অ্যাশলে নামক এক ব্রিটিশকে। ১৮ শতকে তিনি ইংল্যান্ড এবং ইউরোপে প্রথম স্থায়ী এবং ভ্রাম্যমাণ সার্কাস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৬৮ সালের ৯ জানুয়ারি তার সার্কাসের প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সার্কাস ইংল্যান্ডে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, প্রায় সব বড় শহরে এর জন্য মিলনায়তন তৈরি করা হয়। এ রকম একটি স্থাপনা ছিল লন্ডন হিপোড্রোম। ফ্রান্সে সার্কাস প্রতিষ্ঠা করেন আন্তনিও ফ্রাকোনি। আধুনিক সার্কাসের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। উনবিংশ শতকের শুরুর দিকে সার্কাস অব মেশিন অ্যান্ড ব্রিচার্ড অনেক দেশ ঘোরেন। যেমনÑ হাভানা, মন্ট্রিল ইত্যাদি আর যেখানেই তারা গেছেন সেখানেই সার্কাস থিয়েটার স্থাপন করেছেন। এ সময় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি হয় অনেক সার্কাস। ১৮২৫ সালে জোশুয়া পার্ডি ব্রাউন প্রথম সার্কাস দলের মালিক হিসেবে আবির্ভূত হন। সার্কাসের আরো একজন অগ্রপথিক হলেন ড্যান রাইস, যিনি সার্কাস এবং ভাঁড়ের জগতে বিখ্যাত ছিলেন। তার বিখ্যাত একটি শো ছিল ‘দ্য ওয়ান হর্স শো’। আমেরিকায় সার্কাস প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব পিটি বার্নাসের। উইলিয়াম ক্যামেরন কোপ যুক্তরাষ্ট্রের সার্কাস দুনিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেন। তিনিই প্রথম সার্কাস ট্রেন চালু করেন। এই ট্রেন বিভিন্ন শহরে গিয়ে প্রদর্শনী করত। এছাড়া কোপ একই সঙ্গে একাধিক প্রদর্শনী করার রীতি চালু করেন।
১৮৪০ সালে থমাস কুক যুক্তরাষ্ট্র সফর করে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসেন সার্কাস তাঁবুর ধারণা। জিউসেপ সিয়ারিনি (ইতালি), জ্যাকুয়েস তোরুনিয়াব (ফরাসি) এবং লুই সুলিয়ের (ফরাসি) সার্কাসের উন্মাদনা ছড়িয়ে দেন বাকি দুনিয়ায়। এ সময় ভ্রাম্যমাণ সার্কাসগুলো ঘুরে বেড়ায় চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায়। লুই সুলিয়ের চীনা অ্যাক্রোব্যাটিককে প্রথম ইউরোপের সার্কাস প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করেন। ১৯৫০ সালে রাশিয়ার সার্কাস বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনী শুরু করে।
সার্কাসের কঠিন সময়
১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে সার্কাসের জন্য ছিল কঠিন সময়। এ সময় প্রাণী অধিকার আলোচিত হতে শুরু করে। সার্কাসের মালিকরা প্রাণী ছাড়া নিত্যনতুন খেলা উদ্ভাবনে মনোযোগ দেন। এছাড়া মানুষ এবং প্রাণীর যৌথ খেলারও প্রচলন শুরু হয়। প্রাণীদের বাদ দিয়ে শুধু মানুষের খেলা দিয়ে সার্কাস প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে রিংগনির ব্রাদার্স অ্যান্ড বার্নাস অ্যান্ড বেইলি সার্কাস, দ্য মস্কো স্টেট সার্কাস এবং দ্য সার্কাস রয়্যাল ইন অস্ট্রেলিয়া। প্রাণীমুক্ত শুধু মানুষের বিভিন্ন প্রদর্শনী দিয়ে দুনিয়াব্যাপী সার্কাস দেখায় সারকিউ দু সোলিল প্রডাকশন। এরা তাদের সৃজনশীলতা এবং সৌন্দর্যবোধ দ্বারা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সফল সার্কাস দল
সমসাময়িক সব থেকে সফল সার্কাস দল হলো কানাডার ‘সারকিউ দু সোলিল’। ১৯৮৪ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এদের বার্ষিক আয় প্রায় ৮শ ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এদের ‘নুভিয়াউ সারকিউ’ প্রদর্শনীটি ৫ মহাদেশের ২শ শহরের প্রায় ৯০ মিলিয়ন দর্শক উপভোগ করেছেন।
সমসাময়িক সার্কাসগুলো প্রাণীদের চেয়ে মানুষের বিভিন্ন প্রদর্শনীর ওপর জোর দিলেও ঐতিহ্যবাহী পুরনো দলগুলো এখনো প্রাণীদের ওপরই বেশি জোর দেয়। প্রাণীদের খেলাকেই গুরুত্ব দেয় এমন বিখ্যাত কয়েকটি সার্কাস দল হলো যুক্তরাষ্ট্রের রিংগিং ব্রাদার্স অ্যান্ড বার্নাস অ্যান্ড বেইলি সার্কাস, ইউনিভারমোউল সার্কাস, বিগ অ্যাপল সার্কাস, অস্ট্রেলিয়ার সার্কাস রয়্যাল লেনন এস সার্কাস, মিউনিখের সার্কাস ক্রোন, ইতালির মোইরা অরফি ইত্যাদি।
সার্কাসের বিখ্যাত থিম সং হচ্ছে ‘এনট্রান্স অব দ্য গ্লাডিয়েটর। ১৯০৪ সালে এটি কম্পোজ করেন জুলিয়াস ফুবিক।
পৃথিবীর বেশ কিছু বড় শহরে বর্তমানে আছে স্থায়ী ভবন, যেখানে নিয়মিত সার্কাস প্রদর্শনী হয়। যেমন : মিউনিখের সার্কাস ক্রোন বিল্ডিং, মস্কোর স্তেতনায় বুলভার্দের মস্কো সার্কাস, সাংহাইর সাংহাই সার্কাস ওয়ার্ল্ড, প্যারিসের সারকিউ ডি হিভার, বুদাপেস্ট সার্কাস।
‘এখন কোনো ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই’
শামসুজ্জামান খান, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমী
এখন যে কয়েকটি সার্কাস দল কোনোরকমে টিকে আছে তাদের যে কী খারাপ অবস্থা তা বর্ণনা করার মতো নয়। একটা সার্কাস দল টিকে থাকতে হলে সবার আগে যে জিনিসটি দরকার তা হলো আর্থিক সামর্থ্য। কারণ একটা সার্কাস দলে অনেক উপকরণ দরকার হয়। যার মধ্যে জীবজন্তুসহ নানা কলকব্জার সামগ্রী রয়েছে। কাজেই এগুলো যখন থাকবে না বা নষ্ট হয়ে যাবে তখন আবার জোগাড় করতে হবে। এজন্য আর্থিক ব্যাপারটা খুব জরুরি। আগে দেখেছি সরকারের একটা সুনজর ছিল সার্কাস দলগুলোর ওপর। কিন্তু এখন কোনো ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই। যে কারণে তারা বিলীন হয়ে যেতে বসেছে।
আমি কয়েকদিন আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ঘুরে এলাম। সেখানে গিয়ে সার্কাস দেখেছি। অভিভূত হয়ে গিয়েছি আমি অনেকদিন পর সার্কাস দেখে। অভিভূত আগেও হতাম, আমাদের দেশের সার্কাস দলগুলোর সার্কাস দেখে। আমাদের সার্কাস দলগুলোর সদস্যগুলোর মধ্যেও অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন, দক্ষ লোক রয়েছে। এখনো তাদের সঠিক পরিচর্যা হলে তারা পিঠ সোজা করে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু সরকারের মনে হচ্ছে কোনো নজর নেই এদিকে। যার ফলে আমাদের নিজ¯^ একটা ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।
‘আমাদের দেশে এক সময় সার্কাস ছিল বলে গল্প করতে হবে’
সারা আরা মাহমুদ
পরিচালক, নাট্যকলা বিভাগ, শিল্পকলা একাডেমী
২০০০ : বর্তমানে বাংলাদেশে সার্কাসের দৈন্যদশার মূল কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
সারা মাহমুদ : কেবল বর্তমানে নয়, সব সময়ই এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক। বিশেষ করে সার্কাস আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়। সার্কাসে প্রচুর সামগ্রী দরকার হয় যার অর্থমূল্য অনেক। একবার ক্ষতির মুখে পড়লে তাই তা গুছিয়ে তোলা কষ্টকর হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সেগুলোর মধ্যে সার্কাস অন্যতম। পাক বাহিনী, রাজাকার-আলবদররা তাদেরকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু সার্কাসের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ হয়নি কখনই। এরপর কয়েকটি সার্কাস দল ছোট ছোট করে কাজ করে, চেষ্টা করে একটু একটু করে দাঁড়িয়েছে। ¯^াধীনতার পর যে কয়েকটি সার্কাস মোটামুটি দাঁড়িয়েছিল তারাও পরবর্তী সময়ে আর্থিক সঙ্কটের কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা গত তিন বছর ধরে খোঁজ নিয়ে সাতটি সার্কাস দলের একটি তালিকা তৈরি করতে পেরেছি, যারা কোনোরকমে টিকে আছে। দুটি মাত্র দলের কেনাপি আছে, সেই কেনাপিগুলোও শতচ্ছিন্ন। আর এক বছর পর হয়তো কেনাপি দিয়ে সার্কাস দেখানো সম্ভব হবে না। এখনই যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়া যায় তবে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে ‘আমাদের দেশে এক সময় সার্কাস ছিল’ বলে গল্প করতে হবে।
২০০০ : একটা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে নানা অজুহাতে অনুমতি দেয়া হয় না। নানা পরীক্ষা, রমজান মাস ইত্যাদির কথা বলা হয়। মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এ সময় তো সিনেমা হল বন্ধ থাকে না, টিভি বা স্যাটেলাইট বন্ধ থাকে না। তবে সার্কাস কেন বন্ধ থাকবে?
সারা মাহমুদ : এটা আসলে মেলা কেন্দ্রিক শিল্পমাধ্যম। এক্ষেত্রে আসলে নিরাপত্তার ব্যাপারটা বড় হয়ে দাঁড়ায়। সার্কাস তো একটা বড় জায়গা নিয়ে খোলা জায়গায় করতে হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারলে অনুমতি দেয়া হয় না। বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যার নিরাপত্তা জেলা প্রশাসকের জন্য একটি বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রটিতে আমাদের ওই পরিমাণ জনবল নেই। এটাই মূল সমস্যা বলে আমার কাছে মনে হয়।
২০০০ : আগে তো অনেক সার্কাস হতো। তখন সার্কাসের দলগুলো একটার পর একটা শো করে গেছে। তখন তো নিরাপত্তার এমন অজুহাত ওঠেনি।
সারা মাহমুদ : তখন তো দেশে জনসংখ্যা এত বেশি ছিল না। বাংলাদেশে অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল না। মাদকের এমন যথেচ্ছ ব্যবহার ছিল না। তরুণ সমাজের যে ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটছে আগে এমন ছিল না। এ বিষয়গুলোকে কিন্তু মাথায় রাখতে হবে। আগে এগুলো ছিল না বলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সারা রাত ধরে পালাগান, যাত্রাগান, কবিয়াল গান, সার্কাস হয়েছে। নির্বিঘে বাড়ির বৌ-ঝিরাও সেগুলো দেখে ঘরে ফিরে গেছে নিরাপদে, এখন কি সেটা সম্ভব?
২০০০ : মালিকদের কেউ কেউ বলেন, কোনো কোনো টেলিভিশনে বিদেশি সার্কাস দেখানো হয়। এ জায়গাটিতে যদি বাংলাদেশি সার্কাস দেখানোর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়ে তবে সার্কাস দলগুলো উৎসাহিত হয়, তারা কাজ করার একটা ক্ষেত্রও পায়।
সারা মাহমুদ : এটা খুব সত্যি কথা। তথ্য মন্ত্রণালয় যদি বাংলাদেশ টেলিভিশনে অন্তত এমন একটা ব্যবস্থা করে দেয়, তবে খুবই ইতিবাচক একটা কাজ হবে। কারণ বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল বাংলাদেশ টেলিভিশন দেখতে পায়।
২০০০ : বাংলাদেশের সার্কাসের উন্নতির জন্য সরকারের ভ‚মিকার প্রত্যাশা করেন সার্কাসের মালিকরা। যেমন তাদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিদেশি প্রশিক্ষক এনে যদি আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়া যায় ইত্যাদি। এগুলো করা কী সম্ভব?
সারা মাহমুদ : হ্যাঁ, সম্ভব। আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাংলাদেশে সার্কাস দলগুলোর কোনো সমন্নয় নেই। এদের কোনো সংগঠন নেই। পারস্পরিক একতাবদ্ধতা যদি না থাকে তাহলে কিন্তু কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। আপনি দেখুন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আবৃত্তি সমন্নয় পরিষদ ইত্যাদি অনেক সংগঠন রয়েছে। এরা যখন একটা প্রস্তাব সরকারকে উপস্থাপন করে তখন সেটা সহজে গৃহীত হয়। কিন্তু সার্কাস দলগুলো প্রত্যেকে আলাদাভাবে কাজ করে। এখানে অনেক জটিল, কঠিন কাজ রয়েছে, আর্থিক সঙ্কুলানের ব্যাপার রয়েছে। এগুলো এককভাবে করা সম্ভব নয়। এখানে সব সার্কাস দল যদি সম্মিলিত হতে পারি, তবে একটি প্রস্তাবনা পেশ করতে পারি। সে ক্ষেত্রে সরকারও সহজে আমাদের ব্যাপারে একটা নীতি নির্ধারণ করতে পারবে।
‘গ্রামবাংলার মানুষ এখনো
সার্কাস ভালবাসে’
এমএ সামাদ
সভাপতি, বাংলাদেশ সার্কাস মালিক সমিতি
৫০ বছর আগে সার্কাসের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন এমএ সামাদ। খুলনার পাইকগাছায় গড়ে তোলেন ‘দ্য নিউ স্টার’ নামে একটি সার্কাস দল। সার্কাস দল নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন, ফেরি করেছেন আনন্দ-বিনোদন। পড়ন্ত বয়সে এসেও ছাড়তে পারেননি সার্কাসের সখ্য। যতটা না জীবিকা তার চেয়েও যেন বেশি অন্যরকম এক ভালোলাগা, ভালবাসা সার্কাসের প্রতি! তাই তো ৮২ বছর বয়সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গাতিয়ারা থেকে নিজের গড়া সার্কাস দল নিয়ে ছুটে এসেছেন কক্সবাজারের চকোরিয়া কাঁকড়া এলাকার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় মেলায়। এবার শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে এই মেলার। এখন সেই শতবর্ষী মেলায় দার“ণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। দম ফেলার ফুরসত নেই। সেই ব্যস্ততার মাঝেই সার্কাসের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে সাপ্তাহিক ২০০০-এর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশ সার্কাস মালিক সমিতির সভাপতি এম এ সামাদ। গত ৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আজাদ তালুকদার
সাপ্তাহিক ২০০০ : সার্কাস কখন শুর“ করেছিলেন, সার্কাসের ইতিহাস কতদিনের?
এমএ সামাদ : ছোটকাল থেকেই গান-বাজনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতি ঝোঁক ছিল আমার। নিজে আনন্দ করব, অন্যদেরও আনন্দ দেবÑ এমন কিছু করার ভাবনা থেকেই মাথায় এলো সার্কাসের বিষয়টি। ’৫০-এর দশকের শেষের দিকে খুলনার পাইকগাছায় যখন এই সার্কাস দল গড়ে তুলি, তখন পূর্ববাংলায় ‘সাধনা লায়ন’ (যা এখন ‘দি লায়ন’ নামে চলছে) নামে কেবল একটি সার্কাস দল ছিল। তারা শুর“ করেছিল আমার আরো ৩০ বছর আগে।
২০০০ : আপনাদের মওসুম কখন? একটি জমজমাট মেলায় অংশ নিলে কী পরিমাণ উপার্জন হয়?
সামাদ : মূলত শীতকালটাই সার্কাসের মওসুম। এ সময় গ্রামবাংলায় ডানা মেলে বসে রকমারি মেলা। এই সময়টার জন্য সারাবছর অপেক্ষা করি আমরা। কারণ এ সময়ের উপার্জন দিয়েই সারাবছর চলতে হয় আমাদের। কিন্তু ইদানীং সার্কাসের মওসুমেও পরীক্ষা, নির্বাচন, মৌলবাদী থাবা এসবের অজুহাতে সার্কাস বন্ধ রাখতে প্রশাসন থেকে বাধ্য করা হয়। এর ফলে আগের মতো আর উপার্জন হয় না। পহেলা জানুয়ারি থেকে চকোরিয়ায় শুর“ হওয়া ১০ দিনব্যাপী এই ঘোড়দৌড় মেলার সময়সীমা আরো কিছুদিন বাড়তে পারে। যদি বাড়ে তাহলে এই মেলায় সব খরচ বাদ দিয়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছি।
২০০০ : এখনো এত উপার্জন, এত কদর সার্কাসের?
সামাদ : আগে সার্কাস দিয়ে আরো বেশি আয় হতো। কারণ গ্রামবাংলায় সার্কাস অসম্ভব জনপ্রিয়। আমি মনে করি, গ্রামবাংলায় সার্কাসের কদর এখনো কমেনি। তারা এখনো সার্কাস ভালবাসে। পশ্চিমা ও বিদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে এখনো স্বমহিমায় সার্কাস টিকে আছে। এখনো গ্রামের মানুষের বিনোদনের অন্যতম বড় উপলক্ষ সার্কাস। তবে এটাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা। সরকার প্রচার চালিয়ে, সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প রক্ষায় এগিয়ে এলে অবশ্যই এটি বিদেশি সংস্কৃতির চেয়ে বেশি আবেদন সৃষ্টি করতে পারবে।
২০০০ : মেলা কমিটিই বা কী পেয়ে থাকে এখান থেকে?
সামাদ : যারা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন সেই মেলা কমিটির সঙ্গে আমাদের চুক্তি থাকে ৭০ ভাগ, ৩০ ভাগ। উপার্জনের ৩০ ভাগ মেলা কমিটি পাবে আর আমরা পাব ৭০ ভাগ।
২০০০ : সরকারি সহযোগিতার কথা বলছিলেন, সেটা কী ধরনের?
সামাদ : বাংলাদেশ সার্কাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিনের কাছে আমরা সার্কাস ব্যবসায়ীদের জানমালের নিরাপত্তা জোরদার করা, সার্কাস আয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি প্রদানের বিষয়টি সহজ ও হয়রানিমুক্ত করা, মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী আক্রোশ থেকে সার্কাস দলগুলোকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় প্রচার চালিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখাসহ ১৪ দফা দাবি পেশ করেছি। সম্প্রতি আমাদের নিয়ে শিল্পকলায় একটা ওয়ার্কশপ হয়েছিল। সেখানেই আমরা সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর কাছে আমাদের এসব দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করি। মন্ত্রী আমাদের দাবি পূরণের চেষ্টা করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
২০০০ : সার্কাস অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে কখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন?
সামাদ : ১৯৯৫ সালে কক্সবাজারের ঈদগাহে বিনা কারণে একটি মৌলবাদী গোষ্ঠী আমাদের সার্কাসটি জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় আমরা প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলাম। সে ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে আমাদের।
২০০০ : কী কী আইটেম নিয়ে সার্কাস প্রোগ্রাম সাজানো হয়?
সামাদ : নাচ, গান, কৌতুক, নায়ক-নায়িকাদের অভিনয় থেকে শুর“ করে বাচ্চা, জোয়ান-বুড়ো সবারই বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা আছে সার্কাসে। এছাড়া বাঘ-ভালুক, ঘোড়াসহ নানারকম জীবজন্তুর সাহায্যে খেলা দেখানো এবং ৬০ থেকে ৭০ রকমের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে সার্কাস প্রোগ্রামে।
২০০০ : সব মিলিয়ে এখন কয়টা সার্কাস দল আছে বাংলাদেশে?
সামাদ : বড় দলগুলো হলো লায়ন, রওশন, দ্য নিউ স্টার ও ল²ণ দাস। এছাড়া ছোটখাটো আরো ১০-১২টি সার্কাস প্রতিষ্ঠান আছে সারাদেশে। এসব সার্কাস প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে অন্তত ২৫ হাজার মানুষ।
২০০০ : আপনার সার্কাস দলে এখন কতজন স্টাফ আছে?
সামাদ : প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা প্রতিকুলতা ডিঙিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজকের অবস্থানে এসেছে আমার সার্কাস দল। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের চারটি প্রথম সারির সার্কাস দলের অন্যতম। ১৬০ জন স্টাফ কর্মরত আছে আমার দলে। তাদের ওপর নির্ভর করে আড়াই হাজার মানুষের জীবিকা। হাতি, গোড়া, বাঘ-ভালুকসহ নানারকম জীবজন্তু মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদ আছে আমার সার্কাসে।
২০০০ : আপনার তো এখন বয়স হয়ে গেছে! ভবিষ্যতে এটার হাল ধরবে কে?
সামাদ : এটার হাল ধরার জন্য আমার ছেলে শাহজাহান সাজুকে গড়ে তোলা হয়েছে। আমি এই সার্কাসের চেয়ারম্যান, সাজু ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। মূলত সে-ই সবকিছু দেখাশোনা করে। আমি তাকে সঙ্গ দিই।
বিভাগ: প্রচ্ছদ



