banner ad

ঘুষবাণিজ্য
খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন

‘ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না।’ এটা অনেকটা প্রবাদ বাক্য হয়ে গেছে। ঘুষ দেয়া-নেয়া

আমাদের প্রশাসন সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব পদক্ষেপেই ঘুষের টাকা গুনতে হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি সব কাজেই ঘুষের প্রচলন হয়েছে। দুর্নীতির সবচেয়ে প্রকট অংশ ঘুষ। ভুক্তভোগী থেকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সবাই স্বীকার করে ঘুষের দৌরাত্ম্য, প্রভাব ও প্রতিপত্তির কথা। ঘুষ এখন কেবল আর অবৈধ আর্থিক লেনদেন নয়, এক সামাজিক প্রপঞ্চ। ঘুষের স্বরূপ অনুসন্ধান করেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন

 

প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে যেমন চাষাবাদের চল ছিল, তেমনি ঘুষের চলও ছিল। ‘উপঢৌকন’ কিংবা ‘ইনাম’ শব্দটা তো রাজা-বাদশাহদের আমলে সব দেশে জনপ্রিয় ছিল। ব্রিটিশ আমলেও এ দেশে ঘুষের প্রচলন ছিল ব্যাপক। পাকিস্তানি আমলেও ঘুষের ব্যবহার ছিল। বাংলা ব্যাকরণে ঘুষের নানা প্রতিশব্দ রয়েছে। প্রাচীন আমল থেকে ডিজিটাল সময় পর্যন্ত এর ব্যবহার হয়েছে নানারূপে। ঘুষের যত প্রতিশব্দ রয়েছে, অন্য কোনো শব্দে তত আছে কি না সন্দেহ। ঘুষের প্রাচীনরূপ ছিল উপঢৌকন বা ইনাম। ব্রিটিশ আমলে হয় বাম হাতের খরচ, উপরি, বকশিশ। পাকিস্তান আমলে পরিচিত হয় চা-পানের খরচ, সেলামি, খুশি করা আর স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে উৎকোচ, মালপানি, খরচপাতি, বোনাস এমনি আরো কত কি? স্বাধীনতাপরবর্তী সময়েও কাজ করাতে ঘুষ লেনদেনের ধারা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হয়নি। সামরিক শাসক জিয়া ও এরশাদের আমলে ঘুষ নতুন মাত্রা পায়। অবশ্য দুজনই ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই খোলস বদলে স্বমূর্তিতে আবিভর্ত হন।

ঘুষের কারণে বাংলাদেশে বিয়ের বাজারও বদলে যাচ্ছে। কন্যাপক্ষের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চেয়ে তিতাস গ্যাসের মিটার রিডার কিংবা কাস্টম অফিসের কেরানি বা বিমানবন্দরের লোডারদের কদর বেশি। কারণ পরবর্তী সময়ে ছেলেমেয়ে স্কুলে ভর্তি করতে ঘুষের ইংলিশ ভার্সন ‘ডোনেশন’ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চেয়ে মিটার রিডারদের ক্ষমতাই বেশি।

ঘুষের অন্য নাম কখনো কখনো ‘গিফট’। সভ্যতার এ যুগে মানুষের মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি ষষ্ঠ মৌলিক চাহিদা হিসাবে ঘুষই যেন জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তথা সরকারি অফিসে ঘুষের প্রচলন ও ব্যবহার রয়েছে। কাজের ধরন অনুযায়ী শুধু পরিমাণে কমবেশি হয়ে থাকে। ঘুষের প্রভাব এতই সর্বগ্রাসী যে, এর লেনদেনে এখন আর কোনো সামাজিক লাজলজ্জা নেই। নচিকেতার ভাষায় ‘ঘুষ আমার ধর্ম, ঘুষ আমার বর্ম, ঘুষ নিতে কী সংশয়/ প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া অপরাধ নয়।’

 

পুলিশি বকশিশ

পুলিশ আর ঘুষ একে অপরের পরিপূরক। অপরাধ দমন এবং আইন-শৃক্সখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ পুলিশ বাহিনীর বিধিবদ্ধ কাজ হলেও এখন পুলিশ নিজেরাও প্রায়ই অপরাধ করছে। অপরাধীদের লালন করছে। খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ প্রায় সব ধরনের অপকর্ম করানো যাচ্ছে পুলিশকে দিয়ে। গোল্ডলিফ সিগারেট থেকে কোটি টাকার চাঁদা কোনোটিতেই না নেই পুলিশের।

চাকরি নেয়ার সময়ই পুলিশ সদস্যরা ঘুষ দিয়ে যাত্রা শুরু করে। কথিত আছে সাব ইন্সপেক্টর ৫-৭ লাখ, সার্জেন্ট ৬ লাখ, কনস্টেবল পদে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এই ঘুষের টাকা আবার তুলে আনতে হয় ঘুষ নিয়ে। আর এসব ঘুষের টাকা নাকি ভাগাভাগি হয় কনস্টেবল থেকে শুরু করে আইজির দপ্তর পর্যন্ত। বদলি হতে কিংবা বদলি ঠেকাতে ঘুষ আবশ্যক। জানা জায়, বেশি আয়ের থানাগুলোতে ওসি পদে বদলি হতে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। তেজগাঁও, মতিঝিল, সাভারের মতো উচ্চ-আয়ের থানাগুলোতে এসআই পদে বদলি হতে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, এএসআই ৫ লাখ, কনস্টেবল পদে ১ লাখ টাকা উৎকোচ দিতে হয়।

পুলিশের স্লোগান হলো ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম।’ এই সেবা পেতে পুলিশকে ঘুষ দিতে হয়Ñ বিভিন্ন সময়ে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়। থানায় মিথ্যা মামলা করতে ২০ হাজার টাকা, পুলিশি নির্যাতন করাতে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, নির্যাতন করে কাউকে খুন করতে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা (যেমন- রুবেল হত্যা), প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসী হত্যা করতে ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা, মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় হয়রানি করতে ৩৫-৫০ হাজার টাকা। এসব ঘুষ অবৈধ কাজের জন্য। বৈধ কাজেও পুলিশকে ঘুষ দিতে হয়। যেমন বাসা বাড়িতে চুরি-ডাকাতি হলে পুলিশ এলে তাকে খরচ দিতে হয় ২ থেকে ৫ হাজার টাকা।

ঘুষ খাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশও পিছিয়ে নেই। ফিটনেসের অজুহাতে ট্রাকপ্রতি ৩শ থেকে ৫শ টাকা, সিটি লোকাল বাস ১ থেকে ৩শ টাকা, ট্যাক্সি ক্যাব ও প্রাইভেট কার ১শ টাকা, মাইক্রোবাস ২শ টাকা, সিএনজি ৫০ টাকা, মোটরসাইকেলের জন্য ১শ টাকা ঘুষ দিতে হয়। যে সব রাস্তায় অযান্ত্রিক যান চলাচল নিষিদ্ধ সেসব জায়গায় ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিয়ে রিকশা, ঠেলাগাড়ি ও মুরগি ভ্যান অনায়াসে পার করে নেয়া যায়।

আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পুলিশের পাশাপাশি গঠন করা হয় র‍্যাব। প্রথম প্রথম র‍্যাব জনপ্রিয় হলেও এখন র‌্যাবও পুলিশের মতো ঘুষ বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে। ঘুষের বিনিময়ে ক্রসফায়ার দেয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। র‌্যাবের গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদোন্নতিতে ঘুষের প্রচলন শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব তথ্য উঠে এসেছে পর্যবেক্ষণ ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে।

 

রাজউক : ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না

দুর্বৃত্তায়নে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে এখানকার ইট-কাঠ-পাথরও ঘুষ খায়। ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ানোর সাধ্য এখানে কারো নেই। এমন মন্তব্য অনেক ভুক্তভোগীর।

রাজউকে প্ল্যান পাস করাতে হলে কোনো ব্যক্তির পক্ষে ফাইল নিয়ে সারাবছর দৌড়াদৌড়ি করেও সফল হওয়া সম্ভব নয়। এখানে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা ছোট পার্টির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করে দেয়। আর বড় পার্টি অর্থাৎ রিয়েল এস্টেট ও হাউজিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধভাবে কাজ করে অফিসার পর্যায়ের লোকজন। বিধিমাফিক ফি যাই হোক না কেন এক তলা থেকে ছয় তলা পর্যন্ত বাড়ির নকশা অনুমোদন করাতে খরচ হয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। একজন নির্দিষ্ট দালাল এর জন্য কাজ করে। প্রাথমিকভাবে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা অগ্রিম নেয়। বাকিটা কাজ শেষে। একটি প্ল্যান পাস হতে ফাইল ঘোরে ১০ জনের কাছে। প্রত্যেকেই কিছু কিছু বখরা পায়। এ কাজকে ‘প্যাকেজ প্রোগ্রাম’ বলা হয়। স্থানভেদে কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকে। সাধারণত ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, রমনা, মতিঝিল, গুলশান, বারিধারা, তেজগাঁও এলাকায় প্যাকেজ প্রোগ্রামের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার টাকা।

বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা চুক্তি নিয়ে থাকেন। সে ক্ষেত্রে পার্টির সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এবং হাউজিং কোম্পানিগুলো অগ্রিম ৫ লাখ টাকা দিয়ে থাকে। কাজ শেষে বাকি টাকা দেয়া হয়। বিরোধযুক্ত কোনো জমির ওপর রাজউক থেকে নিষেধাজ্ঞার নোটিশ আনতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। জমির দখল নিশ্চিত করতে এ টাকা দেয়া লাগে। স্থানভেদে কম-বেশি হয়ে থাকে। অতিরিক্ত টাকা গুনলে রাজউক তার নিজের জমি অন্যের নামে বন্দোবস্ত করে দেয়।

 

এলজিইডি : ঘুষ যেখানে শেষ কথা

এলজিইডি ও ঘুষ-দুর্নীতি একে অপরের পরিপূরক। এখানে ঘুষ দিলে ফাইল নড়ে। হাত দিলেই ঘুষের টাকা। এখানে প্রকল্প প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত চলে টাকার খেলা। ঘুষের রেটের ওপর প্রকল্পের বাস্তবায়ন নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ার, প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করে। ঘুষের টাকার ওপর ঠিকাদারের ভাগ্যলিপি লেখা হয়। কে কত বেশি কমিশন দেবে তার ওপর ভিত্তি করে কার্যাদেশ বণ্টন করা হয়। এখানে প্রকল্পের ফাইল তৈরির জন্যও গড়ে উঠেছে একটি মধ্য¯^ত্বভোগীচক্র। ঘুষ দুর্নীতি এখানে ওপেন সিক্রেট। ফাইলের সামনে ঘুষের টাকা পেছনেও টাকা। এ ব্যাপারে কোনো রাখঢাক নেই। ঘুষের টাকায় প্রকল্প জালিয়াতি, ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি, ভুয়া প্রকল্প বানানোসহ নানা জালিয়াতি হয়। প্রতিদিন নিত্যনতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়ে এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। এলজিইডিতে প্রতিবছর গড়ে ৬শ কোটি টাকার ঘুষবাণিজ্য হয়ে থাকে। এ টাকার ভাগ পিয়ন থেকে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। এলজিইডিতে ঘুষবাণিজ্য নিয়ে যৌথবাহিনী, দুদক, গোয়েন্দা সংস্থা এমনকি সংসদীয় কমিটিও কাজ করে হার মেনেছে। ঘুষবাণিজ্য এখানে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

রোড কাটিং প্রকল্প, স্কুল, কলেজ, ইউপি ভবন নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ, সংস্কার করতে দুর্নীতি বেশি হয়। জানা গেছে, প্রকল্প তৈরি করতে ৫০ হাজার, উত্থাপন করতে আরো ৫০ হাজার টাকা গুনতে হয়। একটি প্রকল্প পাস করতে ছয়টি টেবিলের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়। এই ছয় টেবিলেই টাকার কারবার চলে। প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ অনুযায়ী ১০ শতাংশ, ২০ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ কমিশনের সিস্টেম রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভবন না করেই কাজ হয়েছে দেখিয়ে বরাদ্দ অর্থ তুলে নেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে কমিশনের পরিমাণও বেড়ে যায়।

 

জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও পরচা

সরকারি অফিস হিসাবে ভ‚মি অফিসের ঘুষবাণিজ্যের ইতিহাস সুপ্রাচীন। ভ‚মি অফিস হচ্ছে সেই সরকারি অফিস যেখানে বিকাল ৫টার পরও কাজ চলে হরদম। জমি কেনাবেচার যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয় রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে। দেশে ৪৭৫টি রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে। সাব রেজিস্ট্রি-অফিসের ওপরে জেলা রেজিস্ট্রি অফিস। জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের ওপরে আইজিআর, এরপর আইনমন্ত্রী।

কোনো জমি কিনতে দলিল মূল্যের প্রতি লাখ টাকায় ১২ হাজার টাকা অফিসে ঘুষ হিসাবে যাবে। আর ২ হাজারের মতো পাবে সরকার। এই টাকা আগেই দলিল লেখকের কাছে গুনতে হবে। তিনি এই টাকা ৯ ভাগ করে জেলা রেজিস্ট্রার, হেড ক্লার্ক, আইজিআর এবং মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দেন। ঘুষের শুরু এক্সট্রা মোহরারদের থেকে। ১ লাখ টাকায় ক্রয়-বিক্রয় এক্সট্রা মোহরার পায় মাত্র ২০ টাকা। তবে একটা জমির বেচাকেনার সঙ্গে ৩ থেকে ৭ জন এক্সট্রা মোহরার জড়িত থাকে। এক্সট্রা মোহরার থেকে সরকারি মোহরার। তেজগাঁও রেজিস্ট্রার কমপ্লেক্সের এক্সট্রা মোহরার মাসুক বলেন, তার কাছে কেউ এলে তিনি নিয়ে যান সরকারি মেহরার আবদুল হাকিমের কাছে। সেখান থেকে পাঠানো হয় কেরানির কাছে। একটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একজন কেরানি থাকে। কেরানি লাখে ১ থেকে ২ হাজার টাকা নিলেও মোহরার পায় ৫শ টাকা। একটি জমি বেচাকেনায় ৩ থেকে ৪ জন মোহরার জড়িত থাকে। কেরানির সঙ্গে একাধিক পিয়ন থাকে। এসব পিয়ন দিন শেষে ৪শ টাকা পেয়ে থাকে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের টাকার বড় অংশ পান সাব-রেজিস্ট্রার। তার জন্য লাখে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বরাদ্দ।

সাধারণত জমি যারা কেনেন তারা দলিলে প্রকৃত মূল্য লিখতে চান না মূলত কর ফাঁকি দেয়ার জন্য। ১০ লাখ টাকার জমির দলিল হয় ৪ লাখ টাকায়। সে জন্য দলিল মূল্য লাখে ১২ হাজার টাকার বাইরেও অর্থ ব্যয় করতে হয় ক্রেতাদের। ক্ষেত্রবিশেষে তা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকাও হয়ে থাকে। সাধারণত সাফ কবলায় এভাবে বড় অঙ্কের টাকা গুনতে হয়।

জমি সংক্রান্ত বিষয়ে সেটেলমেন্ট অফিসও কাজ করে। জমির ভৌগোলিক পরিমাপ অর্থাৎ পরচা সংগ্রহের কাজ এখানে করতে হয়। পরচা তুলতে বৈধ স্ট্যাম্প ফি ৫ টাকা আর একটি ফরম কিনতে খরচ হয় ৫ টাকা। সরকারি কোষাগারে এই ১০ টাকা জমা পড়ে। কিন্তু পরচা তুলতে কমপক্ষে খরচ হয় ৫শ টাকা। দ্রুত তুলতে হলে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা লাগে।

জমির দলিল লেখায়ও খরচ গুনতে হয়। ১২ লাখ টাকার জমিতে দলিল লিখতে ২০ হাজার টাকা, ভায়া দলিল লিখতে মূল খরচ ১শ থেকে ৫শ টাকা হলেও প্রকৃত খরচ দিতে হয় ২ হাজার টাকা। নামজারি করতে নির্ধারিত ফি যাই হোক না কেন প্রকৃত খরচ হয় ৩ হাজার টাকা। অবশ্য জাল বা নকল দলিল হলে রেট ভিন্ন হয়ে যায়। রেজিস্ট্রি অফিসে যারা স্ট্যাম্প বিক্রি করে তারা লাইসেন্সপ্রাপ্ত। এই লাইসেন্স পেতেও ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। অপরদিকে দলিল লেখকদেরও লাইসেন্স আছে। দলিল লেখকদের লাইসেন্স পেতে ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয় জেলা রেজিস্ট্রারদের।

 

স্বাস্থ্যসেবায় ঘুষ

সখিনা বেগমের বাড়ি কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বয়স ৫১ বছর। জীবনে কোনোদিন মোটরগাড়ি চোখে দেখেননি। জ্বর-সর্দি-কাশির জন্য গ্রাম্য হাটের কবিরাজের দাওয়াই খেয়েই বেশ চলেছে এতদিন। হঠাৎ স্বামী অসুস্থ হলেন। ভয়ানক অসুখ। তিনি তাকে নিয়ে এলেন শহরের হাসপাতালে। এর পরের কাহিনী কতটা করুণ তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। সরকারি হাসপাতালের কথাই ধরা যাক। একেবারে বাইরের যে সদর ফটক সেখান থেকে তার জীবনের অন্য অভিজ্ঞতা শুরু। দালাল বাহিনী কীভাবে, কী প্রকারে, কী প্রলোভন দেখিয়ে তারা বেশিরভাগ রোগীকে তথাকথিত ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতেন না। এই বেড়াজাল ডিঙিয়ে টিকেট কাউন্টারে পৌঁছানোমাত্র তাকে নিয়ে সাপ-লুডু খেলা শুরু হয়। কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন, লোকজন একে-ওকে ঠেলে যারপরনাই এগুতে চায়, আর কাউন্টারের ওপারে ভ্রæক্ষেপহীন নার্স অথবা কাউন্টারম্যান অপরিচ্ছন্ন ও ধোঁয়াটে হাতের লেখায় কলম পিষছে। তবে ব্ল্যাকার তথা দালালের হাতে ১০ টাকা দিলে ৬ টাকার টিকেট ঠিকই দ্রুত পেয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অসুস্থ রোগীর সুস্থ আত্মীয় বা সঙ্গে আসা গাইড অর্ধেক অসুস্থ হয়ে রোগীকে নিয়ে টিকেটের গায়ে লেখা রুমের সামনে হাজির। সেখানেও মোটামুটি এক জটলা। ডাক্তার নেই, জরুরি কাজে (!) ব্যস্ত, ওটিতে আছেন ইত্যাদি নানা অজুহাতে ২-৩ ঘণ্টা পার। এরপর অবশ্য ২-৩ মিনিটেই গায়ে বিচিত্র কিছু আঁকিবুঁকি নিয়ে সে রুম থেকে বের হয়ে এসেছেন। যদিও ডাক্তারের সহকারী পিয়নটিকে ২০, ৩০ বা ৫০ টাকা দিয়ে আগে সিরিয়াল দিয়েছেন, লাভ হলো না কিছুই। অবশ্য এই মূল্য (মাত্র ২০ টাকা হারে) সরাসরি গ্রহণ করেন আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তাররা। আর বাইরের বেলায় এই উপঢৌকন একটু ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। সরাসরি কিছু দেয়ার বদলে আপনি হাতে করে নিয়ে এসেছেন ডাক্তার সাহেবের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করাতে হবে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফর্দ। এরপর হাসপাতালে ভর্তি।

অপরিচ্ছন্ন নোংরা কম্বলে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা চলছে। ওয়ার্ডবয়, আয়া, দারোয়ান এমনকি ওয়ার্ড মাস্টার পর্যন্ত ক্রমাণ্নয়ে ঘুষ ঢালার পর একটি বিছানা। অসুস্থ হয়ে যে থুথু, কফ, রক্ত, পুঁজ ঝরছে সেই ময়লা পরিষ্কারের জন্য সুইপারকে দিতে হবে নিয়মিত মাসোহারা। বাথরুম ব্যবহারের জন্য ইনচার্জকে চার্জ দিয়ে চাবি নিতে হবে। কোনো কোনো হাসপাতালের বারান্দায় রোগীদের রান্না করার জন্য চুলা ব্যবহার করা যায় সামান্য কিছু চার্জের বিনিময়ে। সরকারি হাসপাতালে নন-পেয়িং বেডের বেশিরভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফ্রি হলেও পরীক্ষার রিপোর্ট সরবরাহকারীকে দিতে হবে নগদ বকশিশ! আর পেয়িং হলে তো কথাই নেই। ‘পেয়িং বিছানায় ঘুমান আর কিছু ঢালবেন না এইডা কেমুন কতা।’ অপারেশনের পর অজ্ঞান রোগীকে যে ট্রলি বয় ঠেলে ঠেলে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে আসে তার আয় জানলে মনে হবে এই চাকরিটা কেন আমার হলো না।

আর যদি মা হওয়ার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে চায়, তাহলে টাকা না দেয়ায় সদ্যোজাত শিশু নিয়ে টানা-হেঁচড়া এমনকি আটকে রাখার ঘটনার পুনরাবৃত্তি অবধারিত। পৃথিবীর আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুষ দেয়ার হাতেখড়ি হয়ে যায় শিশুদের। হাসপাতালে রাখা ওষুধ ও জিনিসপত্র যে কোনো সময় হারিয়ে যেতে পারে। বিচিত্র কথা হচ্ছে, তা আবার উদ্ধারও করা যায়, তবে সামান্য কিছুর বিনিময়ে।

 

ওষুধ প্রশাসনে যা হয়

ঘুষ, দুর্নীতি আর অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে ওষুধ প্রশাসনে। অভিযোগ আছে দেশের ২৪৬টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে ১৭০টি ভুঁইফোঁড়। এসব কোম্পানি নিজেদের ইচ্ছেমতো ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করে। এসব ওষুধের অধিকাংশ নিম্নমানের। অসাধু কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় ওষুধ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্ধশত অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন করে কোটিপতি বনে গেছেন। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী দেশে ২৪৬টি অ্যালোপ্যাথিক, ২০৪টি আয়ুর্বেদিক, ২৯৫টি ইউনানী ও ৭৭টি হোমিওপ্যাথিক কোম্পানির প্রসেসিং লাইসেন্স, মূল্য নির্ধারণ, লেভেল পারমিশন, ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু, ইনভেন্ট অনুমোদন, কাঁচামাল আমদানি, ব্লক লিস্ট অনুমোদনসহ প্রজেক্ট প্রফাইল তৈরিতে ঘুষ দিতে হয়। অর্থাৎ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের প্রত্যেক স্তরে ঘুষের টাকা গুনতে হয়। জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ৮টি স্তরের প্রত্যেকটিতেই হাজার হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়।

 

পাসপোর্ট

বৈধ কিংবা অবৈধ তিন ধরনের উপায়ে পাসপোর্ট করা যায়Ñ ক. সাধারণ, খ. জরুরি এবং গ. অতি জরুরি। এ জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি রয়েছে। সাধারণ পাসপোর্টে ২ হাজার টাকা, জরুরি ৩ হাজার এবং অতি জরুরি ৫ হাজার টাকা। কোনো প্রকারের দালালের সহযোগিতা ছাড়া ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে রসিদসহ পাসপোর্ট অফিসে আবেদনপত্র দাখিল করার পর আরম্ভ হয় ঘুষের খেলা। অবশ্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদনপত্র জমা দেয়ার হাঙ্গামা এড়াতে হলে দালালকে ২শ থেকে ৩শ টাকা দিতে হবে। পুলিশ অনুসন্ধানের জন্য এসবি অফিসারকে ৩শ টাকা এবং থানার অনুসন্ধানী অফিসার যে বাসায় যাবে তাকে দিতে হবে ২শ টাকা। জরুরি পাসপোর্টের জন্য এসবি অফিসের কর্মকর্তাকে ৪শ টাকা এবং পুলিশকে ৩শ টাকা আর অতি জরুরি পাসপোর্টে এসবি অফিসে ৫শ টাকা এবং পুলিশকে ৪শ টাকা দিতে হবে।

অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও ঘুষ দিতে হয়, যার পরিমাণ ৩শ থেকে ৫শ টাকা হতে পারে। পাসপোর্ট নবায়ন করার ক্ষেত্রে ফি ৫শ টাকা হলেও ব্যাংকে অতিরিক্ত ২শ টাকা ঘুষ দিতে হয়। পাসপোর্ট সারেন্ডার করতেও ঘুষ দিতে হয়। যে কোনো এক জায়গায় ঘুষের টাকা না দিলে পাসপোর্ট আলোর মুখ দেখবে না। ২১ দিনে পাওয়ার কথা থাকলেও ৬ মাসেও তা মিলবে না। বেআইনি পাসপোর্ট মানে একই ব্যক্তি একাধিক কিংবা ভিন্ন পরিচয়ে পাসপোর্ট করতে চাইলে দালালদের শরণাপন্ন হতে হবে। পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই জাতীয় কাজ করে না। এতে খরচ পড়বে ১২-১৫ হাজার টাকা।

 

বিআরটিএ : সবই হবে প্রকাশ্যে

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) প্রধান কার্যালয় তেজগাঁওয়ের এলেনবাড়ি এলাকায়। এ ছাড়াও বিআরটিএ (উত্তর) অফিস মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনে। আর কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় অবস্থিত বিআরটিএ (দক্ষিণ) কার্যালয়। এ দুটি অফিস থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, রুট পারমিট, মালিকানা পরিবর্তন এবং রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়। বিআরটিএ এলাকায় ঢুকলেই ঘিরে ধরবে দালালরাÑ ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, রুট পারমিট বা রেজিস্ট্রেশন কোনডা লাইগবো? আসল না নকল কোনডা লাইগবো? আসল চাইলে রেট বেশি, নকলে অনেক কম। যে কাজেই হোক না কেন সরকার নির্ধারিত ফির চেয়েও দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা গুনতে হবে। নইলে হয়রানি চরমে উঠবে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের সরকারি জমা ৬৫০ টাকা।

কিন্তু এ জন্য খরচ করতে হয় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। অন্যথায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পরিণত হয় সোনার হরিণে। আবার ফিটনেসের সময় গাড়ির গ্লাস ভাঙা থাকলে বা হেডলাইট না জ্বললেও কাউকে সমস্যায় পড়তে হয় না। স্রেফ ১শ থেকে ২শ টাকা ধরিয়ে দিলেই হলো। গাড়ি না এনেই গাড়ির ফিটনেস করিয়ে নেয়ার সুযোগও আছে। তবে এ জন্য ৫শ টাকার দুটি নোট গুঁজে দিতে হয় সংশ্লিষ্ট পরিদর্শককে।

 

কাস্টমস : আইসিডি (ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো)

আইসিডিতে ঘুষের খেলা চলে দিন-রাত। আমদানিকৃত পণ্য কাস্টম থেকে বের করার জন্য প্রথমে কম্পিউটার এন্ট্রি বাবদ ৭শ, এপিএস বাবদ ২শ, প্রিভেনটিভ ২শ, সুপার ১ হাজার, ইন্সপেক্টর ২ হাজার, পোর্ট ৫শ, বন্দর শ্রমিক বকশিশ ৫শ থেকে ২ হাজার এবং কাস্টম অফিসারকে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। অ্যাসেসমেন্ট পর্যায়ে সুপার ২ হাজার, ইন্সপেক্টর ৩ হাজার, সহকারী কমিশনারের সিপাহী ৩শ থেকে ৪শ, জয়েন্ট কমিশনারের সিপাহী ৪শ এবং পিয়নের জন্য ২শ টাকা ধার্য করা আছে বলে আমদানিকারকরা জানালেন।

নরমাল পেপারের ক্ষেত্রে গ্রæপ-১ সহকারী কমিশনার ৫ থেকে ১০ হাজার এবং গ্রæপ-২ সহকারী কমিশনারকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। মালামাল খালাসের ক্ষেত্রে বন্দরের স্টাফ খরচ ১১টি টেবিল বাবদ ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। নিরাপত্তা বিভাগের গেট এসআই ৮শ, গেট সার্জেন্ট ৪শ, শুল্ক গোয়েন্দা ৩ হাজার, প্রিভেনটিভ বাবদ ৩ হাজার, শ্রমিক বকশিশ মালামাল ডেলিভারি বাবদ ১ হাজার টাকা দিতে হয়। আইসিডিতে পণ্য আমদানি করার জন্য সবাইকে এই ফর্মুলা মেনে চলতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইসিডির এক কর্মকর্তা বলেন, আমদানিকারকরা তাদের পণ্য ছাড় করাতে বাড়তি কিছু টাকা ব্যয় করে কাজটা একটু দ্রুত করানোর জন্য। তবে আপনারা যেভাবে বলছেন, সে রকম কোনো ঘুষের রেট এখানে নেই। পণ্য রফতানি করতে হলে পেপার অ্যাসেসমেন্ট ৮-৯শ, পরীক্ষা বাবদ ৬শ, বন্দর কর্তৃপক্ষ ৭শ, শ্রমিক বকশিশ ১৫০ টাকা, ই-বক্সপি ছাড়করণ ৪শ টাকা দিতে হয়।

 

বিমানবন্দর

বিমানবন্দরে সাধারণ আধাকেজি পণ্য রফতানি করতে ৫শ, ১০-১৫ কেজি হলে ১৫ হাজার, বাণিজ্যিক হলে ৩৫-৪০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

ব্যাংকপাড়ায় ঘুষের ছড়াছড়ি

ব্যাংকপাড়ায় চলে ঘুষের টাকার ছড়াছড়ি। সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংকের কেন্দ্রীয় অফিস মতিঝিল ও দিলকুশায়। দেশের অধিকাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত হয় এখান থেকেই। এখানেই অবস্থান করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা বাংলাদেশ ব্যাংক নামে পরিচিত। মতিঝিল অফিসপাড়া থেকেই সব বড় বড় ব্যাংকঋণ দেয়া হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১ থেকে ৩০ কোটি টাকায় যে কোনো লোন পাস করাতে ২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন গুনতে হয়। শিল্পঋণের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কমিশনও দিতে হয়। আবার ঋণের সুদ মওকুফে চলে ঘুষের টাকার অন্য খেলা। এসব ঘুষ লেনদেনে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক থেকে শুরু করে সিবিএ নেতারা জড়িয়ে পড়েন। ঘুষের টাকার কমিশন সবাই পেয়ে থাকেন।

 

আয়কর বিভাগ

ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে আয়কর ফাইল খুলতে হলে কর পরিদর্শককে ১ হাজার, সহকারী কর কমিশনার ২-৩ হাজার টাকা ও পিয়নকে ৫শ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আয়কর উকিল ফাইল তৈরি করে দেন। তারও একটা ফি আছে। সব মিলিয়ে পড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।

 

হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন

হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনে ঘুষের ব্যাপারটা চলে ঋণের ক্ষেত্রে এবং ঋণ নেয়ার পর কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে। এখান থেকে ঋণ নিতে হলে প্যাকেজ প্রোগ্রামে যেতে হয়। কাজ শুরুর আগে অগ্রিম হিসাব ৪০ হাজার দিতে হয়। ঋণ পাওয়ার পর আরো ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়। ঋণের পরিমাণ বেশি হলে টাকাও বেড়ে যায়। সাধারণত ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া প্রযোজ্য। ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হলে ঘুষের পরিমাণ ৩ থেকে ৫ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।

 

শিক্ষা ভবন না উৎকোচ ভবন

ঘুষের টাকা পকেটে নিয়ে যাওয়া ছাড়া শিক্ষা ভবনে যাওয়ার কথা ভাবার উপায় নেই। এখানে ঘুষ দেয়ার সময় সঠিক লোককে চিহ্নিত করতে হবে। তা না হলে ঘুষের টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো উপায় নেই। এখানে সঠিক ঘুষ গ্রহীতার সন্ধান করতে প্রথমেই পিয়নকে ম্যানেজ করতে হয়। পিয়ন বলে দেবে কাকে ঘুষ দিলে লক্ষ্য অর্জিত হবে। এ ক্ষেত্রে পিয়নকে ১শ টাকা আগেই বকশিশ দেয়া উত্তম।

এমপিওভুক্তি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা গুনতে হয়। এখানে মাধ্যমিক ও কলেজের জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। ঘুষের কারবার সাধারণত কর্মকর্তারা করেন না। তাদের কাছে ঘুষ দিতে গেলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতে পারে। ঘুষের লেনদেন পরিচালনা করে কর্মকর্তাদের পিএস বা এপিএসরা। ঘুষের টাকার ভাগ পিয়ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সবাই পেয়ে থাকেন এমন অভিযোগ আছে। এখানে ঘুষের প্রচলনটা অনেকটা পুলিশের মতো। ঘুষ বেশি আদায় করতে পারে এ রকম কর্মকর্তা ডিজির বিশেষ নজর পেয়ে থাকেন।

এমপিওভুক্তিকরণের সময় স্কুল বা কলেজের অবস্থানের ওপর ঘুষের হার নির্ভর করে। স্কুল বা কলেজের অবস্থা ভালো হলে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় কাজ হয়ে যায়। আর খারাপ হলে পরিমাণ বেড়ে যায়। অনেক সময় এলাকাভিত্তিক সম্পর্কের কারণে কম লাগে। একইভাবে শিক্ষকদের গ্রেড পরিবর্তনে ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা, বেতন মঞ্জুরকরণে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। বদলি করা বা বদলি ঠেকাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাগে। এখানে সরকারপন্থী শিক্ষকদের খরচ কম লাগে। বিরোধী দলের হলে বেশি আর শিক্ষক যদি নেতা হয় তাহলে কোনো টাকা লাগে না। এ ছাড়া কোনো কারণে প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে অনুদান বা বেতন বন্ধ হয়ে গেলে তা পুনরায় চালু করতে ৩০-৪০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়।

পেনশনের কাগজপত্র প্রসেসিংয়ে ঘুষ দিতে হয়। তার পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।

প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের আগে পরিদর্শককে ঘুষ দিতে হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রিপোর্ট দেয়া হয়। এই ঘুষের পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।

রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কিংবা কিন্ডারগার্টেনের অনুমতি নিতে বিশাল অঙ্কের টাকা ঘুষ দিতে হয়। একই অবস্থা হাইস্কুল ও কলেজের ক্ষেত্রেও। এই ঘুষের পরিমাণ সর্বনিম্ন দেড় লাখ টাকা। এই জাতীয় লেনদেন বড় কর্মকর্তারা করে থাকেন। মাদ্রাসা বিভাগেও একইভাবে ঘুষের কারবার চলে।

 

স্কুলে ডোনেশন

স্কুলে ভর্তির জন্য ডোনেশন প্রথা প্রথমে চালু করেছিল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো। এখন বাংলা মিডিয়াম স্কুলেও একই সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ টাকা চলে যায় স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের কাছে। যে কারণে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন যেন ছোটখাটো সংসদ নির্বাচনের অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হতে পারলেই ২৫-৩০ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তির অলিখিত লাইসেন্স হাতে মিলে যায়। কোনো কোনো স্কুলের সদস্যরা বছরে ২০ থেকে ৭০ লাখ টাকা আয় করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে ছাত্রভর্তিতে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়ার নজিরও রয়েছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুষবাণিজ্য

দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘুষবাণিজ্য আছে। ২-৩ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে এখানে ভর্তি হওয়া যায় এর প্রমাণ মেলে মাঝে মধ্যে বাঁকা পথে ভর্তি হওয়া ছাত্রদের ছাত্রত্ব বাতিলের ঘটনার মধ্য দিয়েই। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কলা অনুষদে ভর্তির জন্য প্রয়োজন দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা। আর বাণিজ্য ও বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তির জন্য প্রয়োজন ৩ লাখ টাকা। তবে টাকা দিয়ে ভর্তির সুযোগ খুবই সীমিত এবং তা গুটিকয়েক বিভাগে প্রযোগ্য। বছরে গড়ে প্রায় ১শ জন এভাবে ভর্তি হয়। এখানে ঘুষের চেয়েও মূল্যবান লবিং। রেজিস্ট্রার ভবনের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং এক শ্রেণীর ছাত্রনেতা এ কাজ করে থাকে। এ কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট শ্রেণীর দালাল রয়েছে। তারা পার্টি ধরে নিয়ে আসে। সাধারণত বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ ধরনের অবৈধ ভর্তি হয়। কোনো ছাত্র যদি ভর্তি পরীক্ষায় ‘খ’ ইউনিট (কলা অনুষদ) এবং ‘ঘ’ ইউনিট দুটোতেই সুযোগ পায়, তাহলে সে যে ইউনিটে ভর্তি হয় না, সেই ইউনিটের মেধা তালিকায় তার নামের জায়গায় আরেকজনের নাম বসিয়ে দেয়া হয়।

এ ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রার ভবনের কর্মকর্তারা কর্মচারীদের মাধ্যমে দালালদের খরব দেয়। দালালরা ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে পার্টি (ভর্তি ইচ্ছুক) সংগ্রহ করে দেয়। তখন ভর্তির ব্যাপারে আপসরফা বা দেনদরবার হয়।

এ ছাড়া কোনো বিভাগে ভর্তি সম্পন্ন হওয়ার পর মাইগ্রেশনের মাধ্যমে এক বা একাধিক ছাত্র অন্য বিভাগে চলে গেলে সিট ফাঁকা হয়। এখন ওই জায়গায় অবৈধভাবে ছাত্র ভর্তি করা হয়। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি একটু বেশি থাকে। তাই দালালদের টাকাও বেশি দিতে হয়। কারণ প্রত্যেক জায়গায় নিবন্ধন থাকায় নতুন করে নাম তুলতে হয়। এমনকি ওই বিভাগের ইনকোর্স অথবা টিউটোরিয়াল খাতায় আলাদাভাবে নাম তোলা হয়।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোটা রয়েছে। যেমন যোদ্ধা পোষ্য কোটা, শিক্ষক পোষ্য কোটা। উপাচার্যের বিশেষ সুপারিশে দুএকজন ভর্তি হয়ে থাকে। এসব সিট রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে পূরণ হয়ে থাকে।

 

অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় ঘুষের খেলা

দেশের টেলিকম খাতে ঘুষ-দুর্নীতির খেলা চলছেই। এ খাতের ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) এখন ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে। র‌্যাব-পুলিশের তৎপরতার মধ্যেও শুধু ঘুষের টাকার কারণে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা চলছেই। এটা এখন হাইটেক ব্যবসা হওয়ায় অনেকে প্রকাশ্যে ঘুষ দিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা হতো। সে সময় যারা এ ব্যবসায় জড়িত ছিলেন সবাই হাওয়া ভবনে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে এ ব্যবসা করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায়, ওই সময় আন্তর্জাতিক কলের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ অবৈধ পথে টার্মিনেশন করা হতো। ওই ৫ বছরে সরকার রাজ¯^ হারায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভিওআইপি ব্যবসা নিয়ন্ত্রকের হাতবদল হয়। হাওয়া ভবনের বদলে তা দখলে নেয় আমেরিকা প্রবাসী এক ব্যবসায়ী ও ইডেনের ছাত্রী কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত সরকারের প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। সূত্রের দাবি, ভিওআইপি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে বিটিসিএল, বিটিআরসি, পুলিশ ও র‌্যাবকে ম্যানেজ করতে হয় ঘুষের মাধ্যমে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের ঘুষ দিতে হয়। এক একটি এমটিএম বরাদ্দ দেয়া হয় সর্বোচ্চ ৬ মাসের জন্য। একটি এমটিএমের প্রতিদিন আয় ৩০ থেকে ৩২ লাখ টাকা। ৩ মাসের জন্য একটি এমটিএম বরাদ্দ পেতে ঘুষ দিতে হয় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। ঘুষ লেনদেনে এই সেক্টরেই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে।

 

গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি

ডেসা ও পিডিবির মিটার রিডারদের সঙ্গে চুক্তিতে আসতে পারলে সহজেই বিদ্যুৎ লাইন পাওয়া যায়। আবার বিল দেয়ার ক্ষেত্রে কম বিল দেয়া যায়। কলকারখানার মালিকরা এভাবেই ওদের সঙ্গে চুক্তিতে এসে লাখ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল কম দেয়।  ফলে মিটার রিডাররা হয়ে পড়ে কোটিপতি। একই পদ্ধতিতে গ্যাস কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেন মালিক পক্ষ। ঢাকা ওয়াসার পানির লাইন পেতে ও বিল কম দিতে কর্মচারীদের সঙ্গে আঁতাত করতে হয়। এই আঁতাতের ফলে লাইন দ্রুত লেগে যায়। আর পানির বিল সহজেই কমিয়ে আনা যায়। অবশ্য এ ঘুষের টাকা মিটার রিডার বা কর্মচারী একা পায় তা নয়। এ টাকার ভাগ চলে যায় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তি পর্যন্ত। বাংলাদেশের সরকার ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে যারা আছেন তাদের অনেকেই কম-বেশি ঘুষ খান। সরকার ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের ঘুষ গ্রহণের প্রবণতা বাংলাদেশকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত করেছে। অপ্রিয় হলেও সত্য, এখানে গড়ে উঠেছে ঘুষের বাজার। চাহিদা জোগানের ঊর্ধ্বমুখী প্রণবতার কারণে বাড়ছে ঘুষের দর। অথচ এই ঘুষ প্রকারান্তরে জনগণের ওপর অনানুষ্ঠানিক কর। এই করের বোঝা যেভাবে বাড়ছে তা নিঃসন্দেহে দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। সব শ্রেণীর মানুষের ওপর ছড়ি  ঘুরিয়ে শৈল্পিকভাবে যারা ঘুষ খাচ্ছেন তারাই দেশের সবচেয়ে বেশি সর্বনাশ করছেন।

 

ঘুষের বাজার দর

কাজ   ঘুষের পরিমাণ

 

স্কুলে ভর্তি     ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি      ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ

নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি      ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ

সরকারি চাকরি       ৫০ হাজার থেকে ৮ লাখ

বাড়ির প্ল্যান পাস করানো    ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ

সরকারি হাসপাতালে ভর্তি    ৫শ থেকে ২ হাজার

পাসপোর্ট      ৩ হাজার

অবৈধ পাসপোর্ট       ১৫ হাজার

ড্রাইভিং লাইসেন্স     ৬ হাজার

আমদানি পণ্য খালাস ১৫ থেকে ২০ হাজার

ওষুধের নাম অনুমতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ

হাউস লোন   ১ থেকে ৫ লাখ

ব্যাংকঋণের সুদ মুক্তি ১ লাখ থেকে ৫০ লাখ

১ লাখ টাকার জমি রেজিস্ট্রি  ২০ হাজার টাকা

 

বিআরটিএ অফিসে ঘুষের রেট

১. ড্রাইভিং লাইসেন্স

(৫টি পরীক্ষায় ৫০০ টাকা করে

২,৫০০ টাকা)সহ      ৫,০০০-৬,০০০ টাকা

২. ফিটনেস   ১০০-১০০০

৩. রেজিস্ট্রেশন       ২,৫০০-৪,৫০০

৪. রুট পারমিট        ১,০০০-৩,০০০

৫. মালিকানা পরিবর্তন       ২,০০০-৪,০০০

 

শিক্ষা ভবনে ঘুষের হার

প্রাথমিক বিদ্যালয়

শিক্ষকদের গ্রেড পরিবর্তন    ৫০০-১,০০০ টাকা

ক্লাইন্ড অন্তর্ভুক্তকরণে ৫০০ (প্রতি শিক্ষক)

এমপিওভুক্তিকরণ     ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ

শিক্ষকদের বেতন মঞ্জুরকরণ ১০ থেকে ৩০ হাজার

সরকারি স্কুলে বদলি সংক্রান্ত ১৮ থেকে ২০ হাজার

পেনশন কাগজপত্র প্রসেসিং  ১০ থেকে ১৫ হাজার

পরিদর্শক স্কুলে গেলে ১৫ হাজার

 

উচ্চ বিদ্যালয়

বিএড অন্তর্ভুক্তকরণ  ১ থেকে ২ হাজার

এমপিও অন্তর্ভুক্তকরণ        ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার

শিক্ষকদের বেতন মঞ্জুরকরণ ৩০ থেকে ৫০ হাজার

সরকারি স্কুলে বদলি  ২০ হাজার থেকে ১ লাখ

পেনশন সংক্রান্ত কাজ        ২০ থেকে ৪০ হাজার

পরিদর্শক স্কুল পরিদর্শনে গেলে      ১৫ হাজার টাকা

 

কলেজ

এমপিওভুক্তিকরণ     ১ থেকে ২ লাখ টাকা

শিক্ষক বেতন পাস করতে    ২০ থেকে ৫০ হাজার

পরিদর্শক      ২০ হাজার

 

বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

ডা. আ ফ ম রুহুল হক

মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়

 

স্বাস্থ্য খাতে বিগত জোট সরকারের সময় ছিল দুর্নীতির আখড়া। দুর্নীতি ও অনিয়ম এখানে অনেকটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তত্তাবধায়ক সরকারের সময় এ অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে তা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমান সরকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না। বরং শক্ত হাতে দমন করছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। ঘুষ দেয়া-নেয়ার দীর্ঘদিনের যে চর্চা তা একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি কমেছে।

 

নূরুল ইসলাম নাহিদ

মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ নেই। অভিযোগ যা আছে তা মাউশির বিরুদ্ধে। এখানে ঘুষের লেনদেন হয়, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমি নিজেও হাতেনাতে দুর্নীতিবাজদের ধরেছি, শাস্তি দিয়েছি। জোট সরকারের সময় মাউশি ছিল ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করে। এতে মাউশির ঘুষ-দুর্নীতি কমেছে। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে যাচাই-বাছাই করে অ্যাকশন নেয়া হচ্ছে। পরিবর্তনে যে ধারা শুরু হয়েছে তা অব্যাহত থাকলে মাউশি দুর্নীতিমুক্ত হবে। ঘুষ লেনদেনও বন্ধ হবে।

 

বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ

সাবেক চেয়ারম্যান, টিআইবি

 

বাংলাদেশে বিভিন্ন সেক্টরে ঘুষের প্রচলন রয়েছে। ঘুষবাণিজ্যে পুলিশ সেক্টর শীর্ষে রয়েছে। এই সেক্টরে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না। এর পরই শিক্ষার অবস্থান। এখানেও ঘুষ না দিলে ফাইল নড়ে না। ঘুষ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে ফলাফল আশানুরূপ নয়। অর্থাৎ এই সংস্কৃতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। বরং ঘুষের প্রচলন সব সেক্টরে নতুন মাত্রা পেয়েছে। জাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকতে হলে এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

 

ড. আকবর আলি খান

সাবেক উপদেষ্টা, তত্তাবধায়ক সরকার

 

ঘুষ দিতে আমরা এখন অভ্যস্ত। বার্থ সার্টিফিকেট কিংবা ডেথ সার্টিফিকেট, স্কুলে ভর্তি কিংবা চাকরি কোনো কিছুইÑ এখন আর ঘুষ ছাড়া হয় না। ঘুষ দেয়া-নেয়াটা আমাদের সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। সরকারিভাবে কোনো ঘুষের হার না থাকলেও সরকারি অফিসগুলোতে সব বৈধ এবং অবৈধ কাজের জন্যই ঘুষের হার নির্ধারিত হয়ে আছে। সব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার আগে ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে জিহাদ তো দূরের কথা নিজেরাই আকণ্ঠ ডুবে যায় দুর্নীতিতে। ঘুষের প্রচলন সমাজকে কলুষিত করছে। এই দুর্বৃত্তায়ন থেকে আমাদের বের হয়ে আসা উচিত।

 

হাসান মাহমুদ খন্দকার

ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ

 

দেখেন ঢালাওভাবে পুলিশকে দোষারোপ করা ঠিক নয়। ঘুষ কালচার একদিনে গড়ে ওঠেনি। আবার এক দিনে দূর করাও সম্ভব নয়। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সমাজে এর প্রচলন রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে পুলিশকে নানাভাবে সহযোগিতা করতে নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য মডেল থানা গঠন করা হয়েছে। মানুষ এখন থানায় গিয়ে সেবা পাচ্ছে। ধানের মধ্যে চিটা থাকে। সব সেক্টরে ভালো-মন্দ লোক আছে। আমরা চেষ্টা করছি জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার। সে লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনী কাজ করছে। ঘুষবাণিজ্যের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে এসেছে এবং তদন্তে তা প্রমাণ হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

 

গোলাম রহমান

চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশন

 

ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক কাজ করছে না এ ধরনের তথ্য সঠিক নয়। আর দুদক ঠুঁটো জগন্নাথ নয়। দুদক তার নিজস্ব গতিতে কাজ করছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে লড়াই করে যাচ্ছে। দুদকের কর্মকর্তারা ঘুষ খাচ্ছেন এ রকম অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করে দোষী সাব্যস্ত হলে ব্যবস্থা নেয়া হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করছে। নতুন করে সাড়ে চারশ মামলা করা হয়েছে। দুদকে জনবল কম থাকায় যথাসময়ে তদন্তের কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। অচিরেই এর সুফল পাওয়া যাবে।

বিভাগ: প্রচ্ছদ

RSSকমেন্টস (0)

Trackback URL

আপনার মন্তব্য



ওয়েব সাইট

আপনার কমেন্টের সাথে যদি ছবি প্রকাশ করতে চান, এখান থেকে ছবি সংগ্রহ করুন.