গোল্ডেন সার্কাসের গল্প মনিরুজ্জামান খান
বেশিদিন হয়নি সিরাজগঞ্জ শহরে হাতির পিঠে চড়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রা করল একটি ছাত্র সংগঠন। হাতিটি আনা হয়েছিল ভাড়া করে। এটি ছিল একটি সার্কাস পার্টির হাতি। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, একটি সার্কাস দল হাতিটি ভাড়া দিয়েছিল বাড়তি আয়ের জন্য। আজকাল সার্কাসে যা আয় হয় তা যথেষ্ট নয়। যে কারণে প্রায় সময়ই সার্কাস দলকে খুঁজতে হয় বিকল্প পথ।
শহরে সার্কাস পার্টি তেমন একটা দেখা না গেলেও গ্রামকে কেন্দ্র করে সার্কাস এখনো মাঝে মধ্যেই চলে। তবে আগের মতো পড়ে না হইচই। কিন্তু সার্কাসের কথা শুনলে জ্যেষ্ঠ মানুষেরা অনেকেই ফিরে যান তাদের শৈশবে। চনমনিয়ে ওঠে তাদের মন।
জ্যেষ্ঠ মানুষ আমীর হোসেন তালুকদারের স্মৃতিতে কমলা সার্কাস এখনো উজ্জ্বল। ১৯৫১ সালে সিরাজগঞ্জে এসেছিল কমলা সার্কাস। গ্রাম এবং শহরের শত শত মানুষের ভিড়ে সিরাজগঞ্জ শহর হয়ে উঠেছিল উৎসবমুখর। বিএ কলেজের পাশে ছিল নৌকাঘাট। সার্কাস দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত নৌকা নিয়ে। গরুর গাড়ির যাত্রীও কম ছিল না। কমলা সার্কাসের হাতি ছিল ১৭টি সঙ্গে ঘোড়া, বাঘ, ভালুক এবং অন্য পশু-পাখি নিয়ে এক এলাহি কাণ্ড। তবে গ্লোবের ভেতর আড়াআড়ি করে চালিত দুটি মোটরসাইকেলের খেলা বিস্মিত করেছিল আমীর হোসেন তালুকদারকে। রিং-এর খেলা, জিমন্যাস্টিক্স, এক চাকার সাইকেল, শ্বাসর“দ্ধকর ত্রিফলার খেলা এখনো সিরাজগঞ্জের জ্যেষ্ঠ মানুষের মুখে মুখে। আর কমলা সার্কাসের সার্চ লাইটটি মিথ হয়ে আছে এখানকার মানুষের কাছে।
কমলা সার্কাস প্রভাব ফেলে সিরাগঞ্জের তরুণ-যুবকদের মধ্যে। কী শহর, কী গ্রাম প্রায় সব জায়গার তরুণরা সার্কাসের খেলাগুলো অনুশীলন করতে মেতে ওঠে। বিশেষ করে দত্তবাড়ি, চিথুলিয়া, রানীগ্রাম, জানপুর, চড়পাড়া, বাহিরগোলার কয়েকজন তরুণ রীতিমতো বাড়ি বাড়ি সার্কাস দেখাতে শুরু করে। একসময় বাহিরগোলার বিনোদনপ্রিয় মানুষ বরুণ সরকার এই তরুণদের সংগঠিত করে ১৯৫২ সালে তৈরি করেন একটি সার্কাস পার্টি। নাম দেন ‘গোল্ডেন সার্কাস’।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, প্রথম দিকে বড় বড় নৌকার পাল সংগ্রহ করে তারা প্যান্ডেল করতেন আর সেই প্যান্ডেলেই বিনে পয়সায় খেলা দেখাত গোল্ডেন সার্কাস। শুভগাছা গ্রামটি নদীতে বিলীন হলেও বাগবাটি, রহমতগঞ্জের মাঠ এখনো সেই সাক্ষ্য বহন করে। গোল্ডেন সার্কাস দলের সদস্য কাজী মফিদুল ইসলাম ফেরদৌস জানান, বেলকুচির দেলুয়া গ্রামের একটি সার্কাস পার্টি জামতৈলে সার্কাস দেখাতে গিয়ে অনেক বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তারা বাধ্য হয় এই সার্কাস দল ভেঙে দিতে। আর এ দলের সব উপকরণ কিনে নিয়ে বরুণ সরকার শুরু করেন পেশাদার সার্কাস।
গোল্ডেন সার্কাসের অন্য এক সদস্য কোরবান আলী শেখের পুত্র আবদুল হান্নান জানান, তার বাবার সার্কাস দল সম্পর্কে তেমন কিছু জানা না থাকলেও ছোটবেলায় তার বাবা তাদের নানা রকম সার্কাস দেখাত। গোল্ডেন সার্কাস দলটি খুব বেশিদিন টিকে থাকেনি। মাত্র ৪ বছরের মাথায় পেশাদার সার্কাস দল পরিচালনায় অদক্ষতা ও আর্থিক সঙ্কটে পড়ে দলটি বন্ধ হয়ে যায়। আলতাফ হোসেন সরকার, কোরবান আলী শেখ ও কাজী মফিদুল ইসলাম ফেরদৌস গোল্ডেন সার্কাসের এই তিন সদস্য এখনো জীবিত রয়েছেন।
সামাদের সার্কাস দল
সীমান্ত খোকন
সামাদের সার্কাস। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একমাত্র সার্কাস প্রতিষ্ঠান এটি। কিন্তু সরকারের অসহযোগিতা এবং পরিবেশের অভাবে মানুষের চাহিদা থাকা সত্তে¡ও দিনে দিনে মুখ থুবড়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক সামাদের বড় ছেলে সাজু জানান, কোনো জায়গায় খেলা দেখাতে গেলে সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনুমতির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেয়া সত্তে¡ও কাজ হয় না। সেখানে ঘুষ দেয়ার পরও অনুমোদনের ফাইলটি টেবিলে টেবিলে ঘুরতে থাকে। এদিকে স্কুল-কলেজের মাঠে খেলা দেখাতে গেলেও কর্তৃপক্ষ নিষেধ করেন। বর্তমানে কয়েকটি জীবজন্তু নিয়েই প্রতিষ্ঠানটির পথচলা। তারা কোনো জীবজন্তু কিনতে গেলে সরকারের সহযোগিতা না থাকায় সেখানেও নানা বাধার মুখে পড়ে। ফলে ইন্ডিয়া থেকে পাচার হওয়া জীবজন্তু যেমনÑ বাঘ, ভালুক, হাতিসহ বিভিন্ন জীব বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়।
ফলে জায়গা ভাড়া, স্টাফ বেতন, পরিবহন ভাড়াসহ মোটা অঙ্কের বাজেট গুনতে হয়, যা ক্রমেই সার্কাস মালিকদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
পাকিস্তান আমল থেকে শুর“ হওয়া এ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা কামনা করে একটি লিখিত আবেদন করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সার্কাস মালিক
আমরা বাঁচতে চাই
নিরঞ্জন সরকার
মালিক, দ্য লায়ন সার্কাস
যেসব অঞ্চলে দর্শক সমাগম বেশি হয় সেসব অঞ্চলে আমাদেরকে প্রদর্শনীর অনুমতি দেয়া হয় না। সরকার বোধহয় চায় আমরা ব্যবসাপাতি গুটিয়ে ফেলি। নয়তো কিছু হলেই আমাদের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে কেন? বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে আমাদের শো করার অনুমতি মেলে না, অথচ ওই অঞ্চলে প্রচুর দর্শক। অনুমতি না দেয়ার কারণ হিসেবে আমাদের জানানো হয়, যেখানে সার্কাস হয় সেখানে নাকি অসামাজিক কার্যকলাপ হয়। এছাড়া সার্কাসেও নাকি মেয়েদের বাজেভাবে দেখানো হয়। হাতেগোনা কয়েকজনের জন্য আমরা সবাই শাস্তি পাব এটা কেমন কথা?
যে জায়গায় আমাদের অনুমতি মেলে সেখানকার প্রশাসন থেকে শুর“ করে ক্যাডার পর্যন্ত সবাইকে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয়। সরকার যদি এসব ব্যাপারে একটু নজর দিত আমাদের জন্য ভালো হতো। মাঝে মধ্যে দেখি, কোনো কোনো টেলিভিশনে বিদেশি সার্কাস দেখায়। তারা যদি আমাদের দেশি সার্কাস দেখাত তাহলে আমাদের সার্কাস দলগুলোর জন্য ভালো হতো। আর বিদেশি সার্কাসে মেয়েদের যে পোশাক থাকে তার তুলনায় আমরা অনেক বেশি সামাজিক পোশাক পরিধান করে খেলা দেখাই।
আমার খুব কষ্ট হয় এটা ভেবে যে, আমার পরে সম্ভবত আমাদের বংশের আর কেউ এই ব্যবসা ধরে রাখবে না। বড় মেয়ে সোনালী ব্যাংকে চাকরি করে। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে। এই ব্যবসায় তারা ¯^ভাবতই আগ্রহী হবে না।
জেলা প্রশাসক অনুমতি দেন না
সাফদার আলী
স্বত্বাধিকারী, দি নিউ সুমী সার্কাস, সৈয়দপুর
আমরা এখন হাতেগোনা কয়েকটি সার্কাস দেশে টিকে আছি। আমার জানা মতে, তাদের সংখ্যা ১৩-এর বেশি নয়। একটা সার্কাস দলের মালিক হিসেবে আমাকে অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। এক্ষেত্রে ভোগান্তি যতটা হয় তার প্রায় সবটুকুরই ভুক্তভোগী আমি। আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে অনুমতি নেয়া। আমাদের কোনো এলাকায় প্রদর্শনী করতে হলে সে জেলার জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু জেলা প্রশাসকরা অনুমতি দেন না। তারা নানাপ্রকার অজুহাত দেখান। কখনো বলেন, এখন এসএসসি পরীক্ষা চলছে, এখন সার্কাস হবে না। কখনো বলেন, ওই এলাকাটা অনিরাপদ, সার্কাস হবে না। এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রি পরীক্ষা, রমজান মাস ইত্যাদি সময়ে তো সার্কাস করতে কোনো প্রকার অনুমতি দেয়া হয় না। বলা হয়, পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার সমস্যা হবে। কিন্তু এ সময় তো সিনেমা হল বন্ধ থাকে না। ডিশের লাইন বন্ধ থাকে না, ভিসিআর বন্ধ থাকে না। যে কারণে আমাদের এখন বছরের বেশিরভাগ সময় বসেই কাটাতে হয়। দলের ৫০ থেকে ৭০ জন মানুষ যে কারণে বেকার হয়ে পড়ছে। আপনারাই বলুন এই বন্ধের সময় তারা কী করবে? তারা রোজগার করতে পারে না, তাদের পরিবারের সদস্যরাও যে কারণে এ সময় অভাবের তাড়নায় অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করে।
সরকারের বক্তব্য সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বে। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে তো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাটাও করতে হবে। না হলে মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে খারাপ কাজে লিপ্ত হবে, নেশায় আসক্ত হয়ে পড়বে। সেটা কি খুব ভালো হবে দেশের জন্য?
বিভাগ: প্রচ্ছদ



