সাফল্য-ব্যর্থতার তিন বছর খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন
সাফল্য-ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই কেটেছে মহাজোট সরকারের তিন বছর। সরকারের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। তার ভাষণে সরকারের ইতিবাচক দিক উঠে এলেও ব্যর্থতার বিষয়ে তিনি তেমন কিছু বলেননি। বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর ওই ভাষণ প্রত্যাখ্যান করেছে। মহাজোট সরকার জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছে, নির্বাচনী ইশতেহারে যে সব প্রতিশ্রুতি তার কী অবস্থা তা নিয়ে রিপোর্ট করেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ৩ বছর পূর্ণ হয়েছে গত ৬ জানুয়ারি। এই তিন বছরে চাওয়া-পাওয়া এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়ন নিয়ে নানা সমীকরণ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা বিষয়ে সফলতার দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকারের নানা ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা এ সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশার পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে সরকার গত তিন বছর চেষ্টা করেছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। সরকারের বেশ কিছু কর্মকাণ্ড জনগণ পছন্দ করেনি।
দিনবদল ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকারের পাঁচ অগ্রাধিকার প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি হয়েছে কমই। সরকারের এই ৫ অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট দূর করা, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য রোখা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তিন বছর পার হলেও এই পাঁচ অগ্রাধিকারের কোনো কোনোটাতে আংশিক সফলতা অর্জিত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে শুধু বিরোধী দলই নয়, সরকারি দলের পক্ষ থেকেও ব্যর্থতার কথা বলা হচ্ছে জোরেশোরেই। সরকারের কর্মকাণ্ডের অনেক বিষয়ে আশাবাদী হতে পারছে না সাধারণ মানুষ।
সংসদ কার্যকর, রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীকরণ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদেশনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, আইনশৃক্সখলা, সড়ক যোগাযোগ ও পদ্মা সেতু, জঙ্গি দমন, জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য, অর্থনীতির গতিশীলতা, কৃষি, বিদ্যুৎ সেক্টরের উন্নয়ন, আমলানির্ভর প্রশাসন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করছে জনগণ। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রæতির হিসাব যেমন মেলাচ্ছে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় ইস্যু করে বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদিকে সরিয়ে রাখার কৌশলেরও মূল্যায়ন করছে।
সরকারের ৩ বছরের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, অল্প কথায় সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পরিমাণ বেশি। জঙ্গি দমন, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎসহ কয়েকটি সেক্টরে সরকার সাফল্য দেখালেও সংসদ কার্যকর, রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা সৃষ্টি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সড়ক যোগাযোগ ও পদ্মা সেতু, অর্থনীতির গতিশীলতা আনাসহ আরো বেশকিছু বিষয়ে সফলতা দেখাতে পারেনি।
গত তিন বছর সরকার দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। দফায় দফায় বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। একই সঙ্গে আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকার বিষয়ে সমালোচিত হয়েছে। ক্রসফায়ারকে টপকে স্থান করে নিয়েছে গুম ও গুপ্তহত্যা। এটা নতুন করে জাতির জন্য আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতির সূচকে কিছুটা উন্নতি হলেও দেশের প্রধান প্রধান সেবা খাত রয়েছে সেই তিমিরেই। তিন বছরে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ফাঁদে পড়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে অর্থনীতি। দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারের দারিদ্র্য ঘোচানোর প্রতিশ্রুতিও ভেস্তে গেছে।
মহাজোট সরকার জাতীয় সংসদ কার্যকর করার ব্যাপারে ছিল অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু সংসদকে কার্যকর করা যায়নি। বিরোধী দলকে সংসদে আনার ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। বিরোধী দলকে সংখ্যার অনুপাতে বিচার না করে বিরোধী দল হিসেবে মূল্যায়নের ঘোষণা দেয়া হলেও কার্যক্ষেত্রে সেটা দেখা যায়নি, বরং তত্ত¡াবধায়ক সরকার (হঠাৎ ইস্যু) ইস্যুতে সরকার নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। অথচ তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি ছিল না। আদালত সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর কিছু অংশ অবৈধ ঘোষণা করলে তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আদালত আরো দুই মেয়াদে তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পরামর্শ দেয়। আদালতের আদেশ অনুযায়ী বিষয়টি সুরাহার জন্য সংসদীয় কমিটি গঠন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সংলাপও করা হয়। সংলাপে প্রায় সবাই তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আরো দুই মেয়াদে রাখার পক্ষে মত দেন। কিন্তু রাজনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের মতামতকে উপেক্ষা করে হঠাৎ করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তত্তাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করে রাজনীতিতে বিশৃক্সখল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সরকার গঠনের দ্বিতীয় বছর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করাও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ ছিল। সেই বিচার কাজ সরকার শুরুও করেছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে কারো আপত্তি নেই। সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দল বিএনপি এ কথা বারবার বলছে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মান নিয়ে বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। সবাই চায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিরপেক্ষ এবং দেশি ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হোক। কিন্তু শুরুতেই বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী দল ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে রাজনীতিতে সহনশীলতা প্রবর্তনের রাজনীতি সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজনীতিতে সহনশীলতা সৃষ্টির ব্যাপারে তিন বছরেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বরং প্রতিহিংসার রাজনীতি যেন জোর কদমে চালিয়ে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা হচ্ছে। মহাজোট সরকার শিক্ষা খাতে প্রশংসনীয় সফল্য দেখিয়েছে। স্বাস্থ্য সেক্টরেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কৃষিতে উন্নতি করলেও সারের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারেনি। সারের পেছনে কৃষক নয়, সারই কৃষকের পেছনে ছুটবে কৃষিমন্ত্রীর এ বক্তব্য অসার প্রমাণিত হয়েছে। কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না বলে প্রতিদিন মিডিয়ায় খবর আসছে।
বিদেশনীতিতে সরকারের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি। ভারতের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকার সাফল্য দেখাতে পারেনি। তিনবিঘা করিডর ২৪ ঘণ্টার জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। এটা সরকারের সাফল্য। ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হলেও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। এ নিয়ে এখনো পানি ঘোলা করা হচ্ছে। প্রটোকল ভেঙে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে গিয়ে সমস্যার সুরাহা করতে পারেননি। ইস্যু এসব সরকারকে আগামী নির্বাচনে ভোগাতে পারে। সুপার পাওয়ার আমেরিকার সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল হয়েছে। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস ইস্যুতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সম্পর্কোন্নয়ন এবং সরকারের নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটাতে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন বিদেশি পত্রিকায় দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যাওয়া কমে গেছে এ সরকারের আমলে। সৌদি আরবে আকামা জটিলতায় হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ সমস্যা সমাধানে সরকার কার্যকর ক‚টনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারেনি। ফলে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স কমে গেছে। দেশের অর্থনীতি নাজুক হওয়ার জন্য এটাও একটা কারণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত ৩ বছরে ১শ ১০ বার বিদেশ সফর করেছেন। তার এই ঘনঘন বিদেশ সফর দেশের জন্য ক‚টনৈতিক ক্ষেত্রে সফলতা বয়ে আনতে পারেনি।
ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার কথা বললেও সেটা সম্ভব হয়নি। তিন থেকে চারটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকশ বেকারকে চাকরি দেয়া হলেও নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি না হওয়ায় সে প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা যায়নি। অর্থনীতির বেহাল অবস্থা, শেয়ারবাজারে কেলেঙ্কারি, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় তিন বছরে নতুন শিল্পায়ন তেমন হয়নি। ফলে বেকার সমস্যার সমাধান ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঘরে ঘরে চাকরির ব্যবস্থাও করা যায়নি।
সরকারের প্রথম দুই বছর শেয়ারবাজারে লাগামহীন উত্থান ঘটেছে, তৃতীয় বছরে নজিরবিহীন পতন ঘটেছে। লেনদেন, বাজার মূলধন, মূল্যসূচকের উত্থান-পতনে উপর্যুপরি রেকর্ড গড়েছে। এ সময়ে কারসাজি, গুজব, আতঙ্ক, অস্থিরতা, বিক্ষোভ, অবরোধ, ভাঙচুর, মামলা, গ্রেফতারসহ পুলিশের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বারবার। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বালখিল্য বক্তব্য শেয়ারবাজারের অস্থিরতাকে আরো ত্বরাণ্নিত করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির নেয়া সিদ্ধান্ত বাজারের উত্থান-পতন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পথে বসে গেছে, পকেট ভারী হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দলের মদদপুষ্ট একশ্রেণীর ব্যবসায়ীর। তদন্তে এসব ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। উল্টো সরকারই এদের আড়াল করার চেষ্টা করছে। ফলে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশের সর্বত্রই আলোচনার ঝড় বইছে। অব্যাহত দরপতন ও মন্দাভাবের কবলে পড়ে চলতি বছর পুঁজিবাজার ছেড়েছেন প্রায় সাড়ে ৭ লাখ বিনিয়োগকারী। কেউ কেউ দরপতনের সময় বের হয়ে যান। আবার কেউ কেউ ফোর্সসেলের শিকার হয়ে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, অযোগ্য লোকদের দিয়ে আর্থিক খাত পরিচালনা করতে গিয়ে সরকার শেয়ারবাজারে এমন বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ভ‚মি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও ভ‚মিহীন কৃষককে খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়ার কথা উল্লেখ ছিল। সরকারি ওয়াদা অনুযায়ী ভ‚মিহীন কৃষককে খাস জমি দেয়াও হয়েছে, তবে সেই জমি দেয়া হয়েছে ভ‚মিহীন কৃষকদের নামে দলীয় নেতাকর্মীদের। গত বছর ভ‚মি মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে কৃষক ছাড়া অন্য কেউ কৃষিজমি কিনতে পারবেন না এ ধরনের একটি আইন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে ফ্রিস্টাইল দুর্নীতি। ভ‚মি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে সার্ভেয়ার নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারকারীর চাকরি হয়নি। বিশেষ সুবিধা (প্যাকেট) না দেয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটে। ভ‚মি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতি প্রয়োগে হাতে নেয়া পাইলট প্রকল্প অঙ্কুরেই বিনাশ হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতা, দলীয়করণ, সিদ্ধান্তহীনতা এবং পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তে দেশের ভ‚মি ব্যবস্থাপনায় হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পদায়নসহ নানান বিষয়ে রয়েছে অ¯^চ্ছতার অভিযোগ। তবে বেহাত হওয়া কিছু সরকারি সম্পদ পুনরুদ্ধার, নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও সময়ে নামজারি সম্পাদন, জলমহাল এবং বালুমহাল আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন, মন্ত্রণালয়ের পুরনো ফাইল পুনর্বিন্যাস ও সংরক্ষণ জনগণের মনে আশার আলো জাগিয়েছে।
গত তিন বছর দলীয়করণের জিম্মিদশা থেকে জনপ্রশাসনের মুক্তি মেলেনি। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণ অব্যাহত আছে। অযোগ্য ও অদক্ষ হলেও দলবাজি করলে দ্রুত পদোন্নতি এবং ভালো বদলিসহ নানা সুবিধা পাওয়া যায় বলে একশ্রেণীর কর্মকর্তাও দলীয়করণকে জিইয়ে রাখতে চায়। বর্তমান সরকারের ৩ বছরেও যোগ্য ও মেধাবীদের মূল্যায়ন হয়নি। পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল প্রশাসন সংস্কার করার। সেই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। সিটিজেন চার্টারের সুফল জনগণ পাচ্ছে না। কর্মকর্তাদের সবচেয়ে প্রত্যাশার বিষয় সিভিল সার্ভিস আইন মাঝপথে এসে আটকে গেছে। বিধিবিধান মেনে নির্ভয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মকর্তাদের সেভগার্ড তৈরি হয়নি। তবে সীমিত পরিসরে জেলা প্রশাসনে ই-তথ্য সার্ভিস চালু হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন বলেন, তিন বছরে সরকার প্রশাসনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। বেশিরভাগ দফতর ই-গভর্নেন্সের আওতায় এসেছে। তথ্য অধিকার আইন হয়েছে। নানামুখী উদ্যোগের ফলে আমলাতন্ত্রের লালফিতায় বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রশাসন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুস্থ ধারা ফিরে এসেছে।
গত তিন বছরে দ্রব্যমূল্য নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। অথচ নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল এটা নিয়ন্ত্রণ করার। সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কথা প্রথম থেকে বলে আসছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের নানা উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি সরকার। মন্ত্রীদের স্ববিরোধী কথাবার্তায় পণ্যমূল্য হয়েছে লাগামহীন। তা এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা যায়নি। ফলে মানুষকে জমানো পুঁজি ভাঙতে হচ্ছে। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাবের) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে গত এক বছরে পণ্য ও সেবার মূল্য গড়ে প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১১ সালে বাজারে দ্রব্যমূল্য এবং বাড়িভাড়াসহ বেশ কিছু সেবা খাতের মূল্যের হিসাব করে ক্যাব তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে মূল্যবৃদ্ধির এ তথ্য দিয়েছে। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত এক বছরে এসব খাতে গড়ে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে খাদ্যপণ্যে। এর মধ্যে ভোজ্যতেল প্রায় ২৬ শতাংশ এবং শাক-সবজিতে বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০১১ সাল জুড়েই জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এক বছরে ৪ বার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। যে কারণে পণ্যের দামও বেড়ে যায়।
নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা সত্তে¡ও গত ৩ বছর আইন-শৃক্সখলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকার বিষয়ে সরকারের অর্জনের চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি। জোট সরকারের আবিষ্কার ক্রসফায়ার গত ৩ বছরে গুম বা গুপ্তহত্যায় উন্নীত হয়েছে। ক্রসফায়ার হলে লাশ পাওয়া যেত। গুম বা গুপ্তহত্যায় তাও পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয় নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরং গুম ও গুপ্তহত্যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সরগরম হয়ে উঠলেও সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। ঘটনার শিকার পরিবারের সদস্যরা এ জন্য সরাসরি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেই দায়ী করছে। ২০১১ সালে খোদ রাজধানীতেই গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন ৩০ জন। এ পর্যন্ত ১৬ জনের লাশ নদী, হাওর ও জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩৫৯ জন বিচার বহিভর্‚ত হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থি দমনে সরকার সফল হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তৎপর হয়ে উঠতে দেখা গেছে।
অর্থনীতির বিষয়ে নজিরবিহীন টানাপড়েনে কেটেছে সরকারের তিন বছর। ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের পর থেকে টানা তিনটি বছর রাজস্ব আদায় ও কৃষি উৎপাদন ছাড়া অর্থনীতিতে কোনো সুখবর নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে সরকার সফলতা আনতে পারেনি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই দেশের ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা দেখা দেয়। সরকারি বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ঋণ প্রাক্কলন ছিল ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের ৫ মাস যেতে না যেতেই সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ২১ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। সরকারের এ ঋণ গ্রহণ ব্যাংকগুলোকে তারল্য সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কটে কমেছে শিল্পখাতের উৎপাদন। জ্বালানি খাতের ভর্তুকি উসকে দিয়েছে মূল্যস্ফীতিকে। শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থা হারিয়েছে মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে সীমাহীন দুর্ভোগে। তিন বছরে অব্যাহতভাবে কমেছে টাকার মান। বেড়েছে বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি। সর্বশেষ পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করেছে। বন্ধ হয়ে গেছে বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য। ৩ বছরে জাতীয় বাজেট প্রায় দেড় গুণ হলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়েনি মোটেই। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, চ্যালেঞ্জ আছে সত্যি, কিন্তু তারপরও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। গত ৩ বছরে মূল্যস্ফীতি ও রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাফল্য রয়েছে।
সরকারের অন্যতম ওয়াদা ছিল দুর্নীতি রোধ করা। দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু বর্তমানে সরকারি সব সেক্টরে দুর্নীতি আগের মতোই হচ্ছে। দুর্নীতির পরিমাণ কমেনি। সরকারি অফিস আদালতে বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ভ‚মি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা একাধিক উদ্যোগ নিলেও তার ন্যূনতমও কার্যকর হয়নি। বরং ঘুষের বা দুর্নীতির মাত্রা আরো বেড়ে গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে সৈয়দ আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। মহাজোট সরকারের সাফল্য ম্লান করে দিয়েছে বিডিআর বিদ্রোহ। বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের মৃত্যু সরকারকে নাজুক অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। এই বিদ্রোহের ক্ষত ৩ বছরেও সারাতে পারেনি সরকার।
বছরজুড়েই বাড়িভাড়া ছিল লাগামহীন। ২০১১ সালে গড়ে ভাড়া বেড়েছে ১৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পাকা বাড়ির ভাড়া বেড়েছে ১৩ দশমিক ২৭, আধাপাকা বাড়ির ভাড়া বেড়েছে ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। বাড়িভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালারা সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। সরকারও এই অযাচিত বাড়িভাড়ার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
২০০৮-এর নির্বাচনে সরকারের নির্বাচনী স্লোগান ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন। তরুণ প্রজন্ম মহাজোট সরকারের এই স্লোগান গোগ্রাসে গিলেছিল। তাদের অন্তরের চাওয়ার সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছিল। যে কারণে ভোট ব্যাংকের সব হিসাব-নিকাশ মার খেয়েছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন করার ক্ষেত্রে নানা পদক্ষেপ নেয়। তবে সরকারের নেয়া এসব পদক্ষেপ পর্যাপ্ত বলে পরিগণিত হয়নি।
এর বাইরে সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের কাছে সময়মতো বই পৌঁছে দেয়া, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, ১০ হাজার টাকার দোয়েল ল্যাপটপ সরবরাহ, দরিদ্রদের জন্য স্বল্পমূল্যে চাল সরবরাহ করে সাফল্য দেখিয়েছে।
শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের নেয়া নানা পদক্ষেপে আঁধার কাটছে বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। বয়স্ক ও বিধবা ভাতা বাড়ানোর প্রশংসা পেয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার, গৃহায়ণ, আদর্শগ্রাম কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগও প্রশংসিত হয়েছে। এসব দিকে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ঢাকার যানজট নিরসনে বেশকিছু প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু একটিও বাস্তবায়ন হয়নি এ পর্যন্ত। ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। পাতাল রেল বা মনোরেল, সার্কুলার রেলপথ এবং উড়াল রাস্তা নির্মাণ করে গণপরিবহনের যে উন্নতি ঘটানোর কথা দিয়েছিল তার কিছুই হয়নি। ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার (অরবিটাল) জনপথ, বেড়িবাঁধ সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সামনে এখন ১০টি চ্যালেঞ্জ। সময় মাত্র ২ বছর। চ্যালেঞ্জ ১০টি হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, আইনশৃক্সখলা নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধাপরাধীর বিচার, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিরোধ, পুঁজিবাজার চাঙ্গা করা, অর্থনৈতিক সঙ্কট নিরসন, মানবাধিকার সুরক্ষা, পদ্মা সেতু নির্মাণ, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি ও টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুর মীমাংসা।
গত তিন বছর ধরেই মন্ত্রিসভার অদক্ষতার কথা বারবার উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক মন্দার বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকারের চলার পথ মসৃণ ছিল না। বন্ধুর পথ চলার ক্ষেত্রে যে সতর্কতা থাকা উচিত ছিল, সে ক্ষেত্রে তারা সক্ষমতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়নি। আগামী দুবছরে সরকার কি পারবে বিরাজমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ফেলতে, নাকি আরো ডুবে যাবে? তা অবশ্য সময়েই জানা যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির বেহাল অবস্থা
সরকারের তিন বছর পরে হলেও গ্রামীণ ও আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্প (পিএমসি) এখনো অনুমোদিত হয়নি। সঠিকভাবে বিস্তারিত প্রকল্প তৈরি না করা, অর্থাভাব ও আমলাতান্ত্রিক ঢিলেমির জন্য এ রকম ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি। প্রতিটি সরকারের আমলে একই নামে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এলজিইডির পক্ষ থেকে প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও তা অনুমোদন দেয়া হয়নি। সরকারের সীমিত আর্থিক সামর্থ্যরে কথা বলে এ পর্যন্ত দুদুবার প্রি-একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে উত্থাপনের পূর্ব ধাপের কাজ) হয়েছে এই প্রকল্পের। প্রথম দফায় প্রি-একনেকে অনুমোদনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তা আটকে ছিল দীর্ঘদিন। এলজিইডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বরে ২৪টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। যে সময়ে বৃহৎ সড়ক ও সেতু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে ডিপিপি ফেরত দেয়া হয়। বলা হয় বেশি অর্থ ব্যয় হবে এমন প্রকল্পগুলোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন ডিপিপি তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সে অনুযায়ী বরগুনা-বেতাগী-নেয়ামতি-বাকেরগঞ্জ ১০৬ কিলোমিটার সড়কের জন্য আলাদা প্রকল্প নেয়া হয়। ধামরাইয়ের কুটনগর সেতু ও সিংড়ার বালুবাসুয়া থেকে তাড়াশ-বারুতাম পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার সড়কের জন্য আলাদা প্রকল্প নেয়া হয়। সূত্র জানায়, পরবর্তী সময়ে আসা প্রতিশ্রুতিগুলো একত্রিত করে মোট ৬৪টি উন্নয়ন কাজকে পিএমসি প্রকল্পভুক্ত করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এতে আর্থিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২৮ কোটি টাকা। এলজিইডির প্রকৌশলী নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, গত ১৮ ডিসেম্বর প্রি-একনেক বৈঠকে প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে মোট দুবার প্রি-একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে এই প্রকল্প। সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, প্রধানমন্ত্রী সুনামগঞ্জ সফরের সময় নেত্রকোনা থেকে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখনো প্রকল্পটি অনুমোদন হয়নি। একইভাবে সীমান্তে সড়ক (বর্ডার রোড) নির্মাণেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেটি মূলত ধর্মপাশা ও তাহেরপুর সীমান্ত এলাকা থেকে নির্মাণের কথা ছিল। ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব বলেন, নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ইউএনডিপির প্রধান হেলেন ক্লার্ক তার নির্বাচনী এলাকার চরকুকরিমুকরিতে সারাদেশের ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র উদ্বোধন করতে এসেছিলেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে তার এলাকার ৮টি সড়ক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে প্রকল্পগুলো পিএমসি প্রকল্পভুক্ত হলেও আর অগ্রগতি হয়নি। নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহী বলেন, তার এলাকায় কলমাকান্দা-বড়–য়াকোনা সড়ক নাজিরপুর-শিভলী সড়ক, কালিহালা, বিশরপাশা সড়ক, পালপাড়া, পাশকাটা সড়ক, ভরতপুর সড়ক, শিবগঞ্জ গাওকান্দিয়া-শক্সখপুর সড়ক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত সড়ক হিসেবে উন্নয়নের কথা ছিল। তিনি অভিযোগ করেন তার নির্বাচনী এলাকাটি পর্যটন এলাকা হলেও সড়কগুলো নির্মিত না হওয়ায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হতে পারছে না।
নির্বাচিত সংসদীয় সরকারের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। সংসদীয় অধিবেশনে, আঞ্চলিক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। গত তিন বছর প্রধানমন্ত্রী যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার সিংহভাগই কার্যকর হয়নি।
বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া
এইচএম এরশাদ
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি
বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা থাকলে অর্থনৈতিক উন্নতি বেশি হতো। দীর্ঘদিন বিরোধী দল সংসদে অনুপস্থিত। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। তিন বছর সরকার পরিচালনায় সফলতা ও ব্যর্থতা উভয়ই রয়েছে। শিক্ষা, খাদ্য, আইন, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও কৃষিতে সরকার ভালো করেছে। দ্রব্যমূল্যে বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, যোগাযোগ খাতে বিপর্যয়ের কারণে সরকার সমালোচিত হয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও সামনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেছে সরকার। তবে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি সরকারকে বিতর্কিত করে ফেলেছে। সরকার ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করেছে। ব্যর্থ মন্ত্রী ও উপদেষ্টাও চিহ্নিত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে আগামীতে ভালো ফল আসতে পারে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
অল্প অল্প হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। কৃষির উৎপাদন বেড়েছে। সেবা খাতেও আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে। সরকার নানা ক্ষেত্রে সফল হওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সফল হয়ে উঠতে পারেনি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িত খলনায়কদের চিহ্নিত করা গেলেও আইনের মুখোমুখি করা যায়নি। পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা বলেই চিহ্নিত। বহুল কাক্সিক্ষত তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ফলপ্রসূ কিছু হয়নি। সরকারের যোগ্য লোকের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি
মুক্তিযুদ্ধের বিজয় আজো পরিপূর্ণতা পায়নি। মৌলবাদী রাজনীতির করাল থাবা থেকে সরকার বেরিয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের বিচার এখনো হয়নি। সরকার চেষ্টা করছে বিচার করার। এটা ভালো দিক। সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ খাতে। গত তিন বছর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতি পুরো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি সরকার। দফায় দফায় বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। আইনশৃক্সখলা ও মানবাধিকার বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি খুব একটা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে যা করা হয়েছে তাতে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে। দুর্নীতি রোধ ও দুর্নীতি দমনেও সরকার সফল হতে পারেনি।
বিচারপতি লতিফুর রহমান
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, তত্তাবধায়ক সরকার
সাফল্য-ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই কেটেছে মহাজোট সরকারের তিন বছর। দিনবদল ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার আংশিক পূরণ হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়নি। শুধু বিরোধী দলই নয়, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেছে। জঙ্গি দমন, শিক্ষা, কৃষিতে সফলতা দেখিয়েছে সরকার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকার বিষয়ে সমালোচিত হয়েছে। সরকার গুম ও গুপ্তহত্যার কারণে সরকার আন্তর্জাতিকভাবেও সমালোচিত হয়েছে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ফাঁদে পড়ে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে।
বিভাগ: প্রচ্ছদ



