কয়েকটি সার্কাস দলের কথা দি রয়েল বেঙ্গল সার্কাস সুশান্ত ঘোষ
লক্ষ দাসের সার্কাস। এ নামেই দলটি পরিচিত বাংলাদেশে। কারণ এর মালিক লক্ষ দাস। কিন্তু দলটির মূল নাম ‘দি রয়েল বেঙ্গল সার্কাস’। সার্কাস লক্ষ দাসের কাছে শুধু ব্যবসা ছিল না, ছিল এক ধরনের নেশা। হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে নিজের সেরা খেলাটি যখন দেখাতেন, তখন আনন্দে মন ভরে উঠত। সেই নির্মল আনন্দ ছড়িয়ে দিতেন গ্রাম থেকে গ্রামে, জনপদ থেকে জনপদে।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার উত্তর পালরদী গ্রামে কয়েকজন যুবককে সংগঠিত করে ল²ণ দাস ১৯৪৮ সালে এই সার্কাস দলটি তৈরি করেন। কয়েকজন যুবকের এই দলটিতে এখন ৮২ জন মানুষ বিভিন্নভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের যে কয়টি হাতেগোনা সার্কাস দল রয়েছে তার মধ্যে এই দলটিই সবচেয়ে বড় ও সার্কাস নৈপুণ্যে সেরা দল। কিন্তু যার নামে সার্কাস সেই মানুষটি আজ নেই। ১৯৭১ সালে নিজের প্রিয় হাতি বাতাসীর সঙ্গে ল²ণ দাসকেও পাকিস্তানি বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। স্ত্রী নীলা রানীকে বেয়নেট চার্জ করে ট্রাঙ্ক ভর্তি সোনা, টাকা লুট করে নিয়ে যায় তারা। স্বাধীনতার পর এই বিধ্বস্ত সার্কাস আবার গড়ে তুলেছেন তার দুভাই বীরেন্দ্রচন্দ্র দাস ও অরুণচন্দ্র দাস।
সার্কাস দলে রয়েছে দুটি পোষা হাতি মোহনমালা-মধুমালা। রয়েছে ভালুক, ঘোড়া, ছাগল, এমু পাখি, কুকুরসহ নানা জীবজন্তু। এসব জীবজানোয়ার থাকলেও অতীতের রয়েল বেঙ্গল টাইগার ফিরে আসেনি এ সার্কাস দলে। ১৯৭১ সালে শুধু পোষা হাতি নয়, খাঁচার ভেতরে বাঘ, ভালুকসহ পোষা বিভিন্ন প্রাণীকে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। সার্কাস মালিকের শহীদ হয়ে যাওয়া, পোষা প্রাণীদের হত্যার পরও থেমে নেই রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের পথচলা। ১৯৪৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত গ্রাম-শহরে লাখ লাখ মানুষকে নির্মল আনন্দ জুগিয়ে চলেছে এ দলটি।
যেভাবে গড়ে ওঠে লক্ষ দাসের সার্কাস
স্কুলে থাকতেই ল²ণ দাস সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক কসরতও দেখাতেন। একবার বাবার সঙ্গে রাগ করে ঢাকায় মেসো সাধু চরণ সরকারের কাছে চলে যান। মেসোর ছিল ‘দি সাধনা লায়ন সার্কাস’। অল্প দিনেই সার্কাস দলে ল²ণ দাসের নৈপুণ্য ছড়িয়ে পড়ে। তবে মেসোর দলে বেশি দিন থাকেননি। বাড়ি এসে কয়েক যুবককে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘দি রয়েল বেঙ্গল সার্কাস’। সেই থেকে শুরু। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু দক্ষ গুণী শিল্পীদের জড়ো করেন তিনি। সেই সঙ্গে হাতি, বাঘ ও ভালুকসহ বেশ কিছু প্রাণীকেও পোষ মানিয়ে ফেলেন। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের সুনাম।
রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের আকর্ষণীয় খেলা
সাধারণত এক চাকা, দুই চাকা, হাই সাইকেল, ব্যাম্বু ব্যালেন্স, রিং নৃত্য, অগ্নি রিং-এ জাম্প, ডেগার নিক্ষেপ, ফ্লাইং, ফ্লাইং ট্রাপিজ, অ্যাক্রোবেটস, ম্যাজিক, হাতির ফুটবল খেলা, ভালুক-কুকুর-ছাগলের খেলা রয়েছে এই সার্কাসে। তবে শহীদ লক্ষ দাসের কয়েকটি খেলা দেখান তার ভাই অরুণচন্দ্র দাস। এর মধ্যে চোখ দিয়ে ও গলায় রড বাঁকানো, ভারোত্তোলন ও লোহার গ্লোবের মধ্যে মোটরসাইকেল চালনা। ২০ ফুট ব্যাসের লোহার গোলকে মোটরসাইকেল যখন ঘুরতে থাকে দর্শক শিহরিত না হয়ে পারে না।
১৯৭১ : শহীদ হলেন ল²ণ দাস
১৯৭১ সালে এপ্রিলের শুরুতে পিরোজপুরের মাটিভাঙায় ছিলেন ল²ণ দাস। ২৫ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী বরিশালে প্রবেশ করে। এর কয়েক দিন পরে গৌরনদীতে ক্যাম্প করে তারা। ল²ণ দাস পোষা বাঘ ভালুকদের বাড়িতে রেখে শুধু প্রিয় হাতি বাতাসীকে নিয়ে কোদাল ধোয়ার মিস্ত্রি বাড়িতে ওঠেন। স্থানীয় এক রাজাকার গৌরনদীর পাক আর্মির ক্যাম্পে এ খবর পৌঁছে দেয়। পাকসেনারা শব্দ যাতে না হয়, সেজন্য বিলের মধ্যে দিয়ে স্পিডবোট না চালিয়ে বাইতে বাইতে আসে। পাকিস্তানি আর্মি কোদাল ধোয়ার মিস্ত্রি বাড়িতে গিয়ে পলায়নরত ল²ণ দাসের পরিবারকে খুঁজে পায়। প্রিয় হাতিকে বাঁচাতে ল²ণ দাস বেশি দূরে পালাতে না পারায় পাকিস্তানি আর্মি তাকে খুঁজে পেয়ে গুলি করে হত্যা করে। স্ত্রী নীলা রানীর হাতেও বেয়নেট চার্জ করে। ল²ণ দাসকে হত্যার পর হাতিটিকেও গুলি করে হত্যা করে বাগদা স্কুল সংলগ্ন এলাকায়। হাতির চিৎকারে আশপাশের গ্রাম কেপে উঠলেও প্রাণের ভয়ে কেউই এগিয়ে আসতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে মৃত হাতির মাংস পঁচা গন্ধ কোদাল ধোয়া গ্রামসহ কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। হাতির সঙ্গে তার প্রভুর জীবন দান বাংলাদেশের সার্কাস ইতিহাসে বিরল। এভাবে কারণ ছাড়াই সার্কাসের প্রাণী হত্যার ঘটনাও বিরল। ১৯৭১ সালে ১৬ জুনের এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাতিটি তার প্রভুর আর্তচিৎকার শুনে ক্ষেপে যায়। পাকিস্তানি আর্মি হাতিটিকে গুলি করে হত্যা করে।
সার্কাসের একাল সেকাল
সার্কাস দলের অন্যতম পরিচালক শহীদ ল²ণ দাসের ভাই বীরেন্দ্রচন্দ্র দাস জানান, পাকিস্তান আমলে সার্কাস বলতে নির্মল আনন্দকেই বোঝাত। তখন সার্কাস দেখানোর অনুমতি সহজেই মিলত। দর্শক ছিল প্রচুর। সে সময় রোজার সময়ও সার্কাস দেখানো হতো। বাংলাদেশের প্রথম দিকেও এ রেওয়াজ ছিল। এছাড়া বছরের ১০-১১ মাস পর্যন্ত খেলা দেখানো হতো। সার্কাস নিয়ে কোনো বিরূপ পরিবেশ ও পরিস্থিতি ছিল না। সবাই একে নির্মল বিনোদন হিসেবেই গ্রহণ করত। তখনকার দিনে এত ঘন ঘন পরীক্ষা হতো না। ফলে পরীক্ষার অজুহাতে সার্কাস বন্ধ থাকত না। সার্কাস সরকারি বা ব্যবসায়িক সমিতির মধ্যে হতো। কোনো গণ্ডগোল, বিশৃক্সখলা ছিল না। ফলে সার্কাসে কি মধ্যবিত্ত কি নিম্নবিত্ত ঘরের উৎসাহী, দক্ষ মেয়েরা আসত। এসব কারণে সার্কাস দেখতে প্রচুর ভিড় হতো। এখানকার মতো তখন সার্কাসের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রা, জুয়া বা ভ্যারাইটিজ শোর নামে অশ্লীলতা ছিল না। বর্তমানে সার্কাস সাধারণত বিভিন্ন যাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে প্রদর্শন করায় এর বিরোধিতায় একদল মানুষ বাইরে মিছিল-মিটিং করে। সার্কাসের মেয়েরাও বর্তমানে অনেক সময় হামলার শিকার হন। ফলে দক্ষ মেয়ে-খেলোয়াড়রা সহজে এর সঙ্গে যুক্ত হতে চায় না। অথচ সার্কাসকে টিকিয়ে রাখতে হলে সারা বছর খেলা প্রয়োজন। পেশাগত প্রয়োজনে এমনকি দক্ষতা টিকিয়ে রাখতেও এর কোনো বিকল্প নেই।
পৃষ্ঠপোষকতা নেই
সার্কাস সামাজিক আনন্দের উৎস হলেও সার্কাসকে কি সরকারিভাবে, কি সামাজিকভাবে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় না। ফলে গ্রামীণ জীবনের অপার আনন্দের এই উৎসটি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সার্কাসের পশুপাখিদের বাঁচিয়ে রাখতে প্রচুর যতœ ও চিকিৎসা প্রয়োজন। এছাড়া তাঁবু ও গ্যালারি করতেও প্রচুর খরচ হয়ে যায়। সার্কাসকে যুগোপযোগী করার জন্যও কোনো পরামর্শ-সহায়তা মেলে না। বর্তমানে যে কোনো উদ্যোগে ঋণ পাওয়া গেলেও সার্কাস দলকে আধুনিক করতে কোনো ঋণ সহায়তা মেলে না। এছাড়া ইন্স্যুরেন্সের আওতায় রয়েল বেঙ্গল সার্কাসকে নেয়া হয়নি বলে প্রাকৃতিক যে কোনো বিরূপ সময় দলটিকে প্রচুর লোকসান দিতে হয়।
বারবার বিধ্বস্ত রয়েল বেঙ্গল সার্কাস
বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে রয়েল বেঙ্গল সার্কাস। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলায় এই সার্কাসটি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সার্কাসের পশুদের মেরে ফেলে পাকিস্তানি আর্মি। গৌরনদীতে মুক্তিযোদ্ধা নিজাম বাহিনীর প্রধান নিজামউদ্দিন প্রথম ১৯৭২ সালে তাঁবু দিয়ে সহায়তা করে এই সার্কাস দলটিকে। এছাড়া ১৯৭৫ সালে বরিশালের জেলা প্রশাসকও সাহায্যের হাত বাড়ান। সিডরের সময় এই সার্কাস দলটি পুনরায় বিধ্বস্ত হয়। এছাড়াও গত বছরের ঝড়েও সার্কাস দলটি গৌরনদীতে বিধ্বস্ত হয়। বারবার ঝড়ে, বন্যায়, হামলায় বিধ্বস্ত হলেও আবার ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে জেগে উঠে এই সার্কাস দলটি। দলের অন্যতম পরিচালক অরুণচন্দ্র দাস জানান, এরপরও বাংলাদেশে রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের খ্যাতি গড়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালে শিল্পকলা একাডেমীতে সার্কাস দেখিয়ে প্রশংসাপত্রসহ ২ লাখ টাকার অনুদান দেয় সরকার। ১৯৮০ সালে এই দলটি শ্রেষ্ঠ দল নির্বাচিত হয়ে প্রেসিডেন্ট পদক পায়।
বিরূপ প্রচার-প্রভাব পড়ছে সার্কাসে
নানা রকম ধর্মীয় কথা বলে সার্কাসের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের পরিচালক বীরেন্দ্রচন্দ্র দাস। বিগত জোট সরকারের আমলে এই প্রচারণার কারণে প্রশাসনের কাছে থেকে সার্কাস দেখানোর অনুমতি মিলত না। ফলে সে সময়ে ১১ মাস সার্কাস দলটিকে বসে কাটাতে হয়। দীর্ঘদিন বসে থাকায় খেলোয়াড়রা দক্ষতা হারিয়ে ফেলে। সার্কাস দলটিকে প্রচুর লোকসান দিতে হয়।
সার্কাসের জীবজানোয়ার সংগ্রহে সমস্যা
সাধারণত সিলেট ও চট্টগ্রাম থেকে বাচ্চা হাতিদের সংগ্রহ করা হয়। বর্তমান দলের দুটি হাতি মোহনবালা ও মধুবালাকে সংগ্রহ করা হয়েছিল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে। এছাড়া অন্য জীবজানোয়ারদের একটি অংশ বিভিন্ন সার্কাস দল থেকে ও ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে কেনা হয়েছে। এসব জীবজানোয়ারকে রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ও খাবার দিতে প্রচুর সময় ও অর্থ খরচ হয়। কারণ জীবজানোয়ারই একটি সার্কাস দলের মূল প্রাণ। এদের বাঁচিয়ে রাখা দুরূহ।
সার্কাসকর্মীদের দিনযাপন
এক সময় সার্কাস দেখতে যে পরিমাণ দর্শক আসত বর্তমানে এত দর্শক নেই। এছাড়া বিরূপ পরিবেশের কারণে রুচিবোধসম্পন্ন দর্শকরা সার্কাস দেখতে আসতে উৎসাহ বোধ করেন না বলে মন্তব্য করেন রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের ক্যাশিয়ার পরিমলচন্দ্র দাস। তার মতে, সার্কাস দলের খরচও বেড়ে গেছে বহুগুণ। পাকিস্তান আমলে টিকেট ছিল ৮ আনা-১০ আনা। স্বাধীনতার প্রথম দিকে টিকেট ছিল ১ টাকা, ২ টাকা ও ৫ টাকা। বর্তমানে টিকেট ৫০ টাকা, ৭০ টাকা ও ১০০ টাকা। সব মিলিয়ে দলের খরচ উঠিয়ে আনাই কঠিন। অরুণচন্দ্র দাস বলেন, বিগত বছরে সার্কাস দলটি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ার পাশাপাশি অধিক সংখ্যক শো দেখাতে না পারায় দলটি লোকসান পড়ে। তিনি জানান, বর্তমান দলটিতে সব মিলিয়ে ৮২ জন মানুষ যুক্ত আছেন। এর মধ্যে খেলোয়াড়দের সংখ্যা ৪০ জন, যার অধিকাংশই মেয়ে। এছাড়া আছে ছোট ছেলেমেয়েরা।
বর্তমানে অ্যাক্রোবেটসের প্রতিজনকে দৈনিক ১২শ টাকা অন্য খেলোয়াড়দের মাসে ৬-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দিতে হয়। সঙ্গে থাকা ও খাওয়া খরচও সার্কাস দলটিকে জোগাতে হয়।
এছাড়া প্রতি প্রদর্শনী থেকে ৫-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়োজকদের দিতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। জেলা প্রশাসকের এলআর ফান্ড, আয়োজকদের প্রচুর অর্থ দেয়ার পরও দলীয় নেতা-কর্মীদের ফ্রি সার্কাস দেখাতে বাধ্য করা হয়। এসব কারণে সার্কাস এখন আনন্দ নয় বরং ‘হাঙ্গামা’। ফলে বাংলাদেশের সার্কাস দল ক্রমশ কমছেÑ এর দর্শকও কমছে। দলটির পরিচালক অরুণচন্দ্র দাসের মতে, সার্কাসও এখন দলীয় ব্যাপার। নানা কারণে তা নির্মল আনন্দ দিতে পারছে না। সার্কাস দলের সঙ্গে নিত্যনতুন আইটেম ও খেলোয়াড় যুক্ত হচ্ছে না। সার্কাসের আর্কষণ গড়ে উঠছে না সামাজিক-দলীয়-ধর্মীয়-রাষ্ট্রিক বাধার কারণে।
বিভাগ: প্রচ্ছদ



